Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (70 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৪-২০১৮

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, তরুণ হেমিংওয়ের প্রেম এবং একটি চিঠি

আহমাদ শামীম


প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, তরুণ হেমিংওয়ের প্রেম এবং একটি চিঠি

আমেরিকান কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। কালজয়ী গল্প আর উপন্যাসের মাধ্যমে সাহিত্যের লাখো পাঠকের হৃদয় জয় করা এই সাহিত্যিকের জীবনও হাজারো গল্পের উপাদানে ভরা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হেমিংওয়ের জীবনের তেমনি এক অধ্যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছর, ১৯১৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তরুণ হেমিংওয়ে ইতালির আমেরিকান রেড ক্রসে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তার কাজ ছিল অ্যাম্বুলেন্স চালানো। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকদের কাছে সিগারেট ও চকলেট বিক্রি করতেন তিনি।

১৯১৮ সালের জুন মাসের কোনো একদিন, যুদ্ধের ময়দানে অস্ট্রিয়ান সৈনিকদের ছোড়া গোলার আঘাতে মারাত্মক আহত হন হেমিংওয়ে। 'ম্যান অ্যাট ওয়ার' নামক এক চিঠিতে হেমিংওয়ে তার তরুণ বয়সে যুদ্ধে অংশ নেওয়া ও আহত হওয়ার স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন- 'যখন আপনি আপনার বালক বয়সে যুদ্ধে অংশ নেবেন, তখন অমরত্ব বিষয়ে এক ঘোরের জগতে বাস করবেন। অন্যান্য মানুষ মারা যাচ্ছে, কিন্তু আপনি তো বেঁচে আছেন... কিন্তু প্রথমবারের মতো যখন আপনি খুবই বাজেভাবে আহত হবেন তখন আপনার সেই ঘোর কেটে যাবে এবং ভাববেন এটা (মৃত্যু) আপনারও হতে পারে। আমার উনিশতম জন্মদিনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে আমি গুরুতরভাবে আহত হই, যতক্ষণ না আমি বুঝে উঠেছিলাম যে আমার তেমন কিছু হয়নি, যা হয়েছে আমার দেখা অন্য মানুষদের, ততক্ষণ পর্যন্ত সময় খুব বাজে কেটেছিল। সবাই যা করেছিল, আমাকেও তা-ই করতে হয়েছে। যদি তারা সেটা করতে পারে তবে আমি কেন পারব না! তবে এ ক্ষেত্রে তেমন দুশ্চিন্তা না করাই সবচেয়ে ভালো।'

বোমার আঘাতে আহত হেমিংওয়েকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয় ইতালির মিলান শহরের আমেরিকান রেড ক্রস হাসপাতালে। প্রায় ছয় মাস ছিলেন তিনি এখানে। হাসপাতালে তার সেবার দায়িত্বে ছিলেন আরেক আমেরিকান নার্স অ্যাগনেস ভন কুরোসকি। ২৬ বছর বয়সী এই সুদর্শন তরুণীর শুশ্রূষার কল্যাণে বেশ দ্রুতই সেরে ওঠেন হেমিংওয়ে। যার ফলে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে দারুণ বন্ধুত্ব। কিন্তু এই বন্ধুত্ব আর বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হেমিংওয়ে প্রেমে পড়ে যান অ্যাগনেস ভন কুরোসকির। তাদের মধ্যকার এই অসম প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর কথাও ছিল। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে অ্যাগনেস ভন কুরোসকিকে ইতালিতে রেখে হেমিংওয়ে আমেরিকা ফিরে যান। মার্চ মাস নাগাদ হেমিংওয়ে কুরোসকির কাছ থেকে একটি চিঠি পান। সেই চিঠি ছিল অনেকটা ক্ষমা প্রার্থনামূলক। তাদের দু'জনের সুন্দর দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে কুরোসকি বিচ্ছেদের কথাই লেখেন এবং আরও জানান তার বিয়ের কথা। 

হেমিংওয়ের সঙ্গে কুরোসকির সম্পর্ক সেদিনই ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় হেমিংওয়ের অন্যতম সেরা উপন্যাস 'অ্যা ফেয়ারওয়েল টু আর্মস'। বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত উপন্যাসটির অন্যতম প্রধান চরিত্র ক্যাথরিন বার্কলে অ্যাগনেস ভন কুরোসকির চরিত্রের আদলেই গড়া বলে মনে করা হয়। হেমিংওয়েকে লেখা অ্যাগনেস ভন কুরোসকির সেই চিঠি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

মিলান হসপিটাল
৭ মার্চ, ১৯১৯

প্রিয় বালক, আর্নি,
নিজে নিজে অনেক চিন্তা-ভাবনার পরে প্রায় মধ্যরাতে তোমাকে এই চিঠি লিখছি। আমি ভয় পাচ্ছি যে, চিঠিটা তোমাকে দারুণভাবে আঘাত করবে; কিন্তু আমি নিশ্চিত- এটা চিরস্থায়ীভাবে তোমার কোনো ক্ষতি করবে না।

তুমি চলে যাবার বেশ আগ থেকেই আমি নিজেকে অনেক বোঝাতে চেয়েছি যে, আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক একটা সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্ক। কেননা, সব সময় আমাদের মতের অনেক অমিল থাকত এবং তোমার অনেক পাগলামির বিষয় নিয়ে প্রচুর তর্ক করতাম। শেষ পর্যন্ত আমি ক্লান্ত হয়েই সেসব আলোচনা ছেড়ে দিতাম। 

তুমি চলে গিয়েছ কয়েক মাস হলো। আমি জানি, তোমার প্রতি আমার কতটা অনুরাগ। কিন্তু সেই অনুরাগ যতটা না একজন প্রেমিকার; তার চেয়ে বেশি একজন মায়ের। তুমি বলতে, আমি তো একটা বাচ্চা। তোমার বলাটা ঠিক আছে, কিন্তু আমি তো বাচ্চা না এবং প্রতিদিনই আমি বড় হয়ে উঠছি। 

তো, বাচ্চা ছেলে (তুমি এখনও আমার কাছে একটা বাচ্চা ছেলে এবং সব সময়ই সেটা থাকবে), তুমি কি আমাকে অনিচ্ছাকৃতভাবে ধোঁকা দেবার জন্য কখনও ক্ষমা করবে? তুমি জানো, আমি অতটা খারাপ নিশ্চয় না এবং খারাপ কিছু হোক, তেমনটাও আমি চাইনি। এখন মনে হচ্ছে, ভুলটা আসলে আমারই- প্রথম যখন তুমি আমার বিষয়ে অনেক খেয়াল রাখতে এবং এখন আমি অনুতাপে পুড়ছি এবং হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু আসলেই আমি বয়সে অনেক বড় এবং সেটা সত্যিও বটে। আর তুমি যে অল্প বয়সী; একটা বাচ্চা ছেলে- এই ভাবনা থেকেও আমি কোনোভাবে বেরুতে পারছি না।

মিলান থেকে পাদুয়া ঘুরতে যাবার সময় আমি এই কথাগুলো নানানভাবে তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম সেদিন। কিন্তু তুমি মোটেই বুঝতে চাওনি বরং নাছোড়বান্দা বালকের মতো আচরণ করেছিলে। আমি তোমাকে সেদিন আর আঘাত দিতে চাইনি। আজ আমরা দু'জন অনেক দূরে আছি বলেই আমি সেই সাহস পাচ্ছি।

বিশ্বাস কর, এটা আমার জন্যও কষ্টকর। আর আমি শিগগিরই বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমি আশা করছি এবং প্রার্থনা করছি, একদিন তুমি এসব ভুলতে পারবে এবং আমাকে ক্ষমা করতে পারবে। সেই সঙ্গে তুমি তোমার ক্যারিয়ার দারুণভাবে শুরু করবে আর নিশ্চয় দেখিয়ে দেবে, তুমি আসলেই কেমন পুরুষ।

তোমার চির আপন ও ভালোবাসার,
তোমার বন্ধু
অ্যাগি

পরবর্তী সময়ে কুরোসকি আমেরিকায় ফিরে এলেও তাদের আর কখনোই দেখা হয়নি। তরুণ হেমিংওয়ে এবং নার্স কুরোসকির মধ্যকার প্রেমের গল্প নিয়ে ১৯৯৬ সালে 'ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার' সিনেমাটি নির্মিত হয়। হেমিংওয়ের প্রথম প্রেম অসমাপ্তির গল্প হিসেবেই থেকে যায়। 

এমএ/ ০২:৩৩/ ০৪ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে