Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯ , ৩ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৫-২০১১

যন্ত্র কিছুই ভোলে না

মীজান রহমান


যন্ত্র কিছুই ভোলে না
এক
 
স্যার আইজ্যাক নিউটনের এক ভবিষ্যদবাণীঃ আমাদের এই সুন্দর ভুবনখানি ধ্বংস হয়ে যাবে ২,০৬০ সালে। এ ধরনের ভবিষ্যদবাণী সাধারণত পীর পয়গম্বরদের এখতিয়ারে (যদিও দেশবিদেশের যাবতীয় ভণ্ডপীরেরাও ?ভবিষ্যদবাণী?র ব্যবসাতে বেশ দু?পয়সা কামাতে পেরেছেন যুগে যুগে, এবং অধুনা তার প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত), এবং আমরা জানি যে নিউটন কোনও ছদ্মবেশী পীরমুরশিদ ছিলেন না, ছিলেন এক বড়মাপের বিজ্ঞানী। এতই বড় মাপের যে এক হাজার বছরের দশজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর মধ্যে সম্ভবত তাঁর নামই সর্বপ্রথম উল্লেখ্য। অথচ তাঁর মুখ থেকে এমন আপাত অবৈজ্ঞানিক উক্তি শুধু আশ্চর্যজনক নয়, অবিশ্বাস্য, এমনকি মিথ্যা অপবাদ বলেও মনে হতে পারে। দুঃখের বিষয় এই যে এটি কারো উদ্দেশ্যপ্রনোদিত নিন্দা নয়, প্রমাণিত সত্য। এই সত্যটি উদ্ধৃত হয়েছে তাঁর স্বহস্তে লিখিত ১৭০৪ সালের এক পত্র থেকে যা সম্প্রতি ইজরায়েলের এক প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে। আইজ্যাক নিউটনের (১৬৪২-১৭২৭)ব্যক্তিগত জীবনের রহস্যময় কাহিনী অত্যন্ত যত্নসহকারে গোপন রাখা হয়েছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। ১৯৪৬ সালের এক আন্তর্জাতিক গণিত অধিবেশনে তাঁর প্রায় আড়াইশ? বছর ধরে সয-গোপন-করে-রাখা কাগজপত্র সব প্রকাশ করা হয়। তা থেকে এমন সব তথ্য বের হয়ে আসে যে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। এ কি করে সম্ভব? এত বড় বিজ্ঞানী, অথচ বাইবেল, ধর্মচর্চা, প্রাচীন ধর্মীয় ঝাড়ফুক জাদুমন্ত্র এসব নিয়েই কাটত তাঁর বেশির ভাগ সময়? বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী যে-কোন মানুষের পক্ষেই তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রশ্ন উঠবে মনে হবে না যে স্যার আইজ্যাক নিউটন, ব্রিটেনের বিজ্ঞানজগতের সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন রয়েল সোসাইটির প্রথম সভাপতি, যাঁকে ব্রিটেনের রাজাউজির থেকে সাধারণ মুটেমজুর পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ প্রায় দেবতার আসনে বসিয়ে রেখেছে তিনশ? বছর ধরে, সেই মহামানবটি কি করে গোপনে গোপনে বাইবেলের শ্লোক ঘাঁটাঘাঁটি করে মহাসৃষ্টির রহস্যাদিসহ তার অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সাঙ্কেতিক বাণী উদ্ধার করার চেষ্টায় অতিবাহিত করেছিলেন জীবনের দীর্ঘ ত্রিশটি বছর?
  মহাসৃষ্টির মহাপ্রয়াণ বিষয়ে ভবিষ্যদবাণী আরো অনেক হয়েছে। মায়াসভ্যতার আজটেক পঞ্জিকাতে সেই দিনটিকে ধার্য করা হয়েছে ২,০১২ সালের ১২ই ডিসেম্বর----১২/১২/১২ তে। ১,৮৮৮ সালের কথা বলেছিলেন নস্ট্রাডেমাস নামক এক মহাত্মা। সেসময় আধুনিক বিজ্ঞানের সবে ঊষাকাল। মহাজন মহাপুরুষগণ যা বলতেন তা?ই অধোবদনে গ্রহণ করে নিতেন সরলমতি মানবকূল। অনেকে জায়গাজমি বিক্রি করে পরিবারপরিজন নিয়ে বিবিধ পুণ্যাশ্রমে গিয়ে মহাপ্রভুর মহাক্রোধের অগ্নিবর্ষণের অপেক্ষায় কালাতিপাত করেছেন। নস্ট্রারডেমাসের নির্ধারিত দিনটিতে ম্যাসাচুসেট্স্ আইনসভার সদস্যবর্গ আকস্মিক সূর্যগ্রহণকে সেই আখেরাতের নিশ্চিত লক্ষণ ভেবে সভাভঙ্গ দিয়ে পরস্পরের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে নিজ নিজ গৃহে চলে যান। সম্প্রতি হ্যারল্ড ক্যাম্পিং নামক এক ধর্মপ্রচারক ঢাকঢোল বাজিয়ে ঘোষণা করলেন যে পৃথিবীর অন্তিম দিনটি হল ২১ শে মে, ২,০১১। তাঁর ভক্তজনেরা তো বিষয়সম্পত্তি সব ত্যাগ করে পাহাড়ের ওপরে তাঁবু গেড়ে থাকলেন শেষ ক?টা দিন। তারিখটা যে হুবহু মিলে যায়নি সেটা তো আমরা দেখতেই পারছি। গুরুজীর ভক্তরা পর্বতচূড়া হতে অবতরণ করবার পর তাঁদের জায়গাজমি ফিরে পেয়েছিলেন কিনা সেসংবাদ এখনও জানা যায়নি। তবে বিপদ এখনও কেটে যায়নি পুরোপুরি। মহামতি ক্যাম্পিং তাঁর বর্ণিত তারিখ অনুযায়ী পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়নি বলে যারপরনাই হতাশ হলেও একেবারে যে ভেঙ্গে পড়েছিলেন তা নয়। তাঁর মতে ধ্বংস হয়েছিল ঠিকই, তবে ইহজগতে নয়, পরজগতে যারা আগেই স্বর্গবাসী হয়েছিলেন, তাঁরা দেখেছেন সে ধ্বংস। এবং বাকি যারা রয়ে গেছেন তাদেরও অন্তিমমুহূর্তটি এসে যাবে অচিরেই---১৪ই অক্টোবর, ২,০১১! অর্থাৎ এই যে আমি টেবিলে বসে ওঁকে নিয়ে লিখছি, এই লেখাটি হয়ত শেষ করারও সময় পাবোনা----পাঠকদের কাছে সেজন্যে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
  কোন কোন দুর্মুখ মন্তব্যকার এমনও উক্তি করেছেন যে পৃথিবী ধ্বংসের ব্যাপারটি ভবিষ্যদবাণীওয়ালাদে সখের জিনিস---যুগে যুগে অসংখ্য ধ্বংসবাণী প্রচার করেছেন হ্যারল্ড ক্যাম্পিঙ্গের মত ধর্মপ্রচারকই বলুন আর ধর্মপ্রতারকই বলুন, তাঁরা। ইহজগত আর পরজগতের বিষয়াদি নিয়ে তাঁদেরই মাথাব্যথা সবচেয়ে বেশি।
  যাই হোক, অতীতের ভবিষ্যদবাণীগুলো ঠিক হয়নি বলে ভবিষ্যতের ভবিষ্যদবাণীগুলোও যে হবে না তার কোনও নিশ্চয়তা আছে কি? বিজ্ঞানমনস্ক হলে জোর দিয়ে হয়ত বলতে চাইবেন আপনি যে, না, নেই, এটা একেবারেই বিজ্ঞানবিরোধী কথাবার্তা, এটা হতেই পারেনা। আমারও তাই মনে হয় বইকি। উল্টোদিকে আরেকটা যুক্তি আছে যা একেবারে নাকচ করে দেয়া যায় না। ভবিষ্যতে কি ঘটবে বা ঘটবে না তার ওপর একেবারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলাটাও কি বিজ্ঞানবিরোধী নয়? অর্থাৎ ভাবিষ্যতের ভবিষ্যদবাণীগুলোও সব মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে আগেরগুলোর মত, তা?ও কি হলপ করে কেউ বলতে পারে?
  তবে ক্যাম্পিং সাহেবের সর্বশেষ বাণীটি নিয়ে আমি তেমন উদ্বিগ্ন নই---আমার মতে ৯০ বৎসর বয়স্ক এই ভদ্রলোকটি মানসিকভাবে গুরুতর অসুস্থ---নইলে পৃথিবীর ধ্বংস নিয়ে এভাবে উঠেপড়ে লেগে থাকতেন না। তবে আগামী বছরের ডিসেম্বর নিয়ে খানিক উদ্বেগের কারণ থাকলে থাকতেও পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের আয়ুটি ঐ পর্যন্ত টিকে থাকবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই বলে আপাতত আমি নিজেকে নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন আমার ছেলেদুটিকে নিয়ে। ভাবছি, ওদের জায়গাজমি বিক্রি করে মক্কাশরিফে গিয়ে আশ্রয়গ্রহণের পরামর্শ দেব কিনা। ভাবছেন ঠাট্টা করছি। হ্যাঁ, করছি, কিছুটা হলেও করছি। এগুলো ঠাট্টারই বিষয়। তবে আমার চিন্তা হল ২,০৬০ সালটিকে নিয়ে। ওটাকে কি একেবারে অগ্রাহ্য করা যায়? স্বয়ং গুরুদেবের হাতে লেখা দলিল থেকে সংগৃহীত। তিনি বড় বৈজ্ঞানিক সেজন্যে শুধু নয়, তাঁর ভবিষ্যদবাণীর ওপর গুরুত্ব দেবার আরেকটা কারণ আছে। এই বাইবেল ঘেঁটেই তিনি আরো একটা ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন যা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়ে গেছে---তিনি বলেছিলেন যে ১৯৪৮ সালে ইহুদী জাতি তাদের নিজস্ব দেশ অর্জন করবে। সেই প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনে---ঠিক সেবছরই তো ইজরায়েল প্রতিষ্ঠা হল। আড়াই শ? বছর আগেকার ভবিষ্যদবাণী এমন আশ্চর্যভাবে মিলে গেল কেমন করে? সুতরাং বুঝতেই পারছেন কেন একটু বিচলিত না হয়ে পারছিনা আমি।
 

                            দুই

  এবার দেখা যাক আধুনিক প্রযুক্তির কি অভিমত মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে। আধুনিক বিজ্ঞান বলছি না আমি, বলছি প্রযুক্তির কথা। আধুনিক বিজ্ঞান বিশ্বব্রম্মাণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামায় ঠিকই, তার মধ্যে মানবজাতির ব্যাপারটি তো অবধারিতভাবেই এসে যায়। কিন্তু পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে অমুক সালে বা অমুক তারিখে, এটা বিজ্ঞানের বিষয় নয়---প্রযুক্তির বিষয়ও নয়। তবুও প্রযুক্তির সঙ্গে আধুনিক মানুষের যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই ভবিষ্যৎ নিয়ে কতগুলো মৌলিক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সেগুলো নিয়ে আমাদের সবারই কিঞ্চিৎ চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে বলে আমি মনে করি।
  তথ্যগুলো আমি সংগ্রহ করেছি ?সাপ্তাহিক টাইম? পত্রিকার ২১শে ফেব্রুয়ারি (২০১১)সংখ্যার ?২০৪৫? শীর্ষক প্রচ্ছদ-প্রবন্ধটি থেকে। রেমণ্ড কার্জভেইল নামক এক অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন কম্পিউটার-বিজ্ঞানী এমন ভবিষ্যদবাণী করেছেন যে ২০৪৫ সালে জীবানুগবেষণাগারে মৃত্যু ব্যাপারটি মানবজগতের কোনও অবশ্যম্ভাবী ঘটনা নয়, নানাবিধ শক্ত ব্যাধির মত মৃত্যুও একপ্রকারের কঠিন রোগ, যা চিকিৎসাদ্বারা সারানো সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ মৃত্যু একটি রোগ, জীবনের অনিবার্য অন্তিমদশা নয়!
  সর্বনাশ! বলে কি লোকটা? আল্লার আরশ কেঁপে ওঠার কথা। পৃথিবীর যাবতীয় ধর্মগ্রন্থ, তাবত পীর-দরবেশ-নবী-সাধু-সন্ন্যাসীর জীবিকা নিয়ে টানাটানি! মৃত্যু না থাকলে বিশ্বব্যাপী যে প্রকাণ্ড এক বেকারসমস্যা সৃষ্টি হয়ে যাবে সেটা কি ভেবে দেখেছেন এই ভদ্রলোক?
  বড় কথাঃ মানুষ কি সত্যি সত্যি বাঁচতে চায় চিরকাল? মৃত্যু না থাকলে কি জী বন থাকতে পারে?
 অবিশ্বাস্য মেধাবী এই মানুষটির প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে। ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনে একটা জনপ্রিয় ?গেইম শো? ছিল যার নামঃ I?ve Got a Secret (আমার একটি গোপন জিনিস আছে)। শো?র হোস্ট বা উপস্থাপক ছিলেন স্টিভ এলেন। তাঁর প্রোগ্রামের অতিথি ছিল সেদিন এক স্কুলছাত্র। স্টুডিওতে একটি বড় গ্র্যাণ্ডপিয়ানো। ছেলেটি চুপচাপ পিয়ানোতে বসে চমৎকার একটি পাশ্চাত্য সঙ্গীত বাজিয়ে দর্শকমণ্ডলিকে মুগ্ধ করে ফেলল---একটি ১৭ বছরের সদ্য-মোছ-গজানো কিশোর কেমন করে বড় ওস্তাদের মত নিপুণ মুন্সিয়ানার সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারল ভেবে কূল পায় না তারা। এটা বিস্ময় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলঃ এখানে ?গোপন? জিনিসটি কি? নিয়ম অনুযায়ী ?শো?র প্যানেলে গুটিকয় অতিথি ?বিশেষজ্ঞ? ছিলেন যাদের দায়িত্ব ছিল সেই লুক্কায়িত ?গোপনটি?র রহস্য উদঘাটন করা। প্যানেলের সদস্যদের মধ্যে সঙ্গীতজগতের বেশ ক?জন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বও ছিলেন, তাদের কেউই সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হলেন না। প্রাক্তন বিশ্বসুন্দরীও ছিলেন একজন, তিনিও বোবা হয়ে থাকলেন। সঠিক উত্তরটি কেবল একজনই দিতে পারলেন, যিনি আদৌ সংগীতবিশারদ বলে খ্যাত ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নামকরা কৌতুকাভিনেতা। তিনি বললেনঃ এটা কোনও মানুষের রচিত কাজ নয়, যন্ত্র! সত্যি তাই, অনিন্দ্যসুন্দর সেই রচনাটির স্রষ্টা কোনও নামকরা কম্পোজার ছিলেন না, ছিল একটি কম্পিউটার, যার নির্মাণকল্পনা সেই ১৭ বছরের ছেলেটির মাথা থেকে উদ্ভূত। স্টুডিওসুদ্ধ লোক হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন ছেলেটির দিকে। সেই অসাধারণ কিশোরটিই ১৯৬৫ সালের ভবিষ্যদবাণীদায়ী ৬৩ বৎসর বয়স্ক প্রবীণ বিজ্ঞানী রেমণ্ড কার্জভেইল।
  ?৬৫ সালের খেলাঘরে সূচনা হয়েছিল যন্ত্রের সীমাহীন ক্ষমতার যে অবিশ্বাস্য দৃশ্য, প্রশ্ন হল, সেই খেলাতে কি মানবজগতের কোনও গভীরতর বাস্তবতার সংকেত নিহিত ছিল? পশ্চিমের ধ্রুপদী সঙ্গীতের সর্বোচ্চমা্নের স্রষ্টা হিসেবে আমরা জানি বাখ, মোৎসার্ট, বেথোফেন, মেণ্ডেলসন, ব্রাম্স্, শুবার্ট-শুমেন?দের নাম---সেখানে কি কম্পিউটারের নামও যোগ করতে হবে এখন? রাশিয়ার অমর শিল্পী চাইকোভস্কি আর রাখমানানভকে বাদ দিয়ে আমাদের কি ইন্টারনেট কাফেতে গিয়ে ?মহাশিল্পী? যন্ত্রসাহেবের আসরে বসতে হবে? ভবিষ্যতে কি তাহলে চাইল্ড প্রডিজিদের কানাকড়ি মূল্য থাকবে না? নাকি ?প্রডিজি? শব্দটিই অচল ধাতুর মত ইতিহাসের হলদে পাতার ধূসর স্মৃতিতে বিলীন হয়ে যাবে একদিন? এসব প্রশ্ন হয়ত বর্তমান যুগের প্রযুক্তি মদমত্ত দ্রুত ধাবমান শূন্যবিহারীদের কাছে একেবারেই অবান্তর মনে হবে, এবং হয়ত  তারা অবান্তর ও উন্মাদমনের উদ্ভট স্মৃতিকাতরতা ছাড়া কিছু নয়।
  তবুও মানবচিত্তে প্রশ্ন জাগে, কারণ সেখানেই তো ভীত সন্ত্রস্ত বস্তুটি এখনো ধুক ধুক করে ওঠানামা করে যাচ্ছে নিরবধি, যাকে সহজ ভাষায় বলা হয় হৃদয়, প্রাণ। সেটাও কি যন্ত্রের দেশে অবান্তর বলে ঘোষিত হতে পারে একদিন?
  প্রাণীজগতের মানচিত্রে মানুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে স্থাপন করতে পেরেছে প্রধানত একটি কারণেঃ তার বুদ্ধিশক্তি। বোধ, চিন্তা, কল্পনা, এগুলোতে আমাদের প্রাধান্য আছে বলেই অন্যান্য প্রাণীদের অনেকেই আকারে বৃহৎ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের বুদ্ধির কাছে সর্বদাই তাদের মাথা নোয়াতে হয়, অনেক সময় মাথা হারাতেও হয়। এই অসাধারণ যন্ত্রটি, অর্থাৎ মস্তিষ্ক, তার অভ্যন্তরে যে প্রকৃতির কি অভাবনীয় কারুকার্যের সমাবেশ, সে-বিস্ময় হয়ত মানুষ কোনদিনই পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারবে না। জৈবিক বুদ্ধির ক্রমবিবর্তন দ্বারাই তো সম্ভব হয়েছে আজকের এই বিস্ময়কর সৃষ্টির উদ্ভাবন---যার নাম কম্পিউটার। এই যন্ত্রটির গল্প কিন্তু খুব বেশিদিনের পুরনো নয়। প্রথমে একটা ক্ষুদ্র ভ্রূণের মত সূক্ষ্ণ আইডিয়া জন্মলাভ করে ফন নয়ম্যান সহ কতিপয় প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন গাণিতিকের চিন্তায়---সেটা ঘটে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অব্যবহিত পরবর্তী সময়কার অপেক্ষাকৃত শান্ত সুস্থ পরিবেশে, চল্লিশ দশকের শেষের দিকে। তারপর পঞ্চাশ দশকে পদার্থবিদদের হাত দিয়ে উঠে আসে সেমিকণ্ডাক্টার নামক আরেক মৌলিক পদার্থ, যা দ্রুতবেগে বিজ্ঞানের চাকা ঘুরিয়ে দিতে থাকে আধুনিক জগতের প্রযুক্তিমুখিনতার পথে। আস্তে আস্তে ছোটখাটো গণনাকর্ম, হিসেবনিকাশ, যোগবিয়োগ গুণভাগ, বীজগণিত পাটিগণিত, জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির বেশ কিছু জটিল প্রশ্নের সমাধান চোখের পলকে কষে ফেলবার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে যন্ত্র। সত্তর দশকের গোড়াতে আমি নিজেই দেখেছি প্রকাণ্ড ঘরের ভেতর দৈত্যাকার যন্ত্র বসানো হয়েছে সাধারণ অঙ্কটঙ্ক করার জন্যে, যা আজকে আমরা ছোট্ট একটা ল্যাপটপ নিয়ে আরাম করে বসে অনায়াসে করে ফেলতে পারি আগেকার চেয়ে একশ? ভাগ কম সময়ে। সেযুগে টাইপ করা হত শক্ত কাগজ ফুটো করে---আজকের পাঁচ বছরের ছেলেমেয়েরা যা করে ফেলতে পারে কিবোর্ডের ওপর তাদের ছোট্ট দুটি আঙ্গুল চালিয়ে। সত্তর দশকের পর হঠাৎ করেই যেন কম্পিউটারের গায়ে পাখা গজাতে শুরু করে---ধেইধেই করে বের হতে থাকে নতুন নতুন যন্ত্র, একটি আরেকটির চেয়ে দক্ষ, দ্রুত ও ক্ষুদ্রতর। আজকে বিশ্বব্যাপী মানুষ যে-জিনিসটিকে তাদের নিত্যব্যবহার্য বস্তু বলে গণ্য করে, যা ভাতকাপড় আর শ্বাসনিঃশ্বাসের মতই অপরিহার্য দৈনন্দিনতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, অর্থাৎ ইন্টারনেট, যার বাংলা নাম, আন্তর্জাল, তা কিন্তু বাণিজ্যিক হারে আত্মপ্রকাশ করেছিল ১৯৯৫ সালে---আজ থেকে মাত্র ষোল বছর আগে। এত অল্প সময়ে যোগাযোগ জগতের এমন বিশাল বিস্তার পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম। আজকে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি শিক্ষিত মানুষ রোজ অন্তত একবার WWW (World Wide Web)ব্যবহার করেন কাঙ্খিত তথ্য সংগ্রহের জন্যে। প্রযুক্তির এই দুর্মূল্য সম্পদটি যে কত দ্রুত চলে এসেছে মানুষের কাছে তার একটা আভাষ দেওয়া হয়েছে ?টাইমের? সেই নিবন্ধটিতে----সংক্ষিপ্ত একটি চিত্রলেখর মাধ্যমে। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে যে পুরাকালের কৃষিবিপ্লবের সময় থেকে শিল্পবিপ্লবের সময়তে পৌঁছুতে লেগেছিল প্রায় ৮,০০০ বছর। শিল্পবিপ্লব থেকে ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো আসতে লেগেছিল ১২০ বছর। সেখান থেকে চন্দ্রগ্রহে পৌঁছুতে লাগলো মাত্র ৯০ বছর। চন্দ্রগ্রহে পৌঁছানোর পরপরই যেন মানুষ হঠাৎ বিদ্যুতবেগে উর্ধগামী হয়ে গেল। ২২ বছরের ব্যবধানে এসে গেল www, এবং তার মাত্র ৯ বছরের মাঝেই জীবাণুবিজ্ঞাণীদের অণুবীক্ষণের ভেতর ধরা দিল মানবদেহের জেনোমরহস্য! এ যে কি বিস্ময়কর গতি, কত অবিশ্বাস্য অগ্রসরতা জ্ঞানবিজ্ঞানের, তা হয়ত সাধারণ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ-গতি যেমন বিস্ময় সৃষ্টি করে তেমনি করে ভীতির সঞ্চার। গতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে না উঠতেই শুনছি গতির গতিবৃদ্ধির সংবাদ---যাকে সাধারণ ভাষায় বলা হয় ত্বরণ। আজকে পৃথিবীর সর্বত্র প্রায় প্রতিটি যুবক-যুবতী, প্রতিটি কিশোর-কিশোরী, বালক-বালিকার হাতে একটি করে ক্ষুদে কম্পিউটার, যা না হলে তারা অস্থিরতায় ভোগে, দশবারো বছর আগেকার সময়টিকে তারা মান্ধাতার আমল বলে হাসিতামাশা করে----এর শেষ কোথায়? এই সীমাহীন গতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আজ থেকে ২৫ বছর পর বিশ্বের চেহারাটি কিরকম দেখাবে তা কি কেউ কল্পনা করতে পারছেন? তখনকার প্রজন্ম কি আজকের প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে ঠিক একইভাবে ?মান্ধাতার আমল? বলে হেসে উড়িয়ে দিতে চাইবে না?

         
                               তিন

  ?টাইম? ম্যাগাজিনের এই প্রবন্ধটি লিখেছেন লেভ গ্রসম্যান নামক এক বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিক। প্রচুর পড়াশুনা করতে হয়েছে লেখাটি দাঁড় করাতে, রেমণ্ড কার্জভেইল সহ আরো অনেক বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছে, তার স্বাক্ষর এর প্রতিটি অক্ষরে। পাঠক যাতে চমকে না ওঠেন (আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামান্য পরিচিতি থাকলে চমকে ওঠার কোন কারণও নেই)যে মানুষের মস্তিষ্কশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আমাদের যে গতানুগতিক অহংকার তা হয়ত বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না, প্রধানত এই যন্ত্রের কারণে। দেখা যাচ্ছে যে আমাদের মস্তিষ্কের ?জৈবিক বুদ্ধি? এযুগের একমাত্র বা উন্নতমানের ?বুদ্ধি? নয়, ?কৃত্রিম বুদ্ধি? (Artificial Intelligence), সংক্ষেপে AI, নামক এক অদ্ভুত জিনিস এর এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দীন্তে পরিণত হয়েছে। নামে ?কৃত্রিম? হলেও আসলে কিন্তু এর কোনকিছুতেই কৃত্রিমতার নামগন্ধ নেই---শুধু এই যে, এতে জৈবিকতার অভাব। এর মোদ্দা কথাটি হলঃ কম্পিউটারের ভেতরেই এমন সব যন্ত্রপাতি স্থাপন করা যায়, হার্ডওয়ের সফটওয়ের সহকারে, যে মানুষ যেভাবে তার সহজাত জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে একটা সমস্যার সমাধান বের করে ফেলতে পারে, ঠিক একইভাবে একটা কম্পিউটারও পারে সেই সমাধানটি খুঁজে পেতে, এবং আমাদের চাইতে অনেক, অনেক কম সময়ে। শুনতে অনেকটা রবোটের মত মনে হয় বটে, কিন্তু আসলে রবোটের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। রবোট হল অনেকটা শ্রমিকের মত---মানুষ যা হাত দিয়ে করতে পারে রবোট সেটা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে, এবং অধিকতর দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু AI সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস---এ কোনও খেটে-খাওয়া মুটেমজুর নয়, রীতিমত ?বুদ্ধিজীবি?, চিন্তাভাবনা করে, বুদ্ধি খাটিয়ে একটা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারে। এবং আতঙ্কের বিষয় এই যে মানুষের মস্তিষ্কের চেয়ে ঢের বেশি নৈপুণ্যের সাথে। সাধারণ মানুষের কাছে এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। ধর্মবিশ্বাসীদের মাথায়ই ঢুকবে না হয়ত, এ কি করে সম্ভব। পবিত্র কোরাণশরিফ সহ পৃথিবীর যাবতীয় ধর্মগ্রন্থের কোথাও তো লেখা নেই যে যন্ত্র মানুষের মত ভাবতে পারবে, এমনকি একদিন মানুষকে ছাড়িয়েও যেতে পারবে। (যদিও আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমাদের জ্ঞানীগুণী মোল্লামৌলবিরা কোরাণের কোটি কোটি অক্ষর তন্ন তন্ন করে তল্লাশ করে অচিরেই বের করে ফেলবেন যে প্রকৃতপক্ষে সেটা পবিত্র কোরাণেরই অমুক পাতার অমুক আয়াতে স্পষ্টভাবেই বর্ণিত আছে।)
  মানুষের মস্তিষ্কের সমকক্ষতা এখনও পুরোপুরি আয়ত্তে না আনতে পারলেও কম্পিউটার যে মানুষের মননের অনেক কথাই বুঝতে পারে তার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত এখনই আমাদের সামনে উপস্থিত। বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্তিফেন হকিং শারীরিকভাবে এমনই পঙ্গু যে নিজের পায়ের ওপর চলাফেরা করা দূরে থাক, ছোট একটা চেয়ারের ওপর চিরবন্দী হয়ে বসবাস করছেন দীর্ঘকাল যাবৎ। তিনি কথা বলতে পারেন না, লিখতে পারেন না, বাসন থেকে কাঁটা দিয়ে খাবার তুলতে পারেন না মুখে---অর্থাৎ সাধারণ জীবনযাপনের জন্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোন কাজই তাঁর দ্বারা সম্ভব হয় না। অথচ তিনি নিয়মিতভাবে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন আধুনিক বিজ্ঞানের জটিলতম বিষয়াদি নিয়ে, বই লিখছেন একের পর এক, দেশবিদেশের সাময়িক চালচিত্রের ওপর রসালো মন্তব্য করছেন সংবাদ মাধ্যমে। সেগুলো তিনি কিভাবে করতে পারছেন? সবই যন্ত্রের সাহায্যে---তাঁর শরীরের সঙ্গে কম্পিউটার অঙ্গাঙ্গিভাবে সংযুক্ত। একহিসেবে কম্পিউটারই তাঁকে জীবিত রেখেছে।
 আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমেরিকার এক স্নায়ুবিজ্ঞানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা গবেষণা নিয়ে কাজ করছিলেন বহুদিন থেকে। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল এমন এক কম্পিউটার আবিষ্কার করার চেষ্টা যাতে করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রুগীরা নিজেদের অঙ্গসঞ্চালন ছাড়াই সেই যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের মনের ইচ্ছাকে কার্যে পরিণত করতে পারবে---যেমন ধরুণ চায়ের কাপটা মুখে তুলে দেওয়া, চিঠির খামে ঠিকানা লেখা, ইত্যাদি, যা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ নিজের হাতেই করতে পারে অনায়াসে। ভাগ্যের এমনই বিড়ম্বনা যে গবেষণার কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে ঠিক সেসময় ভদ্রলোক নিজেই গুরুতর স্ট্রোকের শিকার হয়ে পড়লেন। প্রাণে বেঁচে গেলেন বটে, কিন্তু শরীরের আর সবই গেল---মাথা থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত। শুধু চোখের মনিদুটো নড়াতে পারতেন, আর দুটি একটি মাংসপেশী এখানে ওখানে। হাত বা পায়ের কাজ সাধারণত রবোট দ্বারাই করা যায়, এবং তাতে মোটামুটি কাজ চলে যায়, কিন্তু রবোট মানুষের মনের গোপন ইচ্ছাকে ব্যবহারিক রূপ দিতে পারেনা। যেমন ধরুণ ক্ষিধে পেয়েছে---সেটা কাউকে বলতে হবে তো? সেকাজটি কম্পিউটার করতে পারবে, এই ছিল তাঁর গবেষণার মূল জিনিস। ?ইচ্ছা?টিকে কর্মে রূপ দেওয়া। কম্পিউটার আপনার মনের ভেতর ঢুকতে পারবে। এমনকি ধরুণ একটা কবিতার লাইন আপনার মনের ভেতর ঘুর ঘুর করছে---আপনার কম্পিউটার বন্ধু তখন রবোটকে কাজে লাগিয়ে দেবে ওটা লিখে রাখতে।
  ভদ্রলোকের চলন ও বলনশক্তি পুরোপুরি লোপ পাওয়ার পর তাঁর সহযোগী ও সহকর্মীরা উঠেপড়ে লেগে গেলেন কত দ্রুত তাঁদের লক্ষস্থলে পৌঁছুতে পারেন যাতে করে তার প্রথম সুফল ভোগ করতে পারেন এই গবেষণার মূল উদ্যোক্তা স্বয়ং। যেহেতু স্ট্রোকের আগেই অনেকদূর এগিয়ে এসেছিল তাঁদের গবেষণার কাজ, তাই, সৌভাগ্যবশতঃ অল্পদিনের মাঝেই তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করতে পারলেন, এবং সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত বিজ্ঞানীর উপস্থিতিতেই। সে এক নাটকীয় মুহূর্ত বটে। আমি সেই অসাধারণ দৃশ্য দেখলাম CBS এর 60 Minutes প্রোগ্রামটিতে---ভদ্রলোক মনে মনে কি বলছেন, সেটা আমরা যারা দর্শক তারা শু্নতে পারছি না, দেখতে পারছি না, কিন্তু কম্পিউটার-চালিত রবোট ঠিকই বুঝতে পেরেছে তিনি কি চাচ্ছেন, এবং সে অনুযায়ী ইচ্ছা পূরণ করে যাচ্ছে।
  অর্থাৎ আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি গন্তব্যে।

                           
                            

                           চার

  কথা হলঃ প্রযুক্তিবিদরা কোথায় নিয়ে যেতে চাইছেন আমাদের, এখন, এবং অদূর ভবিষ্যতে। প্রশ্নটি অন্যভাবেও দাঁড় করানো যায়, এবং হয়ত দাঁড় করানো উচিতওঃ কম্পিউটার মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। কম্পিউটারের সাহায্যে আমরা অনেক অসাধ্যই সাধন করতে পারছি, এবং সেটা যে আমাদের আধুনিক সভ্যতাকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে তাতেও বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু এই এগুনোটা কতদিন চলবে, এবং এর শেষ কোথায়, এসব প্রশ্ন নবীন-প্রবীন সবাইকেই সমভাবে মোকাবেলা করা দরকার বলে আমি মনে করি। আমি ধরে নিচ্ছি যে কম্পিউটার অদূর ভবিষ্যতে আমাদের গাড়ি চালাতে পারবে (যেমন করে ?৭০ দশকের ?নাইট রাইডার? প্রোগ্রামের চমকদার গাড়িটি আপনা-আপনিই দ্রুতবেগে চলে যেতে পারত যেখানে খুশি সেখানে, এমনকি গাড়ির মালিকের সঙ্গে রসালাপে লিপ্ত হতেও পারত মেজাজ মর্জি ভাল থাকলে), যাত্রীবাহী প্লেন ওঠানামা করতে পারবে, নৌকা বাইতে পারবে, ছবি আঁকতে পারবে। কিন্তু বড় প্রশ্নটা হলঃ কম্পিউটার কি আবেগ বলে কোন জিনিস অর্জন করতে পারবে কখনও? কিম্বা বিবেক? ভাল-মন্দ বিচারবুদ্ধি? বিপদের মুখে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে চট করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে? পারবে কি দুঃখি মানুষের কষ্ট দেখে আবেগে আপ্লুত হতে? মানুষ যেমন ভুল করে অনুতপ্ত হতে পারে, ক্ষমা চাইতে পারে, কম্পিউটার কি তেমন করে অনুতপ্ত হতে পারবে?
   এসব প্রশ্ন হয়ত পঁচিশ বছর আগেও অভাবনীয় ছিল, এমনকি হাস্যকরও। কিন্তু ২০১১ সালে সেসব প্রশ্ন আর মোটেও অবান্তর বাতুলতা নয়, অত্যন্ত সঙ্গত ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। এযুগের প্রায় প্রতিটি দেশই, যান্ত্রিকভাবে, প্রযৌক্তিকভাবে, অবিশ্বাস্যরকম অগ্রসরতা লাভ করেছে। এতটাই দ্রুত এই অগ্রপথের গতি যে বিশেষজ্ঞদের মতে এটা গণিতশাস্ত্রের ?এক্সপোনেনশিয়েল? মাত্রার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। তার অর্থ গতির ওপর ত্বরণ, ত্বরণের ওপর আরো ত্বরণ, এভাবে তার মাত্রা কেবল বাড়তেই থাকবে অনির্দিষ্ট কাল। ?টাইম? পত্রিকার সেই নিবন্ধটিতে এই উর্ধগতির একটা ধারণা দেওয়া হয়েছে উর্ধমুখি একটা রেখার ছবি দিয়ে। এই ছবিটার ওপর একটু চোখ বুলোলেই আতঙ্কে শিউরে উঠবে যে-কোন শিক্ষিত মানুষ। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে ২০১৫ সালে কম্পিউটারের বুদ্ধিশক্তি একটা ইঁদুরের বুদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে। ভাবছেন ইঁদুরের আবার বুদ্ধি কিসের! প্রাণীবিজ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করুণ। ল্যাবরেটরিতে তাঁরা বরাবরই ইঁদুর ব্যবহার করছেন যাবতীয় গবেষণাদির জন্যে----নেহাৎ অকারণে নয়। আত্মরক্ষার জন্যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়াতেও ?বুদ্ধি? লাগে, সেই ক্ষমতাটুকু মানুষের যেমন আছে, মুষিকেরও আছে। কম্পিউটারেরও থাকবে ২,০১৫ সালে, এই কথাটিই বোঝাতে চাচ্ছেন আমাদের প্রযুক্তিবিশারদরা। আর ক?টা বছর অপেক্ষা করলে কি অবস্থা দাঁড়াবে অনুমান করতে পারছেন? তাঁরা বলছেন যে ২,০২৩ খৃষ্টাব্দে চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে প্রতিযোগিতা করতে শুরু করবে কম্পিউটার। এবং শেষ মারটা মারবে ২,০৪৫ সালের কাছাকাছি সময়। অর্থাৎ ওই সালে সর্বদিক থেকেই কম্পিউটার আমাদের মস্তিষ্কশক্তিকে ছাড়িয়ে অনেকদূর এগিয়ে যাবে। তখন একটা হাস্যকর ও কিঞ্চিৎ বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যাবে ইহধামের ?সর্বশ্রেষ্ঠ? বলে খ্যাত মানবজাতির জন্যে---তার এই শ্রেষ্ঠত্বের আসনটি ছেড়ে দিতে হবে তার নিজেরই হাতে-তৈরি এক অদ্ভুত ?জীব?এর কাছে যার নাম আমাদেরই প্রদত্ত---কম্পিউটার!
  ২,০৪৫ সালের এই চরম বিড়ম্বনাটি কল্পনা করুণ একবার। একদিকে আমরা চিরঞ্জীব, অন্যদিকে আমরা বর্তমানের জীবজগতের অন্যান্য প্রজাতির মতই একটি হীনতর অবস্থাতে নিপতিত হব---এবং সবার ওপরে দণ্ডায়মান থাকবে তখনকার সর্বশ্রেষ্ঠ ?জীব?----কম্পিউটার! আমরা বাঁচব অনন্তকাল, কিন্তু ইহজগতের ওপর আমাদের চিরাচরিত আধিপত্যটি সঁপে দিতে হবে কম্পিউটার নামক এক মহাশক্তির পাদমূলে। ১৯৯৩ সালে NASA র এক অধিবেশনে Vernor Vinge নামক এক ?কৃত্রিম বুদ্ধি? বিশারদ ঘোষণা দিয়েছিলেনঃ ?Within 30 years we will have the technical means to create super intelligence. Shortly after, the human era will be ended.? (?আগামী ৩০ বছরের মাঝে আমাদের হাতে যান্ত্রিক ক্ষমতা এসে যাবে সর্বোচ্চ মানের ?কৃত্রিম বুদ্ধি? তৈরি করার। এবং তার স্বল্পকালের মধ্যেই সাঙ্গ হয়ে যাবে মনুষ্যযুগ?।)  

                            পাঁচ

  গণিতের একটা গুরুত্বপূর্ণ শাখা আছে যার নাম Complex Analysis. Complex শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ?জটিল?, যার মানে হতে পারে একটি জটিল বিষয়, জটিল মানুষ, জটিল মানসিক অবস্থা, ইত্যাদি। কিন্তু ?গণিতে?র জটিল সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস---সহজ ভাষায়, উদাহরণ স্বরূপ একটা দ্বিমাত্রিক সমতল ক্ষেত্রের কথা কল্পনা করুণ যার একটি মাত্রা বাস্তব সংখ্যাবিশিষ্ট, কিন্তু দ্বিতীয়টি ?কাল্পনিক?--- ইংরেজিতে যাকে বলে Imaginary. ?কাল্পনিক? সংখ্যা যে বাস্তব জীবনে কত উপকারি হতে পারে তার প্রমাণ পেতে হলে যে-কোন পেশাদার প্রকৌশলীকে জিজ্ঞেস করুণ। তাঁদের কাজে ?কাল্পনিক? সংখ্যা ছাড়া একপা এগুবার উপায় নেই। ?কাল্পনিক? সংখ্যার ব্যবহার আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বত্র। মূলত এর প্রয়োজনীয়তার উৎস হল এই যে, এ যেন বাস্তব জগতকে একটা ভিন্ন মাত্রাতে বিস্তৃত করে দেয় যাতে করে সেই বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে ?বাস্তব?কে আরো সূক্ষভাবে বীক্ষণ করা যায়, দেখতে পাওয়া যায় তার বহুবিচিত্র প্রকৃতি।
  আমাদের আজকের প্রসঙ্গে ?কাল্পনিক? সংখ্যার সরাসরি ভূমিকা নেই কোনও, তবে এতে একটা জরুরি বিষয় আছে, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় singularity, যা AI তে  অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ অর্থে singularity হল এমন এক জায়গা যেখানে ইহজগতের প্রচলিত নিয়মকানুন একেবারেই অকেজো, যেখানে অন্যরকম চিন্তাভাবনা নিয়ে আসতে হয় তার স্বরূপ বোঝার জন্যে। একটা মানসিক চিত্র দিয়ে তার কিছুটা ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। ধরুণ একটা সমতল ভূমি----এমনিতে সব ঠিক আছে, কোনও খানাখন্দ নেই কোথাও, দিব্যি শিস দিয়ে দিয়ে আপনি প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ করে যেতে পারবেন। এমন সময় হঠাৎ করে আপনার পা ফেঁসে গেল এক চোরা গর্তের ভেতর----এমনভাবে ফেঁসে গেল যে সেখান থেকে পা ছাড়ানো প্রায় দুঃসাধ্য, বিশেষরকম চন্ত্রপাতি দরকার হবে তার জন্যে। singularity অনেকটা সেরকম। সেখানে আপনাকে দাঁড়াতে হবে, ভাবতে হবে কি করে উদ্ধার পাওয়া যায় সেই গভীর খন্দ থেকে। এর বাংলা প্রতিশব্দ আছে কিনা আমার জানা নেই। অভিধান খুঁজে কিছুই পেলাম না। আপাতত আমি এর নাম দিলাম ?বিবর?---কৃষ্ণবিবরের সঙ্গে যা খাপ খেয়ে যায়, কারণ পদার্থবিজ্ঞানের ?ব্ল্যাকহোল?, যা নিয়ে পণ্ডিতরা অনেক লেখালেখি করেছেন, তার বাংলা তরজমা হয়েছে ?কৃষ্ণবিবর?, সেটাও একপ্রকার singularity. কিন্তু সিঙ্গুলারিটির আইডিয়া গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানে যতটা স্বাভাবিক, আধুনিক প্রযুক্তিজগতে সেটা কেমন করে এত প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ল ভাবতে কেমন ধাঁধার মত মনে হয়। এ তো একটা যন্ত্র---মানুষেরই তৈরি জড় যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়। অথচ এ কেমন করে এমন শক্তিশালী হয়ে গেল? এবং এত অল্প সময়ের মধ্যে? কার্জভেইল আর অন্যান্য প্রযুক্তিবিজ্ঞানীরা যা বলছেন তাতে তো মনে হয়, কম্পিউটার অচিরেই এমন এক স্বয়ংক্রিয় দানবে পরিণত হবে যে মানুষের ওপর কোন নির্ভরতাই থাকবে না তার। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অধিকতর শক্তিশালী কম্পিউটারগুলো তৈরি করবে কম্পিউটার নিজেই! সেটা যে আদৌ সম্ভব তা?ই তো আমাদের মাথায় ঢোকে না। এ তো দেখছি ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের চাইতেও ভয়াবহ।  
   প্রযুক্তির  সিঙ্গুলারিটি  বলতে  বোঝায়  এমন এক  মুহূর্ত  যেখানে  কম্পিউটারের  বুদ্ধি   মানুষের  বুদ্ধিকে  ছাড়িয়ে  যাবে---যার  অর্থ দাঁড়াবে এই যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রজাতি বলে আমাদের চিরাচরিত দাবি আর টিকবে না। শ্রেষ্ঠ জাতির সম্মানটি তখন সমর্পণ করে দিতে হবে আমাদেরই সৃষ্ট এক যন্ত্রের কাছে! বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়? হয়না। কিন্তু ঠিক এই কথাটাই অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে ঘোষণা করে যাচ্ছেন বর্তমান যুগের সিঙ্গুলারিটিবাদীরা।
 বিবরবাদ বিষয়টি আমাদের অনভ্যস্ত কানে খুব নতুন শোনালেও ?কৃত্রিম বুদ্ধি? কিন্তু একেবারে অভিনব কিছু নয়। ১৯৬৫ সালে, অর্থাৎ কম্পিউটারের যখন শৈশবকাল, তখনই আই যে গুড নামক এক ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ ?বুদ্ধির বিস্ফোরণ? নাম দিয়ে একটা দূরদর্শী প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন, যার সারমর্ম ছিল এরকমঃ
 ? ধরে নেওয়া যাক ?অতিচতুর? যন্ত্র বলে আমরা বুঝি এমন এক যন্ত্র যা একটি প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে, যত আকাশচুম্বী প্রতিভাই হোক তার, তাকে অনায়াসে হার মানিয়ে দিতে পারবে যে-কোন বুদ্ধির পরীক্ষাতে। এবং যেহেতু উচ্চমানের বুদ্ধি বলতে এমন বুদ্ধি বোঝায় যা প্রয়োগ করে সে নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারবে, সেহেতু অতিচতুর যন্ত্রের ক্ষমতা থাকবে অধিকতর ধীশক্তিসম্পন্ন যন্ত্র তৈরি করার। অর্থাৎ শেষমেষ বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি হয়ে যাবে একরকম বুদ্ধিবিস্ফোরণ। তখন আমাদের নিরীহ মনুষ্যজাতি পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে সেই যন্ত্রদানবের বিজয়গৌরবের শোভাযাত্রার পথে। আমাদের শেষ পরিণতি হবে ইতিহাসের এক রূঢ় বিড়ম্বনা---মানুষের আপন বুদ্ধি দিয়ে গড়া বস্তুটিই তার বুদ্ধিকে পদদলিত করে বীরদর্পে এগিয়ে চলবে নিরুদ্দেশের পথে?।
  কি আশ্চর্য অব্যর্থ সেই ভবিষ্যদবাণী। যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে মাত্র ৪৫ বছরের ব্যবধানে। গুডের বর্ণিত ভবিষ্যৎ এখনি কড়া নাড়তে শুরু করেছে আমাদের দুয়ারে।
  ?বিবর?বাদীদের সংখ্যা হয়ত খুব বেশি নয়, সারা পৃথিবী জুড়ে হাজারখানেকও হয়ত হবে না, কিন্তু প্রযুক্তিবিজ্ঞানে তারা শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, তাঁদের মেধা একেবারে গগনবিদারী, তাঁদের অধিকাংশই সমাজের গতানুগতিক নিয়মকানুনের বাইরে, তাঁদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সাধারণ মানুষদের কোনও মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। এবং তাঁরা খুব সংঘবদ্ধ ও একনিষ্ঠ। বছর তিনেক আগে ?গুগ্ল্?, ?নাসা? এবং আরো গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও নৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ?Singularity University? নামক এক ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষাগার গঠন করা হয় যার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই বিএ এমএ পাস করা ছাত্রছাত্রী এবং কোম্পানির হোমরাচোমরা কর্মকর্তারা। এ এক অদ্ভুতধরণের নিয়মবহির্ভূত বিশ্ববিদ্যালয় তাতে সন্দেহ নেই, এবং হয়ত সেকারণেই সেখানে জমা হয় অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কৌতূহলী শিক্ষার্থীরা। এ যেন অনেকটা Science Fiction এর অলীক রাজ্যের কাল্পনিক হার্ভার্ড বা কেম্ব্রিজে গিয়ে পড়াশুনা করার মত। বলা বাহুল্য এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে যে-লোকটি মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি সেই ?৬৫ সালের অকালপক্ক কিশোর রেমণ্ড কার্জভেইল। তাঁর সম্বন্ধে মাইক্রোসফটের বিল গেইটস এক ভাষণে  বলেছেনঃ ?বর্তমান যুগে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য মন্তব্য করাতে কার্জভেইলের সমকক্ষ কেউ আছে বলে আমার জানা নেই?। লোকটির এতই খ্যাতি প্রযুক্তিজগতে যে ১,৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন তাঁকে আমেরিকার প্রযুক্তি-এওয়ার্ড দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন।
     প্রযুক্তিবিজ্ঞানের বাণিজ্যিক দিকটার সঙ্গে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হলেও এর জটিল আভ্যন্তরীণ বিষয়াদির বেশির ভাগই তাদের বোধগম্যতার বাইরে চলে গেছে। তার সঙ্গে এখন যোগ দিয়েছে আরো দুটো জিনিস---জেনোমভিত্তিক আধুনিক জীববিজ্ঞান, এবং ন্যানোটেকনলজি নামক আরেক বিস্ময়কর বস্তু, যার সারকথা হল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা সহজ নয় এমন সব যন্ত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগ। এ-তিনটিতে মিলে মানবসভ্যতার এক অবিশ্বাস্য মূর্তি সৃষ্টি করে দিয়েছে। জীববিজ্ঞানীরা আজকে ল্যাবরেটারিতে মানবশিশু সৃষ্টি করার স্বপ্ন দেখছেন, এবং সে-স্বপ্ন সিদ্ধ করার পথে অনেকটা এগিয়েও গিয়েছেন বলে শোনা যায়। এমন দিন হয়ত খুব দূরে নয় যে মেয়েদের আর প্রসবকষ্ট সইতে হবে না দীর্ঘ ন?মাস, ইন্টারনেট দেখে পছন্দমত বাচ্চা অর্ডার দিলেই বাচ্চা পাওয়া যাবে।
  মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় মৃত্যুকে---তাই না এত সাধ্যসাধনা, এত আকুতি-মিনতি প্রভুর কাছে, যাতে আরো ক?টা বছর বেঁচে থাকতে পারি, আরো ক?টা বছর এ সুন্দর ভুবনের আলোবাতাস জলস্থল বৃক্ষলতার বিচিত্রমেলার রূপরস উপভোগ করে যেতে পারি স্ত্রীপুত্রকন্যা পৌত্র-প্রপুত্রসমভিব্যাহারে, তার জন্যে কতনা যোগাড়যন্ত্র, কতনা পীরবমুর্শিদ, আশ্রমদরগাতে মানত করতে যাওয়া। নতুন যুগের বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির কুশীলবেরা এসে মানুষকে সে দায় থেকে মুক্তিদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অর্থাৎ মানবজীবনের যাবতীয় বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ধর্ম-অধর্ম, সংস্কার-কুসংস্কার, সবকিছুর মূলে কুঠারাঘাত করে এক নতুন ধরণের সংস্কৃতি তৈরি করে দিচ্ছে প্রযুক্তি, যেখানে মন্দির আর মসজিদের বদলে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেট ক্যাফে; দীনিয়াত আর ধারাপাতের পরিবর্তে আসছে সফটওয়ের আর ফেইসবুক, ইউটিউব আর টেক্সটিং, ডিজিটাল আর আইপড।
  মৃত্যুঞ্জয়ী হবার কামনা নানাজনকে নানাভাবে তাড়িত করেছে নানাযুগে। বিখ্যাত কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্স্ সেই ব্যাকুল কামনাকে প্রকাশ করেছিলেন ?Sailing to Byzantium? শীর্ষক এক অসম্ভব সুন্দর কবিতাতে, যা প্রথম মুদ্রাক্ষরে প্রকাশ পেয়েছিল ১৯২৮ সালে, তাঁর প্রসিদ্ধ কাব্যসংকলন ?Tower? গ্রন্থটিতে। কবিতাটির মূল বিষয়তে ছিল কবির অন্তহীন দুঃখ যে মানুষের নশ্বর দেহের অভ্যন্তরে বাস করতে হয় তার অবিনশ্বর আত্মাকে। এমন যদি হতে পারত কখনো যে আমাদের আত্মাটি সংযুক্ত হয়ে গেল এক অনুরূপ কোনও অবিনশ্বর আধারেতে, কতনা অন্তহীন অমরত্বের অধিকারী হতে পারতাম আমরা। কথা হলঃ সেই অবিনশ্বর আধার হয়েই এসে গেছে আধুনিক প্রযুক্তির অত্যাশ্চর্য যন্ত্রসমূহ। কার্জভেইল মনে করেন যে মানুষ তার মনকে এক পাত্র থেকে স্থানান্তরিত করে ভিন্ন পাত্রে স্থাপন করার ক্ষমতা অর্জন করবে, যেখানে সে অমর হয়ে থাকবে অনন্তকাল।

                                                     পাঁচ
  কিন্তু  তারপর?  তারপর  কোথায় যাব আমরা? আমাদের সামনে এক অদ্ভুত সংকট উপস্থিত হয়েছে।
 একদিকে আমাদের সর্বকালের সর্বগ্রাসী ভীতি, মৃত্যু, তার কবল থেকে মুক্তির আশ্বাস নিয়ে আসছেন
 প্রযুক্তির বিশাল বিশাল তারকারা, আরেকদিকে তাঁদের মুখেই ধ্বনিত হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত
অবমূল্যায়নের সংবাদ। আরো একটি দিকে ভয়াল মূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিজ্ঞানের আদিগুরু স্যার
 আইজ্যাক নিউটন তাঁর ধ্বংসবাণীর হুঙ্কার সহকারে। ক্ষুদ্র মানব এবার কোথায় যাবে আশ্রয়ের জন্যে?
এই যে এত এত যন্ত্রের সমাহার আমাদের হাতে, এত এত জ্ঞান ধারণ করে রাখতে পেরেছি গুগল আর
আইপডের ছোট্ট আধারের ভেতর, এত তীক্ষ্ণ আর অব্যর্থ সব দিকদর্শন প্রণালী, তবুও কেন এমন দিশাহারা
 হয়ে আমরা ছুটতে শুরু করেছি চতুর্দিকে?
   মানুষের জীবন পঞ্চাশ বছর আগে কি ছিল আর এখন কি হয়েছে তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তো
আমি নিজেই। ?৪০ এর দশকে আমি স্কুলের ছাত্র। তখন আমরা শ্লেটের ওপর চক দিয়ে অংক কষতাম, দোয়াতের কালিতে পাখির-পালক-দিয়ে-তৈরি কলমের নিব ভিজিয়ে লেখাজোকা করতাম। ফাউন্টেন পেন তখন আমাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, বলপয়েন্ট কলম তখনও আবিষ্কারই হয়নি। সন্ধ্যার পর আমরা কেরোসিনের তেলে হারিকেন জ্বালিয়ে লেখাপড়া করেছি। আমার ছেলেরা স্কুলে পড়াকালে, অর্থাৎ মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে রেমিঙ্গটন টাইপরাইটারে হোমওয়ার্ক করত, কম্পিউটার বাজারে বেরুয়নি বলে ক্যালকুলেটার দিয়ে বড় বড় অঙ্ক কষত। বাড়িতে বাবামায়ের কাছে কোনও জরুরি খবর পাঠানোর প্রয়োজন হলে কারো বাড়ির দরজায় টোকা দিয়ে টেলিফোন ব্যবহারের অনুমতি চাইতে হত, নয়ত পকেটে খুচরা পয়সা থাকলে রাস্তার ফোনবুথে গিয়ে ডায়েল করতে হত। তথাপি জীবনের একটা মসৃণ গতি ছিল বইকি, বড় বড় আবিষ্কার তখনও করে যাচ্ছিলেন বড় বড় মনীষীরা, বড় বড় আইডিয়াতে ধন্য হচ্ছিল, সিঞ্চিত হচ্ছিল বিশ্বজগত। ক?বছর আগের কথা সেটা? কুড়ি? তার বেশি হবে কি? সেলফোন নামক মহান যন্ত্রটি তখনো বাজারজাত হয়নি। অথচ দেখুন আজকের নতুন প্রজন্মটির কাছে ওই যুগটাই ?মান্ধাতার আমল?এ পরিণত হয়ে গেছে। ?যোগাযোগ? শব্দটি তাদের অভিধানে অন্যরকম তাৎপর্য লাভ করেছে। যোগাযোগ বলতে আমরা তৎকালে বুঝতাম মানুষে-মানুষে যোগাযোগ---সেতুবন্ধন, বাহুবন্ধন, হৃদবন্ধন। আজকের ছেলেমেয়েরা ?যোগাযোগ?এর যন্ত্র ব্যবহার করে পছন্দমত যোগাযোগ রক্ষা বা ছিন্ন করার জন্যে। এখনে ?সেতু?, ?বাহু? আর ?হৃদয়?এর মত বস্তাপঁচা আহ্লাদী শব্দের কোনও স্থান নেই। এসবের কোনও সময়ই তাদের নেই। তারা মহাব্যস্ত পরস্পরের কাছে ?টেক্সট? মেসেজ পাঠাতে, ডিজিটালের ভিডিও পাঠাতে, রাস্তায় সদ্য-ঘটে-যাওয়া কোনও ?কুল? দৃশ্যের বর্ণনা পাঠাতে।
  আগেকার দিনে, অর্থাৎ সেই আদ্যিকালের রদ্দিযুগে, বাজারে কোনও নতুন জিনিস এসেছে বলতে সাধারণত বোঝাত নতুন একটা মুভি---হলিউড, বোম্বে, কোলকাতার, বা নতুন উপন্যাস বড় কোনও লেখকের। আমরা বাংলাবাজারের মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম ?দেশ? আর বুদ্ধদেব বসুর ?কবিতা? পত্রিকার জন্যে। লাইব্রেরিতে গিয়ে ভিড় করতাম ?স্টেটসম্যান?, ?যুগান্তর?, আর ?আনন্দবাজার? পত্রিকার জন্যে। আর আজ? আজকাল যারা কাগজের পত্রিকা পড়ে, যেমন আমার মত থুত্থুরে বুড়োরা, তারা হল প্রস্তরযুগের মানুষ। আজকাল ওরা  খবর পড়েনা, খবর দেখে, ইচ্ছে হলে, পছন্দমত খবর। দেশবিদেশের খবরে খুব একটা আগ্রহ নেই আধুনিক যুগের মানুষদের, তারা ?আধুনিক? বিষয়াদি নিয়েই অত্যন্ত আধুনিকভাবে ব্যস্ত। আজকালকার স্কুলকলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাদের ইন্দ্রিয়সমূহের প্রায় সবগুলোরই সমান ব্যবহার করে, অনেক সময় যুগপৎ। এটাকে বলা ?মাল্টিটাস্কিং?। আজকের প্রজন্ম মধ্যরাতে দোকানের সামনে তাঁবু গেড়ে বসে থাকে সকাল সাতটায় ?আইপড?এর নতুন সংস্করণ বের হবে তার অপেক্ষায়। আগেকার দিনে কোনও যন্ত্রের ?নতুন সংস্করণ? নামক কিছু ছিল না, থাকলেও দশবারো বছর পরপর হয়ত বেরুত, কারণ জিনিসপত্র তৈরি করার সময়ই ব্যবসায়ীরা টেকসই জিনিস তৈরি করার দিকে লক্ষ রাখতেন। আজকাল তার উল্টো---ফিবছর নতুন নতুন ?মডেল? এনে, দরকার থাক বা না থাক, টিনেজারদের মাথা খারাপ না করতে পারলে তাঁদের ?স্টকভ্যালু? আকাশচুম্বী হবে কিভাবে, এবং স্টক না উঠলে তাঁদের ব্যক্তিগত বোনাস আর শেয়ারহোল্ডারদের স্টকভ্যালুই বা উর্ধমুখী হবে কেমন করে? তাই আমাদের নতুন প্রজন্মকে প্রতিবছর ভিড় করতে হয় ভিডিওর দোকানে, ব্ল্যাকবেরি আর আইপ্যাডের দোকানে, লাইন লাগাতে হয় অত্যাধুনিক সব ডিজাইনার পোশাকের দোকানে। আমাদের যুগে লঙ্গপ্লেয়িং রেকর্ড আর স্টেরিও-টার্ন-টেবিল ইত্যাদি ছিল হাল ফ্যশানের দ্রব্য---এখন সেগুলো ?কালেক্টর্স আইটেম?। চল্লিশ বছর আগে আমি যখন গাড়ি চালাতে শুরু করি তখন আমার গাড়িতে একগাদা রোডম্যাপ থাকত----সেম্যাপের সাহায্যে আমি সপরিবারে সারা মহাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছি, এমনকি ব্রিটেনেও গাড়ি করে ভ্রমণ করেছি নানাজায়গায়। আজকের নব্যযুগের নব্যচালকরা শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে ?জিপিএস?এর সাহায্য ছাড়া দিশাহারা হয়ে যায়। কোন কারণে ?জিপিএস?এর ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেলে তারাও ডাউন হয়ে যায়। জিপিএস অচল হলে তাদের যাত্রাটাই পণ্ড। আমার পরম ভাগ্য যে যান্ত্রিক বিবর্তনের এই পুরো চিত্রটাই দেখতে পারলাম আমি। আর দশটি বছর যদি কোনক্রমে টিকে থাকতে পারি তাহলে হয়ত দেখব এই জিপিএস বস্তুটিও কালেক্টার্স আইটেমে পরিণত হয়েছে। হয়ত গাড়ি তখন আপনা-আপনিই চলবে, সেই সত্তর দশকের ?নাইট রাইডার? ছবির মত। কে জানে, একসময় চালকের অনিচ্ছাতেও চলবার ক্ষমতা হবে কিনা গাড়ির!
  যন্ত্রের আবিষ্কার ও ব্যবহার শুরু হয়েছিল কর্মের দক্ষতা বাড়িয়ে মানুষের জীবনকে আরো সহজ-সুন্দর, বহুমুখী ও সৃষ্টিশীল করে তোলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তাইতো আমরা প্রাগৈতিহাসিক যুগের কৃষিদ্রব্য থেকে চলে আসতে পেরেছি সমসাময়িক কালের স্বয়ংক্রিয় রবোট আর ডিজিটাল যন্ত্রপাতিতে। এসবই আমাদের কল্পনাশক্তি আর মেধার ফসল। কিন্তু কোথায় যেন খানিক ছন্দপতন ঘটে গেছে। আজকে আমাদের অজ্ঞাতসারেই যেন যন্ত্র আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রন চাবিখানি দখল করে নিয়েছে----আমাদের জীবনকে চালাতে শুরু করেছে। এবং এমনভাবে করছে যে আমরা টেরই পাচ্ছি না কোথা থেকে কি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজকে যন্ত্রের প্রভাব। নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অতি তুচ্ছ ব্যবহারই যে-কাজের জন্যে যথেষ্ট সে কাজটুকুও আমরা যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া করতে নারাজ। অর্থাৎ যন্ত্র অলক্ষ্যে আমাদের মনের জগতটিকেও প্রায় দখল করে নিয়েছে। একসময় মানুষের চিন্তাজগতের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক ছিল ধর্ম----ছোটবেলা থেকেই মগজধোলাইর একটা ব্যাপার আছে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের, যার প্রভাব থেকে প্রায় কেউই উদ্ধার পায় না শেষ দিন পর্যন্ত। মধ্যযুগের কোন কোন ধর্মবিরোধী চিন্তাবিদ বলেছিলেনঃ মানুষ ধর্ম আবিষ্কার করেছিল তার নিজেরই শেষ রক্ষার জন্যে। এবার সেই একই কথা হয়ত বলতে হয় ?যন্ত্র? সম্পর্কে। মানুষ যন্ত্র আবিষ্কার করেছে তার নিজের সুবিধার স্বার্থে----সেই স্বার্থের বন্ধন এখন তার শ্বাসরোধ করতে উদ্যত হয়েছে, অনেকটা সেই ধর্মেরই মত। আজকে আমরা কিভাবে কল্পনা করব, কিভাবে ভাববো, কিভাবে সমস্যার সমাধান খুঁজব, সবকিছুর জন্যেই শরণাপন্ন হচ্ছি যন্ত্রের। আজকের জগতে, আমরা স্বীকার করি বা না করি, প্রযুক্তির কুশীলবেরাই মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রিত করছেন। তারপর হয়ত এমন একদিন সত্যি সত্যি এসে যাবে যখন আমরা যন্ত্রদেবের কাছে মাথা নত করে তার একাধিপত্য স্বীকার করে নেব বিনা বাক্যব্যয়ে।
 বিজ্ঞজনেরা প্রশ্ন তুলছেনঃ ভবিষ্যতের কম্পিউটার নাহয় মানুষের কাছ থেকে সব ক্ষমতাই দখল করে নিল, কিন্তু তারপরও কথা থাকে। ?মানুষ? নামক জীবটির যে বিশেষ একটি গুণ, যেগুণটি তাকে বিশ্বজগতের সকল প্রজাতি থেকে পৃথক করে রেখেছে---তার আবেগ, তার বোধশক্তি, তার কারণে-অকারণে বিস্মিত হবার শক্তি, বিচলিত বিমোহিত হবার শক্তি, সে-শক্তি কি কখনো অর্জন করতে পারবে যন্ত্র? বা পারবে সকালবেলা জানালার কপাট খুলে শিশিরের ঘ্রাণ নিতে, পারবে বাগানের ক্ষুধিত মৌমাছিদের ডানার গুঞ্জন শুনতে? মানুষ কি সত্যি সত্যি অমর হতে চায়? নাকি চায় কেবল তার প্রেমকে, তার স্মৃতিকে, তার আনন্দবেদনা বোধটিকে অক্ষয় ও অম্লান করে রাখতে? যন্ত্র কি পারবে সেই ক্ষমতা অর্জন করতে?
 সবচেয়ে ভয়াবহ জিনিস কি জানেন? সবচেয়ে ভয়াবহ হল যে যন্ত্র কখনোই কিছু ভোলে না। একবার তার ক্ষুদ্র বাক্সটিতে আপনার নাম উঠে গেলে সেটা চিরকাল থেকে যাবে। আপনি মরে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও আপনার সেই কাহিনী থাকে যাবে বরাবর যা ছিল তাই। দুটো উদাহরণ দিই। পাঁচ বছর আগে স্টেইসি স্নাইডার নামক এক পঁচিশ বছর বয়স্ক মেয়ে, পেনসিলভ্যানিয়া অঙ্গরাজ্যের এক স্কুলের ট্রেনিং প্রোগ্রামে নিযুক্ত থাকাকালে, খেলাচ্ছলে, মাইস্পেস পৃষ্ঠাতে একটা ছবি দিয়েছিল যাতে তার মাথায় পরা ছিল নৌদস্যুর লম্বা চোখা টুপি, এবং সে প্লাস্টিক কাপে করে সুরাপান করছে এক বদ্ধ মাতাল ক্যাপ্টেনের সঙ্গে এক টেবিলে বসে। এমন কোনও মারাত্মক অপরাধ নয়---নিষ্পাপ ছেলেমানুষী ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু মাইস্পেস মানে কম্পিউটার----কম্পিউটারের কাছে কোনরকম হাসিঠাট্টার প্রশ্রয় নেই, রসিকতা বোঝার ক্ষমতা সে এখনও অর্জন করেনি। বেচারী স্টেইসি ট্রেনিং প্রোগ্রাম থেকে পাস করে বেরুবার মুখে চিঠি পেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে তাকে ডিপ্লোমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, কারণ মাইস্পেসের সাক্ষ্য অনুযায়ী তার আচার আচরণ শিক্ষকতা পেশার জন্যে উপযুক্ত নয়। সে তার ভবিষ্যতের অল্পবয়স্ক ছাত্রাছাত্রীদের জন্যে অত্যন্ত অশোভন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রেখেছে।
  দ্বিতীয় উদাহরণঃ ৬৬ বছর বয়স্ক এক মনোচিকিৎসক প্রমোদভ্রমণের ইচ্ছাতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন । সীমান্ত পুলিশ তাঁর কাগজপত্র দেখে বললেন, না, যেতে দেওয়া হবে না। কেন? কারণ তিনি ৩৬ বছর আগে একজায়গায় লিখেছিলেন যে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে LSD সেবন করেছিলেন একবার। LSD ছিল ষাট আর সত্তর দশকের জনপ্রিয় নেশা, এবং স্বভাবতই যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে নিষিদ্ধ। ওই লেখাটি কর্তাদের কম্পিউটারে ছাপা হয়ে গেছে। ব্যস, সীমানা অতিক্রম করা নিষিদ্ধ হয়ে গেল, ৩৬ বছর আগের সময়ের জন্যে শুধু নয়, সারা জীবনের জন্যে। আরো একটি ছোট খবর শুনলাম ইদানিংঃ ব্রিটেনের এক ১৬ বছরের মেয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছে, কারণ সে তার ফেসবুকে লিখেছিলঃ I?m so totally bored.
 না ভাই, যন্ত্রের স্মৃতিভ্রম হয়না কখনো। আমাদের হয়। হয় বলেই আমরা ভুলতে পারি---ভুলতে পারি আমাদের দুঃখবেদনা কান্নাহাসির স্মৃতিকথা। ভুলতে পারি বলেই জীবনের সব ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি একসময়, প্রিয়জনের কবর থেকে বিদায় নিয়ে হেঁটে যেতে পারি দূর দূর দেশে। আমরা ভুলতে পারি, কি ভাগ্য আমাদের, নইলে কেমন করে সম্ভব হত এক প্রেমের শ্নশান থেকে আরেক প্রেমের মণ্ডপে গিয়ে পুষ্পমাল্য নিবেদন করতে।
  একসময় ছিল যখন নগরের ব্যস্ত রাজপথের ত্রস্ত জনতার স্রোতে আপনি ভেসে যেতে পারতেন, আপনি বেনামীতে নিজের নিভৃত নিলয়টি সঙ্গোপনে আড়াল করে রাখতে পারতেন আপনার নিজেরই চিলেকোঠাতে। কিন্তু আজকে তা সম্ভব হবে না আপনার পক্ষে। আজকে আপনি যেখানে যান সেখানেই বড় বড় দু?টি চোখ তাকিয়ে থাকবে আপনার দিকে---যে-চোখ কোনও পরিচিত শত্রুর চোখ নয়, নয় কোনও গোপন গোয়েন্দার চোখ, সে-চোখ আপনার এই নিষ্প্রাণ নির্বিকার যন্ত্রখানির। আপনার জীবন থেকে আড়াল নির্বাসিত, আপন নিলয় নির্বাসিত, নিবিড় রহস্য একটুখানি, তা?ও নির্বাসিত। জর্জ অ্রওয়েলের সেই ভয়াবহ ?বিগ ব্রাদার? আজকে আপনার মাথার ওপরে কেবল নয়, আপনার অস্তিত্বেরসর্বত্র বিরাজমান।
  অথচ, বিড়ম্বনা এই যে, এ সবই আমাদের নিজেদেরই হাতে তৈরি!
 
   সূত্রঃ
   ১) ?2045: The Year Man Becomes Immortal?, by Lev Grossman, সাপ্তাহিক ?টাইম?, ২১ শে ফেব্রুয়ারী, ২০১১।
   ২) ?The End of Forgetting?, An article in the Saturday Observer section of The Daily Citizen, Ottawa, ON, July 31, 2010, by Jeffery Rosen.
   ৩)Internet



     অটোয়া,
     ৬ই নভেম্বর,?১১
     মুক্তিসন ৪০
 
   
   

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে