Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ , ৩ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (55 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-২০-২০১৮

'মেয়েরা নিপীড়িত... তা যে দেশেরই হোক'

ওলগা গ্রিসনোয়া


'মেয়েরা নিপীড়িত... তা যে দেশেরই হোক'

'আমি আসলে লেখার চেয়ে পড়াটাকেই বেশি উপভোগ করি। আর পড়ার ক্ষেত্রে আমার কোনো বাছবিচার নেই। যখন যে বিষয় পড়তে ভালো লাগে তাই পড়ি। আর লেখালেখি বিষয়টাও কিন্তু খুব উপভোগ্য।' নিজের লেখালেখির বিষয়ে এভাবেই বললেন ওলগা গ্রিসনোয়া। ওলগা গ্রিসনোয়া জার্মান লেখক। ঢাকা লিট ফেস্টের তৃতীয় দিনের অধিবেশন 'নো নোবেল : মি টু ইন লিটারেচার' শীর্ষক আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন তিনি। মি টু ঝড়ের প্রভাব। লেখালেখির শুরু। শৈশব। স্কুলজীবন নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জোহরা শিউলী 

আমরা কথা শুরু করতে পারি লিট ফেস্টে আপনার অধিবেশনটি নিয়েই। 

ওলগা গ্রিসনোয়া :আসলে আমরা মেয়েরা তো নিপীড়িত। তা যেই দেশেরই হই। উন্নত বিশ্বে অবস্থান করে উন্নত জীবনযাপন করলেই যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে যাব তা কিন্তু নয়। কর্মক্ষেত্রে-রাস্তাঘাটে আমাদের নানা বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। মি টু তারই বহিঃপ্রকাশ। এটা একটা সাহসী পদক্ষেপ। মি টু অভিযুক্ত কোনো লেখক নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাবেন না। এটা খুবই ইতিবাচক। সুইডিশ একাডেমির এই পদক্ষেপ তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে সাহায্য করবে। নোবেল পুরস্কার ও তাদের কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই আন্দোলনের ফলাফলের ওপর। আগে অনেকেই কণ্ঠস্বর না তুললেও এখন সবাই কণ্ঠস্বর তুলছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে নোবেল পুরস্কার বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাই।

যারা বই পড়েন, শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করেন তাদের জন্য তো এটা নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে।

সেটা তো অবশ্যই। যারা শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করেন তাদের জন্য এই দূষিত পরিবেশ ক্ষতির দিকে নিয়ে যাবে। গত শতাব্দীতে প্রথম নারীবাদের আন্দোলন শুরু হয়। তারই ফল এই মি টু আন্দোলন। ১৫ বছর ধরে তেমন কোনো পরিবর্তন কিন্তু দেখা যায়নি। কিন্তু বিগত কয়েক মাস ধরে এক ধরনের সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। শুধু নারীদের মধ্যে নয়, পুরুষদের মধ্যেও জনসচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আমি বলব সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যে এই চর্চা থাকলে আমরা নিজেদের শুধরে নিতে পারব অনেক। 

আপনি বলেছেন লেখার চেয়ে পড়তেই বেশি ভালো লাগে আপনার। 

কেন জানি না। এটার আসলে নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন যখন আপনি একটা সিনেমা দেখবেন, তখন কিন্তু আপনার কল্পনার কোনো জায়গা থাকে না। পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী যা দেখাবে তা দেখতেই আপনি বাধ্য। কিন্তু যখন বই পড়বেন? পুরোটাই কিন্তু আপনার জগৎ। গল্পের নায়কা-নায়িকাকে নিজের আদলে গড়ে নেওয়া যায়। সবকিছু নিজের মতো কল্পনা করা যায়। শৈশবে আমি যখন শিশুদের বিভিন্ন বই পড়তাম, তখন থেকেই আমি আমার কল্পনা রাজ্য রচনা করতাম। 

তার মানে পড়ার নেশাটা শৈশব থেকেই। 

হুম সেটা বলতে পারেন। ১৯৯৬ সালে আমার যখন বয়স ১১, তখন রিফিউজি হিসেবে আমাদের রাশিয়া থেকে জার্মান চলে আসতে হয়। কোনোভাবেই আমি জার্মান সিস্টেমের মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারতাম না। জার্মানির যেই স্কুলটাতে আমাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছিল ওই স্কুলের কারিকুলামের সঙ্গেও আমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতাম না। ফলাফল পড়াশোনায় আমি পেছন সারির একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই পরিচিত হচ্ছিলাম। আমার মা-বাবা আমাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আমার ভবিষ্যৎ ভাবনা তাদেরকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছিল। মা-বাবাও পড়ার নেশা ছিল। তাদেরই ছিল নিজস্ব পাঠাগার। বাড়ির ভেতর আমাদের যে পাঠাগার দেখা গেল আমার মা সেখানেই আমাকে নিয়ে বসে গেলেন। বিভিন্ন লেখকদের জীবনীকথা। রূপকথা। অর্থাৎ শিশুদের আনন্দ দেবে যেসব পড়ার বিষয়, সেগুলো আমাকে নিয়ে পড়তেন। আমি কিন্তু আমার মা-বাবার লাইব্রেরির সম্মান রক্ষা করেছি। স্কুলে আমি খুব ভালো ছাত্র হতে না পারলেও লাইব্রেরির আনাচে-কানাচে আমার বিচরণ। বই-ই আমার সঙ্গী। সারাক্ষণের বন্ধু। 

বইপোকা হওয়ার খবর তো জানলাম। এবার লেখালেখির শুরুর কথা যদি জানতে চাই। 

লেখালেখিটাও একটা ঝোঁকের বশেই। আমার যখন বয়স ১৮, তখন একটা প্রতিযোগিতায় অংশ নিই। এটা একান্ত নিজস্ব কৌতূহলে। দেখিই না কী হয় লেখা পাঠিয়ে। লেখা পাঠানোর আগে অবশ্য আমার মাঝে অনেক দ্বিধা কাজ করেছে। পাঠাব কি পাঠাব না। কিন্তু পাঠানোর পর দেখলাম সেই প্রতিযোগিতায় আমি তৃতীয় হয়ে গেছি। কী যে ভালো লেগেছিল। সেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একজন লেখক হিসেবে আমাকে বক্তব্য রাখতে হয়েছিল। ওইদিন থেকে আমি বুঝে গিয়েছিলাম লেখালেখি আসলে কোনো খেলো বিষয় না। এটা একটা কমিটমেন্টের জায়গা। ১৮ বছর বয়সে লেখালেখির যে ট্রেন আমার চলছে, এখন পর্যন্ত তা আমি খুব সচেতনভাবেই চালাচ্ছি। 

লেখক মানে লেখকই। তার নারী লেখক কিংবা পুরুষ লেখক ভাগ করা উচিত নয়। সৃষ্টিশীল কাজে এই ভাগটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

লেখক কিংবা কবি হওয়ার যে কয়টি উপকরণ অর্থাৎ প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-প্রতারণা, ক্রোধ-দ্রোহ, ক্ষয় আর লয়ের সঙ্গে একাকিত্ব কিংবা চাপানো প্রথার সবই সংরক্ষিত রয়েছে নারীর জীবনে। এর সবই ক্রিয়াশীল নারীর মনে। নারীর এ দগ্ধ, এ যাতনা চিরায়ত। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্স কিংবা ইথিওপিয়া থেকে গ্রিস কি রাশিয়ার যে কোনো নারীর জীবনেই রয়েছে এর আগ্রাসন। তাই পৃথিবীজুড়েই নারীর লেখা সাহিত্য পুরুষের পাশাপাশি হয়ে উঠেছে কিংবদন্তি। বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে তাই যে কোনো নারী লেখকেরই অবদান অসীম। 

বিশ্বসাহিত্যে পুরুষ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নারী চরিত্র অঙ্কন করা হয়। আপনার কি মনে হয় না এতে করে নারী চরিত্রগুলোয় অসম্পূর্ণতা থেকে যায়?

পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেশিরভাগ নারী চরিত্র উপস্থাপন করা হয়। এতে করে সাহিত্যে নারী চরিত্রগুলোয় আসলেই অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। নারী লেখক নারীর দৃষ্টিতে সাহিত্য লিখলে নারী সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হবে। এতে সাহিত্যের অসম্পূর্ণতা দূর হবে। নারী লেখকদের লেখায় সমাজের নিয়ম ভাঙার ব্যাপার থাকে। এভাবে সমাজ সংশোধিত হয়। তবে নারী যদি পুরুষতান্ত্রিতার আদর্শে লেখেন, তাহলে সে উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। নারী লেখকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পুরুষ লেখকদেরও নারীর দৃষ্টিতে নারী চরিত্র চিত্রণের আহ্বান জানাই আমি। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান সাহিত্যাঙ্গনের ইতিহাসে গুন্টার গ্রাস ছিলেন জার্মান জাতির বিবেকসম। জার্মানি নাগরিক হিসেবে তার কতটুকু ভক্ত আপনি?

গুন্টার গ্রাস। রাজনীতি সচেতন এই লেখক তার নানা বক্তব্যের জন্য বিভিন্ন সময় সমালোচিত হলেও জার্মানির সংস্কৃতি অঙ্গনে জনপ্রিয়তায় তিনি ছিলেন আকাশচুম্বী অবস্থানে। তিনি তার কলম শানিত করেছেন যুদ্ধ, বর্বরতা আর সব অপশক্তির বিরুদ্ধে। কখনও বিতর্কের ভয়ে মুখ বন্ধ রাখেননি। জার্মানিতে নব্য নাৎসিদের উত্থান হতে শুরু করে বিদেশি বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, যুদ্ধবিরোধী, শান্তি ও পারমাণবিক জ্বালানিবিরোধী আন্দোলনসহ অনেক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তিনি সোচ্চার থাকতেন। অনেক অপ্রিয় সত্য কথা শোনাতেন। আমার মতো তরুণ, যে কি-না লেখালেখিকেই এখন স্বপ্ন ভেবে পথ চলছে- তার কাছে আসলে গুন্টার গ্রাস এক স্বপ্ন পুরুষ। 

১৯০১ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। এখন পর্যন্ত সাহিত্যে ১১১ জন এই গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। মাত্র ১৩ জন নারী পেয়েছেন সাহিত্যে নোবেল। 

আসলেই সংখ্যাটি খুবই কম। ১১১ জনের মধ্যে মাত্র ১৩ জন। এর মধ্যে আমাদের নারীরা যে লেখেননি তা কিন্তু নয়। তারা লিখেছেন। অনেকে আবার নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা সুঁই-সুতার মতো কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন। তারা লিখেছেন এবং অনেক ভালো লিখেছেন। যদিও কথাটা বলা ঠিক নয়, তারপরও আমি বলতে চাই বিশ্ব আসলে পুরুষতান্ত্রিকতার দাস। সাহিত্য-সৃষ্টিশীল কাজ পুরুষরাই করবেন। নারী কেন আবার? আচ্ছা লিখছেন। ভালো। তার আবার পুরস্কার পাওয়ারই কি দরকার? আর নোবেল! এটা একদম বেশি হয়ে গেল না? 

এমএ/ ০৪:৩৩/ ২০ নভেম্বর

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে