Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৫ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-০৮-২০১৩

সাম্প্রতিক ভাবনা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল



	সাম্প্রতিক ভাবনা
১.
এপ্রিলের ৬ তারিখ বিকেলে আমি শাহবাগে বসেছিলাম, সেদিন মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের বিশাল সমাবেশ ছিল। সরকারের হিসেবে সেটা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হলেও শাহবাগে বসে আমার সে রকম মনে হয়নি। সেখানে এক ধরনের উত্তেজনা ছিল। হেফাজতে ইসলামের একটা দল বার বার হামলা করার চেষ্টা করছিল। সেখানে বসে আমি যখন স্লোগান শুনছি তখন একটি মেয়ে আমার কাছে এসে বলল, ‘স্যার, দেশে কী হচ্ছে? আমার মনটা ভাল নেই, কিছু একটা বলে আমাকে সাহস দেন।’ আমি সাধারণত যে কথাগুলো বলি তাকে সেগুলোই বললাম, সাহস দিলাম।
মেয়েটি চলে যাওয়ার পর আমি পুরো ব্যাপারটি নিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম, মনে হলো সত্যিই তো মেয়েটির মন খারাপ তো হতেই পারে। শত বাধা-বিপত্তির মাঝেও যে আমাদের দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে তার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে এখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সেই নারীদের প্রতি তীব্র অসম্মান দেখানোর পরেও আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল হেফাজতে ইসলামকে এত তোয়াজ করে যাচ্ছে কেন? শাহবাগের তরুণেরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলছে; তাদের ওপর হেফাজতে ইসলামের এত রাগ কেন? এই দেশে ইসলাম বিপন্ন, কখনও কারও এই কথা মনে হয়নি; তাহলে হঠাৎ সেই ইসলামকে হেফাজত করার প্রয়োজন হলো কেন?
ধর্ম তো আমাদের জীবন থেকে খুব দূরের কিছু নয়। একটা শিশুর জন্ম হলে প্রথমেই একজন মুরুব্বি খুঁজে বের করা হয় যে শিশুটির কানে আজান শোনাতে পারেন। একটু বড় হলে অবধারিতভাবে একজন হুজুরকে দায়িত্ব দেয়া হয় বাচ্চাদের কোরান শরীফ পড়ানোর জন্য আরবী শেখাতে। ছোট ছোট ছেলেরা মাথায় টুপি পরে আর মেয়েরা মাথায় ওড়না দিয়ে আলিফ জবর আ বে জবর বা পড়তে শেখে। জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার আগে ছেলেমেয়েরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে, ‘স্যার, আমার পরীক্ষা, আমার জন্য দোয়া করবেন।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলি, ‘খোদা, এই বাচ্চাটার পরীক্ষা ভাল করে দিও।’ সবচেয়ে মজা হয় যখন হঠাৎ একজন উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘স্যার, মনে আছে আপনি আমার জন্য দোয়া করেছিলেন? সেই জন্য আমি মেডিক্যালে চান্স পেয়ে গেছি!’ আমার দোয়ায় এত ধার নেই; তাহলে এই দেশে আরও অনেক কিছু ঘটে যেত- আমি সেটা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, সে বুঝতে চায় না। নিজের যোগ্যতায় নয়, আমার দোয়ার কারণে সুযোগ পেয়ে গেছে সেটা বিশ্বাস করতেই তার আগ্রহ বেশি তাই আমি তর্ক করি না!
বছরখানেক আগে আমার এক সহকর্মী যে একসময় আমার ছাত্র ছিল ভয়ঙ্কর একটা এ্যাক্সিডেন্টে পড়ে সেখান থেকে ফোন করেছে মুখোমুখি বাস দুর্ঘটনায় ষোলোজন সেখানেই মারা গেছে। আহত সহকর্মীকে ঢাকায় এনে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করার ফাঁকে আমি আমার মাকে ফোন করে বলেছি, ‘মা আমার একজন টিচার এ্যাক্সিডেন্ট করেছে- তার জন্য দোয়া করেন।’ আমার মা তখনই তার জন্য দোয়া করতে জায়নামাজে বসে যান। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ মারা যাওয়ার পর তাঁর কুলখানিতে কোরান খতম করার জন্য ছোট ছোট বাচ্চা-কাচ্চা পাঁচ-ছয়জন মেয়ে এসেছিল, এই টুকু বয়সে তারা কোরানে হাফেজ। মাথা দুলিয়ে সুরেলা গলায় কোরান শরীফ পড়ে কয়েক ঘণ্টার মাঝে তারা কোরান শরীফ শেষ করে ফেলল। (আমি তাদের আমার লেখা কয়েকটা বই দিলাম, ভূতের বইটা পেয়ে তাদের কী আনন্দ!) একদিন নূহাশ পল্লীতে বসে আছি তখন সাত-আটজন অত্যন্ত সুদর্শন তরুণ আমাকে ঘিরে ধরল ছবি তোলার জন্য। ছবি তোলার পর জানতে পারলাম তারা সবাই একে অপরের কাজিন এবং সবাই কোরানে হাফেজ। হুমায়ূন আহমেদের জন্য কোরান খতম করে তারা তাঁর কবরে এসেছে দোয়া করতে- শুনে কেন জানি আমার চোখে পানি এসে গেল।
আমাদের কাছে এটাই হচ্ছে ধর্ম, এর মাঝে শুধু একজনের জন্যে আরেকজনের ভালোবাসা। যখন দুঃখ-কষ্ট-হতাশা এসে ভর করে তখন ধর্ম একটা সান্ত¡না নিয়ে আসে, একটা ভরসা নিয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মায়েরা তাদের সন্তানের মাথায় হাত রেখে ‘ফী আমানিল্লাহ’ বলে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন। সন্তাননেরা হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে গেছে, যুদ্ধ শেষে কেউ কেউ ফিরে এসেছে, সৃষ্টিকর্তা কাউকে কাউকে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। আমি একজন মায়ের কথা জানি যিনি তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের জন্য টানা নয় মাস রোজা রেখেছিলেন। আমার নিজের মা-চাচী শুধু সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে বুক আগলে আমাদের ভাইবোনদের রক্ষা করেছিলেন। এই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এটাই হচ্ছে ধর্মের রূপ, এর মাঝে শুধু ভালবাসা আর শান্তি, আছে বিশ্বাস এবং ভরসা।
সেই ধর্মকে হেফাজত করার জন্য এপ্রিলের ৬ তারিখ যখন মতিঝিলের শাপলা চত্বরে কয়েক লাখ পুরুষ মানুষ জড়ো হয়েছিল তখন কেন এই দেশের মানুষের, বিশেষ করে মেয়েদের বুক কেঁপে উঠেছিল? এই দেশের অর্ধেক মানুষ মেয়ে, সেই মেয়েদের অবমাননা করার ঘোষণা দেয়া হেফাজতে ইসলামের ধর্মের সঙ্গে আমাদের পরিচিত শান্ত কোমল ভালবাসা, সহনশীলতা, সহমর্মিতার ধর্মের মাঝে এত পার্থক্য কেন? তাদের রাজনীতির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই সেই কথাটি এক শ’বার জোর গলায় ঘোষণা দেয়ার পরও বিএনপির বড় বড় নেতা কেন মঞ্চে গিয়ে বসে থাকলেন? এই দেশে রং বদল করতে সবচেয়ে পারদর্শী জেনারেল এরশাদ কেন তাদের পানি খাইয়ে সেবা করার জন্য এত ব্যস্ত হলেন? জামায়াতে ইসলামী হঠাৎ কেন হেফাজতে ইসলামের মাঝে তাদের আদর্শ খুঁজে পেতে শুরু করল? নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানও কেন হেফাজতে ইসলামকে সমর্থন জানিয়ে রাখলেন?
২.
শাহবাগের তরুণরা যখন যুদ্ধাপরাধীদের সঠিক বিচারের দাবিতে একটা বিস্ময়কর জাগরণের জন্ম দিয়েছিল তখন হঠাৎ করে তাদের সবাইকে ঢালাওভাবে নাস্তিক দাবি করে একটা প্রচার শুরু হলো। একজন মানুষ যদি শুধু নিজে থেকে নিজেকে নাস্তিক হিসেবে ঘোষণা দেয় তাহলে হয়ত তাকে নাস্তিক বলা যায় অন্যদের পক্ষে কোনভাবেই একজনকে নাস্তিক বলা সম্ভব নয়। একজন মানুষকে নানাভাবে গালাগালি করা এক কথা, কিন্তু তাকে নাস্তিক বা মুরতাদ বলা সম্পূর্ণ অন্য একটি ব্যাপার। এটি আসলে মৃত্যুদ- ঘোষণা করা; ধর্মান্ধ মানুষ এই ঘোষণাটি মেনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে এ রকম উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই আছে। কাজেই একজন মানুষ বা একদল মানুষকে নাস্তিক ঘোষণা দেয়া আসলে তাকে প্রাণের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়া। রাজনৈতিক নেতারা সেটা নিয়ে দুর্ভাবনা করবেন কিংবা সত্যি সত্যি তাদের অপবাদের কারণে কেউ একজন খুন হয়ে গেলে তারা খুব অপরাধবোধে ভুগবেন- সেটা কেউ বিশ্বাস করে না। সত্যি কথা বলতে কী ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। একজন মানুষের মৃত্যু তাদের কাছে স্বজনহারা মানুষের বুক ভাঙ্গা হাহাকার নয়, সেটি রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘লাশ।’ কে কত দক্ষভাবে সেই লাশটা নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারবে, কত ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি করতে পারবে সেটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাই খালেদা জিয়া প্রকাশ্য সভায় জনতার কাছে লাশ চাইতে দ্বিধা করেননি!
‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যখন আনুষ্ঠানিকভাবে শাহবাগের তরুণদের নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা শুরু করেছিলেন তখন তার ভিতরে কোন অপরাধবোধের জন্ম হয়েছিল বলে আমার মনে হয় না। আমি মোটামুটি লিখে দিতে পারি শাহবাগের সব তরুণ নাস্তিক সেটা তারা নিজেরাও বিশ্বাস করেন না, কিন্তু সেটা প্রচার করতে তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেন না। সেই প্রচারণার কারণে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল এবং তার কারণে যে কয়টি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল তাদের জন্য সম্পাদক মহোদয়ের বুকের ভিতর কোন অনুশোচনা হয়েছিল কিনা সেটি আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। 
সম্ভবত হয়নি- কারণ আমার দেশ’র সম্পাদক মহোদয়কে অত্যন্ত সঙ্গতকারণে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং এই দেশের পনেরোটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদক প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। মোটামুটি একই সময়ে প্রায় একই ধরনের কারণ দেখিয়ে চার ব্লগারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, পনেরোজন সম্পাদক তখন একত্র হয়ে তাদের জন্য মুখ ফুটে কোন কথা বলেননি। ভাগ্যিস গোলাম আযম কিংবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো যুদ্ধাপরাধীদের কোন পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক নেই, যদি থাকত তাহলে এই পনেরোজন সম্পাদক হয়ত তাদের পক্ষেও বিবৃতি দিতেন। ‘আমার দেশ’ এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের তীব্র সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ প্রচারণার কারণে এই দেশে অনেক প্রাণ ঝরে গেছে, তিনি নিজের হাতে কোন খুন হয়ত করেননি, কিন্তু তাঁর কারণে মানুষের প্রাণ বিপন্ন হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের এ রকম একজন মানুষের জন্য এই দেশের পনেরোজন সম্পাদক বিবৃতি দিতে পারেন- সেটি আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। ঘটনাটি আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে এবং আমি জানি এই দেশের তরুণ সমাজকে প্রচ-ভাবে ক্রুদ্ধ করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাগুলোই যেহেতু এই দেশের মানুষের কাছে সব খবর পৌঁছে দেয় তাই নতুন প্রজন্মের ক্ষোভের কথাটি হয়ত দেশের মানুষ কোনদিন জানতেও পারবে না। 
যাই হোক, রাজনৈতিক মানুষের কাছে হয়ত আমরা নৈতিকতা আশা করা ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু ধার্মিক মানুষের কাছে তো আশা করতেই পারি। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দের মতো ইসলামের আলেম বা চিন্তাবিদ না হতে পারে, কিন্তু তাই বলে আমাদের মতো মানুষরা যে কোরান-হাদিস পড়তে পারে না তা নয়। (হেফাজতে ইসলামের ব্লগের ওপর খুব রাগ, কিন্তু তারা কি জানে ইসলামের ওপর খুব চমৎকার ব্লগ আছে?) ইসলাম ধর্মের ধর্মগ্রন্থে তো খুব পরিষ্কারভাবে লেখা আছে কোন মানুষকে মিথ্যা অপবাদ দেয়া খুব বড় অপরাধ; পরকালে তার জন্য খুব কঠোর শাস্তির কথা বলা আছে। তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর মতো কিংবা ‘আমার দেশ’ পত্রিকার মতো হেফাজতে ইসলাম কেমন করে ঢালাওভাবে শাহবাগের সকল তরুণ-তরুণীকে নাস্তিক হিসেবে ঘোষণা দিতে পারল? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ হলেই সে জামায়াতে ইসলামের বিপক্ষের একজন মানুষ হবে, কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে হলেই সে ইসলামের বিপক্ষে হবে এই সরলীকরণ কবে থেকে শুরু হলো? 
৩.
মে মাসের পাঁচ তারিখ হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অবরোধের ডাক দিয়েছিল। তাদের সঙ্গে রাজনীতির কোন সম্পর্ক নেই কথাটি আনেকবার বলার পরও খালেদা জিয়া অবরোধের সঙ্গে মিলিয়ে আটচল্লিশ ঘণ্টার একটা আল্টিমেটাম দিলেন। হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের কী পরিকল্পনা ছিল তাদের সঙ্গে বিএনপি বা জামায়াতের কী যোগাযোগ ছিল আমরা কিছু জানি না কিন্তু মে মাসের পাঁচ তারিখ ভোর চারটার সময় আমি আমার ফোনে একটি এসএমএস পেলাম। ইংরেজী অক্ষরে বাংলায় লেখা এসএমএস আমি হুবহু তুলে দিচ্ছি : 
‘এই নাস্তিক জাফর ইকবাল, তোদের মৃত্যুর ঘণ্টা বাজছে। হতে পারে আজ রাতই তোদের শেষ রাত। কাল হয়ত তোরা আর পৃথিবীতে থাকতে পারবি না কারণ এই জমানার শ্রেষ্ঠ শায়খুল হাদিস আল্লামা আহমদ শফীর ডাকে সারা বাংলাদেশের তৌহিদী জনতা মাঠে নেমে এসেছে। সেই সব তৌহিদী জনতা প্রধানমন্ত্রীসহ তোদের সব ধরে ধরে জবাই করে ছাড়বে। আমার আল্লাহকে নিয়ে বিশ্বনবীকে নিয়ে আলীমকে নিয়ে কোরানের হাফেজদের নিয়ে কটূক্তি করার ভয়ঙ্কর পরিণাম কী তা আগামী কালকেই হাড়ে হাড়ে টের পাবি তোরা।’
যে কোন হিসেবে এটি একটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর একটি এমএসএস (এটি পাওয়ার পর আমার সম্ভবত পুলিশকে জানানো উচিত ছিল কিন্তু এসব খবর সংবাদপত্রে চলে যায়, আপনজনেরা ভয় পায় আমি তাই চেপে যাওয়ার চেষ্টা করি!) তবে এই এসএমএসটি পড়লে ৫ মে-র ঘটনা সম্পর্কে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। সরকার যদিও এটাকে একটা ‘শান্তিপূর্ণ’ ‘নিয়মতান্ত্রিক’ অবরোধ এবং সমাবেশ ভেবে তাদের ঢাকা শহরে আসতে দিয়েছিল কিন্তু তাদের কর্মীদের অন্য পরিকল্পনা ছিল। হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের তাদের নেতাদের ওপর অটল বিশ্বাস এবং তাঁর নেতৃত্বে তারা আমাদের মতো মানুষদের জবাই করে ফেলাটাকে তাদের ইমানি দায়িত্ব হিসেবে মনে করে। মে মাসের ৫ তারিখে খালেদা জিয়া হেফাজতে ইসলামকে সব রকম সাহায্য করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য লোক জমায়েত হয়ে পরদিন ঢাকা শহরে একটা চরম বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে দেয়া হলে শেষ পর্যন্ত কী হতো আমরা জানি না। 
সেদিন ঢাকা শহরে যে তা-ব হয়েছিল দেশের মানুষ তা অনেকদিন মনে রাখবে। ইসলামকে হেফাজত করার দায়িত্ব নিয়ে একসঙ্গে এত কোরান শরীফ সম্ভবত পৃথিবীর আর কোথাও কখনও পোড়ানো হয়নি- এবং সম্ভবত আর কখনও হবেও না। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যদি কখনও কোরান শরীফের অবমাননা করা হয় বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়। এই প্রথমবার ইসলামপন্থী দলগুলো একেবারে নিঃশব্দে পবিত্র কোরান শরীফের এত বড় অবমাননাটি মেনে নিয়েছে, কেউ টুঁ শব্দটি করেনি। মে মাসের ৫ তারিখের মতো এত বড় নিষ্ঠুরতা এবং ধ্বংসযজ্ঞ আমরা আগে কখনও দেখেছি বলে মনে করতে পারি না আর এর সবকিছু ঘটানো হয়েছে ইসলামকে রক্ষা করার নামে, এর থেকে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?
৪.
আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে সেখানে মন খারাপ হওয়ার মতো কিংবা হতাশ হওয়ার মতো অনেক কিছু ঘটছে, কিন্তু তারপরেও আমি মন খারাপ করছি না কিংবা হতাশ হচ্ছি না শুধু একটি কারণে, সেটি হচ্ছে এখন আমি নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছি এই দেশে একটি অত্যন্ত দেশপ্রেমিক আধুনিক লেখাপড়া জানা তরুণ সমাজ আছে। দেশ যদি বিপদে পড়ে যায় তাহলে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে দেশের পাশে দাঁড়াতে এতটুকু দ্বিধা করবে না। আমি একসময় ভাবতাম আমাদের সংবাদ মাধ্যম এই দেশের একটি বড় শক্তি, কিন্তু দেশের পনেরোজন সম্পাদকদের সাম্প্রতিক কাজকর্ম দেখে আমার সেই ধারণায় চোট খেয়েছে। তাঁরা অনেক জ্ঞানী-গুণী, বিচক্ষণ, যুক্তিবাদী, সচেতন এবং নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী। কিন্তু যেদিন আমি আবিষ্কার করেছি- ন্যায় এবং অন্যায়ের মাঝখানেও কেউ কেউ নিরপেক্ষ হতে শুরু করেছেন সেদিন থেকে এই শব্দটিকে আমি সন্দেহ করতে শুরু করেছি!
ঠিক কী কারণ জানি না জ্ঞানী-গুণী, বিচক্ষণ, যুক্তিবাদী, নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী থেকে কমবয়সী আবেগপ্রবণ যুক্তিহীন কিন্তু তীব্রভাবে দেশপ্রেমিক তরুণদের আমি বেশি বিশ্বাস করি, তাদের ওপর আমি অনেক বেশি ভরসা করি। 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে