Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০১৯ , ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (92 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১৭-২০১৩

আমার বাবার মত মানুষটা

সিয়াম আনোয়ার



	আমার বাবার মত মানুষটা

হুমায়ুন আহমেদ স্যারের একটি বইও আমি আজ পর্যন্ত পড়িনি। একজন লেখক, চলচ্চিত্রকার কিংবা শিক্ষক হুমায়ুন আহমেদকে আমি চিনি না। কিন্তু ব্যক্তি হুমায়ুন আহমেদকে চিনি জানি খুব ভালো করে। একজন সন্তান যেমন চেনে তার বাবাকে।

হুমায়ুন আহমেদ আমার বাবার মতই ছিলেন। ছোটবেলায় আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি। এই মানুষটার মধ্যে আমি খুঁজে পেতাম বাবার সাথে ছেলের সাথে সম্পর্কের মাহাত্ম। অনেক বেশি সাবলীল ছিলাম ওনার সাথে। এত কাছের ছিলাম যে সবকিছুই স্যারের সাথে শেয়ার করতাম। কখনো যদি আমি খুনও করতাম তবে সে কথা শেয়ার করার মত আমার জীবনে মানুষ ছিলেন একটাই। তিনি হুমায়ুন আহমেদ।
 
১৯ জুলাই দিনটা আমার কাছে বহুদিন অন্যরকম আনন্দের দিন ছিল। জাকজমকপূর্ণ না হলেও আনন্দের সঙ্গে কাটত এই দিনটা। আমার আর তানিয়ার বিবাহবার্ষিকী এই দিনে। আর ঠিক এই দিনেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন আমার বাবার মত মানুষটা।
 
গত একটা বছর সব ভালো লাগায়, সব কাজে মিস করেছি হুমায়ুন স্যারকে। পৃথিবীর কিছু বিশাল মনের মানুষের একজন হুমায়ুন স্যার। তার সাথে কাটানো নানান রঙের আনন্দের মুহুর্তগুলো এখন মন খারাপ করে দিচ্ছে। মনে পড়ছে এলোমেলো টুকরো টুকরো স্মৃতি।
 
তার সাথে প্রথম পরিচয় আর আলাপ ছিল একদম সাদামাটা। খানিকটা বিরক্তিরও। সেই সময়গুলো আজ কেমন অন্য অনুভুতি হচ্ছে। ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রথম দেখেছিলাম। ভর্তি হই হই করেও পরে চট্রগ্রাম চলে গিয়েছিলাম। স্যারের সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হয় যখন আমি এলআরবির কিবোর্ডিস্ট। হাই হ্যালো’র ওপর কথা হয়েছিল সোনারগাঁও হোটেলে। 
 
তারপর পেরিয়ে গেছে অনেকদিন। আমি বই পড়ার মানুষ না। হুমায়ুন আহমেদ বড় মানুষ এতটুকু জানি। কিন্তু তেমন কোন আগ্রহ কখনোই ছিল না। তানিয়াকে বিয়ে করার পর ওর মুখে হুমায়ুন আহমেদের কথা প্রায়ই শুনি। একদিন দেখা করতে যেতে বললেও যাওয়ার ব্যপারে আগ্রহবোধ করিনি। 
 
‘শ্যামলছায়া’ ছবির শুটিং চলছিল কাপাসিয়ার কাছে। তানিয়া অভিনয় করছে। আমাকে বললো সন্ধ্যার দিকে গিয়ে ওকে নিয়ে আসতে। গেলাম। ততদিনে আমার বেশ কটি গান হিট হয়েছে। অনেকেই চেনে জানে। শুটিং চলছে বড় একটি নৌকার ওপর। বিশেষ কয়েকজন ছাড়া আর কারো ওঠার অনুমতি নাই। শাওন আমাকে দেখে নৌকার দিকে ডাকল। উঠে দাঁড়িয়েছি। এমন সময় পেছন থেকে হুমায়ুন আহমেদ এলেন। সালাম দিলাম। আমাকে দেখেই ধমক দিয়ে উঠলেন, “এই তুমি এখানে কেন?, নামো। এখানে উঠেছ কোন সাহসে?” আমি নেমে পড়লাম।
 
প্রচন্ড অপমানিত বোধ হচ্ছিল। পরিস্থিতি খুবই থমথমে। স্যারকে শাওন বললো ও তানিয়ার স্বামী। আমি চলে আসব। কিছুক্ষণ পর আমাকে ডাকলেন হুমায়ুন স্যার। বললেন “আমি তোমাকে চিনতে পারিনি। একজন লোককে অপছন্দ করি। আমি ভেবেছি সে।” এই বলে আমাকে হাত ধরে টেনে বসালেন। বললেন ওনাদের সাথে নুহাশ পল্লীতে যেতে।
আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে ভান করে ছিলাম। কিন্তু মনে মনে খুবই অপমানিত বোধ করেছি। রাতে বাসায় ফিরে তানিয়াকে বললাম ‘হুমায়ুন আহমেদ মানুষ হিসেবে তো ভালো না। অপছন্দ করলেই কি একজন মানুষকে এভাবে ধমক দিতে পারে?
 
তারপর অনেকবার বলার পরও আমি কখনো বাসায় তো দূরের কথা সামনেও যাইনি। পহেলা বৈশাখে চ্যালেঞ্জার আমাকে কৌশলে ঘর থেকে বের করে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে চলল। একটানে নুহাশ পল্লী। সেখানে দেখি বিশাল আয়োজন। ঢোলতবলা নিয়ে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর স্যার এসে আমাকে ভেতরের দিকে নিয়ে গেলেন। বললেন তোমাকে বরণ করার জন্য আজ সবাই দাঁড়িয়ে ছিল।
 
সেদিন রাতভর ছিলাম নুহাশ পল্লীতে । গান গেয়েছি। সেই শুরু স্যারের সাথে আত্মিক যোগাযোগ। যে সম্পর্ক বন্ধু কিংবা সন্তান-পিতার সম্পর্কে এসে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৯ সালে আমার ছোট বাচ্চার জন্মের দু’তিনদিন আগে আমাকে ডাকলেন। গেলাম। আমাকে ওনার হাতে আঁকা একটা ছবি দিলেন। একটা মোরগ ঠোকর দিয়ে ডিম থেকে বাচ্চা বের করছে। বললেন, ‘তুমি মোরগ’। তাই তোমাকে দিলাম। ফেরার পথে বললেন, যদি টাকার দরকার হয় আমাকে বলবে। যত লাগে আমি দেব। যদি প্রয়োজন হয় আমি ১০০টা বইয়ের আগাম টাকা নিয়ে তোমার জন্য টাকা জোগাড় করব।
 
সামনে কিছু বলতে পারিনি। সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার চোখে পানি এসে গেল। কত বেশি ভালোবাসা আমার প্রতি, আমার পরিবারের প্রতি।
 
নিয়মিত দেখা হত স্যারের সাতে। স্যারের বাসায় চলে যেতাম। ৭-১০ দিন না গেলে এসএমএস করতেন ‘সেন্ড মি এ ফটো। তোমরা তো ব্যস্ত। তোমাদের দেখতে পাই না। ছবি পাঠালে দেখতে পাব’। সেইসব সময় আজ বড্ড কষ্ট দেয়। একজন মানুষ হুমায়ুনের কাছে শিখেছি মানুষ হওয়ার শিক্ষা।
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে