Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-২৩-২০১৮

যেখানে গল্প জমে

ফারজানা সিদ্দিকা


যেখানে গল্প জমে

'হোটেলে বইসা বন্ধু-বান্ধবগো লইয়া পরোটা ভিজাইয়া ভিজাইয়া চা খায় তোমার মাইয়া! পাংখা গজাইছে! মানুষের মুখে এই সমস্ত কথা শোনার জন্যে তারে লেখাপড়া শিখাই?' বাবার এই অগ্নিমূর্তির সামনে মায়ের মুখ স্বভাবতই কাচুমাচু। ভয়ে মেয়েটি নিজের রুম থেকে বের হয় না। বুঝতেই পারে না এত ভোরে চা-পরোটা খাবার দৃশ্য কে দেখল আর এত সুন্দর করেইবা বাবার কাছে খবরটা কে পৌঁছালো! 'মেয়ে হোটেলে যায়'...বোধকরি, এ কোনো সরল বাংলা বাক্য নয়। এর পেছনে কুৎসিত ইঙ্গিত লুকোনো থাকে। হোটেল আর রেস্তোরাঁ তো এক জিনিস নয়! কিন্তু মফস্বলের বাঙালির জীবনে প্রায়শ দুটোই এক হয়ে ওঠে। নইলে 'ভাতের হোটেল' কথাটা এত চালু থাকে কী করে! কে আর কষ্ট করে ফরাসি রেস্তুরেন্ত শব্দের অন্য মানে খোঁজে। আর খুঁজলেইবা কী... আত্মীয়-পরিজনের বাইরে একা একা বা বন্ধু-বান্ধবসহ মেয়েদের হোটেল হোক বা রেস্তোরাঁ হোক, কোনোটাতে যাওয়াই ভালো দেখায় না। দেখায় না নাকি দেখাত না! সময় বদলেছে ঠিকই কিন্তু সেই বদলের ছাপ কতটা পড়েছে সবখানে- শহরে-মফস্বলে-গ্রামে? রেস্তোরাঁয় চা-পরোটা খাবার অপরাধে মেয়েটির বাবা রেগে উঠেছিলেন সেই সময়টা নব্বইয়ের শুরুর দিকে। অপরাধের নেপথ্য কাহিনী ছিল এই যে, ভোর সাতটার ব্যাচে মেয়েটিকে ক্যামিস্ট্রি পড়তে যেতে হতো। বাড়িতে তখনও চুলা জ্বলত না। এক ঘণ্টা স্যারের কাছে পড়া শেষ করে ওখান থেকেই ছুটতে হতো কলেজের উদ্দেশে। ফলে, খিদে মেটানোর একমাত্র উপায় হলো ব্যাচের বন্ধু-বান্ধবরা সবাই মিলে কলেজের কাছাকাছি একটা সসা রেস্তোরাঁয় ঢুকে চটপট গরম চায়ে পরোটা ভিজিয়ে খেয়ে নেওয়া। এ তথ্য বাবাকে দিলে তাৎক্ষণিক বকাঝকার হাত থেকে রেহাই পেত ঠিকই কিন্তু রাগটা গিয়ে পড়ত মায়ের ওপর...অত ভোরে মেয়ের জন্যে নাস্তার আয়োজন না করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো।

মেয়ে/নারী ঘরে থাকবে, লেখাপড়ার দরকার আছে, কিন্তু সন্ধ্যায় ঠিক বাড়ি ফিরবে, ঘরের খাবার খাবে, চাকরি করবে কিন্তু সেখানেও থাকতে হবে পূর্ণ নিরাপত্তা যেমন স্কুল-কলেজের মাস্টারি, বড়জোর সরকারি ব্যাংক হতে পারে। মধ্যবিত্ত বাঙালির এই মানসিকতা খুব বেশি কি বদলেছে? শতকরা হিসাবে বদলটা যত না স্বতঃস্ম্ফূর্ত তার চেয়ে বাস্তবতার চাপে। আজও মফস্বলের রেস্তোরাঁয় পুরুষ ছাড়া কেবল মেয়েরা চা খেতে খেতে গল্পে-আড্ডায় মেতে উঠলে ভ্রূ কুঁচকায় লোকে। আজও কোনো চাকরিজীবী নারীকে একা বাসা ভাড়া নিতে বেগ পেতে হয়। আজও কাজের প্রয়োজনে নামকরা কোনো হোটেল না হলে একা থাকতে নারী ভয় পায়। আজও মেয়েদের হোস্টেলগুলো ঘিরেই নোংরা গল্প ডানা মেলে। এই অভিজ্ঞতা টের পায় ছোট ছোট জেলা শহরগুলোতে নতুন গজিয়ে ওঠা মেডিকেল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া মেয়েরা। কেউ তাদের বাসা ভাড়া দিতে চায় না, এমনকি প্রশাসনের উদ্যোগেও সাড়া মেলে না তেমন। আর এলাকাবাসীর কাছ থেকে প্রশাসনের কাছে একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে, যখন তাদের দেখা যায় প্রতিষ্ঠানের গেটের সামনের চায়ের দোকানে 'ছেলেদের সঙ্গে ঢলাঢলি' করতে। 

২. কাচের দেয়াল তোলা পিৎজা, পাস্তার রেস্তোরাঁয় অভ্যস্ত নতুন প্রজন্মের পাঠক চোখ কপালে তুলেছেন এতক্ষণে! এও কি সম্ভব! রেস্তোরাঁর পরিবেশের রূপান্তরের ইতিহাস তো খুব দীর্ঘ নয়। রেস্তোরাঁয় পর্দা দেওয়া কেবিন ছিল এক সময়, হয়তো এখনও আছে বেশিরভাগ শহরে। সাধারণত প্রেমিক যুগল বসত সেখানে। অথবা নতুন বিয়ে হওয়া দম্পতি অথবা পর্দানসীন বউ আর বাচ্চাদের নিয়ে ম্রিয়মাণ কোনো স্বামী। কেবিনে প্রেমিকযুগল বসলে বাতাসে ওড়া পর্দার ফাঁক দিয়ে কী হয় দেখার জন্যে বাইরে থাকা কাস্টমারদের কৌতূহল উপচে পড়ত। আর সেই সময় সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষটি হয়ে উঠত ওই নির্ধারিত কেবিনের দায়িত্বে থাকা বয়। সে মুখে এক রহস্যময় হাসি নিয়ে একবার ভরা পানির গ্লাস নিয়ে হাজির হয় তো আরেকবার আরও কিছু লাগবে কি-না বলে বকশিশের প্রত্যাশায় হাত কচলায়। অর্ডার দেওয়া খাবারের কোনোটাই তেমনভাবে খায় না প্রেমিকা। আর প্রেমিকও পেটে খিদে থাকা সত্ত্বেও স্মার্ট হওয়ার ভান করতে গিয়ে গোগ্রাসে খেয়ে নিতে পারে না। ফলে মূল খাবারের চেয়ে তারা বেশি খায় ধনিয়া ভাজা! 

কোনো কোনো শহরে রেস্তোরাঁর খোলা জায়গায় মেয়েদের বসার চল ছিল না বছর দশেক আগেও। একা তো নয়ই, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গেও নয়। কেবল প্রেমিকযুগলের ব্যবহার ছাড়াও কেবিনই মেয়েদের বসার নির্ধারিত জায়গা ছিল। সিলেট শহরে বছর দশেক আগে কেবিন ছাড়া রেস্তোরাঁ 'উনদাল' চালু হওয়ার পর রীতিমতো পত্রিকার খবর হয়ে উঠেছিল।

আর ছিল আলো-আঁধারির চায়নিজ রেস্তোরাঁ। সেখানে বেশি লোকের আনাগোনা নেই। প্রকাশ্য কৌতূহলও নেই, ভিড় তেমন নেই বলে টেবিল খালি করার তাড়া নেই। বয়-বেয়ারারাও অহেতুক টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে না। সেখানে চুক চুক করে স্যুপ খেতে খেতে হাত ধরে বসে থাকা বা টেবিলের নিচে পায়ে পা লাগিয়ে মিটিমিটি হাসা যায় দীর্ঘক্ষণ। 

৩. আসলে রেস্তোরাঁ যাকে বলা হচ্ছে তার স্বভাব আর আকৃতি দুটোরই তো বদল ঘটে গেছে এদেশে। এমনকি নামেও। খাদ্য তালিকায়ও। শুধু চা-কৌটোভরা বিস্কুট আর বনরুটি নিয়ে রাস্তার পাশে যে ছোট ছোট অস্থায়ী প্রায় খোলা দোকান গড়ে উঠেছে তার নতুন নাম হয়েছে টঙ। এমন দোকান আর টঙ নাম বছর পনেরো আগেও চালু ছিল না। রাস্তার ধারে এই আকৃতির দোকানে কেবল সিগারেট-বিড়ি পাওয়া যেত। চা-সিঙ্গাড়া-ডালপুরি ছাড়া রেস্তোরাঁ ভাবাই যেত না। বড়জোর আলুর চপ, কাটলেট, লাচ্ছি। আধুনিক রেস্তোরাঁয় ডালপুরি প্রায় উঠেই যাচ্ছে। সেখানে যুক্ত হয়েছে আমদানিকৃত খাবার দোসা, ছোলা-বাটোরা। চায়েরও তো বদল হয়ে গেছে...গ্রিন টি, লেমন টি, কোল্ড টি, তুলসি টি আরও কত কত বিচিত্র ফ্লেবার।

৪. প্রতিটা জেলা শহরেই একটা নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁ থাকে, যেটা 'বাপ-দাদার আমল' থেকে চলছে! প্রজন্মের পর প্রজন্ম সন্ধ্যায় ওখানেই জমায়েত হয়। রাত ন'টা-দশটা পর্যন্ত আড্ডা চলে, আড্ডার বিষয় এত দ্রুত বদলাতে থাকে যে, বাড়ি ফেরার সময় হলে অনেকেই ভুলে যায় ঠিক কী নিয়ে আড্ডাটা শুরু হয়েছিল! একসময় হয়তো ওই জেলা শহরের ছেলেদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে যায়। বড় কোনো ছুটিতে বাড়ি ফিরে ঠিক সন্ধ্যায় হাজির হয় নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁয়। রেস্তোঁরার মালিক চেনা আত্মীয়ের মতো প্রশ্ন করেন, 'কবে আসছেন? কয়দিনের ছুটি? বয়-বেয়ারারা মুচকি হাসিতে স্বাগত জানায় আর ঠিক ঠিক মনে করে তার পছন্দমাফিক চা এগিয়ে দেয়। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার, নিয়মিত কাস্টমাররা কে চায়ে বেশি চিনি খায়, কার চায়ে দুধ বেশি-চিনি কম, কার লিকার বেশি, কে কাঁচাপাতির চা খায় সবকিছুই মনে রাখতে পারে। আর এরকম মনে রাখতে পারে বলেই কয়েক মাস বা বছরের বিরতির পর ওই কাস্টমার বাড়ির চায়ের চেয়েও বেশি তৃপ্তি পায় নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁর চায়ে। এরকম কোনো কোনো রেস্তোরাঁ কখনও কখনও পিয়নের কাজও তো করে। কোনো বন্ধু রেস্তোরাঁতেই রেখে যায় আরেক বন্ধুর জরুরি কিছু কাগজপত্র। মালিক বা ম্যানেজার যত্ন করে সামলে রাখেন। অন্য বন্ধুটি হয়তো সুবিধামতো কোনো সময়ে ওই রেস্তোরাঁ থেকেই সেটা সংগ্রহ করে নেয়। মোবাইল ফোন আসার আগে অন্যকে বলার জন্যে মুখে মুখে কত খবরও তো মানুষ রেখে যেত রেস্তোরাঁতেই। 

কোনো কোনো রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে নাম লেখা থাকলেও মালিকের নামেই নাম হয়ে যায়। কেউ কেউ মজা করে এসব রেস্তোরাঁর নতুন নামকরণও করে। 

মৌলভীবাজারে এমনই একটা রেস্তোরাঁর নাম 'ম্যানেজার স্টল'। যেখানে নাকি প্রতি সন্ধ্যায় নানান রাজনৈতিক দলের নেতাদের আড্ডা বসে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নানান পেশার মানুষের ভিড় জমে ওঠে। অনেকটা মিলনমেলার মতো। 

খুলনায় বেড়াতে গেলে ডিলাক্সের ফালুদা, চার-রাস্তার মোড়ের চুঁই ঝালের খাসির মাংস না খেলে নাকি জীবন বৃথা! বরিশালে দইঘরের ঘোল-মুড়ি বা নিতাইয়ের মিষ্টি। সিলেটে পানসীর চিকেন চাপ, পাঁচভাইয়ের চালের রুটি-পায়া... প্রতিটা শহরেই এমনি এক একটা রেস্তোরাঁ ঘিরে শুধু কি মুখের স্বাদের স্মৃতি থাকে? নাকি থাকে আরও কিছু!

৫. বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে ক্রমাগত রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ছে যেমন, হুটহাট বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এখন আর পুরনোদের গল্প শুনে রেস্তোরাঁয় খেতে যায় না। রীতিমতো ওই রেস্তোরাঁ সম্পর্কে রিভিউ পড়ে বাছাই করে। বাড়িতে দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার চেয়ে রান্নার ঝক্কি এড়ানোর জন্যে নিমন্ত্রণগুলো রেস্তোরাঁ ঘিরেই। খাবার দেওয়ামাত্র ছবি তোলার হিড়িক। পোস্ট দেওয়া। লাইক-কমেন্ট দেখা চলতে থাকে খাবার খেতে খেতেই। অথচ মাত্র দুই দশক আগেও বিয়ের পাত্রী দেখতে গিয়ে বাড়ির রান্না খাবার না দিয়ে 'হোটেলের খাবার' পরিবেশনের দায়ে কত কত বিয়ের আলাপই ভেঙে গেছে। কিন্তু এর একটা উল্টো চিত্রও তো আছে। অবশ্য সে চিত্র দৃশ্যমান নয়, সে চিত্র থাকে মস্তিস্কে। আর সে চিত্র কেবলই বাঙালি নারীদের চিন্তায় আসে বিশেষত যে নারী দিনের পর দিন বাড়ির রান্নার কাজে যুক্ত থাকে। তারা মাঝে মাঝেই ভাবে, পৃথিবীতে যদি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সিস্টেম চালু হতো! তারা ভাবে ঠিকই কিন্তু রেস্তোরাঁর খাবার খরচের বাহার আর সংসারের উন্নতি ভেবে এক পা পেছায়! আর পরপর তিন দিন রেস্তোরাঁর খাবার খেয়ে সুড়সুড় করে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে! আর রেস্তোরাঁর খাবার মানেই অসুখ-বিসুখ- এ ভাবনাও তো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে রেস্তোরাঁয় ব্যবহূত তেল নিয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া প্রায় অসম্ভব! আর শোনা যায়, আড়তের সকল ভাঙা ডিম নাকি রেস্তোরাঁতেই যায়!

৬. সারাজীবন মানে একটা কর্মময় জীবন হোটেল বা রেস্তোরাঁতেই খেয়ে কাটিয়েছেন এমন লোকের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। এমনই একজন ছিলেন ফরিদপুর শহরে। হাকিম চাচা নামেই তাকে চিনত সকলে। অকৃতদার মানুষটি ছিলেন ফরিদপুরের পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। শহরের ছেলেপেলে যারা নিয়মিত লাইব্রেরিতে যেত, তাদের কারও ভালো ফলাফলে বই নিয়ে নাকি হাজির হতেন বাড়িতে। সারা জীবন হোটেলে থেকেছেন আর তিনবেলাই খেয়েছেন রেস্তোরাঁয়। প্রতিদিন যারা কোনো একটা বেলায় নির্দিষ্ট কোনো রেস্তোরাঁয় খায়, তাদের কিন্তু নির্দিষ্ট একটা চেয়ার-টেবিলের প্রতি আসক্তিও তৈরি হয়ে যায়। রেস্তোরাঁর বিশেষ কর্নার বা বিশেষ টেবিলটা অথবা বিশেষ বয় যে তাকে যত্ন করে পছন্দের মাছের পিসটা বা বাটিতে ডাল একটু বেশি দেয়। গ্লাসটা ভালো করে ধুয়ে আনে। হয়তো তার জন্যে রেখে দেয় মাছের মাথাটা। হয়তো একদিন সে আসতে দেরি করলে উদ্বিগ্ন হয়। চেনা সম্পর্কের বাইরে এ এক অদ্ভুত মায়ার বন্ধন। 

বাঙালি পাঠককে পৃথিবীর নানা রেস্তোরাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছিলেন- এমনই একজন নিয়মিত কাস্টমার মুজতবা আলী। বাংলাদেশের পুরান ঢাকা আর গুলিস্তানে এমনই দু-তিনটে রেস্তোরাঁ ছিল, যেখানে ষাটের দশকের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়মিত পাওয়া যেত। স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীতে সেসব রেস্তোরাঁয় আড্ডার কথা যেমন আছে, তেমনি আছে কোনো কোনো পত্রিকা প্রকাশের প্রারম্ভিক পরিকল্পনার ইতিবৃত্ত। আহা! দুর্ভাগ্য দেশের লেখকগোষ্ঠীর। এক বিউটি বোর্ডিং ছাড়া কেউ সেসব আড্ডার স্মৃতি সামান্যও ধরে রাখেনি। অথচ শোনা যায়, প্যারিসে যে রেস্তোরাঁয় নিয়মিত যেতেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, যে নির্দিষ্ট চেয়ার-টেবিলে বসতেন, সেই রেস্তোরাঁয় আজও সেই চেয়ার-টেবিল সংরক্ষিত আছে। প্রতিবছর হাজার হাজার হেমিংওয়েপ্রিয় পর্যটক সেই রেস্তোরাঁয় ঢুঁ মারে।

৭. টিপ্‌স নিয়ে রেস্তোরাঁর দু'পক্ষের মধ্যেই দ্বান্দ্বিক টানাপড়েনের অভিজ্ঞতা কমবেশি সকলেরই আছে। একপক্ষ ভাবে, কত দেওয়া উচিত? আর অন্যপক্ষ ভাবে, কত দিতে পারে? এ নিয়ে নিঃশব্দে মুহূর্তের এক খেলা জমে ওঠে। কাস্টমার বিল পরিশোধের জন্যে বড় অঙ্কের নোট দিলে বাকি টাকা এমন খুচরো করে ফেরত দেওয়া হয়, যেন খুচরো টাকা থেকে সহজেই সে টিপ্‌স পেতে পারে। তখন কেবল অপেক্ষা... খুচরোর মধ্য থেকে বড় অঙ্কের নোটটাই দেবে তো! আর কোনো কারণে একটা নোটও না দিয়ে কাস্টমার বিদায় নিলে রেস্তোরাঁর বয়দের মুখে অনুচ্চারিত কিছু শব্দ উঠে আসে... সেসব শব্দের উৎস খুঁজতে পারেন কেবল নোয়ম চমস্কি! তবে, রেস্তোরাঁর বয়রা নাকি কাস্টমারের মুখ দেখেই বুঝতে পারে কে কত টিপ্‌স দিতে পারে!

৮. নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে বাড়িতে রওনা দিয়েছিল একজন চেনা মানুষ। কত দ্রুত পৌঁছানো যায় বাড়িতে এই চিন্তা থেকেই শর্টকাট রাস্তা হিসেবে সে বেছে নেয় মাওয়া রুট। গুলিস্তান থেকে মাওয়ায় গিয়ে স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিলে সময় কম লাগবে। ভীষণ তাড়াহুড়ো থাকা সত্ত্বেও মাওয়া ঘাটে ভাজা ইলিশের গন্ধে আটকে যেতে হয়! নিজেকেই যুক্তি দিতে থাকে মনে মনে, 'মরা বাড়িতে কখন কী খাওয়া পাব কে জানে! এখান থেকে খেয়ে যাওয়াই ভালো।' শোকার্ত মনে কাঁটা বিঁধার ভয়ে একটু ধীরেসুস্থেই পরম তৃপ্তি নিয়ে গরম ভাত আর ইলিশ ভাজা সঙ্গে ইলিশের তেলে থাকা দুটো শুকনো মরিচ মেখে পেট ভরে খেয়ে নেয় সে। তারপর আবার বাড়ির পানে ছুটতে থাকে।

কিছু রেস্তোরাঁ এমনই... যার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় জিভে অহেতুক জল আসে। আর সে জন্যেই বোধকরি হাইজিন নিয়ে চরমভাবাপন্ন মানুষটিকেও কেমন টলে যেতে হয় মাওয়া ঘাটের রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে! কিন্তু মাওয়াঘাটের রেস্টুরেন্ট মালিকদের মতোই মনে বাজে একটা কথা, পদ্মা সেতু চালু হলে এমন ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ কোথায় হারাবে?

৯. শহরটাই একটা দেশ। ছোট্ট কিন্তু পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মানদণ্ডে প্রভাব বিস্তারকারী একটা দেশ সিঙ্গাপুর। সে জন্যেই আধুনিক জীবন ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হয়েছে সে দেশের সরকারকে। জমি কম তাই ব্যক্তিমালিকানায় বাড়িঘরের সংখ্যাও কম। রান্নাঘরসহ আর রান্নাঘর ছাড়া বাসার ভাড়ায় বিস্তর পার্থক্য। রান্নাঘর ছাড়া বাসা! বাঙালি মধ্যবিত্ত তো ভাবতেই পারে না। সিঙ্গাপুরবাসী পারে; কেননা শহরজুড়ে নানা মাত্রার রেস্তোরাঁ! ভারত-পাকিস্তান আর বাংলাদেশের বহু মানুষ কর্মসূত্রে ওদেশে থাকে বলে এসব দেশের খাবারের রেস্তোরাঁর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বিশেষ করে লিটল ইন্ডিয়া এলাকায় করে সাউথ-ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ বেশি আর আছে হাতেগোনা কয়েকটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ।

জীবনযাত্রার খরচ, ট্যাক্স আর ফাইনের চাপ এত বেশি যে, সিঙ্গাপুরে একটা কথা চালু আছে, কাজ না থাকলে মরা ভালো! ফলে কাজের ধান্ধায় দিনরাত থাকতে হয় তাদের। রান্না করার সময় নেই যাদের আর খরচ কমাতে রান্নাঘরহীন বাসায় যারা থাকে, খাবারের জন্যে রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর না করে উপায় নেই তাদের। তারা জানে, আইনের ভয়ে ওদেশে ভাঙা ডিম আর ভেজাল তেলের ব্যবহার নেই, সুতরাং খাবার নিয়ে অহেতুক ভয়ও তাদের নেই। দিনরাত রেস্তোরাঁগুলোতে তাই ভিড় লেগে থাকে। 

মোস্তাফা সেন্টারের উল্টোদিকে রবার্ট লেনের শেষ মাথার বাড়িটার নিচতলায় দারুণ এক রেস্তোরাঁ আছে। মালিক পাকিস্তানি। করাচি থেকে সিঙ্গাপুরে এসেছেন প্রায় চল্লিশ বছর আগে। রাস্তার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে থাকেন আর কাস্টমারদের সঙ্গে গল্প-গুজব করেন। বিশেষ করে রোববারে যখন দূর-দূরান্তের প্রজেক্ট সাইট থেকে সারাদিনের জন্যে ওয়ার্কাররা বাজার করতে আসে- পুরো এলাকা গিজগিজ করে লোকে। রেস্তোরাঁ মালিকের গল্পের বিষয় ঘুরেফিরে একই, এই সিঙ্গাপুর কী ছিল আর কী হয়েছে! চল্লিশ বছর ধরে বদলে যাওয়া সিঙ্গাপুর দেখার বিচিত্র অভিজ্ঞতা বয়ান করতে থাকেন কৌতুকী স্বরে। সে গল্পের প্রধান বিষয়, মোস্তাফা সেন্টারের মোস্তাফার জীবন। টুপি সেলাই করার দোকান থেকে কী করে বিশ্বের অন্যতম বিশাল চেইন-শপের মালিক হয়ে উঠলেন মোস্তাফা! আর বাঙালি কাস্টমার বিশেষ করে ভারতীয় বাঙলিদের পেলে বারবার বলতে থাকেন, প্লিজ হ্যাভ এ ডিশ মেইড বাই উত্তমকুমার। লোকে ভড়কে যায়! উত্তমকুমারের রান্না! রেস্তোরাঁর পাকিস্তানি মালিকের বাবুর্চির নাম যে উত্তমকুমার দাস ফ্রম বহররমপুর, ইন্ডিয়া! তো, এই ইয়ার্কির সময় রান্নায় ব্যস্ত না থাকলে উত্তমকুমারও বাংলায় বলতে থাকে, উত্তমকুমাররে ছাড়া আপনার দোকান অচল! কিন্তু অচল শব্দের অর্থ পাকিস্তানি মালিক বোঝেন কি! 

এমএ/ ১০:০০/ ২৩ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে