Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০ , ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.8/5 (76 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১২-২০১৩

জন্মদিনের বিশেষ সাক্ষাৎকার ঃ আমি গ্রামকে শহরে এনেছি-আল মাহমুদ

কবি আল মাহমুদের অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকার


	জন্মদিনের বিশেষ সাক্ষাৎকার ঃ আমি গ্রামকে শহরে এনেছি-আল মাহমুদ
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।
 
৭৭ বছর আগে ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোল্লাবাড়িতে এক কবির জন্ম হয়েছিল। গ্রামদেশের মাঠ-ঘাট, বন-বাদার, নদী-নালা ডিঙিয়ে একদিন তিনি এসেছিলেন ঢাকা নগরীতে। এই ৭৭ বছরের জীবন ভরে তিনি কবিতার খাতা-ভর্তি করে এঁকেছেন বাঙালিয়ানার এক সম্পূর্ণ ছবি। আপাদমস্তক এই কবির জন্মদিন উপলক্ষে তার মুখোমুখি হয়েছেন আবিদ আজম।
 
আবিদ আজম : আপনি একবার বলেছিলেন, জীবনানন্দ দাশের ধূসর পান্ডুলিপি পড়ে প্রথম কবিতা লেখার কথা মনে হয়েছিল আপনার। প্রথম জীবনের সেই স্মৃতি কি মনে করতে পারেন?
 
আল মাহমুদ : হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে প্রথম আমার মনে হলো, আরে! আমিও তো কবিতা লিখত পারি। জীবনানন্দের কবিতাই প্রথম আমাকে আপ্লুত করেছে, মোহিত করেছে। যখন কেউ প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করে তখন গোড়াতেই আকাশ থেকে তার কাছে কবিতা নাযেল হয় না। অনেক কবির কবিতা তাকে প্রভাবিত করে। শুরুর দিকে আমাকেও অনেকে প্রভাবিত করেছেন। তখন আর একজন কবি ছিলেন সমর সেন, গদ্য কবিতা লিখতেন। তার কবিতাও আমাকে ভারি টানতো। আগে এই কথাটা বলিনি কখনও, আজই প্রথম বললাম। শামসুর রাহমানও শুরুর পর্যায়ে ছিলেন জীবনানন্দীয় ঘরনার কবি। জীবনানন্দের কবিতা দিয়ে একসময় আমি প্রভাবিত হয়েছিলাম সত্যি; কিন্তু আমার কবিতাকে তো সবাই ‘আল মাহমুদের কবিতাই’ বলে। এটা আমি হয়তো পেরেছি। জীবনানন্দের কাছে শুধু আমি নই, সব বাংলাভাষীই কৃতজ্ঞ। কারণ- শুধু ‘বনলতা সেনই’ নয়, তার সব কবিতা। তার কবিতা আবৃত্তি করতে ভালো লাগে এখনও ‘লাশকাটা ঘরে/চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।’ কিংবা ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়- আরো এক বিপন্ন বিস্ময়..’ । আমাদের আবদুল মান্নান সৈয়দ তো জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বেশ লিখে-টিখে গেছেন।
 
আবিদ : আপনাদের পূর্ববতী তিরিশ ও চল্লিশের দশকে বাংলা ভাষায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন এমন অনেকেই ছিলেন। কবি হিসেবে আপনার সঙ্গে তাদের সামাঞ্জস্যতা কেমন?
 
মাহমুদ : অগ্রজ-অনুজ কবিদের ভেতর কবিতাই একমাত্র সম্পর্কের বিষয়। আর আমি তো সবাইকে ভেঙে-ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি নিজস্ব কাব্য উঠোনে।
 
অন্যের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে আমার তেমন সময়  লাগেনি। আমার মনে হয় নিজের লেখাকে আমি ‘আল মাহমুদের কবিতা’ করতে পেরেছি। মৌলিকতা এখানেই। এখানে তিরিশের দশকের কথা আসছে, জীবনানন্দ ছাড়া একজন কবির নাম বলো তো? তুমি বলবে জসীমউদ্দীনের নাম। নকশিকাঁথার মাঠ কিংবা সোজন বাদিয়ার ঘাটের নাম আমিও বলতে চাই। আর আমার ধারণা হলো, জসীমউদ্দীন একটা ভিন্ন ব্যাপার। তার একটা কবিতা আছে-না- ‘কাল সে আসিবে মুখখানি তার নতুন চরের মতো’। এই যে উপমায় প্রয়োগ, এটা একটা বিষয়। আর চল্লিশের কবি তো ফররুখ আহমদ। মৌলিক ও স্বতন্ত্র ঘরানার কবি। তার হাতেমতায়ীর কথা আমি বলতে চাই। ‘রাত পোহাবার কতো দেরী পাঞ্জেরী?’ কী আশ্চর্য লাইন! কবিদের ভেতর ফররুখ আহমদ ছিলেন আলিফের মতো সোজা একজন মানুষ। অন্যরা নানান ছলছাতুরী কিংবা আপস করে টিকে ছিলেন। এত শক্তিমত্তার পরও ফররুখের ওপর খুব একটা সুবিচার করা হয়নি। তিনি আমাদের এখনকার অপরাজনীতির শিকার কি-না কে জানে?
 
যারা ফররুখের দিকে আঙুল তুলতে চায়, তাদের সেই অভিযোগের আঙুল নিজেদের দিকে ফিরিয়ে দেখুক না! একটি কথা আমি আগেও বলেছি। আমরা ছিলাম বাংলা ভাষার প্রথম বাঙালি লেখক। তিরিশ-উত্তর বাংলা কবিতায় রূপ, দেশ ভাগ, মানুষ চলে যাচ্ছে, দাঙ্গা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া- এ রকম একটা সময় আমাদের বুকের ওপর দিয়ে গেছে। ভ্রাতৃহত্যা, দুর্ভিক্ষ, মানুষ মরে পড়ে আছে রাস্তায়, জয়নুল আবেদিনের ছবি, কাক মানুষকে ঠোকরাচ্ছে- এ দৃশ্যগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছি। এ জন্য পঞ্চাশের লেখকরা যারা ষাট দশকে লিখেছেন, তাদের ভেতর স্বপ্ন নেই, ড্রিমটা কম। তারপর এই অপূর্ণতা পূরণ করার চেষ্টা করা হলেও আমরা বাস্তবের সংঘাতে বড় হয়েছি।
 
আবিদ : আপনি বলেন আপনার প্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রিয় লেখকের প্রতি আপনার মুগ্ধতা কেমন?
 
মাহমুদ : রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার কয়েকটি লেখা আছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের স্রষ্টা যদি রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় তাহলে হয়তো বাড়িয়ে বলা হবে না। আমি তাকে অনেক বড় কবি মনে করি। ছন্দ, মিল, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা তার কবিতায় যেমন আছে, অন্য আর কোন কবির কবিতাতে তেমনটি নেই। ইংরেজি ভাষায় আমরা যা পাই একাই বাংলা ভাষায় তা করে গেছেন। বাংলা ও বাঙালিদের জন্য রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম, আমি মুসলমান- এতে রবীন্দ্রনাথ পড়তে এবং তাকে ভালোবাসতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি। রবীন্দ্র সাহিত্যে একাত্মবাদের অস্তিত্ব রয়েছে বিশাল অংশজুড়ে- এটা আমার কাছে বিরাট ব্যাপার মনে হয়। রবীন্দ্র রচনার ব্যক্তি এবং সৌন্দর্যবোধ আমাকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। কেউ প্রশ্ন তোলেন রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলিম চরিত্র নেই কেন? এটা তিনি স্বীকার করেছেন যে, মুসলমানদের সম্পর্কে তিনি জানতেন না। বলেছেন- ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে,/ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।’এই দুর্বলতা কবি নিজে স্বীকার করে গেছেন। আর সাহিত্য তো ধর্ম-গোত্রের ধার ধারে না। রবীন্দ্রনাথ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন।
 
রবীন্দ্রনাথের গানও আমার খুবই প্রিয়।
 
যামিনী না যেতে জাগালে না কেন,
 
বেলা হলো মরি লাজে...
 
(নিজের কণ্ঠে অশীতিপর কিংবদন্তি আল মাহমুদ গেয়ে শোনালেন রবীন্দ্রসংগীত)।
 
আমরা রবীন্দ্রনাথ পড়বো এবং প্রয়োজনে তার সমালোচনা করারও স্বাধীনতা আমাদের রয়েছে, আমরা তা করতেই পারি। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলের কথাও বলতে হয়। রবীন্দ্র যুগে নজরুলের আগমন আমাদের সাহিত্যের জন্য বিরাট ব্যাপার। নজরুল কোন সাধারণ কবি নন, অসাধারণ কবি। তার গানের জগৎ বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। চার হাজার গান নিজে লিখে সুর করে গেছেন- এটা তো একটা ঐশ্বরিক ব্যাপার।
 
আবিদ : বাংলা ভাষার লেখক হতে পেরে আপনি গৌরববোধ করেন এবং বলেছেন ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী। কেন?
 
মাহমুদ : বাংলা আমার মাতৃভাষা। আর আমরা বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেই বসে থাকিনি, বরং বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি এবং বিস্তার ঘটাতে সাহিত্যে কাজও করে গেছি প্রতিজ্ঞা নিয়ে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আমার ধারণা খুবই আধুনিকতম। উপমহাদেশে যত ভাষা আছে বাংলাকেই আমার শ্রেষ্ঠ বলে মনে হয়, কারণ ভারতের রাষ্ট্রভাষা বাংলা নয়, হিন্দি। আর সারবিশ্বে বাংলা সাহিত্যের একটা আলাদা অবস্থান আছে বলেই মনে হয়। আর ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী- এ কথা আমিই প্রথম বলেছিলাম। পরবর্তী সময়ে আমার প্রয়াত বন্ধু সুনীল গাঙ্গুলীও স্বীকার করেছেন এবং এ উক্তি মেনে নিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে সুনীলও কিছু কাজ করে গেছেন। বন্ধু হিসেবে তাকে খুব ফিল করি। ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী, এ বক্তব্যের সত্যতা সামনে আরো পাওয়া যাবে।
 

আবিদ : আপনি কবি হওয়ার জন্যই ঢাকা শহরে এসেছিলেন এবং বলেছেন- আমি গ্রামকে শহরে এনেছি। ঘটনাটা কী?
 
মাহমুদ : হ্যাঁ, আমি কবি হবার জন্যই শহরে এসেছিলাম। তার মানে এই নয়, একজন কবি শহরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পকেটে করে গ্রামকে শহরে নিয়ে আসতে পারেন। লেখায়, কবিতায় গ্রামের বিষয়-আশয় ছিল, তাছাড়া আবহমান বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যের রূপদান করার চেষ্টা করেছি। আর বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সময় কৈশোরে যে ঘর ছেড়েছি, সেই যে পলায়ন আর ঘরে ফেরা হয়নি। ফলে কবি না হয়ে আমার উপায় ছিল না। এক সময় চলে এলাম ঢাকায়। একটা টিনের সুটকেস ভর্তি বই নিয়ে ঢাকার স্টেশনে এসে নেমেছি। আমার ‘বদমাশ’ বন্ধুরা বলে ভাঙা সুটকেস (হা...হা...হা) সেই সুটকেসের ভেতর তো বাংলাদেশ ছিল। ঢাকা এসে ভালোই হলো, অনেককেই পেয়ে গেলাম। যাতায়াত শুরু করলাম সওগাত, বেগমসহ অনেক পত্রিকা অফিসে। এখানেই সম্ভবত প্রথম পেয়েছিলাম কবি শামসুর রাহমানকে। শহীদ কাদরী, ফযল শাহাবুদ্দীন কিংবা ওমর আলীও সেখানে ছিল। শুরুতে তারা আমাকে পাত্তা দেয়নি। পরে কবিতা শুনে বললো, ভাই তুমি বসো। আর তার পরের ঘটনা তো সবার জানা। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছি কবিতার জন্য। আর প্রকৃত বন্ধু ছিল শহীদ-ই, এখন বিদেশে স্বেচ্ছা নির্বাসনে, শামসুর রাহমান প্রয়াত। আর ফযলার সঙ্গে তেমন দেখা হয় না। সবাইকে খুব মনে পড়ে। আমি বৃদ্ধ মানুষ, কি আর করার! নিজের অক্ষমতা আমি মেনে নিয়েছি।
 
আবিদ : ‘লোক লোকান্তর’ থেকে শুরু হয়ে ‘আমি সীমাহীন যেনবা প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো’তে পর্যন্ত এই যে দীর্ঘ পরিভ্রমণ, কবিতা সম্পর্কে নতুন করে কী ভাবছেন এখন?
 
মাহমুদ : অনেক তো কাজ করলাম ভাই, এখন একটু বিশ্রাম নিলে হয় না! মানুষ হিসেবে আমারও সীমাবদ্ধতা আছে। সত্যি বলি ভাই, শুরু থেকে আমি নিমগ্ন কবিতাতেই, এই বয়সেও আমি লিখে চলেছি। তোমাদের কাছে এটা অবাক লাগে না? আর কবিতার জন্য আমি কী না করেছি! কবিতা নিয়ে তর্ক করেছি, কেটে পুনরায় লিখেছি, দু-একটা কবিতা খারিজ করে দিয়েছি। আমার একটা কবিতা নিয়ে তো রীতিমতো কতকিছু হয়ে গেল। পরে আমি বললাম কবিতাটা বাদ। আমি হয়তো ভুল কিছু লিখিনি। সমকালীন বাংলা কবিতা গীতপ্রবণ, আমিও ‘লিরিক্যাল পয়েটস’। ছন্দের কবিতা লিখছি। একটা কথা, আধুনিক বাংলা সাহিত্য আর কতদিন ‘আধুনিক’ থাকবে? একশ’-দুইশ’ বছর? এর একটা আলাদা নাম হওয়া দরকার। নতুন আঙ্গিকে কবিতা লেখার কাজটা হয়তো নতুনরা করছে। আর আমাদের এখানে মহাকাব্যের যে সম্ভাবনা ছিল রবীন্দ্রনাথ তা শেষ করে দিলেন। বললেন- ‘আমি নাবব মহাকাব্য-/সংরচনে/ছিল মনে-/ঠেকল যখন তোমার কাঁকন-/ কিংকিণীতে,/কল্পনাটি গেল ফাটি/হাজার গীতে।’ রবীন্দ্রনাথ নিজে মহাকাব্য লিখতে পারেননি বলে আর কেউ পারবে না এমন নয়, রবীন্দ্রনাথের এটা একটা ফালতু অজুহাত। আধুনিক সময়ে মহাকাব্য হতে পারে। আমরা কি উপন্যাস পারি না? আমার একটা উপন্যাস আছে পোড়া মাটির জোড়া হাঁস পড়ে দেখো। কাব্যিক গদ্য কাকে বলে।
 
আবিদ : সোনালী কাবিন তো এখনো আলোচনার শীর্ষে। এই অনুভূতিটা কেমন?
 
মাহমুদ : আমি যখন সোনালী কাবিনের সনেটগুলো লিখি তখন চট্টগ্রামে গুরুখা ডাক্তার লেন-এ থাকি। হঠাৎ করে সনেট লেখার ইচ্ছা
 
 
 
আবিদ : যেই হাত দিয়ে সোনালী কাবিন লিখেছেন, সেই হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে উপমহাদেশ, কাবিলের বোন কিংবা পোড়ামাটির জোড়া হাঁসের মতো গদ্য। একজন কবির পক্ষে এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
 
মাহমুদ : আমার বন্ধু শহীদ কাদরী গদ্যকার আল মাহমুদকে নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। আমি কিছুটা কাজ করে দেখিয়েছি, কবিরাও ভালো গদ্য লিখতে জানে। হুমায়ুন আজাদ একদিন আমাকে ডেকে বললেন, মাহমুদ ভাই আসেন আপনার সঙ্গে একটা সিগারেট খাই। আপনার গদ্য খুব ভালো কথাটা আমি বললাম, কিন্তু লিখবো না। বলেই হাসলেন। সাহিত্যের যত বিষয়-আশয় আছে, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমি কিছুটা কাজ করেছি। উপমহাদেশ উপন্যাসের কথা তুমি বললে এটা একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল। সত্য ঘটনা অবলম্বনে। উপমহাদেশ খুব হেলায়-ফেলায় লিখেছিলাম। পরে এটার গুরুত্ব বুঝলাম। কাবিলের বোনও তাই। আমাকে নিয়ে নানান কথা বলা হয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ তো আমরা করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। কে কাকে গুরুত্ব দেয় আজ? শেখ সাহেব ছিলেন অসাধারণ এক নেতা। তার ডাকে সবাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো। প্রেসিডেন্ট জিয়াও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে বড় কাজ করেছেন নিশ্চয়ই। মানুষ হিসেবে কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। থাক, সাহিত্যের আলোচনার বাইরে না যাওয়াই ভালো। আমরা কবি মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে দু’একটি কথা বললাম। ভালো গদ্য-পদ্য লিখতে পারলে আমি নিজে খুব তৃপ্তিবোধ করি। একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা আছে, কাব্যনাটকও লিখতে পারি। আমার পরিচিত একজন সৈয়দ শাসসুল হক। একটু চতুর লোক। সাহিত্যে নানান কাজ করেছেন। গদ্যও আছে তার। হক কেমন আছে রে? আহ, কত লোকের সঙ্গেই না আমরা সম্পর্কিত ছিলাম, এখন কে কোথায় আছে!
 
আবিদ : আপনার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ‘পরিবর্তন’ নিয়ে চাপরপাশে তুমুল আলোচনা হয় সব সময়। সে আলোচনা হয়তো আপনার সাহিত্য শক্তিকে ছাড়াতে পারে না। কি বলেন?
 
মাহমুদ : দেখ, তুমি কী বলতে চাচ্ছ আমি বুঝতে পারছি। এক সময় আমি সমাজতন্ত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলাম সত্যি, তবে ‘কাঠ নাস্তিক’ যাকে বলে তা কখনোই ছিলাম না। গণকণ্ঠ সম্পাদনার কারণে যখন জেলে যাই তখন একটা ‘কম্পারেটিভ স্টাডির’ সুযোগ পাই। সব জেনে-বুঝে সজ্ঞানে আমি ইসলামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। আমি নিজেকে একজন বিশ্বাসী মুসলমান মনে করি। এটা নিয়ে আমার কোন রাখ-ঢাক নেই। পরিষ্কার কথা। মানুষ হিসেবে আমার হয়তো হাজারো ভুল আছে; কিন্তু কুরআন-ই আমার সংবিধান। রাসূল (সা.) আমার পথপ্রদর্শক। এই বিশ্বাসের কারণে আমাকে গালমন্দ সহ্য করতে হয়েছে। আমি আনন্দিত আমার বিশ্বাসের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে পেরে। আমার ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে কোন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। হতে পারে আমার এই বিশ্বাসকে কেউ কাজে লাগাতে চেয়েছে। আমাকে অস্বীকার করলেও আমার কবিতাকে তো কেউ ফেলে দিতে পারবে না। সাহিত্যের গায়ে রাজনীতির পোশাক আমি কখনো পরাইনি। আমি রাজনৈতিক লোক নই, তবে এ বিষয়ে আমার সচেতনতা আছে। আমাকে যারা নানান অপবাদ দেয় তাদের বোঝা উচিত আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কি আমার অবদান, কি আমার কবিতা।
 
আবিদ : চর্যাপদ থেকে শুরু করে আজকের সাহিত্য পর্যন্ত নারী প্রসঙ্গ এসেছে বরাবরই। নারীর প্রতি এটা কি এক ধরনের পক্ষপাত?
 
মাহমুদ : আমি ও কিন্তু নারীকে ভালোবাসি, পছন্দ করি। (দীর্ঘ হাসি) একজনকে ভালোবাসতাম সৈয়দা নাদিরা মাহমুদ, প্রয়াত। প্রেম-ভালোবাসা তো আমাদের লেখালেখির প্রধানতম অনুষঙ্গ। আর কবিরা তো প্রেম ভাঙ্গিয়েই খান। এই যে তুমি বললে, বিশ্বসাহিত্যের বিরাট অংশজুড়ে নারী বন্দনা। এটা আরোপিত নয়, অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে। নারী ছাড়া তো জগৎ শূন্য- জীবন অপরিপূর্ণ। আর আমি তো নারীর ভেতর দিয়ে প্রকৃতিকে দেখেছি এবং বর্ণনাও করেছি। আমি তো কবি মানুষ, পীর-দরবেশ না- নারীকে ভালোবেসেছি, ওটাকে বাড়াবাড়ি বলা যায়? আমার লেখা সর্বশেষ উপন্যাস পোড়ামাটির জোড়া হাঁস পড়ে দেখো, নারীকে শুধু প্রেমিকা হিসেবেই নয়, প্রেরণাদাত্রী হিসেবে খুঁজে পাবে। উপন্যাসের ওই ‘আনন্দ’ চরিত্রটি কে? ওটা আল মাহমুদ। বাংলাদেশের নারীরা যারা সাহিত্য পড়ে তারা জানে আল মাহমুদ কে। কবিরা কবিতায় নারীকে ভোলাতে চায় নানা ছলছুতোয়। ভালোবাসতে চায় বধূ, মাতা, কন্যা কিংবা প্রেমিকা হিসেবে। প্রকৃত প্রেম-ভালোবাসা সব সময়ই সুন্দর। আর আমার প্রেম-ভালোবাসা শুধু নর-নারীতেই থাকেনি বরং তা আরো ঊর্ধ্বে উঠে সৃষ্টি ও স্রষ্টায় স্থির হয়েছে। আমার রচনায় শুধু প্রেমরই নয় বরং মানবিক ভালোবাসার বিজয় হয়েছে।
 
আবিদ : নানান কিছুর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ একটা জীবন পাড়ি দিয়ে আপনি এখন ক্লান্তিলগ্নে। অভিজ্ঞতা কেমন?
 
মাহমুদ : তুমি যদি অভিজ্ঞতার কথাই বলো তাহলে তা মিশ্র অভিজ্ঞতা। সাহিত্য কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। আমি হয়তো অনেক কিছু পেয়েছি, যা পাবো ভাবিনি। আলহামদুলিল্লাহ। জীবনের কাছে আমি তৃপ্ত। পূর্ণতা না থাকলেও শূন্যতা নেই। অপ্রাপ্তিও হয়তো নেই। আমি মুগ্ধ, আনন্দিত। তবে আমি এখনো ভাবি জীবন নিয়ে, জগৎ নিয়ে। ভাবি, কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাবো। আই উইস টু বি এ পয়েট। অ্যাই অ্যাম এ থিংকার- নট আদারস। আমি চিন্তা করি। চিন্তার ভেতর দিয়েই আমি আল মাহমুদ। লিখতে পেরেছি। আরো অবশ্য লিখতে ইচ্ছে হয় অনেক- অনেক কিছু। কিন্তু এত শক্তি-সামর্থ্য কিংবা আয়ু কোথায় আমার? আল্লাহ চিন্তাশীলদের পছন্দ করেন- তাই চিন্তা করতে ভালো লাগে। আমার এই একাকী স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবনে শুয়ে-বসে, বিশ্রাম নিয়ে দিন কাটাচ্ছি বর্তমানে। ইচ্ছে হলে লিখি, না হয় অলসতা করি। পেছন অতীতের কথা চিন্তা করি। অনেক মুখ মনে পড়ে। ফিরে যাই পেছনে। ভাবতে ভাবতে ফিরে যাই কৈশোরে। মায়ের আঁচল ধরে যেন অলক্ষ্যে বলে উঠি, বাড়ি যাব। মাঝে মাঝে ভাবি আমার বাড়ি কই, আমার বাড়ি কি কখনো ছিল। জীবনে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, তা যেন ফুরোবার নয়। আমি কৃতজ্ঞ এই মা, মাটি আর মানুষের কাছে। আমি আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকি। আর এরই মধ্যে তোমরা একদিন শুনবে ‘আল মাহমুদ আর নেই’।

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে