Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯ , ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (60 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৪-২০১৮

ছোটগল্পের অয়োময় শিল্পী

মনি হায়দার


ছোটগল্পের অয়োময় শিল্পী

জীবনের সব রকম জঙ্গমতাকে ধারণ করেই আনোয়ারা সৈয়দ হক নিয়োজিত হয়েছেন গল্পের বিশাল জগতে। তার সৃজনসত্তা বহুমাত্রিক। তিনি গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ভাষ্য, জীবনীগ্রন্থ, ভ্রমণকাহিনী- কথাসাহিত্য তো বটেই, সাহিত্যের অন্যান্য প্রকরণেও এগিয়ে আছেন। রচনা করেছেন বিচিত্র প্রসঙ্গে, অনুষঙ্গে। সব মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। সংসার ও চিকিৎসা সেবায় দীর্ঘ সময় ব্যয় করার পরও একজন লেখক কতটা নিবেদনশীল হলে এমন নিষ্ঠা ও মাত্রায় লিখে যেতে পারেন! দীর্ঘ জীবনযাত্রায় অর্জন করেছেন দেশ-বিদেশের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। শিল্পের অগণন পথে যাত্রা করলেও কথাসাহিত্যে তিনি সিদ্ধি লাভ করেছেন পূর্ণমাত্রায়। এবং বাংলা কথাসাহিত্যে রেখে চলেছেন বাঙালির চিরায়ত সত্তায় ভাঙনের খেলা ও নির্মাণের পিচ্ছিল সড়কচিহ্ন। তিনি মনোসমীক্ষণের মানুষ। মানুষের অন্তর্জমিনের বয়ন ও বয়ান নিবিড়ভাবে অনুধাবন করেন বটে, কিন্তু গল্প-উপন্যাসে সেসব চরিত্রকে রাখেন সৃষ্টির অলক্ষ্যে। ফলে, আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্প ও উপন্যাস হয়ে ওঠে অনুভবের নির্বাণ। একই সঙ্গে দ্রোহী ও বিবেকী সত্তায় আনোয়ারা সৈয়দ হক থাকেন অটল, অবিচল ও নির্ভীক। জীবন যাপনেও তিনি শাশ্বত বাঙালির পরিধিকে নিজের মতো ধারণ করে এগিয়ে চলেন, ওই যে নিজের মতো করে। যা ভাবেন ও বিশ্বাস করেন, দ্বিধাহীন উৎসে তিনি প্রকাশ করেন অবলীলায়।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনের চালচিত্র প্রকাশ পেয়েছে ছোটগল্পকারদের হাতে, গল্পের বহুমাত্রিক রূপান্তরের ঘাটে। একেকটা গল্পের মানচিত্রে মানব সংবেদের বিচিত্র সংহার, অবিশ্বাস্য রক্তপাত, হত্যা কিংবা প্রেম দারুণ দক্ষতায় আঁকেন গল্পকার শব্দের কালিতে, হৃদয়াবেগের কারসাজিতে। গল্পকার আনোয়ারা সৈয়দ হকও গল্পের মানচিত্রে আঁকেন মনুষ্যচরিত্রের বয়ানে যাবতীয় আর্তি, সর্বনাশ, সুখ, উল্লাস, ভারাক্রান্ত দুঃখ অথবা উদ্ভাস। আর আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্পযাত্রা বেশ পুরনো। গত শতকের সেই ষাটের দশকের গল্পের পথের গথিক তিনি। ষাটের দশকে লেখা গল্প 'অন্ধকারে যে দরোজা'। পরাবাস্তবতার নিরীক্ষায় আনোয়ারা সৈয়দ হক সেই সময়ে, ১৯৬৭ সালে মনোচৈতন্যের সফল স্বাক্ষর রেখেছেন। গল্পের চরিত্র চারজন- শাজাহান, শাহেদ, মাহমুদ ও মেহেদি। চারজনে চুটিয়ে আড্ডা মারে, ঝগড়া করে ক্যান্টিনে। আমরা পাঠক অপেক্ষা করি, কখন চারজনে লড়াইয়ে নামবে। কিন্তু না, গল্পকার আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাদের নিয়ে যান গল্পের অন্য কারখানায়। ক্যান্টিন থেকে শাজাহান চলে যায়। কোথায় যায়? বাসায়। কিন্তু বাসায় গিয়ে শাজাহান কী করে? ভাবনার অলীক খানাখন্দকে ঢুকে পড়ে শাজাহান। জীবনের উদয়-অস্তের হিসাব মিলাতে না পারলে মানুষের মনোচৈতন্যে যা ঘটে, গল্পকার আনোয়ারা সৈয়দ হক তারই বিস্তার ঘটান শাজাহানকে ঘিরে। শাজাহানের মনোচৈতন্যের দুয়ারে কী ঘটে? 

গল্পকার আনোয়ারা সৈয়দ হক 'অন্ধকারে যে দরোজা' গল্পের মানচিত্রে শাজাহানকে আঁকেন এইভাবে :'যেন ঠিক সেই সময় তার মাথার ভেতরে করতোয়া দুলতে দুলতে চলে এলো। পাড় ভাঙছে। নদীর পাড় ভাঙছে। পাড় ভাঙতে ভাঙতে কত বড় হয়ে গেল নদী! কত মস্ত হয়ে গেল! কত মস্ত এই করতোয়া নদী। মা, মাগো, শুনতে পাচ্ছো, নদীর পাড় ভাঙছে, শুনতে পাচ্ছো? শোনো আমাদের সাগরদাঁড়িতে একবার এমন হলো যে...। পদ্মফুল, আমাদের শৈলকুপার ঝিলে দেখেছো কোনোদিন? পাপড়ি মেলতে দেখেছো কোনো পদ্মফুলের? দেখেছো?'

'পাখির পালক' আনোয়ারা সৈয়দ হকের আর একটি গল্প। গল্পের আখ্যান পতিতাদের ঘর-সংসার। আমি সচেতনভাবে লিখেছি, পতিতাদের ঘর-সংসার। আমরা, সভ্যতার সবাই জানি পতিতাদের ঘর-সংসার নেই। প্রশ্ন- এই জানা কতটা সত্য? বরং মিথ্যাটাই জানি। পতিতাদের ঘর-সংসার আছে, ছিল, থাকবে। কেবল বিয়ে করলেই, সন্তান হলেই ঘর-সংসার? পতিতারা জীবনের যাবতীয় গ্লানি আর যন্ত্রণা ধারণ করে, পৃথিবীর কত সংসার বাঁচিয়ে রাখে, সেই হিসাব কি আমরা জানি? আর পতিতাকন্যারা কোটি কোটি জান্তব পুরুষের মর্ষকামীর আগুনে দগ্ধ হয়ে পুড়ে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে, মরার পর মাটিও পায় না। এসব দগ্ধ নারীর একজন আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্পের চরিত্র- ফুলবানু। ফুলবানু বেশ্যার জীবনে এসে একজন লেখক শওকতকে ভালোবেসেছিল। সেই ভালোবাসার ফল, পেটে আসে সন্তান। নিজের সন্তান এসেছে প্রেমিকার পেটে, পুরুষ হিসেবে শওকতের খুশি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শওকত কী করে? গল্পকার আমাদের জানাচ্ছেন একজন সংবেদনশীল লেখকের পৌরুষের পরিকাঠামোর ভাষা। 

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির শ্রেষ্ঠ ঘটনা। যা ঘটেছিল ১৯৭১ সালে বাংলার সাড়ে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সীমানায়, দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের দানব পাকিস্তানি সৈন্যদের দখলদারিত্বের কারণে। সেই একটা কাল এসেছিল বাঙালির জীবনে, নির্মাণ ও ধ্বংস পরস্পর হাত ধরে যাচ্ছিল আর রক্ত-মখমলে বাঙালি জীবন বলি দিয়ে প্রমাণ রাখছিল স্বাধীনতার মূল্য। সেই স্বাধীনতার অমর গাথা আমাদের জীবনে যেমন দিয়েছে তীব্র তীক্ততার স্বাদ, তেমনি দিয়েছে সৃজনের বহুমাত্রিক রূপ। গল্প একটি শিল্পকলা, যার ভেতর দিয়ে গল্পকাররা একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কুসুম ও কাঁটা ফুটিয়ে তুলেছেন গভীর তন্ময়তার সঙ্গে। একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের লালিত ফসল আনোয়ারা সৈয়দ হক। সেই যুদ্ধকালে তিনি সরাসরি দেখেছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পৈশাচিকভাবে নিরীহ বাঙালির ওপর হত্যার উল্লাস। তিক্ত অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ আনোয়ারা সৈয়দ হক মুক্তিযুদ্ধের গল্প কাঠামোয় যুদ্ধসময়ের বাংলাদেশ, সেই সময়ের মুক্তিযোদ্ধা আর পরিপ্রেক্ষিত রচনা করেছেন দক্ষ হাতে। 

'মানুষটি খুঁজে বেড়াচ্ছি' বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ধারণায় একটি অনন্য গল্প। পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্মম হত্যা ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে বাঙালির মানস কাঠামোর নারী-পুরুষের সম্পর্ক কোনো মানবিক মেরুতে সংহতি স্থাপন করেছিল, 'মানুষটি খুঁজে বেড়াচ্ছি' তার দিব্য সাক্ষী। গল্পটি লিখেছেন গল্পকার নিজের বয়ানে। তিনি শুরু করেছেন বেশ নাটকীয় সংলাপে- 'সেই মানুষটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি যে মানুষটি এক রাতের জন্য আমাকে উদ্ধুদ্ধ করেছিল প্রেমে। যে প্রেমের ভেতর থেকে দীপশিখার মতো উঠে এসেছিল আশা। যে আশার ভেতর থেকে উঠে এসেছিল আলো এবং আলোর ভেতরে অনন্যসাধারণ এক জীবন।'

হোক না গল্পের চরিত্র, আনোয়ারা সৈয়দ হকের 'মানুষটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি' মুক্তিযুদ্ধের গল্পের চরিত্র। কিন্তু সেকালে, একাত্তরের দগ্ধকালে অনেক নারী মেয়ে কন্যা ছিল এই বাংলার, যারা সব ত্যাগ করে বাংলার স্বাধীনতাই চেয়েছিল। গল্পের আখ্যানে তিনি সেই সময়কেই মূর্ত করেছেন আগুনে ঝলসানো রুটির মতো, নিজে দগ্ধ হতে হতে। আমরা সাধারণত জানি, নারী অবলা। নারী সময়ানুসারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কিন্তু আমরা আনোয়ারা সৈয়দ হকের এই গল্পে আবিস্কার করি, নারী অবলা নয়। নারী সাহসী এবং প্রতিরোধেও একনিষ্ঠ। মুক্তিযোদ্ধা আহত জয়নালের রক্ত বন্ধ হওয়ার জন্য এই নারী মুহূর্তে নেয় চরম সিদ্ধান্ত। পাঠ করি আনোয়ারা সৈয়দ হকের আখ্যানে- 'এদিকে রক্তপড়া বন্ধ হয়েছে মুখে বললেও জয়নাল ঘনঘন জঙ্ঘায় হাত রেখে দেখতে লাগল। আমি ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্ধকারে আবার ছিঁড়ে ফেললাম আমার শাড়ির আঁচল। এবার জয়নালের আপত্তি না শুনে নিজের হাতেই পুরনো ব্যান্ডেজের ওপরে নতুন ব্যান্ডেজ বাঁধলাম। বাঁধার সময় আমার হাতে তরল ও আঠাল রক্তের ধারা এসে লাগল। আমি ভীত-বিহ্বল হয়ে উঠলাম। জয়নালের শরীর আমার শরীরের আওতার ভেতরে এসে কেমন যেন কাঁপতে লাগল। যুবতী শরীরের এত নিকট সান্নিধ্য ওর ভেতরে কোনো বিকারের সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু আমি সতর্ক হলাম না, প্রয়োজন বোধ করলাম না। এই আহত মুক্তিযোদ্ধাটিকে বাঁচিয়ে রাখা সেই মুহূর্তে আমার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল। জয়নাল হঠাৎ বলে উঠল, এত কাছে আসবেন না, আমি ঠিক আছি। 

জয়নালের কথায় আমি থমকে গেলাম। আমার বোধ ফিরে এলো। অন্ধকারে ঘুমন্ত ছেলের দিকে দৃষ্টি ফেলে ভাবলাম, সত্যিই তো! এ আমি কী করছি! আমি যে অবস্থাকে যুদ্ধাবস্থা হিসেবে দেখছি সেখানে নারীর শরীরের ক্রমাগত সান্নিধ্য পুরুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে। যুবতী নারীর শরীরের ঘ্রাণ কি কস্তূরীমৃগকে স্মরণ করিয়ে দেয় না?

আমার এ রকম চিন্তা চেতনার ভেতরেই শব্দের বোমা ফেলে জয়নাল বলে, দেশে আমার প্রেমিকা আছে। আমার ফিরে যাবার অপেক্ষায় আছে ও।'

মানুষের জীবন কত ঘটনাবহুল! যুদ্ধের মাঠে, অন্ধকার রাতের অন্ধ আলোয় আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন নারীর পরস্পর অবস্থানের পরও যে মানসিক বিক্রিয়া, যুধ্যমান জীবনের বিপরীত সংঘাত- সেটাও জীবনের অনুষঙ্গ। এবং আনোয়ারা সৈয়দ হক সেই পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরেছেন রক্ত অঙ্গীকারে। সেই বিভীষিকার রাতে একদিকে নারীর সন্তানসহ পালিয়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নেওয়া, অন্যদিকে আহত মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষা করার দায়িত্ব। কারণ, রক্তক্ষরণে জয়নাল ক্রমশ নির্জীব হয়ে পড়ছে। জয়নাল ঘুমিয়ে পড়ছে। নায়িকা জানে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে একবার ঘুমিয়ে গেলে আর জেগে উঠবে না মুক্তিযোদ্ধা। 

জয়নালকে সেই অন্ধকারে রেখে বকুল ছুটে যায় গ্রামে, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। কিন্তু সেই জয়নালকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সিনেমার গান আছে একটা.. তোমাদের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা রবে না...। জয়নালদের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাসে কোথাও নেই। কিন্তু বকুল এখনও খুঁজে বেড়ায় জয়নালকে। কারণ গল্পকার জানাচ্ছেন- 'মানুষটি একটি রাতের ভেতরে আমার জীবনের অভিজ্ঞানকে পাল্টে দিতে পেরেছিল।'

আনোয়ারা সৈয়দ হক বাংলা ছোটগল্পের কীর্তিমান গল্পকার।

এমএ/ ০২:৪৪/ ০৪ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে