Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৫ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২৯-২০১৮

একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে

আবদুল গাফফার চৌধুরী


একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে

ভারতের 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' পত্রিকার কাছে দেওয়া (গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত) ড. কামাল হোসেনের এক সাক্ষাৎকারে তিনি যেসব কথা বলেছেন, তা পাঠ করে মধুসূদনের সেই বহু পুরনো, বহুল ব্যবহূত কবিতার লাইনটি মনে পড়ল-'একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে?' এই প্রবীণ নেতার মন্তব্য পাঠের পর প্রথমে বিশ্বাস হয়নি, এ কথা তার মুখ থেকে বেরিয়েছে! পরে বিশ্বাস করতে হলো। আমার এই লেখার সময় পর্যন্ত ড. কামাল তার এই প্রকাশিত বক্তব্য সত্য নয় বলে দাবি করেননি।

বিস্ময়! বিস্ময়! ড. কামাল হোসেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, 'জামায়াতিরা বিএনপির মনোনয়ন পাবে এবং ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করবে- এ কথা জানলে আমি ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব গ্রহণ করতাম না।' তার এই কথা বিশ্বাস করতে হলে মনে প্রশ্ন জাগে, জামায়াতিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রশ্নেই বিকল্পধারার ডা. বদরুদ্দোজ্জা ঐক্যফ্রন্টে আসতে চাননি। ড. কামাল এ কথা জানার পরও কৌশলে তাকে এড়িয়ে গিয়ে (দাওয়াত করে এনে বাসায় বসিয়ে রেখে) একা ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন কেন? জামায়াত যে বিএনপির সঙ্গে থাকবে এবং সঙ্গে থাকলে তাদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে, এ কথাও তিনি অবশ্যই জানতেন। তাহলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাছে দেওয়া তার বক্তব্যটি কি সত্য?

দুই, এটা কী করে হলো? একটি ভারতীয় পত্রিকা জামায়াতের সঙ্গে ড. কামালের সম্পর্কের ব্যাপারেই প্রশ্ন করেছে। তিনি তার জবাবে সত্য-মিথ্যা যা-ই বলে থাকুন, ভদ্র ভাষায় কথা বলেছেন। তাহলে দেশের এক সাংবাদিক তাকে সঙ্গতভাবে একই প্রশ্ন করায় তাকে 'খামোশ' বলে থামাতে চাইলেন কেন? 'এই প্রশ্ন করার জন্য তুমি কত টাকা খেয়েছ' বলে অশোভন আচরণ করলেন কেন? এই আচরণ কি তার আঁতে ঘা লাগার প্রমাণ নয়?

ঐক্যফ্রন্টের আবরণে ড. কামাল যে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন, এই অভিযোগ গোড়া থেকেই তার বিরুদ্ধে উঠেছে। আর জামায়াত যদি বিএনপি জোটে থাকে, তাহলে অবশ্যই তারা বিএনপির প্রতীকে (যেহেতু তারা নিবন্ধিত দল নয়) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে- এ কথাও তার মতো প্রাজ্ঞ আইনজীবীর না জানা থাকার কথা নয়। তিনি জামায়াতিদের বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে নামার সত্যি সত্যি বিরোধী হলে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো বিএনপির সঙ্গে আঁতাত করতে যেতেন না। আর গেলেও বিএনপির নমিনেশন ঘোষিত হওয়ার পর ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতেন।

ড. কামালের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বিএনপি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকতার পর তার উচিত ছিল, ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব ত্যাগ করা অথবা ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটকে বহিস্কার করে তাকে পুনর্গঠন করা। তিনি কোনোটাই করেননি। যেসব কাজ করছেন, যেসব কথা বলছেন, মনে হয় তা তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলের ডিকটেশনমতো করছেন। দেশের সেরা আইনজীবী হয়েও দেশের উচ্চ আদালত কর্তৃক দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন। বিএনপি-জামায়াত জোট আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা যেসব অভিযোগ তুলছে, তোতা পাখির মতো তা আওড়াচ্ছেন এবং তাদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সিইসির সঙ্গে অশোভন  আচরণ করেছেন (যাকে মিডিয়ায় আখ্যা দেওয়া হয়েছে উচ্চবাচ্য)। পুলিশকে জন্তু-জানোয়ার বলে গালি দিয়েছেন।

আমাকে যদি ড. কামাল হোসেন ক্ষমা করেন তাহলে বলব, এটা তো দীর্ঘকালের ব্যর্থতা ও হতাশাজনিত মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ। মানসিক ভারসাম্যতা না হারালে কেউ বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘকালের অনুসারী ও ঘনিষ্ঠ সহচর থাকার পর বঙ্গবন্ধুর ঘাতক ও একাত্তরের পরাজিত শক্তির সঙ্গে হাত মেলায়? স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে (তাদের যতই অন্য দোষ থাকুক) ক্ষমতাচ্যুত করে সেই ঘাতক স্বাধীনতার শত্রুদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য মাঠে নামে?

তিনি যদি আওয়ামী শাসনে অসন্তুষ্ট দল ও ব্যক্তিদের (যারা দেশদ্রোহী এবং একাত্তর ও পঁচাত্তরের ঘাতকচক্র নয়) নিয়ে গণতান্ত্রিক ঐক্যফ্রন্ট গঠন করতেন এবং নিজের নেতৃত্বে নির্বাচনে নেমে দেশকে একটি বিকল্প গণতান্ত্রিক সরকার উপহার দিতেন, তাহলে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নির্বাচনে পরাজিত হলেও অগৌরবের কিছু ছিল না। কিন্তু তার বদলে স্বাধীনতা ও তার আদর্শবিরোধী চক্রে তাদের পুতুল নেতা হয়ে তিনি যা করলেন, তাতে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হলেও তাকে তার বর্তমান দোসররা ব্যবহূত কলার খোসার মতো ফেলে দেবে, ইতিহাসে তার নাম কলঙ্কিত হবে। আর এবারের নির্বাচনে তার ফ্রন্ট যদি পরাজিত হয়, তাহলে বেঁচে থাকতেই তিনি জনগণের ধিক্কার কুড়াবেন এবং ইতিহাসে স্থায়ীভাবে কলঙ্কিত চরিত্র হবেন।

কামাল প্রসঙ্গে এখানেই ইতি টানি। রোববার সেই বহু প্রত্যাশিত ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। জাতির সামনে তার ভাগ্য নির্ধারণের আরেকটি ঐতিহাসিক দিন। আমি ৩০ ডিসেম্বরের এই নির্বাচনকে মনে করি ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সমতুল্য। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যদি তার নৌকা প্রতীক নিয়ে নিরঙ্কুশ জয়ের অধিকারী না হতো, তাহলে বাংলাদেশের ভাগ্যে স্বাধীনতা অর্জন ছিল অসম্ভব ব্যাপার। শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা নয়, জনগণের ওপর, তাদের ভাষা-সংস্কৃতির ওপর চাপানো হতো মধ্যযুগীয় লৌহ শাসন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই নির্বাচনও একটি চিরাচরিত নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনে একদিকে রয়েছে '৭১ সালের স্বাধীনতাবিরোধী হিংস্র সাম্প্রদায়িক চক্র, অন্যদিকে রয়েছে এই স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামো রক্ষার গণতান্ত্রিক শিবির। '৭০ সালের নির্বাচন ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, এবারের নির্বাচন সেই স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম। সেবার  নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এবার নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা  শেখ হাসিনা।

আর ২৪ ঘণ্টা পর জাতির সামনে সেই দুর্লভ দিনটি, দুর্লভ ক্ষণটি আসবে, যখন অকম্পিত চিত্তে নির্ভুলভাবে তাকে ভোটপত্রে প্রার্থীর প্রতীক বেছে নিতে হবে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের আকাশে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের রক্তিম সূর্য মেঘমুক্ত হবে, না সেই সূর্য আবার দীর্ঘকালের জন্য রাহুগ্রস্ত হবে। দেশদ্রোহীর গাড়িতে আবার উড়বে রাষ্ট্রীয় পতাকা? দণ্ডিত মানবতার শত্রু ও ঘাতকদের অনুসারীরা ক্ষমতায় এসে শুরু করবে ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসার রাজনীতি? যা ২০০১ সালের বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে যাবে।

আমি গণক ঠাকুর নই। তাই বলতে পারব না, রোববারের নির্বাচনে দেশের ভাগ্য কীভাবে নির্ধারিত হবে। কিন্তু আমার ৫০ বছরের বেশি সময়ের সাংবাদিক অভিজ্ঞতা বলে, বাংলার মানুষ '৭০ সালের নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেনি। ১৯৯৬ সালে, ২০০৮ সালে বিভ্রান্ত হয়নি। ২০১৮ সালেও হবে না। এই নির্বাচন সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করা, অন্যথায় নির্বাচনটি বানচালের জন্য একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা কম চক্রান্ত করেনি, কম সন্ত্রাস ছড়ায়নি। বিদেশে অর্থবৃষ্টি দ্বারা তারা মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে এবং দেশেও তারা সরকার উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে দেশের একজন প্রধান বিচারপতিকেও প্রভাবিত করেছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা যাকে অর্ধেক নোবেল পুরস্কার দিয়েছেন, তিনিও সেই পুরস্কারকে মূলধন করে দেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছেন।

কোনো চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশ্বময় প্রচার করা হয়েছে, এই নির্বাচন হবে না। হতে দেওয়া হবে না। সব শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশপ্রেমিক মানুষের আজ কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা, নূহ নবীর নৌকার মতো শেখ হাসিনার নৌকাও যেন সব ঝড়ঝঞ্ঝা-প্লাবন অতিক্রম করে জয়যুক্ত হয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়। ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি-জামায়াত জোটের শেষ মুহূর্তের ষড়যন্ত্র, পরাজয় অবধাবিত জেনে নির্বাচন বানচালের শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং '৭০-এর নির্বাচনের মতো ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও নৌকা জয়ী হয়। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সফল এবং চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে।

২০১৮ সালেও জাতি ভুল করবে না। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পতাকা তারা ভূলুণ্ঠিত হতে দেবে না। এটা আমার বিশ্বাস এবং প্রার্থনা।

আর/১৬:১৪/২৯ ডিসেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে