Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (40 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-২৩-২০১৮

নিকারাগুয়ায় স্বর্ণের সন্ধানে  

মঈনুস সুলতান


নিকারাগুয়ায় স্বর্ণের সন্ধানে
 

কিছুদিন হয় আমি নিকারাগুয়ার লেওন শহরে বাস করছি। ওখানে জানপহচান দোস্তি হয়েছে সিনিয়র ডিগমারের সঙ্গে। ডিগমার শখের স্বর্ণ-সন্ধানী। তিনি গোল্ড প্যানিং করতে ভালোবাসেন। আজ আমি তার পিকআপে চড়ে স্বর্ণের তালাশে রওনা হয়েছি। সমুদ্রকে একপাশে রেখে সিনিয়র ডিগমার পিকআপে শার্প টার্ন নিয়ে ঢুকে পড়েন ইনল্যান্ডে। এদিকে, সারি সারি পামগাছ। পিচঢালা সড়কটিতে গাতা-গর্ত তেমন নেই। পথের পাশে দু-একটি গরুর খামার। চামড়ার হাইবুট পরা কাউবয়রা ঘোড়ায় চড়ে অলসভাবে ঘুরপাক করছে। তাদের কারও ঠোঁটে চেপে ধরা পাইপ থেকে উড়ছে তামাকের ধোঁয়া। একটি খড়ের গাদায় ডিগবাজি খাচ্ছে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। আমরা পিকআপের পেছনে করে বহন করছি গোল্ড প্যানিংর জন্য একটি মোটরওয়ালা যন্ত্র। সিনিয়র ডিগমার আধপোড়া সিগারটিতে আগুন দিতে গেলে পিকআপের গতি শ্নথ হয়। তখনই দেখতে পাই- থোকা থোকা ধোঁয়ার ধূসর মেঘ উড়ে যাচ্ছে প্রান্তরের দিকে। পরিস্কারভাবে অনুভব করি- আমরা চলে এসেছি আগুন-পাহাড় মমোতমবোর কাছাকাছি। তাই আমি এক্সাইটেড হয়ে গাড়ির টেপ-ডেকে জন ডেনভারের 'কান্ট্রি রোড টেক মি হোম...' লিরিকের সিডিটি অন করি।

পিকআপ এবার হাইওয়ে থেকে নেমে আসে ছাইরঙা ধুলামাটি কাঁকড়েপূর্ণ মেঠোপথে। গেল দিন চারেক আমাদের কেটেছে আগ্নেয়গিরির প্রান্তিকে গোল্ড প্যানিংয়ের জোগাড়যন্ত্রে। শৌখিন স্বর্ণ-সন্ধানী হিসেবে সিনিয়র ডিগমারের অভিজ্ঞতা প্রচুর। আমার এ বিষয়ে আগ্রহ বিস্তর, কিন্তু দক্ষতা নেই বললেই চলে। স্বর্ণ সংগ্রহের যাত্রায় এত জোগাড়যন্ত্র দেখে আমার হিমশিম খাওয়ার হালত হয়েছে। তাই গোল্ড প্যানিংয়ের ওপর চটি বইপুস্তক পড়ে গেল দিন চারেক লবেজান হয়েছি। দীর্ঘ ঘাস কেটে পিকআপটি আগ বাড়ে। আর নুড়িপাথরে চাকার ঘর্ষণজনিত আওয়াজে মেঠোপথটির দু'পাশে ওড়ে ছোট ছোট ঘাসবীজভুক পাখি ও বর্ণিল ডানার অজস্র প্রজাপতি। জন ডেনভার এবার উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে যাচ্ছেন, 'রকি মাউন্টেন হাই...।' দিগন্তে কালবোশেখির গাঢ় কালনির মতো মমোতমবো পাহাড়টির শৃঙ্গ খানিক উঁকি দিয়ে মিলিয়ে যায় মেঘের আবডালে। 

আমি মমোতমবো আগ্নেয়গিরির পাদদেশে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সিনিয়র ডিগমার রাজি হননি। তিনি সিনিয়র আলেহান্দ্র হেরনানদেজের সঙ্গে কথা বলে তার ক্যাটল রেঞ্চে ছোট্ট একটি কেবিনের বন্দোবস্ত করেছেন। সিনিয়র হেরনানদেজ ও তার নারীসঙ্গী সিনিয়রা কারিনা গার্সিয়া বর্তমানে ক্যাটল রেঞ্চের একটি কটেজে ছুটি কাটাচ্ছেন। এদের সঙ্গে লেওন শহরের পার্টিতে আমার বার কয়েক দেখা হয়েছে। হেরনানদেজ একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপের স্বত্বাধিকারী। তার ক্যাটল রেঞ্চটি চার হাজার একরের। সয়সম্পত্তি তদারকির সুবাদে এলাকার তাবৎ কিছু তার চেনা। ডিগমারের ধারণা- গোল্ড প্যানিংয়ের জন্য তিনি জায়গা সিলেক্ট করতে সাহায্য করবেন।

ডিগমার সিগারের শেষাংশ জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে মেঠোপথে ফের টার্ন নেন। তিনি বেজে যাওয়া সিডির ভলিউম কমিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেন, 'সিনিয়র সুলতান, তুমি বোধ হয় ধরতে পারোনি- হঠাৎ করে কেন হেরনানদেজ ও কারিনা লেওন শহর ছেড়ে সপ্তাহ দেড়েক হলো ক্যাটল রেঞ্চে ঘাপটি মেরে আছেন?' আমি গল্পগুজবের আলামত ঠের পেয়ে তার দিকে উদগ্রীব চোখে তাকাই। ঝোলা গোঁফের ফাঁকে মৃদু হেসে ডিগমার বলেন, 'কারিনা অভিবাসী হিসেবে ফ্লোরিডায় বাস করার সময় বিয়ে হয়েছিল আমেরিকান স্পেশাল ফোর্সের এক কমান্ডের সঙ্গে। তাদের মধ্যে ফরমালি ডিভোর্স হয়নি। তার স্বামী মিলিটারি অ্যাসাইনমেন্টে মাস ছয়েকের জন্য ইরাকের কুর্দিস্তানে যায়। তখন সিনিয়র হেরনানদেজ কারিনাকে ফুঁসলে নিয়ে আসেন নিকারাগুয়ায়। তো, সাবেক স্বামীটি আমেরিকা থেকে কয়েক দিন আগে পর্যটক হিসেবে লেওনে এসেছে। সে হন্যে হয়ে লেওনে নিখোঁজ স্ত্রীর তালাশ করছে।'

আমরা এসে পৌঁছি কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া ক্যাটল রেঞ্চে। সামনে প্রসারিত তীব্র সবুজ মাঠটি ছড়াচ্ছে শ্যামলিমা স্নিগ্ধতা। ওখানে চরছে পাঁচটি ঘোড়া। দিগন্তের কাছাকাছি আগুন-পাহাড় মমোতমবো যেন আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছে। তার চূড়া থেকে উত্থিত ধোঁয়া ভাসমান মেঘদলের সঙ্গে মিলেমিশে সৃষ্টি করছে নিসর্গের বিরল এক যুগলবন্দি। আমাদের দিকে একটি কোয়াড বাইককে এগিয়ে আসতে দেখে ডিগমার পিকআপ থামান। বাইকের আরোহীর পরনে জিন্সের বগলকাটা নিমা, তা উপচে বেরিয়ে আসছে বাইসেপের জোরালো তাকদ। মানুষটি মাথা থেকে হ্যাট খুলে ইশারায় আমাদের সম্ভাষণ জানালে আমি তার ঘন চুলের ঠিক মধ্যিখানে বৃত্তের আকারে চাঁছা তালু দেখতে পাই। তার গণ্ডদেশে হুলোবিড়ালের গোঁফের মতো লাল, সবুজ ও হলুদ কালিতে আঁকা রেখা দেখেও অবাক হই। মানুষটি কোনো কথাবার্তা না বলে আমাদের দিকে বাড়িয়ে দেয় স্বচ্ছ প্লাস্টিকে বাঁধাই করা একটি নোটবুক। তার পহেলা পৃষ্ঠায় এসপানিওলে বড় বড় করে লেখা, 'আমার নাম কাকাওপেরা। আমি মায়ানগানা গোত্রের লোক। আমাদের সম্প্রদায়ের নিবাস চিনানদেগা এলাকায়। এ ক্যাটল রেঞ্চে আমি হচ্ছি কাউবয় ইনচার্জ।' কাকাওপেরা আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে আঙুল দিয়ে ফের ইশারা করলে বুঝতে পারি, মানুষটি বোবা। পরের পৃষ্ঠায় হাতে আঁকা পুরো রেঞ্চের মানচিত্র। কাকাওপেরা ম্যাপের একটি বিন্দুতে আঙুল রেখে অন্য হাতে তুলে নেয় ছোট্ট একটি স্লেট, তাতে পেনসিল দিয়ে সিনিয়র হেরনানদেজের নাম লিখলে বুঝতে পারি- তিনি ওই লোকেশনে আছেন। একই প্রক্রিয়ায় সে আমাদের দেখিয়ে দেয়- কোথায় পার্ক করতে হবে পিকআপটি। আমাদের মধ্যে ইশারায় আলাপ শেষ হতেই কাকাওপেরা কান থেকে আধপোড়া সিগারটি বের করে তা কামড়ে কোয়াড বাইকে স্টার্ট দিয়ে বিপরীত দিকে ছোটে। ডিগমারও ফের পিকআপ স্টার্ট দেন। 

আমরা দেখিয়ে দেওয়া জায়গায় পিকআপটি পার্ক করি। তারপর কেবল ব্যাকপ্যাক পিঠে ফেলে রওনা হই সিনিয়র হেরনানদেজের সন্ধানে। পার্কিং লটের ঠিক পেছনে শুরু হয়েছে বুনোফুলের বেগুনি আভায় রঙিন হয়ে ওঠা প্রান্তরের। আমরা বুটজুতার চাপে লজ্জাবতী লতা ও দণ্ডকলসের ঝোপঝাড় চেপ্টা হয়ে আসা একটি পায়ে চলা ট্রেইল ধরে আগ বাড়ি। আলাভোলা হাওয়ার সঙ্গে উড়ন্ত মৌমাছির গুঞ্জন মিশে জায়গাটি যেন দুপুরের রোদে তন্ময় হয়ে আছে। খানিক সামনে যেতেই দেখি- একটি নাম-না-জানা গাছের ছায়ায় ক্যানভাসের গার্ডেন চেয়ারে বসে আছেন সিনিয়র হেরনানদেজ। তার সামনের টেবিলটিতে রাখা দাবার ম্যাগনেটিক সেট। কাল্পনিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে গুটি চালছেন। আমাদের দেখতে পেয়ে চোখ তুলে 'বিয়েনভেনিদো বা ওয়েলকাম' বলে হাতের ইশারায় বসতে বলেন। আমরা চেয়ার টেনে বসি। সিনিয়র দাবার মারপ্যাঁচে মশগুল হয়ে আছেন। তার টেবিল থেকে খানিক দূরে একটি ঝোপের তলায় দুটি রক্তাক্ত হাঁস। একটি পোষা গোল্ডেন রিট্রিভার প্রজাতির কুকুর জিভ বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে তীক্ষষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গুলিবিদ্ধ বলাকা দুটির দিকে। ভি-ফর্মেশনে আকাশ দিয়ে ওড়ে গোটা আষ্টেক হাঁসের একটি ঝাঁক। কুকুরটি কুঁই কুঁই করে উঠলে সিনিয়র ডান হাতে টেবিলের পায়ার সঙ্গে দাঁড় করানো বন্দুকটি তুলে নেন। তিনি আকাশ স্ক্যান করে বোধ করি কিছু একটা হিসাব-নিকাশ করেন। তবে পাখিগুলোর ফর্মেশনটি উড়ছে বেশ দূর দিয়ে, তাই শুট না করে বন্দুকটি নামিয়ে হেসে বলেন, 'এসতে লুগার অ্যাজ উন পকো সলিটারিও, বা এ জায়গাটি ভারি নির্জন, একা লাগছিল, তোমরা দু'জন এসে যাওয়াতে খুব ভালো লাগছে।' আমি কথা বলার সুযোগ পেয়ে জানতে চাই, ক্যাটল রেঞ্চের কী পরিস্থিতি? তিনি দাবার সেটে গুটি সিজিলমিছিল করতে করতে ফের আকাশের দিকে তাকিয়ে এখানে গরু পালনের বিষয়-আশয় ব্যাখ্যা করেন। সিমেনতান ও চিয়ানিনা নামে কেবল দুটি প্রজাতির গরু এখানে পালন করা হয়। এ দুই জাতের গবাদিপশু বিফের জন্য বিখ্যাত। বাছা বাছা কিছু গরুকে তার কাউবয় ইনচার্জ কাকাওপেরা খানিকটা রাম খাইয়ে তরতাজা করে রাখে। এগুলো উপযুক্ত হলে সিনিয়র এদের জাহাজযোগে জাপানে পাঠান। জাপানিজ মার্কেটে তার বিফ খুব ভালো দামে বিকোয়। বিফের কোয়ালিটি নিয়ে আরও কিছু বলতে গিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ হাওয়ার ইশারা করে তিনি বন্দুকটি ঘাড়ে তুলে টানটান হয়ে আকাশের দিকে তাকান। দ্বিতীয় বন্ধনীর মতো ফর্মেশন তৈরি করে এদিকে উড়ে আসছে অতিথি পাখির ঝাঁক। সিনিয়র বন্দুক কাঁধে উঠে দাঁড়িয়ে বাঁ চোখ কুঁচকে এইম করেন। আমি গুলিটি যাতে টার্গেট হিট করতে না পারে, তার জন্য নীরব অনুনয়ে প্রার্থনা করি। ফায়ারের আওয়াজে পুরো ঝাঁক ছত্রভঙ্গ হয়ে ছিতরে যায় চারদিকে। টুপ টুপ করে আকাশ থেকে ঝরে পড়ে তিনটি গুলিবিদ্ধ হাঁস। ডিগমার সিনিয়র হেরনানদেজের দিকে বুড়ো অঙ্গুলী তুলে তারিফে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, 'কে টিরো পারফেকতো, বা কী দুর্দান্ত শট।' হেরনানদেজ মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করেন। গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুরটি পড়িমড়ি ছুটছে গুলিবিদ্ধ হাঁসগুলো কালেক্ট করতে। আমি আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে বুনোফুলে ভরা প্রান্তরের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকি। হয়তো তুন্দ্রাঞ্চল থেকে পাখিগুলো উড়ে আসছিল ঘাসবীজ, শালুকের ডাঁটি ও তাজা মাছের জন্য। হাঁস তিনটিকে আরও দিন কতক বেঁচে থাকার সুযোগ দিলে জগৎ-সংসারে কী এমন ক্ষতি হতো?

টেবিলে রাখা ওয়াকিটকি বেজে ওঠে। সিনিয়র হেরনানদেজ তা হাতে নিয়ে কথা বলেন। আমি সিনিয়রা কারিনা গার্সিয়ার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। তখনই সচেতন হয়ে ওঠি যে আমরা চলে এসেছি লেওন নগরী থেকে বেশ খানিকটা দূরে- আগুন-পাহাড় মমোতমবোর পাদদেশে। জায়গাটি মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের বাইরে। ওয়াকিটকি রেখে তিনি মৃদু হেসে বলেন, 'কারিনা তে এসতা এসপারানডো, বা কলটি এসেছে কারিনার কাছ থেকে, সে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।' জানতে পারি যে রেঞ্চের একটি দালানে ব্যাকপ্যাকার পর্যটকের জন্য চালু আছে একটি ছোটখাটো ইয়ুথ হোস্টেল। সিনিয়রা গার্সিয়া ওখানে কাজকর্মের তদারকি করছেন। তো, তার সন্ধানে আমরা সিনিয়র হেরনানদেজকে 'আদিওস বা গুডবাই' বলে উঠে পড়ি। তিনি ওয়াকিটকিতে রেঞ্চের কোনো কর্মচারীকে আমাদের হাতে কেবিনের চাবি তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

পার্কিং লটে এসে দেখি, দাঁড়িয়ে আছে কাকাওপেরা। সে তার কোয়াড বাইকের পেছনে তুলে নেয় খাবারদাবার-ভর্তি কুলার। আমরা তার পেছন পেছন হেঁটে আসি আমাদের ছোট্ট কেবিনে। এক কামরার ঘরটি গাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি। ভেতরে বিছানাপত্র ছাড়াও আছে খোলামেলা জানালার পাশে রাইটিং টেবিল। রান্নাবান্নার ছোট্ট কিচেনেটটিও আমাদের পছন্দ হয়। বাথরুমে হট ওয়াটারের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে রিলাক্স করার জন্য কামরায় কাঠের একটি দোলনাও আছে। তাতে বসে পড়ে দোলা দিতে দিতে ডিগমার বলেন, 'সিনিয়র সুলতান, তুমি বরং ইয়ুথ হোস্টেলে গিয়ে সিনিয়রা কারিনার সঙ্গে কথাবার্তা বলে আসো। আমি এ সুযোগে এ এলাকার টপোগ্রাফিক্যাল ম্যাপটি খুঁটিয়ে দেখে নিই। মানচিত্রে কোথায় কী, তা জানা থাকলে গোল্ড প্যানিংয়ের লোকেশন খুঁজতে সুবিধা হয়।'

কাকাওপেরা তার হাতে আঁকা মানচিত্রে আমাকে ইয়ুথ হোস্টেলের লোকেশন দেখিয়ে দিয়ে ইশারায় তার কোয়াড বাইকের পেছনে উঠতে বলে। কিন্তু আমি মাথা ঝাঁকিয়ে আপত্তি জানাই। সে কোয়াড বাইকটি হাঁকিয়ে চলে যায় অন্যদিকে। এলাকাটা পাহাড়ি বলে আবহাওয়ায় আছে খানিক শীতলতা। তাই ঝলমলে রোদ মাথায় হাঁটতে খারাপ লাগে না। মিনিট সাতেক হেঁটে আসার পর দেখতে পাই, ঘাসে ইয়োগা-ম্যাট বা ফোমের মাদুর পেতে সূর্যস্নানে মেতেছে দুটি মেয়ে। বিকিনি বটম পরা তরুণী দুটির পাশে রাখা সিগরেটের প্যাকেট, লাইটার, ফ্যাশন ম্যাগাজিন ও সানস্ট্ক্রিন ইত্যাদি। এরা সম্পূর্ণ টপলেস হওয়ায় তাদের দিকে তাকাতে লজ্জা হয়। কিন্তু তারা শুয়ে শুয়ে ওয়েভ করলে আমিও হাঁটার গতি কমিয়ে ওয়েভ-ব্যাক করি। তখন দেখতে পাই, একটি মেয়ে প্লাস্টিকের আংটায় সাবানের ফেনা চুবিয়ে ফুঁ দিয়ে উড়াচ্ছে বুদ্বুদ। সূর্যের কিরণ মাখা বেশ কতগুলো বুদ্বুদ উড়ে আসে আমার দিকে। আমি হাঁটতে হাঁটতে সিনিয়রা কারিনা গার্সিয়ার কথা ভাবি। তার সঙ্গেও আমার দেখা হয় লেওন শহরে একটি পার্টিতে। মাস ছয়েক আগে তার পুরুষ-সঙ্গী সিনিয়র হেরনানদেজ তাকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে দেন সৈকতে পিতৃমাতৃহীন হওয়া তিনটি পেলিকান শাবক। মহিলা বেজায় বিপাকে পড়েছিলেন পোষ্য পেলিকানদের নামকরণ নিয়ে। পার্টিতে তিনি তাদের ঝুড়িতে করে নিয়ে এসেছিলেন। আমি আমোদ করে প্রস্তাব করেছিলাম, 'সিনিয়রা, এদের নাম অরুণ, বরুণ ও কিরণমালা রাখলে হয় না?' তিনি ঠাট্টাটি সিরিয়াসলি নিয়ে সত্যি সত্যিই পেলিকান শাবকদের নাম রাখেন অরুণ, বরুণ ও কিরণমালা। এ শব্দ তিনটি তার কানে এত ভালো লেগেছিল যে 'মে এনকানতা এল সনিডো, বা ধ্বনিগুলো এত সুন্দর' বলে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তার গণ্ডদেশ। প্রতিক্রিয়ায় আমি তার চুম্বনের প্রত্যাশাকে বিমুখ করিনি। 

আরও মিনিট আষ্টেক হেঁটে আমি চলে আসি ইয়ুথ হোস্টেলে। পেছন দিকের আঙিনায় পাওয়া যায় সিনিয়রা কারিনা গার্সিয়াকে। মনে হয়, তিনি সাদায় কালো পালকের মিশেল দেওয়া পেলিকান কিরণমালাকে নাচ শেখাচ্ছেন। একটি ঝোপের তলায় রাখা স্টিরিও থেকে ঢিমেতালে বাজছে নিউ এজ ঘরানার বাদ্য। তার সুরতালে স্টেপ মিলিয়ে ড্যান্স করছেন কারিনা। কিরণমালা তার ডানা দুটি সামান্য ওঠানামা করছে, সঙ্গে সঙ্গে তার বিরাট ঠোঁট জোড়া ফাঁক করে সঙ্গীতের ছন্দে যেন লিপসিং করে যাচ্ছে। এর আগে আমি টিয়াপাখিকে ড্যান্স করতে দেখেছি, তাই বিষয়টি অভূতপূর্ব কিছু বলে মনে হয় না। তবে বেশ কয়েক মাস পর কিরণমালার সঙ্গে ফের দেখা হলো। পেলিকানের ছোট্ট শাবকটি এত বড় হয়েছে দেখে সত্যিই অবাক লাগে। আর কারিনাকে মনে হয় এই প্রথমবার মেকআপ ছাড়া দেখলাম, তার মলিন চোখমুখে বয়সের হালকা ছাপ, সাদামাটা জিন্স ও সোয়েট শার্টে তাকে এত অর্ডিনারি দেখায় যে একটু বিস্মিত না হয়ে পারি না। কারিনা স্টিরিওটি বন্ধ করে ম্লান হেসে আমার মুখোমুখি দাঁড়ান। তিনি 'মুই কনতেনতো দে ভের তে, বা তোমাকে দেখে কী যে ভালো লাগল' বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন বটে, কিন্তু কালিমাখা চোখের তলায় বিষণ্ণতাকে ঢাকতে পারেন না। কারিনা দু'হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন। আমি আলিঙ্গনের প্রতিদানে তার গ্রীবায় চুমো খেতে খেতে ভাবি- হাসিখুশি- খানিকটা চটুল স্বভাবের এ নারীর দিনযাপনেও তবে আছে বিষাদ। তিনি কিরণমালাকে দেখিয়ে বলেন, কেবল এ পেলিকানটির আছে সঙ্গীতে সাড়া দেওয়ার মতো প্রতিভা। বাকি দুটি- অরুণ আর বরুণ জলে তাদের শরীর চুবানো আর মাছ খাওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আগ্রহী নয়। আমি ব্যাকপ্যাকে জিপলক করা পলিথিনের প্যাকেটটি থেকে সাবধানে বের করে আনতে যাই একটি শুঁটকি মাছ। পুরো শুঁটকিটি বের করার অবকাশ হয় না, কিরণমালা বেজায় দীর্ঘ ঠোঁট জোড়া বাড়িয়ে খপ করে তা তুলে নেয় মুখে। সিনিয়রা কারিনা তার ঠোঁটকে হাস্যকরভাবে বিস্তৃত করে বলেন, 'নো পদরিয়া তেনের নিংগুন রিগালো, বা আমি কি সামান্য একটি গিফ্‌টও পেতে পারি না?' আমি তার ঠোঁটে চুমো খাওয়ার বিরল সুযোগটি হেলায় হাতছাড়া করে ফের ব্যাকপ্যাক হাতড়ে বের করে আনি দার্জিলিং চায়ের ছোট্ট বাক্সটি। সিনিয়রা কারিনা কৌতূহলী হয়ে জানতে চান, 'কমো ভয় আ আছের তে?, বা কিন্তু কীভাবে চা বানাব?' নিকারাগুয়ার দোকানপাটে চা পাওয়া যায় না। এ দেশে তপ্ত এ পানীয়টির নাম শোনেনি- এমন লোকের সংখ্যা বিপুল। তাই আমি চা তৈরির পদ্ধতিটি বিস্তরিতভাবে বর্ণনা করি। ইয়ুথ হোস্টেলের একজন কর্মচারী এসে সিনিয়রা কারিনার মনোযোগ আকর্ষণ করলে অতঃপর আমি বিদায় নিয়ে আমাদের ছোট্ট কেবিনের দিকে রওনা হই। হাঁটতে হাঁটতে আকাশে মেঘ ভেঙে ফুটে ওঠা মমোতমবোর অগ্নিময় প্রোফাইলের দিকে তাকিয়ে ভাবি- এ যাত্রায় আমার অদৃষ্টে স্বর্ণ জুটবে কি?

এমএ/ ১১:৩৩/ ২৩ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে