Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ১ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (20 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-১৬-২০১৮

আরো বড় বিজয়ের জন্য অপেক্ষায় আছি

আবদুল গাফফার চৌধুরী


আরো বড় বিজয়ের জন্য অপেক্ষায় আছি

আজ থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমি একটা বিজয় উৎসব দেখেছি। রক্তস্নাত বিজয় দিবস। আজ ৪৭ বছর পর একই ডিসেম্বর মাসে ১৬ তারিখের পর আরেকটি বিজয় দিবসের জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করছি এবারের বিজয় দিবস হবে আরেক বিজয় দিবসের প্রস্তুতি। স্বাধীনতার অসমাপ্ত যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের দিন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণতান্ত্রিক শিবিরের চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য অধীর আগ্রহের সঙ্গে দেশপ্রেমিক মানুষের সঙ্গে আমিও অপেক্ষা করছি।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণের সুযোগ এনে দিয়েছিল। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোটের সম্ভাব্য বিজয় অর্জিত স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেবে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিকে নিরাপত্তা দেবে। সেই নিরাপত্তার ব্যূহ ভেদ করা আর কখনো শত্রুপক্ষের দ্বারা সম্ভব হবে না।

কিছু লোকের মনে সন্দেহ আছে, এবারের এই যুদ্ধে কি আমাদের বিজয় হবে? এই সন্দেহ ১৯৭১ সালের যুদ্ধেও অনেকের মনে ছিল, ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সারা দেশ তখন শোকাচ্ছন্ন। দুই দিন পর সেই শোক থেকে তরবারি তৈরি হলো। শোকের তরবারি হয়ে গেল বিজয়ের তরবারি, সারা দেশ আপ্লুত হলো জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে।

আমার বিশ্বাস আর ১৭ দিন পর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন শেষ হলে আবার দেশব্যাপী সেই বিজয় নিনাদ শোনা যাবে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। রাত্রির অন্ধকার চিরে যেমন সূর্যের উদয় হয়, তেমনি বর্তমানের সব হতাশা-নিরাশা দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘনিয়ে একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠবে আরেকবার। আর এখনো যাঁরা ঢাকায় নয়া কাশিমবাজার কুঠিতে বসে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের ছুরিতে শাণ দিচ্ছেন, তাঁদের সব অভিসন্ধি ব্যর্থ হবে।

যাঁরা এখন ঢাকায় সাংবাদিক সভা ডেকে তাঁদের খোয়াব সফল হওয়ার আশায় তর্জন-গর্জন করছেন, আর কয়েক দিন আছে আওয়ামী সরকারের আয়ু। তার পরই আমরা ক্ষমতায় যাব এবং আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতাদের তখন আর পাত্তা পাওয়া যাবে না; তাঁদের এই হুঙ্কার যে অক্ষমের আস্ফাালন তা সম্ভবত তাঁরা বুঝেও না বোঝার ভান করছেন এবং দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ড. কামাল হোসেনের কণ্ঠে এখন খালেদা জিয়ার হুমকি। কয়েক বছর আগে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতিদের জঙ্গি সমাবেশের সময় খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা ত্যাগ করার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘নইলে তারা দেশ থেকে পলায়নের সুযোগ পাবে না।’ তার পরিণতি কী হয়েছে দেশবাসী জানেন।

এবার আরেকটি বিজয় দিবসের প্রাক্কালে খালেদা জিয়ার ধানের শীষ বুকের বোতামে সেঁটে কুলত্যাগী কামাল হোসেন সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের ক্ষমতায় থাকার দিন শেষ। যাওয়ার আগে দু-একটা ভালো কাজ করে যাও। নইলে তোমাদের বিচার হবে।’ দেশের কোনো সংকট দেখলেই যে নেতা বিদেশে পালান, তাঁর মুখে এই হুমকি সাজে কি?

আমি কামাল সাহেবের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী মানুষ নই। সামান্য একজন সাংবাদিক মাত্র। কিন্তু আমিও তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলছি, আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আবার সারা বাংলায় বিজয়ের স্রোতে নৌকা ভাসবে। তাঁর সঙ্গে (হয়তো সঙ্গে থাকবে আরো কিছু পরাজিত ও পলাতক নেতা) আমার আবার দেখা হবে লন্ডনের কোনো রাস্তায় অথবা বেকার স্ট্রিটের টিউব স্টেশনে। যেমন দেখা হয়েছিল সত্তরের দশকের শেষ দিকে। সেবার যাদের ভয়ে তিনি পালিয়েছিলেন, এবার তাদের কাঁধে সওয়ার হয়ে ভাবছেন হাসিনার ওপর প্রতিশোধ নেবেন। কিন্তু সফল হবেন কি? ইনশাআল্লাহ, কামাল সাহেব ৩০ ডিসেম্বরের পর ‘লন্ডন মে ফের মিলেঙ্গে।’ তখন কী বলবেন? মার্কিনি অর্থে অক্সফোর্ডে আবার গবেষণা করতে এসেছেন?

৪৭ বছর আগের বিজয় দিবস আর বর্তমানের সম্ভাব্য বিজয় দিবসের পার্থক্য এই যে তখন জনগণের স্বাধীনতার যুদ্ধের শিবিরে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে যে দু-একজন ‘কালো মোষ’ চরিত্রের, এবার তাঁরা একাত্তরের পরাজিত শত্রুশিবিরের নতুন মুখ। তাঁদের মধ্যে আছেন একাত্তরের বাঘা সিদ্দিকীও। অবশ্য এখন তাঁর ব্যাঘ্রচরিত্র আর নেই। বাঘা সিদ্দিকীকে এখন কেউ কেউ ব্রিজসিদ্দিকীও বলেন। ইদানীং সারা টাঙ্গাইলে—বিশেষ করে সখীপুরে তাঁর কার্যকলাপ যাঁরা জানেন, তাঁরা বিস্মিত হয়ে ভাবেন, মোস্তফা মহসিন মন্টু, কাদের সিদ্দিকী—এই জাতীয় বিতর্কিত লোকদের নিয়ে কামাল হোসেন কী করে দেশে আইনের শাসন বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন?

সম্প্রতি কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, তাঁদের ফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি এক হ্যাঁচকা টানে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের করে আনবেন। খালেদা জিয়া রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দি হননি। দুর্নীতির দায়ে দেশের উচ্চ আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি জেলে গেছেন। বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাঁকে কারামুক্ত করা সম্ভব। কিন্তু যিনি বলেন, নির্বাচনে জিতলেই আদালতের রায়, বিচার ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে একজন দণ্ডিত রাজনৈতিক নেতাকে কারাগার থেকে টেনে মুক্ত করে আনা হবে, তাঁরা নির্বাচনে জিতে কিভাবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন, তা দেশের সচেতন মানুষ অবশ্যই বুঝতে পারছেন।

একাত্তরের বিজয় ছিল রণাঙ্গনের যুদ্ধ জয়। রণাঙ্গনের যুদ্ধে জয় হলেও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেনি। স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচন অবশ্যই সাধারণ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এটা অসমাপ্ত রাজনৈতিক যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। সত্তরের নির্বাচনের দুই বড় পক্ষই এবারের নির্বাচনেও মুখোমুখি হয়েছে। এই নির্বাচনে গণতন্ত্র নয়, দেশের স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামো রক্ষা পাবে কি না এই প্রশ্নের মীমাংসা হবে। আমার আশা, এবার ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবস পালনের পর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের শেষে আমরা একাত্তরের যুদ্ধ জয়ের উৎসবের মতো আরেকটি মহাবিজয়ের উৎসব পালন করতে পারব। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে দেশের আকাশ বাতাস আবার মুখরিত হবে।

এবারের নির্বাচনযুদ্ধে স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ একটি বড় রকমের কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শত্রু এটা প্রমাণিত হওয়ায় নতুন মুখোশ ধারণ করেছে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের তিন-চারজন নেতাকে এনে তাদের পঞ্চম বাহিনীর (Fifth Column) মুখোশ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। যাতে সাধারণ মানুষ ভাবে এরা একাত্তরের পরাজিত শত্রুপক্ষ নয়, এরাও স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরের নেতা।

কিন্তু এই কৌশল গ্রহণে এবার কাজ দেবে না। বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা জানে, এই কুলত্যাগী মুষ্টিমেয় নেতা বহু আগে নীতিভ্রষ্ট ও আদর্শভ্রষ্ট হয়েছেন। গত ৪০ বছর যে বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে তাঁরা কথা বলেছেন, এখন তাঁদের দলে ঢুকে তাঁদের ধানের শীষ প্রতীক ধারণ করে স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের শিবিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। বহুদিন তাঁরা স্বাধীনতার পক্ষের শিবিরে ‘ট্রয়ের ঘোড়ার’ মতো ছিলেন। এখন তাঁদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর এঁরা সচেতন ভোটদাতাদের হাতে চরম ধাওয়া খাবেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। সে জন্যই এই লেখার শিরোনাম দিয়েছি, ‘আরো বড় বিজয়ের জন্য অপেক্ষায় আছি।’

আওয়ামী লীগের দেশ শাসনে অনেক সাফল্যের সঙ্গে অনেক ব্যর্থতাও আছে। দলটির অভ্যন্তরে অনেক চোর-বাটপার এবং দুর্নীতিবাজও আছে। এটা সব দেশের গণতান্ত্রিক দলের জন্যই সত্য। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এখনো পতাকা বহন করছে স্বাধীনতার আদর্শের, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতের বেশির ভাগ নেতার পরিচয় একাত্তরের হানাদারদের দোসর এবং গণহত্যা ও গণধর্ষণের সহচর। এখন তাঁদের নতুন সেনাপতি ড. কামাল হোসেন ও তাঁর নন্দীভৃঙ্গী দুই সহচর। ৩০ ডিসেম্বরের পর জনগণের মহাবিজয় উৎসবের দিনে তাঁরা কোথায় থাকবেন সে কথাই এখন ভাবছি। মাত্র কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, ‘তারেক রহমানের মতো দুর্বৃত্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি দেশত্যাগ করবেন।’ এখন তিনি সেই তারেক রহমানের হাতে রাজনীতির নতুন বায়াত নিয়েছেন। ৩০ ডিসেম্বরের পর কি তারেকের সঙ্গেই তিনি লন্ডনে মিলিত হবেন?

এবারের ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবস উপলক্ষে একটি নতুন পরিপ্রেক্ষিতে বিজয় দিবসটি নিয়ে আলোচনা করলাম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে গোটা মুক্ত ইউরোপ যখন বিজয় উৎসবে মত্ত, তখন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাঁর ডান হাতের দুই আঙুল ফাঁক করে তাঁর সেই বিখ্যাত ভি চিহ্ন ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘একটি বিজয় দিবসকে শুধু একটি উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়, তা যেন জনগণকে প্রস্তুত করে ফ্যাসিবাদ চূড়ান্তভাবে উৎখাতের আরো বড় যুদ্ধ জয়ের উৎসবের জন্য।’

এ কথাটি বাংলাদেশের জন্য এবার অত্যন্ত সত্য। আমরা ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবস পালন করছি ৩০ ডিসেম্বরের পর আরো বড় একটি যুদ্ধ জয়ের উৎসব পালনের অপেক্ষায়।

আর/০৮:১৪/১৬ ডিসেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে