Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-০৬-২০১৯

হুয়ান ভেনাডো দ্বীপের সৈকতে সবুজ ডিঙি

মঈনুস সুলতান


হুয়ান ভেনাডো দ্বীপের সৈকতে সবুজ ডিঙি

গোধূলি গাঢ় হয়ে আসতেই আমরা এসে পৌঁছি নিকারাগুয়ার ইসলা হুয়ান ভেনাডো দ্বীপের তটে। ম্যানগ্রোভ বনের সবুজে ছলকে উঠছে বেলাশেষের ক্রিমসন ছটা। ভাটির টানে জল নেমে যাচ্ছে দ্রুত, বেরিয়ে পড়ছে শ্বাসমূল। আমি খানিক দূরের এক শান্ত জলের লেগুনে দ্বীপের একাংশের ঝুঁকে পড়া ছায়ার দিকে চোখ রেখে বর্ণাঢ্য এক গোধূলির প্রত্যাশায় কায়মনে উইশ করি।

সমুদ্রসৈকত থেকে কায়াক জাতীয় বোটটি হাঁকিয়ে এখানে আসতে সময় লেগেছে মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিট। আমি বোটে মেরিন গাইড ক্রিসটেলার পাশে বসি। সে ফিসফিসিয়ে বলে, 'ওলা বা হ্যালো।' আমি জবাব দিই, 'ওহ্‌, ইয়েস, হাই।' তখনই বোটের সামনে, তবে বেশ দূরে, দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো বঙ্কিম আর্চ তৈরি করে লাফিয়ে ওঠে একটি ডলফিন। মনে হয়, ডলফিনটি চলছে সপরিবারে দারাপুত্র নিয়ে। তার সঙ্গে সঙ্গে একই কেতায় লম্ম্ফ দেয় আরেকটি স্ত্রী ও শিশু ডলফিন। এই স্পেক্টাকুলার দৃশ্যপট স্থায়ী হয় মাত্র মিনিট দুয়েক।

নৌযাত্রায় আর তেমন কিছু ঘটে না। তবে হঠাৎ করে যেন জল ফুঁড়ে ভেসে ওঠে তীব্র সবুজ রঙের একখানা বেজায় ছোট্ট ইঞ্জিনহীন কায়াক। দেখতে দেখতে নাওখানা বাতাসে পাল ফুলিয়ে ভেসে আসে আমাদের বোটের কাছাকাছি। পালের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আগেকার যুগের নাবিকদের মতো জমকালো ক্যাপ মাথায় এক অল্পবয়সী যুবক। তবে শর্টস পরা তার পেশিবহুল ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ আদুল থাকায় ছেলেটিকে বেজায় হাস্যকর দেখায়। পাটাতনে সিঁটিয়ে বসে আছেন রাশভারি চেহারার তুলনামূলকভাবে বয়স্ক এক মহিলা। আমি তাকে লক্ষ্য করে ওয়েভ করলে তিনি শোভনভাবে হেসে হাত নাড়েন। ছেলেটির সঙ্গেও আমার চোখাচোখি হয়, সে একহাতে নাবিকের টুপিটি খুলে জলদস্যুর কায়দায় আমাদের বাঁও করে। ইঞ্জিন হাঁকিয়ে আমাদের বোটখানা সবুজ কায়াকটি ছাড়িয়ে তরতর করে এগিয়ে যায়। আমি ফিরে তাকাই, আর ভাবি, পাল তুলে, নাও বেয়ে এ অসমবয়সী যুগল যাচ্ছে কোথায়?

দ্বীপের কাছাকাছি এসে মাঝি ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে বৈঠা মেরে সুনসান জলে ভাসে কিছুক্ষণ। তখনই বিচিত্র ঘটনাটি ঘটে, সমুদ্রের থির জলে যেন মঞ্চস্থ হয় আমার জীবনের সবচেয়ে অবাক করা দৃশ্যপট। নৌকা থেকে বেশ খানিকটা দূরে- জলের সারফেসে প্রথমে মুখ উঁচিয়ে লাফিয়ে ওঠে এক জোড়া সিহর্স বা সিন্ধুঘোটক। সিহর্স দুটি মৃদু ঢেউয়ে দুলে দুলে যেন ড্যান্স করছে। দেখতে দেখতে উঁকি দিয়ে উঠে দাঁড়ায় আরও দুটি সিহর্স। তারা পরস্পরকে ঘিরে চোখে চোখ রেখে, মনে হয়, নীরবে আদান-প্রদান করছে হৃদয়ে জমে থাকা কোনো না-বলা কথা। ক্রিসটেলা এক্সাইটেড হয়ে অস্ম্ফুটে বলে, 'অহ ডিওস্‌, সন তান লিনডো ই এনকানতাডোর... বা, ওহ্‌ মাই গড, দে আর সো কিউট অ্যান্ড লাভলি।' তার কথা শুনে আমি প্রশ্ন করি, 'ইজ দিস আ কোর্টিং রিচ্যুয়েল অব সিহর্সেস?' বিয়াংকা জবাব দেয়, 'নট অ্যাকজ্যাক্টলি আ কোর্টিং রিচ্যুয়েল। সিহর্সরা জোড় বাঁধে সারাজীবনের জন্য। হুয়ান ভেনাডো দ্বীপের আশপাশে এ সময় সিহর্সদের আবেগপ্রবণ হয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নৃত্য করা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়।' আমরা দ্বীপের তটরেখার সমান্তরালে ভেসে যাই আরও খানিকটা। ক্রিসটেলা পাশ থেকে ফের বলে, 'সো, ইউ লাইকড ড্যান্সিং সিহর্স?' 'ইয়েস, দ্যাট ওয়াজ কুল' বলে প্রতিক্রিয়া জানালে সে বলে, 'উইথ সাম গুডলাক, আমি হয়তো তোমাকে ব্লু মারলিন মাছের পরস্পরের কাছাকাছি হওয়ার ব্যাপারটা দেখাতে পারব।'

আমাদের বোট চলে আসে ম্যানগ্রোভ ঝোপের কিনারে। দেখি- নোঙর করা বেশ বড়সড় একটি বোট থেকে নেমে বুকজলে শরীর ডুবিয়ে ব্যাগ-বস্তনি মাথার ওপর তুলে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে ছেলেমেয়ে মিলিয়ে জনা সাতেক পর্যটক। আমরা তাদের লক্ষ্য করে হাত নাড়ি। ক্রিসটেলা ব্যাখ্যা করে বলে, এরা গাছের ডালে হ্যামোক ঝুলিয়ে রাত কাটাবে। কেউ কেউ হয়তো রেকর্ড করবে শ্বাসমূলের বনানীতে ক্রমাগত আওয়াজ করে যাওয়া পতঙ্গের ধ্বনি। আর খুব ভোরে যখন সমুদ্র-কচ্ছপরা ডিম পাড়তে চরে উঠবে, গাছের উচ্চতায় শুয়ে-বসে তখন সহজেই ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করবে তাদের তৎপরতা। আমাদের বোটম্যান ল্যান্ডিং খুঁজতে খুঁজতে ভেসে আসে আরেকটি ওপেনিংয়ে। হঠাৎ করে ট্যুরগাইড সিনিয়র ডিগমারের চোখে পড়ে বিপজ্জনক প্রাণীটি। তিনি আর্তস্বরে বলে ওঠেন, 'দ্যাটস্‌ আ রিয়েল হ্যাজার্ড, এখানেও ল্যান্ড করা যাবে না দেখছি।' একটি মেটে রঙের কুমির ওপর থেকে অত্যন্ত শ্নথগতিতে বুকে হেঁটে যাচ্ছে জলের দিকে। দৃশ্যটি আমার মাঝেও ছড়ায় রীতিমতো আতঙ্ক। ক্রিসটেলা অস্ম্ফুটে বলে, ' ওহ্‌ নো, গেট দ্য হেল আউট অব হিয়ার।'

জোরে বৈঠা মেরে মাঝি অতঃপর আমাদের নিয়ে আসে দ্বীপের অন্যদিকের একটি ল্যান্ডিংয়ে। হাঁটুজল ভেঙে আমাদের মালসামান নিয়ে আমরা ডাঙায় উঠি। দেখি, সবুজাভ গাছের তলা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে নিঃসঙ্গ একটি পাখি দাঁড়িয়ে পড়ে আমাদের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে। বেলাশেষের আলো পড়ে অজানা খেচরটির আশপাশ সোনালি আভায় মায়াময় হয়ে আছে।

হাঁটুজল ভেঙে আমাদের মালসামান নিয়ে আমরা ডাঙায় উঠি। এ জায়গার সুনসান নীরবতা ভেঙে জংলা ঝোপঝাড় অতিক্রম করে আমরা চলে আসি দ্বীপের ভেতরবাগে। হুয়ান ভেনাডো দ্বীপটি সম্পূর্ণ নির্জন নয়। এখানে সিটার্টোল হ্যাচারি বলে সমুদ্র-কচ্ছপদের দেখভালের জন্য আছে ছোট একটি স্থাপনা। জনা দুয়েক প্রকৃতি সংরক্ষণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেয়ারটেকারগোছের মানুষ এ দ্বীপে স্থায়ীভাবে বাস করেন। এদের একজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সিনিয়র ডিগমার আমাদের জন্য রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত করেন। ছনে ছাওয়া খোলামেলা কাঠের প্ল্যাটফর্মে স্লিপিংব্যাগ ইত্যাদি রেখে বুঝতে পারি- এখানেই আমরা সমবেতভাবে রাত কাটাতে যাচ্ছি।

বিয়াংকার সঙ্গে সিনিয়র ডিগমার রওনা হন কাঁকড়া ও লবস্টার ধরতে। আমিও দ্বীপটা ঘুরেফিরে দেখার জন্য অতঃপর হাঁটতে বেরোই। সৈকতে ভেঙে পড়ছে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ। এ শব্দের সঙ্গে মিশে যাওয়া পাখিদের কাকলিতে মনঃসংযোগ করে এক পা-দুই পা করে মুথা ঘাস মাড়িয়ে সামনে বাড়ি। 

অবশেষে আমি দ্বীপ কেটে ভেতরের দিকে ঢুকে পড়া খাড়ির কাছে এসে দাঁড়াই। একটি গাছের মগডালে বসে তিনটি শ্বেতশুভ্র সারস নিজেদের মধ্যে কী যেন শলাপরামর্শ করছিল, আমাকে দেখতে পেয়ে এরা স্রেফ চুপ মেরে যায়। আস্ত দুটি কাটা গাছ দিয়ে তৈরি সাঁকো ধরে আমি চলে আসি ওপারে। তখনই লাকি চার্মে রিনিঠিনি ধ্বনি পরিস্কার শুনতে পাই। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখি- বেঁকে যাওয়া খাড়ির কাদাজলে পা চুবিয়ে ডিগমারের সঙ্গে বিয়াংকা কাঁকড়া শিকারে মেতেছে। সে ধনুকের মতো পিঠ বাঁকিয়ে দু'হাত দিয়ে জলের তলায় খোঁজাখুঁজি করলে- থির জলে তার শরীরের প্রতিফলন ভেঙেচুরে খানখান হয়।

পাখপাখালির কাকলিতে ভরপুর একটি উপবন পাড়ি দিয়ে চলে আসি খোলা দরিয়ার পাড়ে। সারসের প্রসারিত ডানার মতো দ্বীপের পাথুরে একটি ডাঙা এদিকে তৈরি করছে রীতিমতো লেগুনের আকৃতি। তার থির জলে আলোর সোনালি রেখায় তৈরি হয়েছে ডায়মন্ড শেইপের কিছু আকৃতি। ওখানে চিত্রার্পিত হয়ে ভাসছে একটি সবুজ রঙের রাবার ডিঙি। বর্ণাঢ্য নৌকাটিকে একনজরেই চিনতে পারি। আসার পথে অসমবয়সী এক যুগল পাল খাটিয়ে এ নায়ে ভাসছিল। আন্দাজ করি, তারাও এখানে ক্যাম্প করে রাত কাটাবে। আঁশটে গন্ধ মাখা পরিসরে আমি চুপচাপ এক পা-দুই পা করে এদিক ওদিকে হাঁটাহাঁটি করি। যুগলের দেখা পাওয়া যায় বালুচরে পড়ে থাকা একটি জং-ধরা ট্রলারের আবডালে। সৈকতে কম্বল বিছিয়ে বসেছেন রোদচশমা পরা মাঝবয়সী মহিলা। তার সামনে বেতের পিকনিক বাস্কেট। বেশ দূরে তার যুবক-সঙ্গী হেলমেটে মুখ-মাথা ঢেকে হাতে খোলা তলোয়ার নিয়ে শরীরের নৃত্যময় কসরতে ফেন্সিংয়ের নানা মুভ প্র্যাকটিস করছে।

মহিলা রোদচশমা চুলে তুলে দিয়ে কাছের মানুষের মতো হেসে বলেন, 'হাই, কামঅন অভার।' আমি কাছে গিয়ে তাকে 'গ্রিটিংস' বললে তিনি হাত বুলিয়ে কম্বলের ভাঁজ মসৃণ করতে করতে বলেন, 'আই অ্যাম ডিলায়লা, কেয়ার ফর আ ড্রিংক?' আমি মাথা হেলিয়ে 'আ ড্রিংক উড বি লাভলি' বলে বসে পড়লে তিনি খুঁটিয়ে আমাকে দেখতে দেখতে পিকনিক বাস্কেটের ডালা খোলেন। মভ রঙের একটি সানড্রেস পরে আছেন ডিলায়লা। তার চোখমুখের কৌতূহলে যেন অস্তমিত হতে গিয়েও গোধূলির আভার মতো রেশ ছড়াচ্ছে উচ্ছল যৌবন। বাস্কেট থেকে রেড ওয়াইনের বোতল বের করে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে ডিলায়লা মন্তব্য করেন, 'ইউ লুক লোনলি অ্যান্ড বিট আপ, পরিবারের ঝুট-ঝামেলা থেকে পালিয়ে এসেছ নাকি?' ঠোঁট টিপে কর্ক-স্ট্ক্রু দিয়ে ওয়াইন বোতল খুলতে খুলতে আমার দিকে আবার তাকান। ডিলায়লার চোখমুখে সাইকিয়াট্রিস্টের মতো কনফিডেন্স দেখতে পেয়ে আমি আগ্রহের সঙ্গে জবাব দিই, 'সংসার থেকে আমি একটু বিরতি নিচ্ছি, বাট আই অ্যাম কিউরিয়াস, হোয়াট ইজ ইয়োর স্টোরি ডিলায়লা?' কোনো দ্বিধা না করে তিনি যেন খোশগল্পে মাতেন, 'মাই পার্টনার লেফট মি। আটারো বছরের সংসারে আমি তার সঙ্গে অনেক অ্যাডজাস্ট করেছি, কিন্তু কিছুদিন হলো সে তার মেয়ের বয়সী ব্লন্ড চুলের এক যুবতীর সঙ্গে জোড় বেঁধেছে। তাকে নিয়ে হওয়াই দ্বীপে বেড়াতে গেছে।'

ডিলায়লা গ্লাসে রেড ওয়াইন ঢেলে আমার সামনে রাখলে আমি পানীয়টির ফ্লোরাল সৌরভে মুগ্ধ হয়ে বোতল তুলে নিয়ে লেভেলটি পড়ি। গ্রানাচা গ্রেইপের নির্যাসে তৈরি 'লা পাকা' বলে স্প্যানিশ এ ওয়াইন বছর তিনেকের পুরনো। ডিলায়লা আমার আগ্রহ দেখে টোস্টের জন্য গ্লাস উঠিয়ে 'দিস ওয়াইন ইজ নট ফুল বডিড, এর মাইল্ড স্বাদ গোধূলির আলোছায়ার মতোই হালকা এবং রহস্যময়,' বলে মৃদু হাসেন। আমি গ্লাস তুলতে গিয়ে আঙুলের ইশারায় তলোয়ার হাঁকড়ানো তরুণকে দেখিয়ে বলি, 'তাকে পানীয়তে শরিক করবেন না?' মহিলা হেসে বলেন, 'হি ইজ নট বিগ অন ওয়াইন। তবে বেশ রাতে লাভ হেজার্ডের পর ভোদকার শট নিতে পছন্দ করে। শক্ত-সামর্থ্য এ ছেলেটির নাম ডগলাস, ইউএস ফোর্সের মেরিন সেনানী। ফেন্সিং বা তলোয়ার খেলার ব্যাপারে ক্রেজি। প্র্যাকটিস শেষ হলে নিজেই এসে যোগ দেবে। উই ডোন্ট নিড টু ওয়েট ফর হিম।' আমি এবার মৃদু  হেসে গ্লাস তুলে তাতে গোধূলির আলোছায়ার প্রতিফলন মিশিয়ে টোস্ট করি, 'চমৎকার এ গোধূলিতে যেন যৎসামান্য মনের কথা বলার সুযোগ পাই।' ডিলায়লা পানীয়তে চুমুক দিয়ে বলেন, 'ওয়ান্ডারফুল উইশ, নাউ টেল মি সামথিং আবাউট ইয়োরসেল্কম্ফ।' আমি গ্লাসে ঠোঁট ছুঁইয়ে এর উডি ফ্লেভার উপভোগ করতে করতে কী বলব, তা নিয়ে ভাবি। ডিলায়লা সূত্র ধরিয়ে দিয়ে জানতে চান, 'তোমার পার্টনার তোমাকে ছেড়ে গেছে কি, নাকি তাকে ডিভোর্স করে ঘুরতে বেরিয়েছ?' আমি জবাব দিই, 'কোনোটাই ঘটেনি আমার ক্ষেত্রে। মাই পার্টনার ইজ বিজি উইথ হার পার্সোনাল রিসার্চ। পেশায় ডিপ্লোম্যাট, চুটিয়ে নতুন একটি ভাষা শিখছে, মেতে আছে জব ট্রেনিং নিয়ে। এ সময় আমি পাশাপাশি না থাকলে তার ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হবে না। শি ইজ নট গোনা মিস মি আ হৌল লট। তাই চলে এসেছি নিকারাগুয়ায় ঘোরাঘুরি করতে।' হালকা হেসে ডিলায়লা আমাকে ঠুঁইয়ে দেন, 'তোমার পার্টনার নিশ্চয়ই ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে, লিপ্ত হচ্ছে হরেক রকমের মিথস্ট্ক্রিয়ায়, সে যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে এবং তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়... হোয়াট আর গোনা ডু অ্যাবাউট ইট?' আমি ডিলায়লার ঢেলে দেওয়া রিফিল তারিয়ে তারিয়ে এনজয় করতে করতে জবাব দিই, 'অন্য কারও সঙ্গে ভালোবাসায় জড়ানো ও আপাত পরপুরুষের সঙ্গে ঘর বাঁধার উদ্যোগ... এসব তার অধিকারের আওতায় পড়ে, শি সার্টেনলি হ্যাজ দ্য রাইট টু ডু দ্যাট।' আমি একটু পজ নেই, ডিলায়লা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছেন, তো আমি আলোচনাকে লঘু করে বলি, 'ইটস্‌ আ ট্রেড অফ, বিষয়টা লেনদেনের মতো। আপনি যা ধারণা করছেন, তা যদি আদৌ ঘটে, বিনিময়ে আমি ফিরে পাব আমার ফ্রিডম।' 'ওয়েল সেড' বলে তিনি আমার মন্তব্যের তারিফ করে বলেন, 'আই অ্যাম গ্ল্যাড দ্যাট আই ওয়াজ অ্যাবোল টু এস্টাবলিশ মাই রাইটস। আমার আটারো বছরের আটকুড়ো হাজবেন্ডকে কিকড আউট করে আমিও ফিরে পেয়েছি আমার ফ্রিডম।' আমাদের গল্প জমে উঠছে দেখে আমি সরাসরি প্রশ্ন করি, 'আটারো বছরের পুরুষ-সঙ্গী সম্পর্কে আরেকটু বলতে চান কি ডিলায়লা?' তিনি উৎসাহিত হয়ে জবাব দেন, 'অহ্‌, ইয়েস, ইউএস ফোর্সের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সে। তার সঙ্গে আমি পুরো দুই বছর কাটাই মাইক্রোনেশিয়ার একটি ছোট্ট দ্বীপে। ভ্রমণ করি ভিডব্লিউ ভ্যান হাঁকিয়ে সারা ইউরোপ। গালফের পয়লা যুদ্ধে সে কুয়েতে লড়াই করতে গেলে আমি তার ফিরে আসার প্রতীক্ষায় ইস্তাম্বুলের একটি হোটেলে মাস দুয়েক বাস করি সম্পূর্ণ একা। তখন প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা তার মঙ্গল কামনা করে আমি চার্চে মোমবাতি জ্বালাতাম। হি ইজ নাউ স্টেশনড্‌ ইন আ ইউএস মিলিটারি বেইস ইন জার্মানি। ইউ নো, আই হ্যাভ আ হৌল লট টু টক অ্যাবাউট হিম।'

তলোয়ার খাপে পুরে, মাথা থেকে হ্যালমেট সরাতে সরাতে এসে কম্বলে হাঁটু গেড়ে বসে ডগলাস। ডিলায়লা রুমাল দিয়ে তার মুখের ঘাম মুছিয়ে দিলে সে তাকে প্যাসোনেটলি বারবার চুমো খায়। ডিলায়লা একটু লজ্জা পেয়ে বলেন, 'মিট মাই কুল প্রিন্স চার্মিং, হি প্রমিজ মি টু গিভ আ লিটিল বেবি।' আমি ডগলাসের সঙ্গে হাত মেলালে সে বাস্কেট থেকে সোডাজলের ক্যান তুলে নিতে নিতে জানতে চায়, আমি কোথাকার মানুষ। বুঝতে পারি, বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কিছু সে জানে না। আমার পূর্বপুরুষদের পেশা নিয়ে প্রশ্নাদি করে ডগলাস জানতে চায়- ইসলাম ধর্মে তিমিমাছ শিকার নিষিদ্ধ কি-না? লালচুলো যুবকটির চোখেমুখে মঙ্গোলিয়ান ছাপ দেখতে পেয়ে তার বিস্তারিত বৃত্তান্ত জানতে আমারও আগ্রহ হয়। তো, জিজ্ঞেস করি, 'হ্যান্ডসাম ইয়াংম্যান, টেল মি হু ইউ আর, আই অ্যাম সিম্পলি কিউরিয়াস।' ক্রেকারে সফট চিজ মাখাতে মাখাতে কোনো প্রকারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে নিজের সম্পর্কে কথা বলে যায় ডগলাস। ছেলেটির ফ্র্যাঙ্কনেসে আমি অবাক হই, তার বাবা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে আইরিশ-আমেরিকান। মাথায় কোঁকড়ানো লাল চুল সে পেয়েছে পিতার কাছ থেকে। তিনিও পেশায় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন সেনানী। পার্শিয়ান গাল্কেম্ফর দ্বিতীয় যুদ্ধে কোমরে গুলিবিদ্ধ হন। বর্তমানে বিকলাঙ্গ এবং অবসরপ্রাপ্ত। চলাচল করেন হুইলচেয়ারে। যুদ্ধের আগে তিনি কোরিয়ায় আমেরিকান মিলিটারি বেসে কাজ করতেন। তখন নামগোত্রহীন এক সেক্সওয়ার্কারের সঙ্গে তার সম্পর্কের সূত্র ধরে ডগলাসের জন্ম হয়। এইডস রোগে মায়ের মৃত্যু হলে শিশু ডগলাস কয়েক বছর এতিমখানায় কাটায়। যুদ্ধের পর আহত বাবা একটি সমাজসেবামূলক এজেন্সির মাধ্যমে তার সন্তানের অরফানেজে বেড়ে ওঠার সংবাদ পান। অতঃপর, ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে বালক ডগলাসকে পুত্ররূপে স্পন্সার করে নিয়ে আসেন যুক্তরাষ্ট্রে।

আমাদের বলার মতো কথাবার্তা একসময় ফুরিয়ে আসে। ক্রিমসন বর্ণের সয়লাবে জলের শরীর উথালপাতাল করে দিয়ে ডুবছে সুরুজ। ভালোবাসার অন্তর্গত উচ্ছ্বাসের মতো উজাড় করা এ বর্ণাঢ্যতার দিকে আমরা নীরবে তাকিয়ে থাকি। অনেকগুলো বেলেহাঁস ডানায় সূর্যাস্ত মেখে ঝুপঝুপ করে নামছে বালুচরে। আমরা গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে চিং শব্দে বোতলের বাকি পানীয়টুকু শেষ করি। ডিলায়লা ডগলাসের সঙ্গে জলে গা চুবানোর আগ্রহ দেখান। তো আমি- 'থ্যাংকয়ু সো মাচ ফর দি গুড কনভারসেশন অ্যান্ড ফাইন ওয়াইন' বলে অতঃপর উঠে পড়ি। 

এমএ/ ০৯:০০/ ০৬ জানুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে