Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ , ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (57 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৪-২০১৮

হাসান আজিজুল হকের প্রথম উপন্যাস

আহমেদ শাহীন


হাসান আজিজুল হকের প্রথম উপন্যাস

কঠিন বাস্তববাদী লেখক হাসান আজিজুল হক বর্তমান সময়ের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'আঠারো বছর বয়স' কবিতার অদম্য দুঃসাহসী পঙ্‌ক্তির মতোই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হাসান আজিজুল হকের 'শামুক' উপন্যাস। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থাতেই রচনা করেন শামুক নামে এক সামাজিক প্রতিচিত্রের বাস্তবধর্মী উপন্যাস। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার প্রতিযোগিতায় প্রধান সাতটি উপন্যাসের একটি ছিল শামুক। ১৯৫৭ সালে লেখা উপন্যাসটি 'পূর্বমেঘ' পত্রিকায় ১৯৬২ সালে তিন কিস্তিতে প্রকাশ পেলেও বই আকারে এই প্রথম বাজারে এলো। বর্তমানের আবহে বসেও সেই সময়ের মুসলমান সমাজের এক বাস্তব চিত্র অনুভব করা যায় উপন্যাসে। 

এর শুরুটা হয়েছে এক নিগূঢ় তত্ত্বকথার মাধ্যমে; 'তেলাপোকা পাখি নয়', আবার একটু পরেই 'ডানা থাকলেই পাখি হয় না, উড়তে পারলেও না'। এর মাধ্যমে নায়ক মুনীরের একজন সামান্য কেরানির চাকরি করেও পাখির মতো ওড়ার বাসনা এবং জীবনের কোনো অংশেই তা না পারার অক্ষমতা বোঝানো হয়েছে। নায়ক মুনীর একজন সামান্য কেরানি, যে মুসলমান সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর কঠিন সব বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে কলেজ পর্যন্ত পড়ালেখা করতে পেরেছে। আর তাই দিয়ে কেবল একটা কেরানির চাকরি পেয়েছে। কিন্তু তার ভেতরে অদম্য ইচ্ছা আর বিশালতার স্বপ্ন সত্ত্বেও স্থবির শামুকের মতো জীবন নির্বাহ করতে হয়েছে। যেটা মানুষ হিসেবে জীবনের চরম সীমাবদ্ধতা আর সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে হয় খানিকটা বাধ্য হয়েই। মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনাময় সচল জীবন কীভাবে সমাজস্থ অচল চিন্তা-চেতনার কারণে এক একটা বিশাল জীবনকেও শামুকের গতির মতো নির্বাহ করতে হয় তাই ফুটে উঠেছে চরম বাস্তবতায়।

ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের দখলে আসার পর হিন্দুরা যেভাবে ইংরেজি শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করে, সে তুলনায় মুসলমানরা ছিল একেবারেই বিপরীত। কেউ স্বেচ্ছায় শিক্ষা অর্জনে আত্মনিয়োগ করলেও সমাজ, পরিবেশ ও পরিবার তাকে নানাভাবে নিবৃত করতে পিছপা হতো না। এ রকমই পশ্চাৎপদ মনোভাবের এক পরিবার থেকে নায়ক মুনীরের উত্থান। এখানে নায়ক মুসলমানদের চিরাচরিত ধর্মীয় শিক্ষার ছায়াতলে না গিয়ে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহী হয়ে ধর্ম, সমাজ ও সংস্কারের পর্বতসম বাধা পায়ে ঠেলে সামনে এগিয়ে আসার আশাব্যঞ্জক উত্থানের পরও শেষ পর্যন্ত সমাজ সংস্কারের কাছে ব্যর্থ হয়ে কেরানির চাকরিতে প্রবেশের কাহিনী লেখকের সুনিপুণ হস্তে মূর্ত হয়ে উঠেছে। 

সাধারণত হাসান আজিজুল হকের পরিণত বয়সের উপন্যাসে আমরা সমাজতন্ত্রের সামাজিক মূল্যবোধের দ্বারা বাস্তবসম্মত কাহিনীর স্বাদ পেয়ে থাকি। তার প্রায় সব কাহিনী নির্মাণের ক্ষেত্রেই নর-নারীর জৈবিক চাহিদাসম্পন্ন রক্ত-মাংসের প্রেম অনুপস্থিত। তিনি বিশ্বাস করেন অসুস্থ, বিকারগ্রস্ত, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় প্রেমও পণ্যের মতো বেচাকেনার বিষয়। তাই তিনি নারী-পুরুষের প্রেম নয়; সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বাস্তব যৌন-জীবনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্নেষণ করেন। কিন্তু নিজ যৌবনের প্রথম ধাপে লেখক তার শামুক উপন্যাসের কাহিনী নির্মাণে নিরেট প্রেমেরও অবতারণা করেছেন। লেখক নায়িকা রিনার রূপের সাথে বুদ্ধিমত্তারও পরিচয় দিয়েছেন বেশ দক্ষতায়। পুঁথিপাঠের আসরে নায়িকা যেভাবে নায়কের চোখ-মন আকর্ষণ করে প্রেমের অদৃশ্য চিঠি বিনিময় করে, তা সত্যি অতুলনীয়। সমাজ বাস্তবতায় তাদের প্রেম কখনোই মিলনে পরিণত হয় না। তবে জীবনের শেষ প্রান্তে নায়ক মুনীর তার সেই কৈশোরের প্রেমের মোহে শান্তি খুঁজে পায় বেশ। 

মূলত হাসান আজিজুল হক সেই সময়কার সমাজ জীবনের নিরিখে এক চমৎকার চিত্র রূপায়ণের প্রয়াস পান এ উপন্যাসে। আশা করি, আমাদের সেই সময়কার দিনগুলোয় ফিরিয়ে নিতে বেশ সহায়ক হবে শামুক উপন্যাসখানি। 

এমএ/ ০২:৩৩/ ০৪ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে