Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (39 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-২৩-২০১৮

মানুষ, আমি মানুষ কুড়াই

জয়া ফারহানা


মানুষ, আমি মানুষ কুড়াই

পাকস্থলীর ভাষা সর্বজনীন। রেস্তোরাঁকে তাই কাউন্সিলর বললে কেউ খুব আপত্তি করবেন না বোধ হয়। ভাবুন একবার, সেডেন্টারি লাইফ স্টাইলের সঙ্গে স্ট্রেস বেড়ে যাওয়ার কারণে যারা কম বয়সে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ধকল সইছেন তাদের কথা। কফির সঙ্গে টপিং হিসেবে সব সময় যাদের কফি মগভর্তি হয়ে থাকত আইসক্রিম বা হুইপ্ট ক্রিমে, তাদের যদি সারাক্ষণ দুধ-চিনি ছাড়া ট্যালটেলে চা বা কফি খেতে হয়, তবে মেজাজ খিটখিটে না হয়ে উপায় কী? কিংবা ধরুন সেই বন্ধুর কথা, হার্টের মেইন আর্টারিগুলোতে অনবরত টহল দিয়ে বেড়ানো এলডিএল কোলেস্টেরলের ভয়ে যিনি রেড মিট পনির সমেত হোয়াইট ব্রেড পিৎজা খাওয়া ছেড়েই দিয়েছেন; তাকে যদি রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে হোল হুইট ব্রেডের স্প্রাউট পিৎজা খাওয়ানো হয় কিংবা কোনো ওবিস বন্ধুকে চকোলেট চিপস ভর্তি ব্রাউনির বদলে টক দই আর ধনে পাতার আদর দিয়ে বানানো আনারসের মোহময় স্বাদের রায়তা খাওয়ানো যায়, তবে কি কিছুটা হলেও পাকস্থলীর কাউন্সিলিং হয়ে যায় না? এবং সেই কাউন্সিলিংয়ের সুবাদে নির্নিমেষ শোনা হয়ে যায় না মনের কথাও? যেমন শুনেছিলেন চুনীলাল, দেবদাসের গল্প। কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস, বিউটি বোর্ডিং, শরীফের ক্যান্টিন হাজার হাজার গল্পের জরায়ু। মধুদার ক্যান্টিন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের গল্প? না, হয় না। পাতাকুড়ানি মেয়ে পাতা কুড়ানোর ছলে কখনও ঝরা পাতা কুড়ায়, কখনও পুষ্প কুড়ায়, কখনও শস্য কুড়ায়, কখনও দুঃখ কুড়ায়। আর যাদের গল্প শোনার খিদে তারা কুড়ায় গল্প। রেস্তোরাঁ গল্প কুড়োনোর এক চেনা-অচেনা অন্তরঙ্গ উঠোন। 

দুই.

'রেস্তোরাঁ আর যাই হোক অন্দর তো নয়' যদি রেস্তোরাঁ সম্পর্কে আপনার এমন আনুষ্ঠানিক ধারণা থাকে, তবে তা বদলে ফেলতে অনুরোধ করি। হোটেল ম্যানেজমেন্টের সিলেবাস যে গতিতে বদলাচ্ছে, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের তার সঙ্গে পাল্লা দিতেই হচ্ছে। রেস্তোরাঁর ল্যান্ডস্কেপ বলতে এখন আর আমরা শুধু কংক্রিটের লাক্সারিয়াস আর্কিটেকচার বুঝি না। ভোক্তাদের রুচির ডায়মেনশনের পরিসর বেড়েছে। তার সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিতে হচ্ছে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদেরও। হয়তো সে কারণে পৃথিবীর বিখ্যাত সব জলপ্রপাত, ফরেস্ট, বার্ড স্যাংচুয়ারি কিংবা সি বিচের কাছাকাছি তৈরি হয়েছে আকর্ষণীয় সব রেস্তোরাঁ। ১৮০ একর রেইন ফরেস্টজুড়েও তৈরি হয়েছে রেস্তোরাঁ। বুনো ফুলের গন্ধ, পাখিদের কলতান, প্রাকৃতিক ঝোরার সুরেলা গর্জনের সঙ্গে যদি পান ধোঁয়া ওঠা গরম কফি অথবা বরফ ডোবানো লস্যি ক্রাশার লেমন অরেঞ্জ ব্রিজার, স্যুদারের মতো মকটেল কিংবা রিফ্রেশিং ড্রিংক, তবে কি চিন্তা এবং মাথার সঙ্গে মনও খুলে যায় না? ব্লাইন্ড আর স্কাই লাইটের আলো-ছায়ায় রহস্যময় আবহ কিংবা খোলা আঙিনায় সারি সারি ছাতার নিচে খেতে খেতে মনের দরজা বন্ধ করে রাখবেন এমন পাথর-মন কার আছে ? কিংবা আকাশভাঙা ঝমঝমে বৃষ্টির এমন দিনে কাছের মানুষকে যা বলা যায়, তা বলেননি তেমন দুর্ভাগাই বা কে আছে? ঢাকাতেই আছে এমন বেশ কিছু রেস্তোরাঁ, যেখানে প্যালটেকে রেজ্যুভিনেট করে পছন্দের খাবার খাওয়া যায়। রেস্তোরাঁ মানে এখন শুধু আবদ্ধ চারটি দেয়াল, বসার জন্য সুসজ্জিত কিছু সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট কিংবা আলো-আঁধারির খেলা নয়। কোনো এক রেস্তোরাঁ মেঘ-রোদ-বৃষ্টির ভাবনা মাথায় রেখে আয়োজন করেছে ওপেন মেটালিক রুফের ব্যবস্থা। মাথার ওপর থেকে ছাদ সরিয়ে দিলেই দেখা যাবে সোনালি রোদ্দুরে ধোয়া নীল আকাশ; কখনও দিগন্ত-জোড়া সবুজ, শীতের দুপুরে বাইরের জানালা দিয়ে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে মাংসে ঠাসা নরম চিকেন কাটলেট কিংবা খাস্তা বিফের প্যাটিস, সঙ্গে জ্যাম ডোনাট কিংবা গরম গরম ব্রাউনি। কোনো কোনো রেস্তোরাঁর সঙ্গে পাবেন ছোট্ট সবজি ক্ষেত, মাছের জলাশয় ও ফার্ম হাউস। জলাশয় থেকে মাছ পছন্দ করার পর শুরু হবে রান্না। 

কংক্রিটের জঙ্গল ঢাকা শহরের মতো মানুষ কিংবা জন্তুর বর্জ্য যেখানে প্রকাশ্যে রাস্তায় পড়ে থাকে না, তেমন কোনো শহর ধরা যাক সিলেট কিংবা মৌলভীবাজারের নির্মল কোনো গ্রাম, যেখানে নিঃশ্বাসে বিষ ঢোকে না, প্লাস্টিক যেখানে নিঃশ্বাস ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেয়নি, সেখানকার রেস্তোরাঁয় গিয়ে কমলা বাগানের কমলা লেবু ক্রাশ করা ইলিশই খেতে চাইব। কিংবা স্থানীয় হোম মেড কোনো অপশন। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান কিংবা রাঙামাটির রেস্তোরাঁয় গেলে খেতে চাইব বাঁশের চোঙায় আদিবাসীদের তৈরি পিঠা। সিরাজগঞ্জের রেস্তোরাঁয় গিয়ে ফ্রিশিয়ান খামারের খাঁটি দুধের খাঁটি ছানার রসগোল্লা না খেয়ে তো আসবই না। কেউ কেউ ভাবেন, রেস্তোরাঁ বুঝি পুষ্টি আর স্বাদের চিরবিরোধী এক প্রতিষ্ঠান; যেখানে স্বাস্থ্য আর স্বাদের মধ্যে রয়েছে ঘোর কলহ। ধারণাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। অয়েস্টার ফিশ কিংবা ডার্ক সসের অতিরিক্ত লবণ বাদ দিয়ে টক দই ও লেবুর ব্যবহার শুরু হয়েছে কিছু রেস্তোরাঁয়। চিকেনের সঙ্গে দই আর গোলমরিচ গুঁড়ো ম্যারিনেট করা কিউকাম্বার চিকেনের রেসিপি, স্টাফড মাশরুম, সয়া পনির টিক্কা, হোল হুইট ব্রেড দিয়ে তৈরি স্প্রাউটস পিৎজা, টাটকা ধনে পাতা আর মধুমাখা চিকেন সালাদ, সঙ্গে হোল গ্রেন ব্রেড, সুগন্ধি বেসিল দেওয়া ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত শতভাগ সুস্থ বাচ্চা মুরগির স্যুপ, গাজীপুরের ক্ষেত থেকে তুলে আনা শীতের সদ্য ঝকঝকে পালং শাক, সঙ্গে রসুন ভিনেগার দিয়ে তৈরি সবজির বিশেষ পদ কিংবা টক দই ও গন্ধরাজ লেবু দিয়ে রান্না দেশি রুই, নিম পাতার সঙ্গে মটর ডাল, পলতার ডগা চচ্চড়ি, গিমে শাকের কবিরাজি, নারকেল-কুমড়ো দিয়ে করলা থেকে শুরু করে মাশরুমের সালাদ কি স্বাস্থ্যপ্রদ রেসিপি নয়? এখন আপনি ডুবো তেলে বেগুন ভাজার অর্ডার না দিয়ে বেগুন পুড়িয়ে রসুন দিয়েও খেতে পারেন রেস্তোরাঁতে। কিছু বিশেষ রান্নার কথা অবশ্য আলাদা। তেল-কৈ তো আর কম তেলে রান্না করা যায় না। তাতে তেল-কৈয়েরও অসম্মান, শেফেরও অমর্যাদা। আপনি যদি চকোলেট, কুকিজ, পেস্ট্রি, আইসক্রিম, রোল, কাটলেট, চাউমিন, বার্গার কিংবা পিৎজার মতো টেম্পটিং খাবারের ভোক্তা হন, সে দোষ তো রেস্তোরাঁর নয়। খুব সাধারণ ঘরোয়া উপকরণ দিয়েও শুধু রান্নার মুন্সিয়ানার কারণে একেকটি রেস্তোরাঁ আমাদের প্রিয় হয়ে ওঠে। হতে পারে সেটা রাস্তার পাশের কোনো সালাদিয়া ঢাকা হোটেল; হতে পারে তারকাখচিত রেস্তোরাঁ কিংবা চীনা রেস্তোরাঁ। চীনারা এদেশে চৈনিক খাবারের প্রবর্তক বলে একটি সাধারণ ধারণা আছে, যা ভুল। এদেশে চীনা খাবার এনেছিলেন মোগলরা। চেঙ্গিস খাঁ এসেছিলেন মঙ্গোলিয়া থেকে, সঙ্গে এনেছিলেন চীনা খাবার। এখনকার মোগলাই খানার তও-তরিকাতে অবশ্য বিন্দু-বিসর্গ চৈনিক গন্ধ নেই। 

সময়ান্তরে দেশান্তরে খাবারের বিবর্তন ঘটেই চলেছে। এই ঢাকা শহরেই আইরিশ দম্পতির মেথি শাকের সঙ্গে মাছ ভাতের রেস্তোরাঁ চালানোর দৃষ্টান্ত আছে। আছে নানান স্বাদের সালাদ, স্যুপ ব্রথ কিংবা ডিমসামের মতো অ্যাপেটাইজার। তবে সত্যি বলতে রেস্তোরাঁয় অ্যাপেটাইট হওয়ার সবচেয়ে বড় অ্যাপেটাইজার কিন্তু গল্প। শুনেছিলাম রেস্তোরাঁয় বসেই। বলি তবে। তখন সে খুব ছোট। ক্লাস ওয়ান বা টুতে পড়ে। বিকেল বেলা পার্কে খেলতে গেছে। সঙ্গে ধনী মামাতো ভাই। মামার বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া পার্ক। সবে ভাইটি দোলনায় চড়েছে। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে দোলনায় চড়বে বলে। কিন্তু ভাইটি কিছুতেই আর দোলনা থামায় না। আধ ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটি দোলনা থামিয়ে বলল, এবার আমি চড়ব। মামাতো ভাই সদম্ভে ঘোষণা দিল- 'না'। শুরু হলো হাতাহাতি। অল্প বিস্তর চোট পেল দু'জনই। পার্কে বসে মেয়েটি যখন কাঁদছে মামা তখন মেয়েটির কান ধরে বলল, অয়নকে মেরেছিস কেন ? মেয়েটি দুরু দুরু বুকে বলল, ও-ও তো মেরেছে আমাকে। কথা শেষ হলো না। তার আগেই ঠাস করে গালে এক চড় এসে লাগল। আর কোনোদিন যেন না শুনি- তুই ওকে মেরেছিস। ততক্ষণে মাঠের অন্যান্য বন্ধু পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটির। উপভোগ করছে মেয়েটির লাঞ্ছনা। দুঃখ-অপমান-রাগে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে পড়তে চাইছে। কিন্তু না, কাঁদা যাবে না। তাহলে ওরা আরও হাসবে। মেয়েটি গলার কাছে অনুভব করছে দলা পাকানো কষ্ট। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরেছে। শক্ত মুঠোয় ধরে রেখেছে ফ্রকের কোণা। এর পর মেয়েটির জীবনে অনেক উত্থান-পতন। কিন্তু মেয়েটি আর কাঁদেনি কোনোদিন। সে জানে, কাঁদলেই পেছন থেকে হেসে ওঠে কোনো না কোনো মামাতো ভাইয়ের দল। 

তিন.

ভিক্ষুকেরও এক-আধদিন ডাকাত হতে ইচ্ছে করে- এই সূত্রে আমারও ইচ্ছা করে নায়াগ্রা ফলস স্টেট পার্ক থেকে মাত্র সাত মিনিটের হাঁটা পথের দূরত্বের রেস্তোরাঁ কমফোর্ট ইন-এ যেতে। নস্টালজিক স্কুলের দিনগুলোতে ভূগোল বইয়ের পাতায় রূপসী নায়াগ্রা মনের গভীর শিকড়ে ছড়িয়েছিল উন্মাদনা, উত্তেজনা। বইয়ের পাতায় যখন নায়াগ্রার জলের অদ্ভুত নীলচে সবুজ আভা আর রঙ-বেরঙের জলরাশির রঙিন বর্ণছটার কথা পড়তাম, তখনই মনে হতো, আমি বোধ হয় চড়ে বসেছি 'মেড অব দ্য মিস্ট' বোটে। কল্পনায় দেখতে পেতাম ৩৫ মাইল দীর্ঘ নায়াগ্রা প্রস্পেট পয়েন্ট থেকে ১শ' ফুট উদ্দাম ফল্কগ্দুধারায় লাফিয়ে পড়ছে গায়ে। কখনও ভেবেছি, জাম্বিয়ার লিভিং স্টোন শহরের জাম্বোজি সান হোটেলের কোনো এক রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত দেখব। কখনও ইচ্ছা করেছে কর্নাটকের যোগ জলপ্রপাত দেখার জন্য জেড গার্ডন রেস্তোরাঁয় যেতে। শুনেছি, সেখানে চারটি জলধারা একসঙ্গে বিশাল জলপ্রপাত সৃষ্টি করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শরাবতী নদীতে। মানালির অর্চার্ড গ্রিনস রেস্তোরাঁয় গেলে দেখা যেত বিপাশার মতো নদী, ডুংরির মতো পাহাড় আর দেওদার পাইনের জঙ্গল। সব মিলিয়ে হিমাচল প্রদেশের ছিমছাম শৈল শহর মানালি, পেছনে তিব্বতি মনাস্ট্রিতে বিশাল বুদ্ধ মূর্তি, ডুংরি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে হিড়িম্বা মন্দির; তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হিমাচল ফোক মিউজিয়াম। একেকটা শহর গড়ে ওঠার পেছনে কত জানা-না জানা ইতিহাস! কত গল্প, কত মিথ! সেসব মিথ আর গল্প ট্যুরিস্টরা সঙ্গে নিয়ে আসেন স্যুভেনির, হ্যান্ডিক্র্যাফটস, ছবি আর সেলফির মাধ্যমে। সবুজের হাতছানি, অরণ্যের রোমাঞ্চ, পাহাড়ের নীরবতা কিংবা শপিং মলের রঙিন জনজোয়ার। তবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কিংবা অনাবিল নিসর্গের স্বাদ; যেটাই বলুন স্থানীয় কুইজিনের খাবারের স্বাদ না নিলে সবই বৃথা। দ্য অনলি ওয়ে টু দ্য হার্ট ইজ থ্রু দ্য স্টমাক।

চার.

'বাঙালী মেনু' প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন, 'ভগবান দয়াময়। তিনি সব কিছুই দেন। তবে তার টাইমিংটা বড্ডই খারাপ। বৃদ্ধকে দেন তরুণী ভার্যা আর রেস্তোরাঁয় যাবার পয়সা।' লেখকের এই পরিহাস থেকে আমরা পাঠকরা অন্তত একটি জিনিস পরিস্কার বুঝতে পারি, যৌবনে পকেটে সিঙ্গেল চায়ের রেস্তোও থাকে না। অভিধানে রেস্তোরাঁ শব্দের অর্থ দেওয়া আছে পুঁজি, পয়সা-কড়ি ইত্যাদি হাতে সম্বল  থাকার পর খাবারের জন্য খরচ করার জায়গা। তবে আভিধানিক অর্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যাদের পয়সা-কড়ি নেই তারা কি রেস্তোরাঁয় যান না? ভোজন রসিকদের ভোজনের অর্থ ভূত-প্রেত যোগায়। বর পাওয়া গুপি কিংবা বাঘার কথাও মনে করতে পারি। হাতে তালি দিয়ে 'শুন্ডি' বললেই যারা পৌঁছে যায় খাবারের রাজ্যে। খাওয়ার জন্য বাঁচা, নাকি বাঁচার জন্য খাওয়া- এটাও বার্নিং ইস্যু আজকের ভেগান ডায়েট ও ভেগান ফুড হ্যাবিটের দুনিয়ায়। ভেগানরা বদ্ধপরিকর পৃথিবী নামক এই গ্রহতে প্রতিটি প্রাণীর পূর্ণ অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কোনো প্রাণী কিছুমাত্র কষ্ট পেতে পারে, তা সে নিরীহ অথবা হিংস্র যাই হোক না কেন, ভেগানদের পক্ষে তা সহ্য করা মুশকিল। ভারতের বিখ্যাত ভেগান নেতা নরেন্দ্র মোদি ও মানেকা গান্ধী এ তালিকায় পড়েন। মাছ-মাংস, ডিম তো দূরের কথা; এরা ঘি, দুধ বা মধুও খান না। কারণ এ তিনের উৎসই প্রাণী। তবে ভালো হয় যদি মধুর উৎস মৌমাছি এবং দুধের উৎস গরু-ছাগল-ভেড়ার পাশাপাশি ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের আমলে বেশি না হোক অন্তত সমান মর্যাদা পায়। দেশি ঘির গন্ধে ম-ম করা পরাটাওয়ালা গলির গয়াপ্রসাদ শিবচরণের মাংসাশি দোকানে টানানো রয়েছে জওহরলাল নেহেরু, বিজয় লক্ষ্মী পণ্ডিত ও লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মতো নেতার ছবি। তবে ফ্যাশন ট্রেন্ড বলে কথা। ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর পর ইনবক্সে 'এনিমেল প্রোডাক্ট নো এন্ট্রি' জাতীয় মেইল পাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতান্ত কম নয় এই সময়ে। 

'তুমি মাংস খাও? তাহলে তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে না।' 'আমাকে চুম্বন করতে চাও? আমিও চাই। কিন্তু তোমার নিঃশ্বাসে তো রক্তের গন্ধ। নিশ্চয়ই তুমি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোনো না কোনো মাংস খেয়েছ? এই একবিংশ শতাব্দীতেও তুমি পশুর মাংস খাও? তবে তুমি নিশ্চয় মানুষ নও। রাক্ষস-টাক্ষস হবে।' ইকো-ফেমিনিজমের সমর্থক ভেগান মেয়েরা প্রেম তো দূরের কথা, যারা মাংস খায় তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বও করবে না। পশ্চিমে কম বয়সীদের কাছে এটাই লেটেস্ট ট্রেন্ড। পুবেও লেগেছে ভেগান হাওয়া। ফেসবুকে প্রোফাইল ছবি দেখে ক্র্যাশ খেয়েছেন, কোন তরিকায় সেই 'ক্যান্ডি ক্রাশকে' নিয়ে রেস্তোরাঁয় যাবেন এই বুদ্ধি ভাঁজছেন যখন; তখন এই 'ভেগান মেইল' কপালে চিন্তর ভাঁজ ফেলার মতোই বটে। ভাববেন না। পল ম্যাকার্টনি, মাইকেল জ্যাকসন, গ্রেগ চ্যাপেল, পামেলা অ্যান্ডারসন, ব্রিটনি স্পিয়ার্স থেকে অনিল কুম্বলে, আনুশকা-ভেগান তালিকা দীর্ঘতম। ভেগান হওয়ার জন্য পৃথিবীজুড়ে চলছে সেলিব্রিটি এন্ডোর্সমেন্ট। এই প্রভোকেটিভ তালিকার চেয়েও ভেগানদের প্রতি অধিকতর আকৃষ্ট হওয়ার অন্য কারণও আছে। ফ্রয়েড তার 'টোটেম অ্যান্ড ট্যাবু' বইয়ে দেখিয়েছেন প্রাচীন গোষ্ঠীগুলো কীভাবে বেদিমূলে বলিদান দিয়ে উৎসব পালন করত দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং কীভাবে ওই পশু-মাংস খেতে বাধ্য করত অন্যদের। মন্দিরে পাঠবলি, উটবলি, ভেড়াবলি এবং অন্তবাসী সমাজে পাখ-পাখালি বলির নেপথ্যে অনেক অমানবিক গল্প রয়েছে। সেটা আলোচনার সুযোগ এখানে পাওয়া যাবে না। তবে এই শ্রেণিটির কথা না বললেই নয়, যারা সব খাবার ৪৮ ডিগ্রি উষ্ণতায় রান্না করে খান। পারলে রান্না ছাড়াই খান। ডিম খান কাঁচা। এদের বিশ্বাস, যিশু কাঁচা খাবার খেতেন। আরও আছেন অঙ্কুরিত বীজভোজী। এরা প্রধানত খান কল বের হওয়া ছোলা-মটর-গমসহ অন্যান্য কাঁচা তরকারি। তবে নন-ভেগানরা রেস্তোরাঁর সঙ্গিনী হিসেবে ভালো- এমন প্রমাণ মেলে না। যেসব মেয়ে গান বোঝে, সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করে, নাচতে জানে, ওয়াইনে বানচাল হয় না, অপ্রিয় সত্য এড়িয়ে চলে, পলিটিক্স নিয়ে মাথা ঘামায় কম এবং জাত-ফাত, সাদা-কালো, দেশি-বিদেশি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সংস্কার বিবর্জিত এমন মেয়েরাই রেস্তোরাঁয় ভালো সঙ্গিনী- লিখেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। এমন এক সঙ্গিনীর কাছে শুনেছিলাম তার জীবনের গল্প। 

মেয়েটির এ গল্প ২০ বছর আগের। তখন তার বয়স ১৮। একটা ছেলেকে পছন্দ করত। কিন্তু সেভাবে কখনও কথা হয়নি। আসলে তখন এখনকার মতো এত মেলামেশার সুযোগ ছিল না। ছেলেটি তাদের পাড়াতেই থাকত। স্কুলে যাবার পথে রোজ দেখা হতো তার সঙ্গে। স্কুলও ছিল পাশাপাশি। ছেলেটি দেখতে দারুণ। স্টুডেন্টও ভালো। তুলনায় মেয়েটি দেখতে 'ভালো' নয়; স্টুডেন্ট ভালো নয়, দরিদ্রও ছিল বটে। অনেক মেয়েই পছন্দ করত ছেলেকে। একদিন আরেক বান্ধবীর মাধ্যমে ছেলেটি জানায়, মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে চায় সে। সেদিন দুপুরে মেয়েটি অনেকক্ষণ ধরে সাজল। বিকেল ৫টা বাজার আগেই পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট জায়গায়। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও ছেলেটি এলো না। দুঃখে মেয়েটির চোখ ফেটে জল আসে। ফেরার পথে মেয়েটি মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল এই বলে, কোনো কাজে হয়তো আটকে গেছে ছেলেটি। কিছুটা এগিয়ে আসার পর মেয়েটি দেখল টম ক্রুজের মতো দেখতে ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে তার বন্ধুদের নিয়ে। তারা হাসছে, মেয়েটিকে নিয়ে নানান রকম মন্তব্য করছে। মেয়েটি তখন বুঝতে পারল, এটি নিছক ছেলেটির মজা। দুঃখ-অপমানে মেয়েটি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু অসফল সেখানেও। বেঁচে রইল মেয়েটি। তবে যেদিন সে দ্বিতীয় জীবন পায়, সেদিনই সে প্রতিজ্ঞা করেছিল- পড়াশোনা ছাড়া আর কোনোদিকে মন দেবে না। এখন সে স্বাবলম্বী, স্বনির্ভর একজন চিকিৎসক। আর যে নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসক সেখানেই মাদকাসক্ত রোগী হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে ধনীর সেই লাডলাটি। পরিবারের মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্রয়ে বখে গিয়ে পড়াশোনা আর এগোয়নি। তবে মেয়েটি এখন বদলে গেছে আদ্যোপান্ত। অপমানের সেই জ্বলুনি আর নেই। ক্ষমা করে দিয়েছে ছেলেটিকে। ঠিক জেন ফন্ডার মতো। আমেরিকান সৈন্যদের উৎসাহ দিতে ভিয়েতনাম সফরে গিয়েছিলেন জেন ফন্ডা। সফর শেষে ফিরলেন আদ্যোপান্ত আত্মিক পরিবর্তনসহ এক অন্য মানুষ হয়ে। গিয়েছিলেন ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধরত নিজ দেশের সৈন্যদের প্রণোদনা দিতে; ফিরলেন অহিংস নীতির সমর্থক হয়ে। ভিয়েতনামি সৈন্যরা তাকে আমিষ বর্জন করে পুরোপুরি ভেগান করে তুলেছিল। এ গল্পটির জন্মও কিন্তু ভিয়েতনামের এক রেস্তোরাঁয়। 

এমএ/ ১১:২২/ ২৩ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে