Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১২-২১-২০১৮

যে গল্পে পরী নাই

ইকবাল হাসান


যে গল্পে পরী নাই
কবির আগমন ও আপাত প্রস্থান
 
আমাদের পরিচয় পর্বের কথা আপনাকে বলা হয়নি কোনোদিন। আই মিন, কীভাবে কবির সঙ্গে পরিচয়।
 
টিম হরটন'স থেকে কফি নিয়ে বসার মুহূর্তে মকবুল ফরাজি, মার্ক হ্যাডনের 'দ্য কিউরিয়াস ইনসিডেন্ট অব দ্য ডগ ইন দ্য নাইট টাইম'-এর বালকটি যেভাবে তার পিতার দিকে বিহ্বল চোখে তাকাত সেভাবে আমার দিকে তাকাল। বোঝার চেষ্টা, আমি শুনতে আগ্রহী কি-না।
 
বাইরে আকাশ নীল। দুপুর আর বিকেলের মাঝামাঝি সময়। এ ক'দিন আকাশের ওপর দিয়ে ধকল গেছে খুব। 
 
অনেকদিন পর ঝকঝকে রোদ আজ- নিষ্পত্র বৃক্ষের শাখায়, পার্কিং লটে গাড়ির কাচে ঝিলিক দিচ্ছে সেই রোদ। রোদ হলে কী হবে, তাপমাত্রা মাইনাস ১৮, ফিল লাইক মাইনাস ২৭। এ রকম ঝলমল একটা দিন অথচ মনেই হবে না যে, বাইরে শীত দামেস্কের তরবারি দিয়ে চামড়া ছিলে নিচ্ছে। চায়নিজ চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে যেন আলাদা করছে মানুষের হাড়-মাংস।
 
আমরা বসেছি জানালার পাশে, মুখোমুখি। ডানে ও বাঁয়ে আমাদের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে রোদ।
 
মনে মনে বলি, কবির সঙ্গে পরিচয়ের গল্পটি আজ না শুনলেই নয়!
 
আমি বাইরে তাকিয়ে আছি। মকবুল বলে, কী ভাইজান, শুনতে মন চাইতেছে না? না চাইলে নাই, আরেকদিন শুনাবো। এমন তো জরুরি কিছু না যে আজই শুনাতে হবে।
 
বাহ! মকবুলের মাথার অ্যান্টেনা তো ভালোই কাজ করছে আজ। আমার মনের কথা পড়ে ফেলেছে।
 
শোনো মকবুল, কফিতে চুমুক দিয়ে আমি বলি, তোমার মুখে নানা মানুষের গল্প শুনতে শুনতে টায়ার্ড হয়ে গেছি। এখন থেকে তুমি আমাকে গাছপালা, নদী-সমুদ্র-আকাশ, বৃষ্টি, পাহাড়-পর্বত আর জঙ্গলের গল্প বলবে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনব।
 
খুব বিরক্ত হয় মকবুল, কী কথার মধ্যে আপনি কী কথা ঢুকাইয়া দিলেন! গাছপালা, নদীনালার গল্প মানে কী! শোনেন ভাইজান, মানুষের তুলনায় পাহাড়-পর্বত, জঙ্গল-ফঙ্গল তো কিরতিম। মানুষই তো আসল। প্রতিটি মানুষ হইতেছে গল্পের খনি। ২৫ বছর ট্যাক্সি চালাইয়া বুঝছি, মানুষের পরতে পরতে লুকাইয়া আছে হাজার হাজার গল্প। 
 
বুঝতে পেরেছি আজ রেহাই নেই। বললাম, ঠিক আছে কবির সঙ্গে তোমার পরিচয়ের গল্প শুনব। তবে গল্পটি নির্মেদ হতে হবে। বানিয়ে বানিয়ে লম্বা করা চলবে না।
 
নির্মেদ মানে কী?
 
মেদহীন। অর্থাৎ গল্প ফ্যাটলেস হতে হবে।
 
এইটা আবার কী কইলেন? আপনার কথার মধ্যে নানা ঝামেলা থাকে ভাইজান। গল্প কি গরু-খাসির মাংস যে ফ্যাট থাকবে? 
 
একটু খুলে বলি, তাহলে তোমার বুঝতে সুবিধা হবে। মোপাশা-ফ্লবেয়ার এ দু'জনের নাম শুনেছ? 
 
প্রথমজনের নাম শুনেছি, দ্বিতীয়জন কে?
 
প্রথমজনের গুরু। তো একদিন সারারাত জেগে মোপাশা একটি গল্প লিখলেন। পরদিন সকালে গল্প নিয়ে গুরুর বাড়ি হাজির। ফ্লবেয়ার গল্পের পুরোটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর যা বললেন তা শুনে মোপাশা হতাশ। গল্পের প্রথম কয়েক পাতা, শেষের পাতাটি এবং মাঝখানের কিছু অংশ ফেলে দিতে হবে। তাহলেই এটা গল্প হয়ে উঠবে।
 
তাইলে আর থাকল কী!
 
বললাম, যেটুকু থাকল ওইটুকুই গল্প।
 
আমি আপনাকে যা বলব তা কিন্তু কোনো বানোয়াট গল্প নয়, পুরোটাই সত্যি। অতএব কিছুই ফালানো যাবে না। আপনি শুনতে চাইলে বলব। না চাইলে না।
 
আচ্ছা শুরু কর, নো ভূমিকা।
 
কফিতে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে মকবুল ফরাজি শুরু করে তার গল্প।
 
সেই বিকেলে মকবুল ফরাজির গল্প।
 
প্রথমেই বইলা রাখি ভাইজান, আমি কিন্তু শুদ্ধ ভাষায় বেশিক্ষণ কথা কইতে পারি না। মাঝেমধ্যে দেখবেন শুদ্ধ-অশুদ্ধ মিল্লামিশ্যা একাকার।
 
হা-হা, ঠিক আছে। গল্পে আসো। নো ভূমিকা।
 
এই কবি আমার লগে বিট্রে করছে। হেই গল্প পরে। আগে বলি, দ্যাখা ওইলো কেমনে।
 
এরকম শীতের মাস, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। সন্ধ্যার সময় গাড়ি নিয়ে বের হইছি। এমন সময় রেডিও ডেসপাচার বলল, নাইন আইসক্রিম লেনে যেতে, প্যাসেঞ্জার এয়ারপোর্ট যাবে। এয়ারপোর্টের কথা শুনেই বললাম, রজার্স।
 
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আইসক্রিম লেনের সামনে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। দরজা খুলে যিনি বেরিয়ে এলেন তাকে দেখে আমি হতবাক! গ্রামে ধানের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ূয়া, আরে ওই যে- ক্ষ্যাংড়াকাঠির মাথায় কুমড়া, সে রকম একজন বেরিয়ে এলেন। পরনে ধবধবে সাদা স্যুট, গলায় সাদা মাফলার। দেখে মনে হইল যেন একখানা কাফনের কাপড় গাড়ির দিকে আসতেছে। সঙ্গে ট্রলি, হ্যান্ডব্যাগ আর দশাসই স্যুটকেস।
 
সবকিছু সামলাতে ক্ষ্যাংড়া কাঠির ত্রাহী অবস্থা দেখে আমি হাত দিলাম। হঠাৎ দেখি, দরজায় একজন দাঁড়িয়ে, তার মুখে আঁচল। ভেজা ভেজা গলায় বললেন, ঢাকা পৌঁছামাত্র ফোন দেবা কিন্তু। বাংলাদেশ গেলে তোমার তো আর দিশা থাকে না। 
 
ভালো থেকো।
 
তুমিও।
 
গাড়িতে উঠেই ক্ষ্যাংড়া কাঠি বললেন, টার্মিনাল ওয়ান।
 
আইচ্ছা। 
 
তারে দেখামাত্র আমার মনে হইল, এই ক্ষ্যাংড়া কাঠি লোকটার নিশ্চই ডায়াবেটিস আছে। তো খুবই মোলায়েম স্বরে জানতে চাইলাম, ভাইজানের কি ডায়াবেটিস? 
 
আমার এ প্রশ্নে বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন তিনি।
 
বললেন, এই ডায়াবেটিস মানে? আপনি ডাক্তার নাকি?
 
কী যে কন ভাইজান! ডাক্তার অইলে কি আর টেক্সি চালাইতাম ! এমনি মনে অইল, আপনার বোধহয় ডায়াবেটিস। বড় খারাপ রোগ। মনে দোষ নিয়েন না। এই রোগে আমার বাপ গেছে, চাচা গেছে, একমাত্র মামা- হেও গেছে। আমার মায়েরও ডায়াবেটিস ছিল, হালকা পাতলা।
 
কী নাম আপনার?
 
মকবুল ফরাজি।
 
আপনার? 
 
ইকবাল হাসান।
 
ইকবাল হাসান! আপনারে একটু চেনা চেনা লাগতেছে। আপনারে কি টিভিতে দেখছি? দেশ টিভি না দেশি টিভি..., না মনে করতে পারতেছি না। তা ভাইজান, কী করেন আপনি?
 
এই এক-আধটু লেখালেখি করি।
 
আপনি লেখক! কিন্তু আপনার নাম তো শুনি নাই। কী লেখেন?
 
না শোনারই কথা। আমি কোনো নামি লেখক নই। সামান্য গল্প কবিতা লিখি এই আর কি!
 
খুব ভালো, খুব ভালো। তা ভাইজান, আমারে নিয়া একটা গল্প লেখেন। 
 
তার মানে? 
 
মানে কিছু না। আপনারা তো মানুষ, মানুষের জীবন নিয়া গল্প লেখেন। আমার কাছে অনেক গল্প আপনি পাইবেন; আমি গল্পের খনি।
 
তাই নাকি! 
 
শোনেন কবি ইকবাল হাসান ভাই, আমার জীবনটাই একটা গল্প। শোনলে আপনি না লিখে পারবেন না। 
 
ঠিক আছে, বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসে আপনার গল্প শুনব। আমার ফোন নম্বরটা দিচ্ছি আপনাকে।
 
তবে একটা শর্ত আছে। আপনি আমার গল্পে নিজের গল্প, বানোয়াট কিছু ঢুকাবেন না। খালি আমার গল্পটা লিখবেন। আমার জীবনের গল্প।
 
ঠিক আছে, আগে গল্পটা তো শুনি।
 
আর একটা অনুরোধ, গল্পে পরী-জিন আনবেন না। আজকাল পোলাপাইন কী যে লেখে! সব গল্পে পরী উইড়া আসে। পড়তে গেলে মাতা আউলাইয়া যায়।
 
ওরা জাদুবাস্তবতা নিয়ে খেলে। দুরূহ কাজ। ওসব গল্প আপনার জন্য নয় মকবুল। 
 
শোনেন কবি ভাই, অত বেকুব ভাইবেন না। আমার গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ, মোপাশা পড়া আছে। আমি...
 
ঠিক আছে, ঠিক আছে,এবার আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে আমি মকবুলকে থামিয়ে দেই, বলি- তুমি তো গল্প বলতে গিয়ে উপন্যাস শুনাচ্ছো। শর্ট করো।
 
আচ্ছা। কবিকে সেদিন আর কিছু বলা হয় নাই। এর মাস দুই পর এক সন্ধ্যায় কবি ভাইকে আমি আমার জীবনের গল্প বলি। তবে পুরা জীবনের না, অর্ধেক জীবনের।
 
উনি কি লিখেছিলেন গল্পটা? 
 
হ্যাঁ, লিখেছিলেন। তবে কাহিনীতে ঝামেলা আছে। গল্পে যদিও পরী নাই। তারপরও আমার তেমন পছন্দ অয় নাই। পড়লেই বোঝবেন, উনি খুব একটা ভালো লেখক না। 
 
তোমার কাছে আছে গল্পটা? 
 
জি, মকবুল কাঁচা কাম করে না। গল্পটা একটা ঈদসংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। ফটোকপি করে আন্‌ছি। এই নেন, পড়ে দেখেন।
 
 
 
গল্পের নাম :পূর্বে পশ্চিমের ছায়া
 
 
 
অবশেষে পরম করুণাময়ের অশেষ রহমতে মকবুল ফরাজির হাতে চিঠিখানা এসে পৌঁছায়।
 
সাধারণত ধর্মকর্মের দিকে তেমন আগ্রহ না থাকলেও চিঠিখানা পাওয়ামাত্র সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায় তার। সে জানালার বাইরে আকাশের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে, পাতলা একখণ্ড মেঘ ছাড়া তার চোখে ধরা পড়ে না কিছুই, তবু এই প্রথমবারের মতো কেন যেন মনে হয়, আছেন তিনি। সপ্তম আসমানের কোথাও না কোথাও তাঁর আরশ এবং সেখানে বসেই তিনি সব কিছু কন্ট্রোল করেন- মক্তবে ছেপারা পড়ার সময় এমন শুনেছে মকবুল ফরাজি। সেসব যদিও বাল্যকালের কথা, আজ তবু চিঠিখানা পেয়ে এবং মাথার উপর থেকে বিশাল ভারী একখানা পাথর সরে যাওয়ায় করুণাময়ের অস্তিত্ব ও রহমত দুটো সম্পর্কেই যেন কিছুটা নিশ্চিত হতে পারে সে। 
 
স্ত্রী সেলিনা আখতার রিমঝিম তাকে তালাকনামা পাঠিয়েছে, বাইপোস্ট।
 
যদিও এই তালাকনামা এসেছে ওয়েস্টকোস্ট থেকে কিন্তু ভিতরে বাংলাদেশের উকিলের চিঠি। পাকাপোক্ত কাজ। উকিলের নাম ব্যরিস্টার সগির উদ্দিন আলতামাস। নাম থেকেই দাম বোঝা যায়। রিমঝিম যখন তাঁকে উকিল হিসেবে নিয়েছে জাঁদরেল হবেন নিশ্চয়ই। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে ধরনের ফরোয়ার্ডিং লেটার মূল চিঠির সঙ্গে আদান-প্রদান করা হয়, সে ধরনের একখানা লেটার তালাকপত্রের সঙ্গে, উকিল সাহেবের সিল-স্বাক্ষর সংবলিত। তালাকপত্রখানা দেখে বেশ কৌতূহল হয় মকবুল ফরাজির, এতসব করার কোনো দরকার ছিল না, আমাদের দেশে সিস্টেম তো একেবারে জলবৎ তরলং, তিন তালাক বললেই কাজ হয়ে যায়। এখানে অবশ্য ব্যপারটা একটু আলাদা, স্ত্রী তালাক দিচ্ছে তার স্বামীকে। তা একখানা সাদা কাগজে 'আমি তোমাকে তালাক দিলাম' বলেলই তো আমি মেনে নিতাম। আমি তো আর ফাইটে যেতাম না। আর আমাদের আছেই বা কি, যা নিয়ে আমাদের ফাইট হবে। মকবুল ফরাজি ভাবে, আহা রে, না জানি রিমঝিমকে কত ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।
 
বেশ ক'বছর আগে টেলিভিশনে মাইকেল ডগলাস ও ক্যাথলিন টার্নারের একটি ছবি দেখেছিল সে, ওয়ার অব রোজেজ। ওয়ারেন অ্যাডলারের উপন্যাসের চিত্ররূপ। 'ডিভোর্স ব্যাটেল' যে কত ভয়াবহ হতে পারে তারই কাহিনীচিত্র। স্বামী-স্ত্রীর অই সম্পর্কের কথা ভাবলে ঘুমের মধ্যেও শিউরে ওঠে সে। বলতেই হবে, ভাগ্য তার খুবই সুপ্রসন্ন, সবকিছু হয়ে গেল চট্‌জলদি, বেশ শর্টকাট। 
 
মকবুল ফরাজির জীবনে তালাকের অভিজ্ঞতা এই প্রথম। নিজেরই জানা ছিল না যে, সে এত খারাপ লোক এবং তার বিরুদ্ধে রিমঝিম এত এত অভিযোগ বুকের ভেতর লালন করে আসছে এতদিন। তালাকপত্রে লিপিবদ্ধ নানা অভিযোগের মধ্যে 'অসুস্থ অবস্থায় সেবাযত্ন না করা', 'ভারবাল এবিউজ', 'দায়িত্বহীনতা', 'বিয়ের পর দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ফেলে রাখা', 'সংসারের প্রতি উদাসীনতা', 'গ্রাম্য আচরণ' সহ 'শারীরিক নির্যাতনে'র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগও রয়েছে। এর মধ্যে 'ভারবাল এবিউজ', ও 'শারীরিক নির্যাতন' শব্দ ক'টির ওপর চোখ আটকে যায় তার। সে ভাবার চেষ্টা করে, কবে কখন এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সে কিছুতেই মনে করতে পারে না, আর ঠিক তখন ফোন আসে রিমঝিমের। 
 
চিঠি পেয়েছো? মিথ্যা বলবে না। 
 
বলতে দিলা কই।
 
শুদ্ধ করে কথা বলো। আমার সঙ্গে ফাজলামো করবে না। চিঠিটা পেয়েছো? ভেরি ইম্পর্টেন্ট।
 
হ, পাইয়া গেছি।
 
এ কথায় টেলিফোনের অপরপ্রান্তে যেন স্বস্তি, তোমাকে ডিভোর্স করেছি।
 
আলহাম্‌দুলিল্লাহ। 
 
স্টুুপিড। তোমাকে বহুবার বলেছি, আমার সঙ্গে ফাজলামো করবে না। আই এ্যম নো মোর ইওর ওয়াইফ।
 
পত্রখানা পাওয়ার পর বুঝলাম।
 
কী বুঝলে?
 
বুঝলাম, ইউ আর নো মোর মাই ওয়াইফ।
 
আবার ফাজলামো...!
 
ফাজলামি কোথায় করলাম? তুমি কইলা তালাক দিছো, আমি কইলাম আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ খোদার শুকরিয়া আদায়ের মধ্যে ফাজলামোর কী দেখলা? 
 
স্টুপিড।
 
ফোন রেখে দ্যায় রিমঝিম।
 
 
 
আনন্দ, আনন্দ! মকবুল ফরাজির মনে হয়, এই হচ্ছে সময়। এই হচ্ছে আনন্দের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দু'হাত দু'দিকে ছড়িয়ে সুউচ্চ পাহাড় থেকে অনন্তে ঝাঁপ দেয়ার। তারপর চারদিকে শুধু নীল আর নীল। এলোমেলো মেঘের সাম্পানে মুক্তবিহঙ্গের মতো ভেসে বেড়ানো।
 
রিমঝিম দূর থেকে বলছে যেন, এই নাও, স্বাধীনতা তোমাকে দিলাম। কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায় তার। আর সে জানালার বাইরে আকাশের দিকে চোখ রেখে বলে ওঠে, আলহামদুলিল্লাহ।
 
 
 
দুই
 
পাঁচ দিন কোনো ফোন নেই রিমঝিমের, মকবুল ফরাজি টের পায় তার ভিতরটায় দোলা দিয়ে উঠছে একধরনের অস্থিরতা। কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে গেল নাতো। ঝামেলায় জড়ানোর মতো মেয়ে সে নয়, তবু বলা যায় না- একা থাকতে গেলে বিদেশ-বিভুঁইয়ে কত ধরনের ঝামেলা হতে পারে। নিজেকে অবশ্য টেক-কেয়ার করার ক্ষমতা আছে রিমঝিমের। তার উপর সে তো আর পুরোপুরি একা নয়, মাথার উপর মামা-মামি আছেন। তবু কেন মাথার ভিতর ঝিঁঝিঁ পোকার অস্থির শব্দ।
 
রিমঝিমকে প্রথম যেদিন দেখেছিল সেদিনও এমন অস্থির লাগছিল। অসম্ভব চঞ্চল, ছটফটে, স্ট্রেট টকার মেয়েটিকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় তার। 
 
আপনি সানগ্লাস পরে আছেন কেন? এখানে তো রোদ নেই। সানগ্লাস খুলে ফেলুন, আপনার চোখ দুটি একটু দেখি।
 
বলে কী মেয়ে! প্রথম দর্শনেই এভাবে কথা বলা! অবাক হয় মকবুল ফরাজি, আর ভিতরে ভিতরে ঘেমে একাকার যখন, রিমঝিমের কণ্ঠে ধমক, কী বললাম, সানগ্লাস খুলুন।
 
মকবুল ফরাজি অতএব এই প্রথমবার কালো কাচের আবরণমুক্ত চোখ দুটি তুলে পরিপূর্ণভাবে তাকায় রিমঝিমের দিকে।
 
ওয়াও! আপনার চোখ দুটি তো খুব সুন্দর।
 
তুমি নিবা? তোমারে দিয়া দিমু- বলতে গিয়েও কিছু না বলে বরং নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
 
কী ব্যাপার, লজ্জা পেলেন নাকি? ওখানে সাদা গার্লফ্রেন্ড নেই আপনার? 
 
এ প্রশ্নের কী জবাব দেবে ভেবে না পেয়ে শেষে বলে, সাদা-কালো কাউরে পাওয়া এত সোজা না।
 
বিশ্বাস করলাম না, যার চোখ অত সুন্দর তার একজন গার্লফ্রেন্ডও নেই তা কী করে হয়!
 
বিশ্বাস না করতে চাইলে কইরেন না। তবে অইখানে আমার কেউ নাই। আমি একলা।
 
শোনেন মিস্টার, আপনাকে দু-একটি কথা পরিস্কার বলে দিচ্ছি, এক, আপনার নামটি চেঞ্জ করতে হবে।
 
মকবুল ফরাজি অসম্ভব গ্রাম্য একটি নাম। আর দুই, আমাকে বিয়ে করার আগে আপনাকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা শিখতে হবে।
 
রিমঝিমের এ কথায় কিঞ্চিত বিস্মিত হলেও মকবুল ফরাজির অবয়বে সে বিস্ময় থাকে অপ্রকাশিত, বরং সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এই মেয়েটিকেই সে বিয়ে করবে নাম চেঞ্জ না করেই এবং যথাসম্ভব দ্রুত।
 
সে শুধু মুখে বলে, আইচ্ছা।
 
তার হাতে আর সময় নেই, তাকে ফিরে যেতে হবে এমন যুক্তি নিয়ে রিমঝিমদের বাড়িতে যাওয়ার তিন দিনের মাথায় তাদের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই বিদেশে নিজ কর্মস্থলে ফিরে আসার পর মকবুল ফরাজি টের পায় চোখ দুটিই শুধু নয়, হৃদয় মন সবকিছুই যেন মেয়েটি রেখে দিয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে রিমঝিম তাকে এতটা দখল করে ফেলেছে ভাবতেই ভালোলাগার অজানা এক আশ্চর্য শিহরণ অনুভব করে সে। এই বোধ, অপেক্ষার এই বিরল অনুভূতি কোথায় ছিল এতকাল? অপেক্ষাও যে এতটা আনন্দের হতে পারে জানা ছিল না মকবুল ফরাজির।
 
তবে খুব বেশি দিন অপেক্ষায় থাকতে হয়নি তাকে। স্ত্রী হিসেবে ফার্স্ট ট্রাক প্রসেসিং-এ ইমিগ্রেশন নিয়ে রিমঝিম যেদিন বিদেশের মাটিতে পা রাখে, সেদিনই যেন স্বপ্নের দেয়াল ধসে পড়ে। ট্যাক্সিতে মালপত্র উঠিয়ে মকবুল ফরাজি ড্রাইভিং সিটে বসতেই খুব বিরক্তির সঙ্গে জানতে চায় রিমঝিম, তুমি ট্যাক্সি চালাও? ছিঃ!
 
ছিঃ ছিঃ করতাছ কেন? আমি কইছি কোনো দিন যে, কানাডার প্রধানমন্ত্রীর অফিসে চাকরি করি? 
 
তাই বলে তুমি ট্যাক্সি চালাবে? আর কি কোনো কাজ নেই এদেশে?
 
তুমিতো নতুন আইছো এই দেশে। কিছুদিন থাকার পর দেখবা, এই দেশে যে কোনো কাজই সম্মানের। কেউ কোনো কাজ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের চোখে দ্যাখে না।
 
এ কথার কোনো জবাব দ্যায় না রিমঝিম। চুপ করে থাকে সে।
 
সেই যে ছিঃ ছিঃ দিয়ে শুরু তারপর শতচেষ্টা করেও মকবুল ফরাজি সংসারের ধসে যাওয়া দেয়ালটি পুনর্নির্মাণ করতে পারেননি। এবং এই ব্যর্থতা তাকে ধীরে ধীরে অই ধসে যাওয়া দেয়ালের প্রান্তসীমায় দাঁড় করিয়ে দ্যায়। একই বাড়িতে, একই ছাদের নিচে ভালোবাসাহীন জীবন যাপনের চেয়ে আলাদা হয়ে যাওয়াই উত্তম, এমন প্রস্তাব রিমঝিম দিয়েছে বার কয়েক। আর অন্যদিকে, এই যে একই বাড়িতে থাকা, এই যে প্রায় প্রতিদিন দেখা হওয়া এর মূল্যই বা কম কি- এমন ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকার কারণেই মকবুল ফরাজি চাইছিল সম্পর্কের সুতোটুকু ধরে রাখতে। কিন্তু এদেশে আসার নয় মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ বদলে গেল রিমঝিম এবং এতটাই বদলাল যে, এক সময় মকবুল ফরাজির মনে হলো, ফাঁপা অন্তসারশূন্য এই জীবন ও সংসারে অবশিষ্ট বলে আর কিছু নেই।
 
রিমঝিম এমন একটি সময়ের অপেক্ষায় ছিল হয়তো।
 
 
 
সারারাত ট্যাক্সি চালিয়ে ভোররাতে বাসায় ফিরে দ্যাখে রিমঝিম নেই, ফাঁকা চারদিক। চার লাইনের একটি চিরকুট রেখে চলে গেছে। 
 
কোনো একদিন এমনটি হবে ভেবে রেখেছিল বলেই তার চলে যাওয়ায় খুব একটা বিস্মিত হয়নি মকবুল ফরাজি।
 
যদিও অহেতুক ভোর অব্দি ঠাঁয় বসেছিল সে, সকালের দিকে ফোন করে রিমঝিম অবশ্য জানিয়েছিল, সে ভ্যানকুভার চলে এসেছে মামা-মামির কাছে। এ সংসারে ফিরে আসার কোনো বাসনা তার নেই।
 
 
 
তিন
 
অবশেষে ফোন এলো রিমঝিমের, পাঁচ দিনের মাথায়। 
 
কী করছ?
 
তা দিয়া তোমার কী কাম? ইউ আর নো মোর মাই ওয়াইফ।
 
জানি।
 
তো জানলে জিগাইতে আছো ক্যান্‌?
 
এমনি জানতে ইচ্ছে হলো।
 
শুনবা কী করতাছি? তোমার ডিভোর্স পাওয়ার আনন্দে মুখের মধ্যে বুইড়া আঙুল ঢুকাইয়া চু্‌ষতাছি।
 
স্টুপিড। রিমঝিম হিস্‌হিস্‌ করে বলে ওঠে।
 
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দ্যায় মকবুল ফরাজি।
 
একটু পরই আবার ফোন বেজে ওঠে, রিমঝিম।
 
ফোন রেখে দিলে কেন? এ কেমন ভদ্রতা?
 
স্টুপিড মানুষেরা এমুনি করে।
 
তোমাকে আর কতবার বলবো, আমার সঙ্গে শুদ্ধ ও সুন্দর করে কথা বলবে। আজ পর্যন্ত শিখলে না।
 
আর শিখতে অইবো না। কামের কতায় আহো, বারবার ফোন লাগাইতেছ কেন?
 
কেন, তোমাকে ফোন করা নিষেধ নাকি? 
 
নিষেধ অইবো কেন! তবে ডিভোর্স স্বামীর লগে বাতচিৎ গুনার কাজ। দোজগে যাবা।
 
এই হাদিস কে শেখালো তোমাকে?
 
কামের কতায় আও। বারবার ফোন কেন?
 
হ্যাঁ, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। আসার সময় তাড়াহুড়ার মধ্যে আমি আমার পাসপোর্ট, সার্টিফিকেট ও কিছু কাগজপত্র ফেলে এসেছি। কুরিয়ারে পাঠিয়ে দাও প্লিজ। ঠিকানা দিচ্ছি...।
 
আচ্ছা। তোমারে একটা কথা জিগাই। তুমি তালাকনামায় লিখছো, আমি তোমারে মারধর, গালিগালাজ করছি...
 
আমি লিখিনি। উকিল লিখেছে।
 
তুমি না কইলে উকিল লিখলো কেমনে?
 
দ্যাখো মকবুল, আমাকে শুধু শুধু রাগাবে না। ওসব কথা আমি বলিনি। আমি শুধু বলেছি, আমাদের বনিবনা হচ্ছে না। তালাক দিতে হলে নাকি অমন দু'একটি অভিযোগের কথা বলতে হয়, তাই উকিল সাহেব আমাকে না জিজ্ঞেস করেই ওসব লিখেছেন।
 
আর তুমি এই ডাহা মিথ্যা কথাগুলি মাইনা নিলা?
 
আমার মানা না মানায় কী বা এসে যায়! আর তুমিইবা এতটা সিরিয়াস হচ্ছো কেন? এতে তোমার তো কোনো ক্ষতি হয়নি।
 
আমার ক্ষতি অয় নাই তো তোমার অইছে?
 
হ্যা, ক্ষতি যা হবার আমারই হয়েছে। আমি আমার স্বামী হারিয়েছি, তুমি কিছুই হারাওনি।
 
ফোন রেখে দ্যায় রিমঝিম।
 
 
 
চার
 
হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে, তারপর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। টরন্টোর আবহাওয়া এ রকমই। এই ভালো, এই খারাপ। কাল রাতে কাজে যায়নি সে, ক'দিন থেকেই ভাবছে, এ শহর ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যাবে। এই ঘর, এই বারান্দা, আসবাবপত্র সব কিছু জুড়ে যেন রিমঝিমের ছায়া।
 
রিমঝিম চলে গেলেও যেন রেখে গেছে তার শরীরের অশরীরী ছায়া। মেয়ে মানুষরা পারেও বাবা! তবে আনন্দের ব্যাপার, মকবুল ফরাজি হিসেব করে দ্যাখে, গত চার মাসে একটিবারও ফোন করেনি সে। 
 
অন্তত ফোনের উপদ্রব থেকে সে মুক্ত। এ রকম ভাবতে না ভাবতেই আজ ফোন বেজে ওঠে সহসা, অপর প্রান্তে রিমঝিম।
 
কেমন আছো?
 
তা দিয়া তোমার কাম কী?
 
তুমি কি আমার উপর রেগে আছো মকবুল?
 
ফালতু কথা ছাইড়া কামের কথা কও। আবার ফোন কেন?
 
আমি ফিরে আসছি।
 
মানে কি ? কই আইবা? 
 
কেন, আমার সংসারে। 
 
সংসার পাইলা কই? নতুন সংসার অইছে?
 
নতুন হবে কেন? পুরনো সংসারেই ফিরে আসছি।
 
বাট ইউ আর নো মোর মাই ওয়াইফ, তুমি আমারে তালাক দিছো...
 
তাতে কি? বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড হিসেবে থাকবো। আই অ্যাম নট জোকিং মকবুল, আমি এখন এয়ারপোর্টে। অ্যান্ড আই অ্যাম কামিং।
 
ফোন রেখে দ্যায় রিমঝিম।
 
 
 
পাঁচ
 
স্তব্ধ হয়ে সোফার উপর বসে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে ওঠে মকবুল ফরাজি। আর সময় নেই তার হাতে, কিছু কাপড়-চোপড় আর নিত্যব্যবহারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটা ব্যাগে ভরে নেয় সে। একটা ট্যাক্সি ডাকে। ওয়ালেট থেকে রিমঝিমের রেখে যাওয়া চিরকুটটি রাখে টেবলের উপর, বাইরে তখন প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি।
 
মকবুল ফরাজি তখনও জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, তার গন্তব্য কোথায়! 
 
অবশেষে রিমঝিম
 
গল্পের শেষ এইখানে।
 
আমি বললাম কি, আর উনি লিখলেন কী! আমি কি জানি না, আমি কই যাইতেছি? যত সব ফালতু কথা। উনি গল্প শেষ করলেন, মকবুল ফরাজি তখনো জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, তার গন্তব্য কোথায়!
 
এইটা কথা অইলো কোনো! আমি না জানলে থান্ডার বে'র টিকেট কাটলাম কেমনে? আমি তো জানি আমি কোথায় যাচ্ছি।
 
সমস্যা আরো আছে এই গল্পে। পূর্বে পশ্চিমের ছায়া- নামটা উনি কেন দিলেন তা আমার মাথায় একেবারেই ঢুকছে না। পশ্চিমে পূর্বের ছায়া হলেও মানতে পারতাম। জানেন, রিমঝিম যে ফিরে এসেছে অবশেষে সেই কথাটা কিন্তু উনি লেখেননি গল্পে। এই থান্ডার বে'তেই ঘটনাটা ঘটেছিল। একদিন, খুব বৃষ্টি ছিল সেদিন, আমি গাড়ি নিয়ে বেরোবো, এমন সময় দরজা খুলতেই দেখি, রিমঝিম। সাক্ষাৎ পরী। 
 
বললাম, মকবুল গল্পে অমন হয়। কিছু অনিশ্চয়তা, কিছু রহস্য তো গল্পে থাকতেই হবে।
 
এমএ/ ০৯:৪৪/ ২০ ডিসেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে