Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-০৬-২০১৮

রবীন্দ্রনাথের গানে পথ ও পথিক

আফসার আহমদ


রবীন্দ্রনাথের গানে পথ ও পথিক

রবীন্দ্রনাথের গানে বারবার নানা অর্থে নানা মাত্রায় পথ ও পথিকের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে। পথ ও পথিক প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে রবিমানসের গভীরতম বোধ থেকে উৎসারিত হয়েছে কবির সত্য, সুন্দর ও পরমেশ্বর অন্বেষণের ভাবনা। তবে শুধু আধ্যাত্মিকতা কিংবা ধর্মীয় ভাবনার প্রেক্ষাপটে নয়, মানুষের মধুরতম প্রেমের প্রেক্ষাপটেও পথ প্রসঙ্গ নবমাত্রায় উচ্চকিত রবীন্দ্রনাথের গানে। পথ ও পথিক- এই শব্দ দুটি কখনও সমার্থক, আবার কখনও একে অপরের পরিপূরক হয়ে অভিন্ন দ্যোতনায় উদ্ভাসিত। 

পথ ও পথিক প্রসঙ্গ নিয়ে কবিতা কিংবা গান লেখা নতুন কোনো বিষয় নয়। রবীন্দ্রনাথের পূর্বে ও পরে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক সাধনায় পথ ও পথিক প্রসঙ্গটি এসেছে এবং সাধক কবিগণ তাদের কবিতা ও গানে শব্দ দুটির বহুমাত্রিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। এই ধরায় আমরা ফার্সি কবি হাফিজ, রুমি, শেখ সাদী, হিন্দিভাষী সাধক কবি কবীর, বাংলার বাউলসাধক লালন প্রমুখ সুফি-সাধক কবি ও বাউলের নাম উল্লেখ করতে পারি। বৈষ্ণব কবিদের পদাবলীতেও কৃষ্ণকে লাভের দুস্তর সাধনায় পথের ক্লেশের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গোবিন্দদাসের একটি পদে দেখি, রাধা দুস্তর পথ অতিক্রমের জন্য সাধনা করছেন। কবি বলেন, 'দুতর পন্থ গমন ধনি সাধ এ মন্দিরে যামিনী জাগি।' মরমি কবি-সাধকদের প্রায় সকলেই নিজেকে পথিক ভেবে পথ চলেছেন পরমেশ্বরের অন্বেষণে। গান ও কবিতা রচনা করেছেন তাদের সাধনতত্ত্ব প্রকাশের নিমিত্তে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এসব মরমিবাদী কবি-সাধকদের মৌল পার্থক্য হলো দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতা। আর এই ভিন্নতার কারণেই পথ ও পথিক শব্দের প্রয়োগ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের গানে নানা মাত্রা ও নানা ব্যাখ্যায়। একই সঙ্গে জীবন ও ধর্মবিশ্বাসের গভীরতর মানবিক সংলগ্নতার স্বাতন্ত্রিক প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের গানের পথ ও পথিক প্রসঙ্গে। পথ ও পথিক শব্দ দুটির ভেতরে রবীন্দ্রনাথ আধ্যাত্মিকতা ও মরমিয়া জীবনদর্শনকে প্রবিষ্ট করেছেন তার নিজস্ব জীবনবোধ ও ধর্মবিশ্বাসের আলোকে।

বাংলাদেশের আউল, বাউল, দরবেশ, সুফি-সাধকরা কবিতা ও গানে পথ ও পথিকের কথা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশে জমিদারির কাজে এসে এই ধারাটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীরতর পরিচয় ঘটে। বাংলার বাউলদর্শন ও প্রেমধর্ম কবিকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করে লালনের গান ও দর্শনের সঙ্গে পরিচয় ঘটার পর। আমরা এ কথা রবিজীবনী থেকে জানতে পারি যে প্রাচ্য দর্শন, বিশেষ করে উপনিষদের শিক্ষা থেকেই ধর্মবোধের মূলভাবটি আহরণ করেছেন কবি। এর সঙ্গে মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পৃক্তি রবীন্দ্রনাথকে সারাজীবন সেই পরম সুন্দর ঈশ্বরের দিকে ছুটে চলার প্রেরণা জুগিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মানবধর্মের মূল দর্শন এসেছে বাউল ধর্মচিন্তা থেকে। ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত হিবার্ট বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ বাউলদের মানবধর্মের ব্যাখ্যা করেছেন। পল্লীর নিরক্ষর বাউলরা মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে ভর করে তাদের যে আধ্যাত্মিক জগৎ রচনা করেছেন, সেখানে পরমেশ্বর এসেছেন অরূপ রতন বা মানুষ রতন হয়ে। আর এ জন্যই রবীন্দ্রনাথ 'আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে/তাই হেরি তাই সকলখানে' এই সহজিয়া তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। এই প্রাণের মানুষের সন্ধানে পথে বের হয়ে 'কাঙালবেশে দ্বারে দ্বারে', বহু দেশ ঘুরে পথপরিভ্রমণ করে খুঁজে না পেয়ে অবশেষে নিজের অন্তরেই সন্ধান পেয়েছেন। তাই তিনি নিজের কাছেই পরমকে অন্বেষণ করেছেন। কারণ, মানুষ তো পরমাত্মারই অংশ। রবীন্দ্রনাথ তার ধর্মবিষয়ক লেখায় এভাবে বলেছেন, 'পরম মানবের বিরাটরূপে যাঁর স্বতঃপ্রকাশ আমারই মধ্যে তাঁর প্রকাশ সার্থক হোক।' বাউল কবিদের উদ্ধৃত করে সেই প্রবন্ধে কবি বলেছেন- আমি কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে।/ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে/ দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে।' সর্বমানবাত্মার মুক্তির আনন্দের ভেতরেই রবীন্দ্রনাথের ধর্মদর্শন নিহিত।

রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত কোনো ধর্মদর্শনের ঘেরাটোপে আবদ্ধ না থেকে মুক্তচিন্তার মানবতাবাদী ধর্মভাবনার দিকে ছুটে চলেছেন নিরন্তর। আর এই বিশ্বাসের বিস্তারের কেন্দ্রে ছিল প্রেমভাবনা। এই প্রেম মানব-মানবীর আটপৌরে প্রেমভাবনায় ক্লিশে নয়, বরং তা ব্যক্তি ও বিশ্বপ্রকৃতির গভীর সংরাগে বর্ণিল। রবীন্দ্রনাথ তার 'পথেপ্রান্তে' প্রবন্ধে বলেছেন, 'পৃথিবীর লোক পথ দিয়া চলিয়া যাইতেছে। তাহারা সঙ্গে কিছুই লইয়া যায় না। তাহারা সুখ-দুঃখ ভুলিতে ভুলিতে চলিয়া যায়। ... ... আর কিছুই থাকে না, কিন্তু প্রেম তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে।' প্রেমকে পাথেয় করেই আমাদের মরমি কবিরা দীর্ঘ পথযাত্রা শুরু করেছেন পরম সুন্দরকে পাওয়ার আশায়। তাদের কবিতা ও গানে আমরা এই পথ ও পথিকের বিষয়টি প্রেমের সংরাগে রঞ্জিত দেখি। হাফিজ, শেখ সাদী, রুমি, কবীরের দোহা কিংবা লালনের গানে মাশুকের উদ্দেশে আশেকের নিরন্তর ছুটে চলার কথা আছে। সাধক কবিরা পথের ডাক শুনেছেন। ঘর ছেড়েছেন। পথের শেষ কোথায় জানতে চেয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এদের চিন্তাধারার মূলে পার্থক্য রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি ও দার্শনিক। মধুর প্রেমের জারকরসে ব্যক্তির সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির অন্বয় তার মূল অন্বিষ্ট। কিন্তু সুফি-সাধকদের কবিতায় ধর্মচিন্তার পরিপূরক হয়ে উঠেছে এই পথ ও পথিক ভাবনা। তত্ত্বের ভারে তা শ্নথ খানিকটা। রবীন্দ্রনাথের গানকে তত্ত্ব এসে আকীর্ণ করেনি, বরং নির্ভার গতি এনে দিয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন চর্যাপদে পথের কথা আছে। এই পথে বহু মানুষের আনাগোনার কথা আছে। বৌদ্ধধর্মকে মূলে রেখে প্রতিদিনের জীবনযাপনের উপাদান-উপকরণকে গানের বিষয় করেছেন চর্যাকাররা। চর্যাপদের পথবিষয়ক ভাবনায়ও বিষণ্ণতার অনুরণন শুনি। কবি বলছেন, 'আলি' ও 'কালি'র দ্বারা পথ রুদ্ধ হলো। এই পথের শেষে কোথায় গিয়ে বাস করবেন, তা জানেন না কবি কাহ্নপা। মানুষের আসা-যাওয়া দেখে কবি বিমনা ও বিষণ্ণ। কবি বলেন-

যে যে আইলা তে তে গেলা।

অবনাগমনে কাহ্ন বিমনা ভইলা

কাহ্নকহি গোই করিম নিবাস।

জো মন গোঅর সো উয়াস

রবীন্দ্রনাথের গানেও শুনি আসা-যাওয়ার পথের ধারে বসে মানুষের আসা-যাওয়া দেখতে দেখতে কবি বিষণ্ণ। পথিকরা বাঁশি ভরে যে সুর সঙ্গে করে আনে, তাই কবির মনপ্রাণ কেড়ে নেয়। তবু পথের ভাবনায় পথকেই ভালোবাসেন কবি। গানটিতে কবি বলেন-

সুরের সাথে মিশিয়ে বাণী দুই পারের এই কানাকানি

তাই শুনে যে উদাস হিয়া চায় রে যেতে বাসা ছাড়ি

কিংবা কবি যখন অন্তরের গভীরে ডুব দিয়ে নিজেকে শুধোন 'আসা যাওয়ার মাঝখানে/একলা চেয়ে আছ কাহার পথ-পানে', তখন পথটি রাস্তা না হয়ে অপেক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের গানে পথ, পথের সাথী, পথিক অভিন্ন হয়ে উঠেছে। পথিক কোনো এক গন্তব্যে পৌঁছবে বলে ছুটে চলে। কিন্তু গন্তব্য কোথায় কিংবা পথের শেষ কোথায়, কে জানে? রবীন্দ্রনাথের গানে আমরা শুনি- চলার পথে যদি সেই পরম বন্ধু কিংবা পরানসখা সঙ্গে না থাকেন, তবে কী করে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। প্রশ্নটির ভেতরে বেদনা ও নির্ভরতার যে অদ্বৈত ভাবনা প্রকাশিত, তা দূর করে দেয় পথচলার কষ্ট। বাংলার আউল-বাউল ও সুফি-সন্তরা পথের অপরিসীম ক্লেশের ভেতর দিয়ে তাদের পরমপ্রিয় বা অরূপ রতনকে পাওয়ার জন্য বিরামহীন ছুটে চলেন। তারাও জানেন না পথের শেষ কোথায়? এই পথের বেদনা ও পথশেষে প্রাপ্তির সংশয় পথিকদের বিষণ্ণ করে, তবুও তাদের পথযাত্রা শেষ হওয়ার নয়। ছুটে চলার খামতি ঘটে না। 'অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার' এই লক্ষ্যে মহা অজানার পথে যাত্রা শুরু করেন। 

রবীন্দ্রনাথের গানে এই পথচলা খুব সহজ নয়। সেই দূরের আনন্দধাম অন্বেষণ করেন কবি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে। কারণ কবি তো সেই পথ জানেন না। পথ চলতে চলতে সূর্য ডুবে যায়; অন্ধকারে ছেয়ে যায় পৃথিবী। তখন কবি সেই আঁধার পথচলায় বিশ্ববিধাতার কৃপা প্রার্থনা করেন। কবির অতৃপ্ত বাসনা তৃপ্ত করার জন্যই অদেখা আনন্দধামের পথে ছুটে চলা। কবির মনে তীব্র বেদনা ধ্বনিত হয় :তবে কি কোনোদিন পথের শেষ তার জানা হবে না! তবে এই সংশয়ে থেমে থাকেন না কবি। তিনি পরম বিশ্বাসে সংশয় জয় করে পথ চলেন। পথ চলেন আনন্দ, প্রেম, নির্ভরতা এবং চলার প্রসন্নতায়। কবির এই ভাবনাগুলো পাই গীতাঞ্জলি পর্বের কবিতা ও গানে। কবি সেই পরমপ্রিয়র উদ্দেশে অসীম আশায় উচ্চারণ করেন- 'মেঘের 'পরে মেঘ জমেছে,/ আঁধার করে আসে,/ আমায় কেন বসিয়ে রাখ/ একা দ্বারের পাশে।/ কাজের দিনে নানা কাজে/ থাকি নানা লোকের মাঝে,/ আজ আমি যে বসে আছি/ তোমারি আশ্বাসে।' গীতাঞ্জলি পর্বে কবি সেই প্রিয়তমের চরণের ধ্বনি শোনেন। এক অপরিসীম গভীর নির্ভরতায় পথিকহীন পথে সেই পরম পথিকের উদ্দেশে বলেন- কূজনহীন কাননভূমি/ দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে,/ একেলা কোন্‌ পথিক তুমি/ পথিকহীন পথের পরে।/ হে একা সখা, হে প্রিয়তম,/ রয়েছে খোলা এ ঘর মম,/ সমুখ দিয়ে স্বপনসম/ যেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে। 

পথ ও পথিক এই দ্বৈত ভাবনার অদ্বৈত রূপ নিয়ে কালে কালে কত না কবি ও সাধককে তাড়িত করেছে তার সংখ্যা কে জানে! সেই ধারাবাহিকতায় পথে বের হয়ে আসার তীব্র টানের গানের পরিচয় পাই মরমি কবিদের রচনায়। মরমি কবিদের গানে আমরা পাই পথের সন্ধানদাতা গুরুর খবর। বাউলরা তাই সঠিক পথের সন্ধানের জন্য গুরুর কাছে চান পথনির্দেশ। মরমি সাধনায় এই পথ হলো মানুষের জীবনব্যাপ্ত সত্য অন্বেষণের পথ। এই পথের শেষে হয়তো রয়েছেন সেই করুণাসিন্ধু আলোকময়ের বাস। 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে পথকে দেখেছেন জীবনের চলমানতার প্রতীকরূপে। এই পথ কুসুম-কোমল নয়। এ পথে পা রক্তাক্ত হয়। পথের সবটাই কণ্টকাকীর্ণ। পথে চলতে চলতে কবির কানে বাজে পরমসুন্দরের বাণী। তাই পথ শেষের কথা না ভেবে পথকেই ভালোবাসেন কবি। তাঁর পথচলার বেদনা ও আনন্দের পৌনঃপুনিক বাণী- 

আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো

তাই তো তোমার বাণী বাজে ঝর্না-ঝরানো।

পাথর ছড়ানো পথে তবু নির্ভার নির্ভরতায় প্রিয়তমের বাঁশির সুরে আবিষ্ট হয়ে ছুটে চলেন পথিক। পথের ক্লেশ দূরে চলে যায়।

রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বাস প্রচলিত ধর্মবোধ থেকে আলাদা। কবি কি তাঁর ঈশ্বরের জন্য ছুটছেন? এই পথের টানে ঘর ছেড়ে কবি কি সবই বিসর্জন দিয়েছেন? দেননি। কবি প্রেমের ভেতর দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্ন থেকে আরাধনা করেন পান্থজনের সখাকে। সৃষ্টি যেন ধাবিত হয়ে ছুটে চলেছে স্রষ্টার প্রবল টানে। যেমন পদাবলীর রাধা ছুটেছেন কৃষ্ণপ্রেমের প্রবল টানে। তবে আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের গানে পথিকের ছুটে চলায় বৈষ্ণবীয় তত্ত্বের চেয়ে উপনিষদের ভাবনার সঙ্গে অধিকতর সংলগ্ন। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা পথে নামেন আকাশের বজ্রবিদ্যুৎ উপেক্ষা করে নিঃসীম রাতের অন্ধকারে। পথের ভয় রাধার মনেই আসে না। কারণ অন্তরজুড়ে তাঁর তীব্র কৃষ্ণপ্রেম। তবে জাগতিক অর্থে রাধার পথের শেষে কৃষ্ণের অনিবার্য উপস্থিতি পথক্লেশকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোনো মূর্ত রূপ নয়; বিমূর্ত কোনো রূপের অন্বেষণে পথক্লেশ সহ্য করে পথ চলেন। ফলে পথ শেষের চেয়ে পথচলার আনন্দকে নিবিড় বোধে হৃদয়ের আনন্দ করতে পেরেছেন কবি। আমরা উপনিষদে যে একেশ্বর ভাবনার পরিচয় পাই এবং সেই একেশ্বর ভাবনা কী করে সমস্ত সৃষ্টির ভেতরে ছড়িয়ে যায়, সে কথা উঠে এসেছে। ঋকের (১।১৬৪।৪) ঋষির মনে জন্মরহিতরূপে বিরাজমান ঈশ্বরের একত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন জেগেছে এবং এই অক্ষয়, অনন্ত, লয় ও বিনাশহীন, পূর্ণ ও অনাদি সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি সর্বক্ষেত্রে অনুভব করেন ঋকমন্ত্রের রচয়িতা। সারা পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত এই স্রষ্টাকে বৈদিক ঋষিরা জলে, স্থলে, আকাশে, চন্দ্র-সূর্য গ্রহ-তারায় সবখানে অনুভব করেন। রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও এই পরিব্যাপ্ত সত্য সুন্দরকে অন্বেষণ করার ব্যাকুলতা রয়েছে। আর এ জন্যই তিনি পথে চলেছেন। চলতে চলতে তারই লীলাখেলা অনুভব করেন কবি। তাই প্রকৃতির বিশ্বপ্রকৃতির ভেতরে, সৃষ্টিকে ভালোবেসেই রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরপ্রেম বিকশিত। আর এ জন্যই তিনি স্বর্গের আলোকসভার জন্য আকুল নন। আকুলতা তাঁর পৃথিবীব্যাপ্ত সুন্দরের ভেতর থেকে সুন্দরের অন্বেষণে। 

ওই আলোক-মাতাল স্বর্গসভার মহাঙ্গন
হোথায় ছিল কোনযুগে মোর নিমন্ত্রণ,
আমার লাগলো না মন লাগলো না
তাই কালের সাগর পাড়ি দিয়ে এলেম চলে
নিদ্রাবিহীন গগনতলে।

আবার প্রকৃতি বিষয়ক গান বলে চিহ্নিত রবীন্দ্রনাথের একটি গানে প্রকৃতির ভেতরে সেই সুন্দরের উপস্থিতি এভাবে অনুভব করেন-

আকাশভরা সূর্য-তারা বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।

এবং এই বিস্ময়ে কবি অসীম কালের জোয়ার হিল্লোলের সঙ্গে নিজের নাড়ির টান অনুভব করেন। তাই কবি যে পথের কথা বলেন, তাতে শুধু ভারতীয় সন্ত-বাউলের আধ্যাত্মিকতার টান নয়, একজন রোমান্টিক কবির তৃষ্ণাতুর অন্তরের ছুটে চলার গান। রবীন্দ্রনাথের এসব গানে, বিশেষ করে তাঁর ধর্মবোধটি অনুভব করার জন্য অনেকেই মিস্টিক কবির স্বরূপ খোঁজেন। আসলে রবীন্দ্রনাথের এই ক্রমাগত ছুটে চলা এবং পরম সুন্দরের প্রতি অনির্বার টানে পথচলার ভেতরে একজন সৌন্দর্যবাদী রোমান্টিক কবির আত্মার অবিরাম ক্রন্দনধ্বনিটি বাণী ও সুরে প্রকাশমান। কারণ রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিবিষয়ক গানে যেমন প্রেম অনুপস্থিত নেই, তেমনি প্রেমের গানেও প্রকৃতি প্রবলভাবে উপস্থিত। আবার প্রেমে পূজা এবং পূজায় প্রেম সমানভাবে বিরাজমান। ফলে রবীন্দ্রনাথের গানে প্রেম, প্রকৃতি ও পূজার ত্রয়ী সম্পর্ক বিদ্যমান। মোট কথা, রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরকে দেখেছেন মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে। 'চিত্রা' কাব্যের 'চিত্রা' শিরোনামের কবিতায় যা আভাসিত তা-ই রবীন্দ্রনাথের গানে পূর্ণরূপে প্রকাশিত। 'চিত্রা' কবিতায় কবি জগতের মাঝে বিচিত্ররূপিণীকে দেখেছেন নানাভাবে ছড়ানো। অপার বিস্ময় ও মুগ্ধতা থেকে কবি বলেছেন :কত না বর্ণে কত না স্বর্ণে গঠিত/ কত যে ছন্দে কত সংগীতে রটিত/কত না গ্রন্থে কত না কণ্ঠে পঠিত-/তব অসংখ্য কাহিনী।' এই বিচিত্রিরূপিণীই শেষে 'অন্তব্যাপিনী হয়ে মুগ্ধ সজল নয়নের একটি স্বপ্ন হয়ে হৃদয়বৃন্তে একটি পদ্মরূপে 'একমেবদ্বিতীয়ম' রূপে বিরাজমান। প্রকৃতিব্যাপ্ত অনন্ত সৌন্দর্যের ভেতরেই প্রকৃতিপ্রেমিক ঈশ্বরভক্ত কবি রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি ও স্রষ্টার অদ্বৈত রূপটি উপলব্ধি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের গানে ঋকের প্রতিধ্বনি এভাবে এসেছে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা এককরূপে থেকেও মানবহৃদয় ও প্রকৃতিতে বিস্তারিত। অনেকটা গীতার এই বাণীটির মতো :'একোহম বহুশ্যাম'। অর্থাৎ আমি এক ছিলাম আমি বহু হলাম। কিংবা 'অদ্বৈতম অচ্যুতম অনাদি অন্তম রূপম'। অর্থাৎ তিনি 'একম' হয়েও নিজেকে অনন্তরূপে প্রকাশ করতে পারেন। ঈশ্বর বহু হয়ে ছড়িয়ে পড়েন তারই সৃষ্ট জলে-স্থলে-সূর্য-তারায় প্রকৃতির সবখানে। ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু থেকে শিশুর হাসিতে- সবখানে অদ্বৈত ঈশ্বরের দ্বৈত রূপ ধরা পড়ে। এ জন্যই রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি ও স্রষ্টার অদ্বৈত রূপের সৌন্দর্য ও লীলারাশি প্রকৃতির মধ্যে উপলব্ধি করেছেন। কারণ রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে স্রষ্টা ও সৃষ্টি দ্বৈত-অদ্বৈতের লীলাখেলা। আবু সয়ীদ আইয়ুবের ব্যাখ্যা প্রণিধানযোগ্য। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'স্রষ্টা ও সৃষ্টি একই পরম সত্তার দুই ভিন্নরূপ। অর্থাৎ পূর্ণতার পথে মানুষ যেমন পান্থ, ভগবানও তেমনি। মানুষের কর্মক্ষেত্র মানব সমাজে সীমিত, ভগবানের কর্ম অনন্ত দেশকাল পরিব্যাপ্ত। আর তিনি পূর্ণ মহাকালে।' আর এভাবেই রবীন্দ্রনাথের গানে পথ ও পান্থর অদ্বৈত রূপ প্রকাশিত।

এমএ/ ০৯:০০/ ০৬ নভেম্বর

প্রবন্ধ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে