Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (40 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১২-২১-২০১৮

সৈয়দ হকের জন্মদিন

আনোয়ারা সৈয়দ হক


সৈয়দ হকের জন্মদিন

উনিশশো তেষট্টি সালের খুব সম্ভব জুন মাসে সৈয়দ হকের সঙ্গে আমার প্রথম চাক্ষুষ দেখা হয়। এর আগে মাস ছয়েকের মতো হয়তো পত্রমিতালি। সেইসব পত্রমিতালির সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে আমার শ্বশুরবাড়ির কাছের একজন মানুষ। কারণ যেখানে আমাদের স্যুটকেসটা রেখে বিদেশে চলে গিয়েছিলাম, যার হাতে সরল বিশ্বাসে গচ্ছিত ছিল সবকিছু, তিনি সেটার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে আমাদের বিদেশ থাকাকালীন সেটা ভেঙে খুলে জিনিসপত্র, চিঠিপত্র, স্যুভেনির, পরস্পরকে দেয়া-নেয়ার শুভেচ্ছার নিদর্শন সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে তছনছ করেছিলেন। এই রাগ ও ক্ষোভের কারণ হয়তো এটাই হতে পারে যে, আমি বা আমরা বিদেশ থাকাকালীন তাদের কোনো আর্থিক সাহায্য করতে পারিনি। 

দুটো ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে করা সম্ভবও ছিল না।

পরে যখন সৈয়দ হকের কাছে এই নিয়ে আহাজারি করি, তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, আরে পাগলি, মানুষের জীবনই হারিয়ে যায়, তো জিনিস! মুক্তিযুদ্ধের সময় তুমি আমি বা বাচ্চারা হারিয়ে গেলে কী হতো?

মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী জীবনের সব ঘটনাপ্রবাহ তিনি এভাবেই মূল্যায়ন করতেন।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি তাঁর আত্মীয়কে এজন্য সামান্য তিরস্কারও করেননি। 

কেন করেননি জানি না, তবে আমার মনে খুব কষ্ট হয়েছিল।

সেই ট্রাঙ্কের ভেতরে ছিল প্রথম জন্মদিন পালনের স্মৃতি, তাঁকে দেয়া ছোট ছোট কিছু স্যুভেনির, কিছু পেইন্টিং, তাঁর লেখার সবুজ রঙের মোটা একটা কলম, আমাদের মধ্যে পরস্পরের চিঠি লেখালিখি, তাঁর সাহিত্য ভাবনা সেইসব চিঠির ভেতরে, তার বাবার নিজের হাতে লেখা চিঠি তাঁর পুত্রকে, তাঁর লেখা চিঠি তাঁর ছোট ভাইয়ের কাছে যেখানে এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, 'ভাই, আমি হবো একজন নামকরা চিত্রপরিচালক আর তুমি হবে একজন শ্রেষ্ঠ বক্তা!' আরও ছিল একজন নবীন অচেনা শিল্পীর কাছ থেকে আমার হোস্টেল খরচের পয়সা দিয়ে কেনা কিছু হাতে আঁকা পেইন্টিং।

তখনও আমি জানতাম না শিল্পের ভুবনে তাঁর চলাফেরা আমার সাথে দেখা হবার অনেক আগে থেকেই। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর জানি বন্ধু। শিল্পী মুর্তজা বশীর তাঁর ঘনিষ্ঠ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাঁর কাছের মানুষ এবং পটুয়া কামরুল হাসান তাঁর প্রিয় কামরুল ভাই।

সুতরাং একজন নবিশ শিল্পীর আঁকা ছবি তাঁকে প্রভাবিত করবে কেন?

কিন্তু আমি এতকিছু তখনও জানতাম না। বরং দেশ থেকে বাবার পাঠানো মাসিক খরচের পয়সা দিয়ে অচেনা সেই শিল্পীর ফটেগ্র্যাফিক ছবিগুলো কিনে আমি কী যে খুশি ! ছবির ভেতরে নদী, আকাশ, গাছ, ঘাস কত কিছু। আর কি চাই! আমি তো একেবারে মুগ্ধ। তখনও ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি বা প্যারিসের ল্যুভর দেখা হয়নি তো! ইচ্ছে ছিল ছবিগুলো তাঁকে উপহার দিয়ে একেবারে তাক লাগিয়ে দেব!

আমি যখন তাঁর চোখের সামনে ছবিগুলো একটার পর একটা প্রদর্শন করে গর্বের সঙ্গে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, আর তিনি আমাকে একভাবে প্রশংসা করে চলেছেন, আরে বাঃ, সাংঘাতিক সুন্দর তো! কোথায় পেলে এত সুন্দর ছবি? আরে, এগুলো রেখে দাও যত্ন করে! 

আমি যেবার তার প্রথম জন্মদিন পালন করি, আমাদের বিয়ের আগে, তিনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। খুশির চেয়েও বেশি অবাক। তবে আমিই বা কীভাবে জানলাম যে মানুষের জন্মদিন পালন করতে হয়? আমাদের বাড়িতে তো কোনোদিন কারও জন্মদিন পালিত হয়নি কখনো। এগারোটি ভাইবোনের জন্মদিন পালন করবে কে? তা ছাড়া আমাদের কার কখন জন্ম, সেইসব নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয় না। শুধু যখন স্কুলে ভর্তি হবার সময় আসত তখন বানিয়ে এবং আন্দাজ করে একটা তারিখ বসিয়ে দেয়া হতো। 

তবে ঢাকায় আসার পর থেকে মানুষের জন্মদিন যে একটি আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করার বিষয়, সে সম্পর্কে একটি ধারণা গড়ে উঠেছিল। আমার মেডিকেলের সতীর্থ ইফফাত আরা ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে আমাকে একদিন ঢাকার নামকরা এক পরিবারের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন বেড়াতে। সেখানে গিয়ে শুনি, সেই ছেলের জন্মদিন পালন করা হয়েছে একদিন আগে। শুনে তো আমি মনে মনে অবাক। সারা বাড়িতে তখনও জন্মদিনের বেলুন উড়ে আছে। ঝুলে আছে ছাদের রেলিং থেকে। শুনলাম, বিরাট কেক কাটা হয়েছে ওইটুকু একটি বাচ্চা ছেলের। 

আরে ব্বাস! মনে মনে আমি অবাক।

সেই দিনের পর থেকে আরও অনেক জন্মদিনের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। সুতরাং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি জন্মদিন পালন করা শুরু করি তাঁর। 

তারপর বিদেশে গেলেও আমি তাঁর জন্মদিন পালন করা থেকে বিরত থাকিনি।

যখন বিদেশ থেকে সৈয়দ হক দেশে ফিরে এলেন, তিনি তাঁর সতীর্থ শামসুর রাহমানের পঞ্চাশতম জন্মদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনে এক প্রকার জোর করেই দেশবাসীর সমুখে উদযাপন করেন। সকলে অবাক। কারণ একজন কবির জন্মদিন যে সরকারি টেলিভিশন উদযাপন করতে পারে, সে ধারণা তখন যেন কারও ছিল না। কবিকেও যে সম্মান করতে হয় জনসমক্ষে, তাই বা ক'জনে তখন জানত? বেশ কয়েক বছর বাদে সৈয়দ হকের পঞ্চাশতম জন্মদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনে পালন করার আয়োজনও কয়েকজন তরুণ কবি উৎসাহের সাথে করার চেষ্টা করেছিলেন। কবি মোহন রায়হানকে এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে। তিনি চেষ্টা করেছিলেন সৈয়দ হকের পঞ্চাশতম জন্মদিন পালন করার। কিন্তু নানা রকম বৈরিতায় সে জন্মদিন পালিত হতে পারেনি। সৈয়দ শামসুল হক কে- এই ধারণায় বড় মানুষদের হস্তক্ষেপে সে জন্মদিন আর পালিত হয়নি। তবু মোহন রায়হান থেমে থাকেননি। তিনি রাইটার্স ক্লাবের মাধ্যমে সৈয়দ হকের সত্তরতম জন্মদিন পালন করেছিলেন মহা ধুমধামের সঙ্গে।

কবি মোহন রায়হান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কিন্তু মহৎ প্রাণের একজন কবি ও মানুষ। কত মানুষের সাহিত্যিক প্রমোশনের জন্য যে তিনি সৈয়দ হককে অনুরোধ করেছিলেন, সেইসব তো আমার নিজের চোখে দেখা। আবার সেইসব মানুষকেই দেখেছি সুযোগ পেলে মোহনকেই পদদলিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।

জানি এসব কথা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।

অবশ্য আগে আমার ধারণা ছিল না যে কোনোদিন তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে দেশের সংবাদপত্রগুলো বিশেষভাবে তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করবে। তাঁকে শুভেচ্ছা জানাবে। বঙ্গবন্ধু, দেশ, মাটি, মানুষ, মাতৃভূমির প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং ঐকান্তিক নিষ্ঠার জন্য তাঁকে জানাবে আন্তরিক ধন্যবাদ। এবং একদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনও তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করবে। 

আর চ্যানেল আই-এর ফরিদুর রেজা সাগর তো প্রতি বছরই সৈয়দ হককে নিয়ে চ্যানেলে প্রোগ্রাম করেছেন। সাহিত্য সম্রাজ্ঞী রাবেয়া খাতুন, যিনি সাগরের মা, তাঁর জন্মদিনও একই তারিখে হওয়ায় সাগর প্রতি বছরই বিশাল আয়োজন করতেন তাঁদের দু'জনকে একত্র করে জন্মদিন পালন করতে। 

এ প্রসঙ্গে সদ্যপ্রয়াত সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের কথা মনে পড়ে। আশ্চর্য মহৎপ্রাণের এই ব্যক্তিটি প্রায় প্রতি বছরই তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় সৈয়দ হকের জন্মদিন পালন করতেন বড় নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে। 

এবং তখনও ভাবিনি, ভবিষ্যতে এমন একদিন আসবে যখন দেশের প্রধানমন্ত্রীও তাঁর সচিবের মাধ্যমে তাঁকে তাঁর জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁর বাড়িতে দূত পাঠাবেন!

এবং সাহিত্যের চারণভূমিতে সৈয়দ হক তাঁর দিবারাত্রির পরিশ্রমের পদচ্ছাপ রেখে যাবেন!

ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে? আর ভবিষ্যৎ আমরা জানি না বলেই না আমাদের এতসব আয়োজন!

আজ পেছনের দিকে তাকালে মনে হয়, সৈয়দ হক খুব ভাগ্যবান মানুষ, যিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই মানুষের প্রবল অনুরাগ, ভালোবাসা ও স্নেহ নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছেন। 

তবে কটূক্তি বা গালাগালও যে প্রচুর খেয়েছেন, সে ব্যাপারে আর কারও সন্দেহ থাকলেও আমার অন্তত নেই। বিশেষ করে গোপন মোবাইল টেক্সট ও অগোপন ফেসবুক। 

আমার পরিবার ও পরিবারের বাইরে সকলেই প্রায় সমান সমান এসব ব্যাপারে!

তবে তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ একই সঙ্গে জীবনের মহত্ত্ব এবং চেনা ও অচেনা মানুষের অনুরাগ আজীবন আপ্লুত করেছে সৈয়দ হককে। 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যদি জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্ত গালি খেয়ে যেতে পারেন এবং যখন কবিগুরুকে বৃদ্ধ বয়সে দুঃখ করে বলতে শোনা যায়, আমার বিরুদ্ধে ওরা এতসব লিখছে, আমার বন্ধুদের ভেতরে কি এমন কেউ একজন নেই যে, এর উত্তর দিতে পারে? 

সেখানে সৈয়দ হক তো কোন ছার!
আমার সৈয়দ হক তো কবিগুরুর পেছনেই স্মিত মুখে নত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন!
শুভ জন্মদিন, সৈয়দ হক। 

এমএ/ ০৯:৪৪/ ২০ ডিসেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে