Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৯ , ৮ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-১৫-২০১৮

ড. কামাল কি জাতির সর্বনাশের সলতে পাকাচ্ছেন?

আনিস আলমগীর


ড. কামাল কি জাতির সর্বনাশের সলতে পাকাচ্ছেন?

ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। বাংলাদেশের মানুষও বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সব সময় সংশয়ে থাকে। কারণ, যেকোনও সময় যেকোনও ছুঁতো ধরে তারা নির্বাচন বয়কট করতে পারে। ইতোপূর্বে তারা ভোটগ্রহণের মাঝপথেও নির্বাচন বয়কট করেছিল।

আবার সরকারের মেয়াদ শেষে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃষ্টান্তও এই দলটির নেই। দীর্ঘ সময়ব্যাপী বিএনপির আচরণে একগুঁয়ে মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত তারা মনে করে, প্রশাসনযন্ত্র সৃষ্টি হয়েছে তাদের কথা শোনার জন্য।

দলটির সমর্থকদের শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার স্বভাবও একগুঁয়ে, যাকে তারা অলঙ্কার দিয়ে বলেন ‘আপসহীন’। ‘ছোহবাতুস সালেকিন’– যার সঙ্গে যে চলবে সে তার মতোই হবে। লোহার সংস্পর্শে সোনাও লোহা হয়ে যায়। তাদের নেত্রীর এই স্বভাব তৃণমূল পর্যন্ত সংক্রমিত। তাই দেখা যায়, তাদের নেত্রী যখন ‘না’ বলেন, তখন ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একই কথা। তারা তখন যুক্তির কোনও তোয়াক্কা করে না।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যখন নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইভিএম ব্যবহার করা হবে, তখন খালেদা জিয়া ঘোষণা দিলেন ইভিএম ব্যবহার করলে তারা নির্বাচন বয়কট করবেন। নির্বাচন কমিশন ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু না হটায় তারা নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু তাদের মেয়রপ্রার্থী মনিরুল দলের কথায় কর্ণপাত না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচন করলেন। মনিরুল মেয়র নির্বাচিতও হলেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করলেন।

আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে না দেওয়া এক অদ্ভুত ব্যাপার। এই দলটি সরকারে থাকতে প্রযুক্তিকে দূরে ঠেলে দেয় কিংবা সীমিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু অন্যরা মেধা পরিশ্রম করে প্রযুক্তি সংযোজন করলে তারাই এর সৎ হোক আর অসৎ হোক দুই কাজে ব্যবহারে এগিয়ে থাকে। রাস্তার পাশে ভ্যান গাড়িতে করে তরকারি বিক্রি করা হকারও এখন আর এনালগ দাড়িপাল্লা ব্যবহার করে না।

কোটি কোটি ভোটার সিল দিয়ে ভোট দিতে গেলে অর্ধেক লোকেরও ভোট দেওয়া হবে না সে কথা বিবেচনা করেই তো ইভিএমের উদ্ভাবন। এবারও আংশিক ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিএনপি তা ব্যবহারের বিরোধিতা করছে। শেষপর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত নেয়, কে জানে!

অবশ্য সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে ড. কামাল হোসেনসহ বিএনপি নেতারা নির্বাচন বয়কট না করার কথা বলেছেন। গত ১৬ নভেম্বর স্থানীয় এক হোটেলে ড. কামালসহ ঐক্যফ্রন্ট নেতারা জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা করেছেন। সম্পাদকরা রাখডাক না রেখেই কথা বলেছেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের একটি কথা উল্লেখ করার মতো।

তিনি বলেছেন, ‘আপনারা দল করবেন, রাজনীতি করবেন; আপনারা নির্বাচনে যেতে চাইবেন, আবার চাইবেন না—এটা হতে পারে না, এটা অসম্ভব ব্যাপার। এখানে আওয়ামী লীগ তো কখনও কোনও নির্বাচন বাদ দেয়নি। জিয়াউর রহমান ৩৯টি আসন দিয়ে বিদায় করে দিয়েছিলেন, এরশাদ ৭৬টি আসন দিয়ে বিদায় করে দিয়েছিলেন, জয়ের পথে ছিল আওয়ামী লীগ।’

মতিউর রহমান আরও বলেছেন, ‘নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, সব যেন মেনে নেয়। মেনে নেওয়ার অভ্যাসটা আমাদের হয়তো অর্জন করা উচিত। ফল নিয়ে আমরা তর্ক করতে পারি, বিতর্ক করতে পারি, ভিন্নমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু নির্বাচন হয়ে গেলে, গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, তা নিয়ে তো একটা বড় প্রশ্ন আছেই।’ গণতন্ত্রের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে কোনও অবস্থাতেই নির্বাচন বর্জন না করার পক্ষে বলেছেন উনি।

নাঈমুল ইসলাম খান জানতে চেয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে জাতীয়ভাবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করবেন কিনা? এছাড়া ১৫ আগস্ট এবং ২১শে আগস্ট সম্পর্কে বিএনপির বক্তব্যও জানতে চান তিনি। এর উত্তরে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেছেন, প্রথমে তারা সবাই প্রশ্ন শুনবেন, পরে উত্তর দেবেন। উত্তর পাওয়া যায়নি।

নিউ এইজ সম্পাদক নুরুল কবির বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো কী, সাংবাদিকদের কাছে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের তা জানার দরকার নেই। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তারা কী কী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন, তা তো তাদের মনে থাকার কথা। সে অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের সমস্যার প্রতিকারের কথা বলেন তিনি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা জানতে চেয়েছেন বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর-এর প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরাজ খালিদী।

কোনও প্রশ্নেরই সোজা উত্তর দেননি নেতারা। শুধু খালিদীর প্রশ্নের উত্তরে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠরা যাকে নেতা নির্বাচিত করবেন, তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। খালিদী বলেছেন, তার উত্তরে তিনি সন্তুষ্ট নন। নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবিরই মূলত সঠিক উপলব্ধি থেকে সঠিক কথাটা বলেছেন।

আসলে ‘বর্ণচোরা’ কিছু লোক একত্রিত হয়েছেন সমাজটাকে বিভ্রান্ত করার জন্য। কামাল হোসেন বলছেন, তিনি এসেছেন বাংলাদেশের জনগণকে তাদের রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন, ‘তিক্ত বড়িকে মিষ্টি আকারে গেলানোই রাজনৈতিক নৈপুণ্য’। বিএনপি দীর্ঘদিনব্যাপী সংকটে আছে। রাষ্ট্রীয় উৎপাতে ঘর ছেড়ে বের হওয়াই তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। রাষ্ট্রীয় উৎপাতও অহেতুক নয়। সুযোগ পেলেই তারা সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়। গত সপ্তাহে তারা দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে এসে নয়াপল্টনের অফিসের সামনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে। বহু পুলিশ সদস্যকে আহত করেছে। যথারীতি দায়টা সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে পার পেতে চেয়েছে কিন্তু একে একে সব সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে এবং তারা বিএনপির ছাত্রসংগঠনের নেতা এটাও জানা যাচ্ছে।

যে মিছিলে এসব কাণ্ড করেছে তা ছিল নাকি মির্জা আব্বাসের মিছিল। একবার ২০১৩ সালে তাদের ডাকা হরতালের সময় আব্বাসের লোকেরা তার রাজারবাগ বাড়ির সামনে এক চলন্ত ট্রাককে আটক করে আগুন দিয়ে ট্রাক আর তার ড্রাইভার হেলপারকে পুড়ে অঙ্গার করে ফেলেছিল। বিএনপি-জামায়াতকর্মীরা ২০১৫ সালে চৌদ্দগ্রামে এক ট্রাক ড্রাইভারকে ট্রাক থেকে নামিয়ে রাস্তায় ফেলে মাথা ইট দিয়ে মেরে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল, চৌদ্দগ্রামে চট্টগ্রাম থেকে আসা এক নৈশকোচে পেট্রোলবোমা মেরে ৮ জন যাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল।

এমন আরও বহু ঘটনা আছে, যে কারণে রাষ্ট্র তাদের নির্মমতা থেকে নিরীহ মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতো। তাদের নেত্রী জেলে, ২ নম্বর  নেতা লন্ডনে। এমন অসহায় অবস্থায় দেশের কিছু সুশীল ও কিছু বিদেশি রাষ্ট্রদূত ড. কামালকে দিয়ে বিএনপির সঙ্গে ফ্রন্ট গঠন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ‘বুড়ো কাপালিক’ ড. কামাল হোসেন গণফোরাম নামক একটি গঠন করে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছিলেন কোনও সুযোগ আসে কিনা আওয়ামী লীগের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করার। এখন সেই সুযোগের সৎব্যবহারের জন্য তিনি সলতে পাকাচ্ছেন। আর হুঙ্কার ছেড়ে সন্ন্যাসী সেজে এক বাজনা বাজাচ্ছেন, ‘আমি জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে এসেছি।’

ড. কামাল যে জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফেরত দেওয়ার কথা বলেন সেই জনগণের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। নিজের স্বার্থ ছাড়া জনস্বার্থে তিনি কখনও লড়েননি। বরং আইনজীবী পেশার দোহাই দিয়ে দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানির হয়ে লড়েছেন। তার উদ্দেশ্য শেখ হাসিনার রাজনীতি শেষ করা। শেখ হাসিনার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিরুদ্ধে বহু বছর থেকে নেপথ্য নায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখছেন তিনি। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের  বিচারের সময়ও তার ভূমিকা স্বচ্ছ ছিল না। এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য  নিজ কন্যার জামাতার সারা বিশ্বে প্রোপাগান্ডা চালানোর সময়ও তিনি চুপ ছিলেন। অনেকবার ব্যর্থ হয়েছেন, একমাত্র ২০০১-এ লতিফুর রহমানকে দিয়ে খেলিয়ে সাফল্য পেয়েছিলেন। সর্বশেষ বিচারপতি সিনহাকে দিয়ে জুডিসিয়াল ক্যু করানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন।

এই দেশে রাজনীতিবিদেরা জনগণের উপকারের কথা বলে জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়। ড. কামাল হোসেন জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা বুঝিয়ে দিতে এসেছেন নাকি তারেক রহমানের খাস তালুকের দখলদারিত্বের লাঠিয়ালগিরি করছেন, তা বোঝা যাবে নির্বাচনের পরে। সর্বনাশের চূড়ায় চড়লেও বাঙালির বহুক্ষেত্রে হুঁশ থাকে না। আবেগে পরিচালিত হয়, তখন কী চায়, কেন চায়, নিজেও জানে না। এবারের নির্বাচনে বাঙালি ভুল করলে অতলস্পর্শী এক খাদের কিনারায় গিয়ে উপস্থিত হবে।

আর/০৮:১৪/১৫ ডিসেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে