Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (20 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১২-২৬-২০১৮

জনগণের শক্তিই বাংলাদেশের ভরসা

আনু মুহাম্মদ


জনগণের শক্তিই বাংলাদেশের ভরসা

বাংলাদেশের নির্বাচনে এখন প্রধান দুটি পক্ষ- আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও মহাজোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট। এই দুই জোটের মধ্যে চারটি দল ঘুরেফিরে বাংলাদেশের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। এগুলো হলো :আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেসামরিক শাসন প্রক্রিয়া বেশ কয়েকবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে সামরিক শাসনের কারণে। এর মধ্যে দু'বার পুরোপুরি সামরিক শাসন হয়েছে, আরেকবার বেসামরিক শাসনের ওপর সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব বিস্তারের মাধ্যমে নির্ধারক ভূমিকা পালন শুরু করলেও তা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। পুরোপুরি সামরিক শাসনের সময়ে, সরকারি সংস্থার তত্ত্বাবধানে, দু'বারই দুটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। তৃতীয়বারও চেষ্টা হয়েছিল; কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।

এটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ যে, বাংলাদেশে রাজনীতিতে নতুন কোনো শক্তিশালী ধারা সামরিক শাসনের বাইরে থেকে টিকে থাকতে পারেনি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের বাইরে নতুন কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারা জনতৎপরতায় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ, সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি ও রব-জলিল নেতৃত্বাধীন জাসদ সাময়িকভাবে আলোড়ন তুললেও সেই ধারা রক্ষা করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত এটাই সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুনের প্রবেশের বাধা প্রায় অনতিক্রম্য। 

গত চার দশকে নির্বাচনের মাধ্যমে যেসব দল ক্ষমতাসীন হয়েছে, তারা একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ এককভাবে, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট, যার অন্যতম অংশীদার ছিল জামায়াতে ইসলামী এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট, যার অন্যতম ছিল এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। সর্বোচ্চ সুযোগ পাওয়ার পর তাদের ভূমিকা থেকে রাজনীতির সর্বোচ্চ সীমা ধরা যায়। ২০০১ সালে নির্বাচিত চারদলীয় জোট ও ২০০৮-এ নির্বাচিত মহাজোট দু'বারই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দেশের গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু দু'বারই একচেটিয়া নির্বাচনী ক্ষমতা ব্যবহূত হয়েছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ও দুর্নীতি বিস্তারে। এসব কাজে দুইকালের মধ্যে একই সঙ্গে ধারাবাহিকতা ও ক্রমবিকাশ দেখা যায়। যেমন- চারদলীয় জোটকালে হাওয়া ভবন, জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও দেশ-বিনাশী চুক্তি, ব্যাংক ঋণ লোপাট ইত্যাদি ঘটতে থাকে, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানানো হয়।

২০০২ সালে শুরু হয়েছিল নতুন পর্যায়ের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে মানুষ ধরে ধরে খুন। এরপর গত ১৬ বছরে সরকারের নানারকম পরিবর্তন হলেও এই কাজের কোনো বিরতি ঘটেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দায়িত্ব পালন করলেও পুলিশ-র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন বাহিনীকে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়ার কারণে ক্রসফায়ারে খুনের পাশাপাশি গ্রেফতার-আটক বাণিজ্য, পাইকারি নির্যাতন, হেফাজতে খুন, নির্বিচার রিমান্ডে নির্যাতন অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পায় এই সরকারের আমলে। এই সময়ে দুর্নীতিও বেড়েছে চক্রবৃদ্ধি হারে।

কার্যত কর্তৃত্ববাদী শাসন, জনঅধিকার হরণ, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিভিন্ন নির্বাচিত বেসামরিক সরকার ও সামরিক সরকার কোনো ভিন্নতা দেখাতে পারেনি। বলা যায়, এসব বিষয়ে ধারাবাহিকতার সম্পর্ক দেখা গেছে বরাবরই। দেশের সব প্রতিষ্ঠানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর সরকার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষত ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে গত পাঁচ বছর এই ক্ষমতা একচ্ছত্রকরণ অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। সরকার সর্বস্তরে একচেটিয়া ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ, দমন-পীড়ন যাত্রাকে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে 'উন্নয়ন' যাত্রার ছবি উপস্থিত করে। 

বর্তমান সরকার উন্নয়নের যে ধারা জোরদার করেছে সেই ধারা বা উন্নয়ন মডেল কোনো নতুন মডেল নয়, এটি চলছে কয়েক দশক ধরেই। বিশেষত আশির দশক থেকে তা স্পষ্ট অবয়ব নিয়েছে। পুঁজিবাদ বিকাশের এই মডেল বর্তমানে 'নিও লিবারেল মডেল' নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। নামে লিবারেল বা উদারনৈতিক হলেও তা শুধু পুঁজির জন্যই উদারনৈতিক, মানুষ ও প্রকৃতির ওপর আগ্রাসী, দৃষ্টিভঙ্গিতে কট্টর রক্ষণশীল। এই মডেলে সব নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্ব ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে তার জায়গা দেওয়া হয় বিভিন্ন বাণিজ্যিক গোষ্ঠীকে। এই মডেল অনুযায়ী কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মুনাফা বৃদ্ধির জন্য দুনিয়া উন্মুক্ত, উন্মুক্ত স্থান-বন-নদী-পাহাড়-শিক্ষা-চিকিৎসা-কৃষি জমি সবকিছু মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কতিপয়ের দখলে যায়। তাতে সর্বজনের জীবন-জীবিকা-প্রাণ-প্রকৃতি-বায়ু-পানি-নিরাপত্তার যে দশাই হোক না কেন। যেমন আমরা অনেক নিরাপদ বিকল্প উপস্থিত করা সত্ত্বেও সুন্দরবন বিনাশ করে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ! প্রকৃতপক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখানে লক্ষ্য নয়, দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীকে খুশি করাই লক্ষ্য। যা বর্তমান সরকারের কৃতিত্ব হিসেবে দেশ-বিদেশের করপোরেট গোষ্ঠীর কাছে স্বীকৃত তা হলো- জোরকদমে, নির্দি্বধায়, জনমতের তোয়াক্কা না করে, আইনবিধি অগ্রাহ্য করে, দেশের জন্য ফলাফল পাত্তা না দিয়ে দ্রুত এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দৃঢ়তা। এই দৃঢ়তা নিয়েই এবারের নির্বাচনে সরকারি দলে ও আশপাশে মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঋণখেলাপি, ব্যাংক লোপাটকারী, শেয়ারবাজারে ধস নামিয়ে লাখ লাখ মানুষকে পথে বসিয়ে অর্থ লুণ্ঠনকারী, খুনি ও মাদক ব্যবসার মাফিয়া, নদী ও বন দখলদার প্রভৃতি। 

যে মেগা প্রকল্পগুলো সরকার 'উন্নয়ন' হিসেবে হাজির করছে এবং যে উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখার কথা বিএনপিও ঘোষণা করেছে, সেগুলো আমরা উন্নয়ন হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে করব কিনা, সমাজে তার পর্যালোচনার অভাবই লুটেরা-দখলদারদের এক ধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি করার ক্ষমতা দিয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে তার প্রধান শক্তি হিসেবে থাকবে বাংলাদেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি, মাদক ব্যবসায়ী ও বন-জঙ্গল-নদী দখলকারীরাই। ভারতের মোদি সরকারও একই রকম দৃঢ়তা প্রদর্শনের জন্য দেশ-বিদেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিশেষ প্রিয়। গত নির্বাচনে তিনি ব্যাপক ও সার্থকভাবে পিআর বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেছিলেন। আদভানি সে সময় মোদি সম্পর্কে বলেছিলেন, 'হি ইজ দ্য মোস্ট সাক্সেসফুল ইভেন্ট ম্যানেজার।' বাংলাদেশেও এবারের নির্বাচনে বহুসংখ্যক জনসংযোগ বা পিআর বা বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান প্রচারে নিয়োজিত আছে। বিজ্ঞাপনের জোয়ার দিয়ে অনেক জরুরি আলোচনা, প্রশ্ন, প্রাণ প্রকৃতি বিনাশ, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা সফলও হচ্ছে অনেকখানি। 

এখন শুধু নিরাপদে-নির্ভয়ে ভোট প্রদানের বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দলীয় সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বর্তমান সরকারের দাবি, তাদের অধীনে নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হবে। কিন্তু এর জন্য সরকারের যে ভূমিকা দরকার, তারা করছে এর বিপরীত। গত কয়েক দিনের সংবাদে দেখা গেছে, সরকারদলীয় প্রার্থী ছাড়া আর কোনো দল, জোট বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় যে প্রচার তা তারা চালাতে পারছেন না। অনলাইনেও বিরোধী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নানাভাবে হামলার শিকার হচ্ছেন। গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম- এসব মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া জারি আছে। নির্বাচন সামনে রেখেই এই আইন পাস হয়েছে। এই আইনের কারণে, পাশাপাশি বিধিনিষেধ, মৌখিক নির্দেশ-আদেশ এবং হয়রানির কারণে সংবাদমাধ্যমগুলো ভয়ভীতির মাঝে কাজ করছে, তা আমরা বাইরে থেকেও বুঝতে পারি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি গত ২২ ডিসেম্বর নাগরিকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ৫ দফা দাবি বাস্তবায়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এগুলো হলো : ১. নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের অবশিষ্ট সময়টুকুতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; ২. নির্বাচনের কাজে সম্পৃক্ত প্রশাসন যাতে করে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে; স্বাধীনভাবে দেশি এবং বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে; ৩. হামলা, মামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এসবে জড়িত ব্যক্তি-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সক্রিয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অবিলম্বে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের ও ধরপাকড় বন্ধ করতে হবে, হয়রানিমূলক মামলায় গ্রেফতারকৃতদের এই মুহূর্তে মুক্তি দিতে হবে; সব ধরনের যোগাযোগে বাধা সৃষ্টির বদলে তাকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং ৪. নির্বাচন কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনকারী এবং তাদের ওপরে হামলাকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। 

আগামী ৩০ ডিসেম্বর যেমন সরকার ও সব দলের পরীক্ষা, তেমনি জনগণের জন্যও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে বাংলাদেশ এক মহাবিপর্যয়ে পতিত হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করুক আর ভোটকেন্দ্রগুলোতে জনতার ঢল নামুক; জনগণের শক্তিতেই বাংলাদেশ রক্ষা পাক, ভোটের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে জনগণ সব শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করুক। 

অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক: অর্থনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এমএ/ ০৫:১১/ ২৬ ডিসেম্বর

মুক্তমঞ্চ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে