Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (45 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১১-০১-২০১৮

বিশ্বযুদ্ধের কথক হেমিংওয়ে

মোজাফফর হোসেন


বিশ্বযুদ্ধের কথক হেমিংওয়ে

হেমিংওয়ে ছিলেন ‘ওয়ার প্রোডাক্ট’। গোটা মার্কিন সাহিত্যে তাঁর মতো করে যুদ্ধকে আর কেউ উঠিয়ে আনতে পারেননি। ফলে বিশ্বসাহিত্যে ওয়ার রাইটিংস বা যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকর্মের প্রসঙ্গ উঠলেই চলে আসে তাঁর নাম। হেমিংওয়ের সাহিত্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী নিঃসঙ্গতা বা হতাশার কথা যেভাবে এসেছে তিনি নিজে যুদ্ধসৈনিক না হলে হয়তো সেভাবে আসত না। ব্যক্তিজীবনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাংবাদিক হিসেবে ফ্রন্টে কাজ করেছেন। যুদ্ধে আহতও হয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হেমিংওয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র। ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে আমেরিকা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। জার্মান ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষ জোটে শরিক হয়। ১৮ বছর পূর্ণ হলে হেমিংওয়ে আর্মিতে নিজের নাম লেখানোর চেষ্টা চালান; কিন্তু বাঁ চোখে সমস্যা থাকার কারণে বাদ পড়ে যান। যখন তিনি জানতে পারেন যে, রেড ক্রস স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার নিচ্ছে, তিনি দ্রুত নিজের নাম লেখান। তিনি কানসাস শহরে কাজ করেন। এই শহরের কথা তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসে উল্লেখ আছে। যুদ্ধ চলাকালে স্টার নামক সংবাদপত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে তাঁর জন্য বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। ছোট ছোট বাক্য, সংক্ষিপ্ত কার্যকরী বয়ান, অতিকথন বর্জন- এগুলো তিনি সংবাদমাধ্যমে কাজ করতে করতে আয়ত্তে আনেন বলে ধরে নেওয়া যায়।

যুদ্ধকালে হেমিংওয়ে প্রথমে যান প্যারিসে, এরপর মিলানে। যেদিন তিনি মিলানে পৌঁছান, সেদিনই সামরিক ভাণ্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। হেমিংওয়ে সৈনিকদের ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরীর মর্গে বয়ে আনেন। তিনি ওই প্রথম প্রত্যক্ষ করেন যুদ্ধের বীভৎস চিত্র। এরপর তিনি নিজেও অস্ট্রিয়ার মর্টার সেলে আহত হন। ওই সময় তিনি ইটালিয়ান সৈন্যদের মধ্যে চকোলেট ও সিগারেট বিলি করছিলেন। আহত অবস্থায় তিনি মিলানের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে নার্স Agnes von KurowsKz-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। পরিচয় থেকে প্রণয়। যার অনুপ্রেরণায় তিনি লেখেন পৃথিবীবিখ্যাত উপন্যাস এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস। একইভাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস দ্য সান অলসো রাইজেস, আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস আইল্যান্ডজ ইন দ্য স্ট্রিমও তাঁর যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে রচিত। এর বাইরেও তাঁর প্রায় প্রতিটি রচনায় কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধোত্তর সমাজব্যবস্থার ছোঁয়া আছে।

হেমিংওয়ের বিখ্যাত ছোটগল্প ইন্ডিয়ান ক্যাম্প বের হয় ১৯২৪ সালে প্যারিসের একটি পত্রিকায়। এই গল্পে হেমিংওয়ের প্রায় আত্মজৈবনিক চরিত্র নিক অ্যাডামসের প্রথম আবির্ভাব ঘটে। শিশুচরিত্র নিকের বয়ানেই গল্পটি বলা। এই গল্পে শিশু নিক তার ডাক্তার বাবার সঙ্গে ইন্ডিয়ান ক্যাম্পে যায় এক মহিলার সন্তান জন্ম দিতে। অবস্থা ক্রিটিক্যাল দেখে ডাক্তার মহিলাকে সিজার করার সিদ্ধান্ত নেন। সহযোগিতা করে নিক। তখনকার যুগে সিজার করাটা আজকের মতো সহজ ছিল না। অজ্ঞান বা অবশ না করে পেট কাটার কারণে স্বামী তার স্ত্রীর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে চাকু দিয়ে নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করে। এই গল্প দিয়েই হেমিংওয়ে তাঁর স্বকীয় স্বর নিয়ে ছোটগল্পের জগতে আবির্ভূত হন। পরবর্তীকালে তাঁর ছোটগল্পের সিগনেচার টোন হয়ে ওঠে এই মৃত্যু-আতঙ্ক ও একাকিত্ব।

আমরা জানি এরপর হেমিওংয়ে প্রায় দুই ডজন গল্প লিখেছেন নিকের বয়ানে বা নিককে অন্যতম চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। হেমিংওয়ের মৃত্যুর পর এই গল্পগুলো নিয়ে The Nick Adams Stories শীর্ষক একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এই সিরিজ গল্পে আমরা শিশু থেকে তরুণ নিক অ্যাডামসকে পাই।

১৯২৫ সালে ১৫টি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় হেমিংওয়ের প্রথম ছোটগল্পের সংকলন ইন আওয়ার টাইম। বইটি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া ফেলতে পারেনি। ইন্ডিয়ান ক্যাম্প ছাড়াও এই সংকলনে স্থান পাওয়া উল্লেখযোগ্য গল্পগুলোর ভেতর আছে ক্যাট ইন দ্য রেইন, সোলজার’স হোম, দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য ডক্টর’স ওয়াইফ, দুই খণ্ডে দ্য বিগ দু হার্টেড রিভার, অণুগল্প এ ভেরি শর্ট স্টোরি প্রভৃতি।

সোলজার’স হোম গল্পটির প্রকাশকাল ১৯২৫। ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে হেমিংওয়ে ইতালি থেকে আমেরিকা ফিরে আসেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর বাবা-মা মোটেও খুশি ছিলেন না। তিনি বাড়ি ফেরা মাত্রই তাঁরা তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাঁরা কাজ খোঁজার জন্য অথবা পড়ালেখা শুরু করার জন্য হেমিংওয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। কিন্তু হেমিংওয়ে ওসবের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ এই গল্পের ক্রেবজ চরিত্রটি আসলে হেমিংওয়ে নিজেই। যুদ্ধফেরত একজন সৈনিকের হতাশাগ্রস্ত জীবন এই গল্পের মূল বিষয়বস্তু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যে ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সৃষ্টি হয়, এই গল্পে সেই জেনারেশনের একজন প্রতিনিধির কথা বলা হয়েছে।

অণুগল্প আকৃতির ‘এ ভেরি শর্ট স্টোরি’ গল্পটি ইন আওয়ার টাইম গ্রন্থের ১৯২৪ সালের ফরাসি সংস্করণে একটি অনুচ্ছেদ হিসেবে বের হয়। পরবর্তীকালে হেমিংওয়ে কিছুটা সম্পাদনা করে ১৯২৫ সালে প্রকাশিত বইটির মার্কিন সংস্করণে যুক্ত করেন। গল্পে হাসপাতালে সেবা দিতে গিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আহত সৈনিকের প্রেমে পড়ে যায় নার্স। তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সৈনিক আমেরিকায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসার পর সেই নার্সের একটি চিঠি পায় এই মর্মে যে, সে নতুন করে এক অফিসারের প্রেমে পড়েছে। হেমিংওয়ে নিজেও আহত হয়ে মিলান হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন এক নার্সের প্রেমে পড়েন। অসফল প্রেম সেটি। গল্পের প্রধান চরিত্র শিকাগোর হওয়ার কারণে অনেকে তাকে নিক বলে মনে করেন।

হেমিংওয়ের দ্বিতীয় গল্পসংকলন প্রকাশিত হয় মেন অ্যান্ড উইমেন শিরোনামে ১৯২৭ সালে। এই সংকলনে স্থান পায় ১৪টি গল্প। উল্লেখযোগ্য গল্পগুলোর ভেতর আছে- ‘আনডিফিটেড’, ‘ইন অ্যানাদার কান্ট্রি’, ‘হিলস লাইক হোয়াইট এলিফেন্টস’, ‘দ্য কিলারস’, ‘টেন ইন্ডিয়ানস’, ‘বেনাল স্টোরি’ প্রভৃতি। এর ভেতর ‘হিলস লাইক হোয়াইট এলিফ্যান্টস’ এবং ‘দ্য কিলারস’ গল্প দুটি হেমিংওয়ের বহুলপঠিত গল্পগুলোর ভেতর অন্যতম। ‘হিলস লাইক হোয়াইট এলিফ্যান্টস’ গল্পের প্রেক্ষাপট স্পেন। শুরুতেই পাহাড়-গাছপালাবেষ্টিত রেলস্টেশনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। মাদ্রিদের ট্রেন ধরার জন্য এক আমেরিকান তার বান্ধবীকে নিয়ে স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছে। ওরা বিয়ার অর্ডার করে। বান্ধবী বলে যে সামনের পাহাড়টা দেখতে শ্বেতহস্তীর মতো। আমেরিকান পুরুষটি তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছে না বলে জানায়। তারা পান করতে থাকে। বান্ধবী ফের বলে, পাহাড়টি আর সাদা হাতির মতো দেখাচ্ছে না। তারপর তারা মেয়েটির সম্ভাব্য অপারেশন করা নিয়ে আলাপ করে। হেমিংওয়ের ‘ক্যাট ইন দ্য রেইন’ গল্পের মতো এখানেও প্রেমিক-প্রেমিকা আলাপ করছে পাশাপাশি বসে কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে। দুজনের কথা দুজন মন দিয়ে শুনছে বলে হয় না। অর্থহীন আলাপ করে তারা সময় অতিবাহিত করে মাত্র। চরিত্রদের ভেতর বোঝাপড়ার অভাব, যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা, সকলের মাঝে থেকেও একাকিত্ব বোধ করা হেমিংওয়ের প্রায় সব গল্পেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই তাঁর গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আলোচককে হয়তো একই কথা বারবার বলতে হতে পারে। যেমন ‘ক্যাট ইন দ্য রেইন’ গল্পে দেখা যায়, শুরুতে বেড়াল আমেরিকান স্ত্রীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও শেষদিকে এসে গুরুত্ব হারায়। এখানেও আমরা দেখছি সাদা পাহাড়কে আমেরিকান লোকটির বান্ধবী আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। সম্ভাব্য গর্ভপাত নিয়ে আলোচনা করছে দুজনে। হেমিংওয়ের গল্পে সন্তান প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এবং গর্ভপাত দুটোই মেজর বিষয়। নারীদের চুল ছোট করে ফেলার প্রসঙ্গটিও বারবার এসেছে।

‘দ্য কিলার্স’ গল্পটি হেমিংওয়ে লেখেন মাদ্রিদে এক হোটেলে বসে। হেমিংওয়ের অন্যতম সেরা গল্প এটি। এই তিন হাজার শব্দের গল্পের ওপর শতাধিক আলোচনা লেখা হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষভাবে এবং এর ছায়া অবলম্বনে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এখানে আমরা নিককে কৈশোর থেকে তারুণ্যে পৌঁছতে দেখি।

‘ইন অ্যানাদার কান্ট্রি’ গল্পের প্রেক্ষাপট যুদ্ধাকালীন মিলান শহর। এক আমেরিকান এবং পাঁচ ইটালিয়ান সৈনিক আহত হয়েছে। গল্পটি আমেরিকান সৈনিকের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত। সম্ভবত সে নিক অ্যাডামস। সকলের মধ্যে সে আলাদাভাবে নিজেকে চিহ্নিত করে।

তৃতীয় গল্পসংকলন উইনার্স টেক নাথিং প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। এই সংকলনেও ১৪টি গল্প স্থান পায়। হেমিংওয়ের লেখা আমার নিজের সবচেয়ে প্রিয় গল্প ‘আ ক্লিন, ওয়েল-লাইটেড পেইস’ আলোচ্য গ্রন্থভুক্ত গল্প। এই সংকলনের ‘হোমাজ টু সুইজারল্যান্ড’, ‘আ ন্যাচারাল হিস্টোরি অব দ্য ডেড’, ‘আফটার দ্য স্টর্ম’, ‘দ্য সি চেঞ্জ’, ‘আ ডে’স ওয়েট’, ‘দ্য মাদার অব আ কুইন’ প্রভৃতি গল্পও অনেকের প্রিয়।

‘আ ক্লিন, ওয়েল-লাইটেড পেইস’ গল্পে প্রায় শেষরাতে পানশালা থেকে বাড়ি ফেরে বধির বৃদ্ধ চরিত্রটি। পান করছে, দুজন ওয়েটার তার উঠে যাওয়ার অপেক্ষা করছে। তারা তাকে নিয়ে নিজেদের ভেতর কথা বলছে। একজন ওয়েটার জানায় যে বৃদ্ধ সম্প্রতি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। কারণ হিসেবে তারা হতাশাকে চিহ্নিত করে। হতাশার কারণ একজন ওয়েটার জিজ্ঞেস করলে অন্যজন উত্তর করে, ‘নাথিং’। ‘কারণ তার অনেক টাকা আছে’, এরপর যোগ করে সে। ওয়েটাররা দেখে রাতের অন্ধকারে এক সৈনিক এক মেয়েকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। ওয়েটারের একজন বৃদ্ধের গ্লাসে ব্রান্ডি দিতে দিতে বলে, ‘আপনার সেদিন মারা যাওয়া উচিত ছিল।’ যুবক ওয়েটারটি প্রার্থনা করে বৃদ্ধ যেন জলদি উঠে পড়ে, তাহলে সে তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর কাছে যেতে পারবে। ওয়েটারটি ক্যাফে পরিষ্কার ও আলোকোজ্জ্বল করে রাখার কথা চিন্তা করে। সে শেষদিকে ‘আইডিয়া অব নাথিংনেস’ নিয়ে ভাবতে থাকে। এই গল্প থেকে আমরা হেমিংওয়ের সিগনেচার রাইটিং স্টাইল সম্পর্কে জানতে পারি। হেমিংওয়ের মেদহীন ঝরঝরে গদ্য, ছোট ছোট সরল বাক্য, একটি দুটি শব্দে ডায়লগ, চরিত্রদের মূল কথা বাদ দিয়ে হেঁয়ালি করে কথা বলা, পরস্পরকে ঠিকমতো বুঝতে না পারা, কালক্ষেপণের বিষয়টি অর্থাৎ কখন বৃদ্ধের গ্লাসে ব্রান্ডি ঢালা হচ্ছে, কখন বৃদ্ধ উঠে যাচ্ছে সেটি উল্লেখ না করা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য এই গল্পে আছে। আইরিশ কথাশিল্পী জেমস জয়েস গল্পটি পড়ে বলেছিলেন, ‘হেমিংওয়ে সাহিত্য ও জীবনের মাঝের পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছেন। পৌঁছে গেছেন সেখানে, প্রতিটি লেখক যেখানে পৌঁছতে চান।’

‘দ্য সি চেঞ্জ’ বা ‘সমুদ্র পরিবর্তন’ গল্পটি ১৯৩১ সালে দ্য কোয়ার্টার পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। গল্পটির বিষয় উভগামিতা বা বাই-সেক্সুয়ালিটি। হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কেউ কেউ উভগামী ছিলেন, যেমন প্রখ্যাত লেখক গার্ট্রুড স্টেইনের নাম করা যায়। গল্পের শিরোনাম নেওয়া হয়েছে শেক্সপিয়ারের ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এর শিরোনাম থেকে। গল্পটিতে ফিল নামে ছেলেটির এবং অনামা মেয়েটির সম্পর্কের আসন্ন বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যখন তারা মেয়েটির অন্য সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে থাকে। গল্পের শুরুতে তাদের মতানৈক্যকে একটি প্রণয় সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সাধারণ কাহিনি বলেই মনে হবে। পরে ধীরে ধীরে পাঠক গল্পের বিশেষ মোচড়টি অনুভব কতে পারবেন।  যেমন ফিল তার প্রেমিকার সম্পর্ককে ‘বিকৃতি’ বা ‘অন্যায়’ হিসেবে আখ্যা দেয়- যা মেয়েটি মানতে চায় না বা প্রতিবাদ করে। তবে সবকিছুর পরও মেয়েটিকে ক্ষমাপ্রার্থী ও খানিকটা নিষ্ক্রিয় বলেও মনে হয়। ফিলকে সে তার প্রেমের ব্যাপারে বারবার আশ্বস্ত করে। আলোচ্য সংকলনের ‘দ্য মাদার অব আ কুইন’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। হেমিংওয়ে সমকামিতা নিয়ে যে কয়েকটি গল্প লিখেছেন তার মধ্যে ‘দ্য মাদার অব আ কুইন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৩৮ সালের The Fifth Column and the First Forty-Nine Stories শিরোনামে হেমিংওয়ের ছোটগল্পের একটি অ্যানথলজি বের হয়। সেখানে উল্লিখিত তিনটি গ্রন্থের গল্পগুলোর পাশাপাশি হেমিংওয়ের তিনটি বড়গল্প স্থান পায়- ‘দ্য শর্ট হ্যাপি লাইফ অব ফ্রান্সিস ম্যাকম্বার’, ‘দ্য ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘ওল্ড ম্যান অ্যাট দ্য ব্রিজ’। ‘আপ ইন দ্য মিশিগান’ গল্পটিও কিছুটা সম্পাদনার পর হেমিংওয়ে এখানে স্থান দেন। এরপর ‘ওয়ান ট্রিপ অ্যাক্রোস’ এবং ‘দ্য ট্রেডসম্যান’স রিটার্ন’ গল্প দুটি থেকে তিনি ১৯৩৭ সালে টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট শিরোনামে একটি উপন্যাস প্রকাশ করেন।

আলোচ্য সংকলনে স্থান পাওয়া হেমিংওয়ের মিতব্যয়ী কথনের গল্প ‘ব্রিজের ধারে বৃদ্ধ’ (‘ওল্ড ম্যান অ্যাট দ্য ব্রিজ’) প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে কেন ম্যাগাজিনে। গল্পটি যুদ্ধ ও মৃত্যু নিয়ে। স্প্যানিশ সিভিল ওয়ার চলাকালীন একজন যোদ্ধা এবং ৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধের কথোপকথন। সকলে ব্রিজ পেরিয়ে শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। বৃদ্ধ যেতে চায় না। হয়তো এই ব্রিজের ধারেই তার মৃত্যু হবে।

‘কিলিমানজারোর বরফপুঞ্জ’ গল্পটি ১৯৩৬ সালে লেখা। প্রকাশিত হয় Esquire ম্যাগাজিনে। হেমিংওয়ের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং বহুলপঠিত গল্পগুলোর একটি। গল্পটি অবলম্বনে একই শিরোনামে ১৯৫২ সালে আমেরিকান এবং ২০১১ সালে ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কিলিমানজারো দিয়ে গল্পটি শুরু হয়। এই গল্পে হেমিংওয়ে স্ট্রিম অব কনসাসনেসের ব্যবহার করেছেন।

একটি মহৎ সিংহের উপাখ্যান হলো শিশুতোষ ফেবল। এটি ভালোর সঙ্গে মন্দের বিরোধ নিয়ে রচিত। একদিকে হ্যারল্ড ক্রেবজ যান যুদ্ধে, অন্যদিকে ভালো সিংহটি যায় আফ্রিকা। সেখানে তাকে মন্দ সিংহরা গ্রহণ করতে চায় না। গল্পে ভ্রমণের গুরুত্বটাও উঠে এসেছে।

‘দ্য শর্ট হ্যাপি লাইফ অব ফ্রান্সিস ম্যাকম্বার’ গল্পটির প্রেক্ষাপট আফ্রিকা। প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে Cosmopolitan ম্যাগাজিনে। ফ্রান্সিস মাকম্বার এবং তার স্ত্রী মার্গারেট আফ্রিকা যায় শিকারে। সেখানে মাকম্বার ও উইলসন একসঙ্গে শিকারে নামে। ঘটে যায় নাটকীয় এক ঘটনা। স্ত্রীর ভুল ফায়ারে নিহত হয় মাকম্বার। হেমিংওয়ের সবচেয়ে সফল গল্পগুলোর একটি এটি। গল্পটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দুটিই হয়। কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন উইলসনের সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠায় মার্গারেট স্বেচ্ছায় মাকম্বারকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে কোনো কোনো সমালোচক এটাকে দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন।

‘আমি ধারণা করছি তুমি যাই দেখ তা থেকে তোমার অন্য একটা কিছু মনে হয়’ গল্পটি হেমিংওয়ে লেখেন ১৯৫৫ সালে। পিতাপুত্রের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এই গল্পের প্রধান বিষয়। লেখক নিজের ব্যক্তিজীবন থেকে পুত্রের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রেক্ষাপট ধরে গল্পটি লিখেছেন।

হেমিংওয়ের জীবদ্দশায় অগ্রন্থিত গল্পগুলোর ভেতর উল্লেখযোগ্য ছিল- ‘নাইট বিফোর ব্যাটল’, ‘আন্ডার দ্য রিজ’, ‘নোবডি এভার ডাইজ’, ‘দ্য গুড লাইন’, ‘দ্য স্ট্রেঞ্জ ক্যান্ট্রি’, ‘এ ট্রেন ট্রিপ’ প্রভৃতি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত দ্য নিক অ্যাডামস স্টোরিজ গল্প সংকলনে অগ্রন্থিত ‘সামার পিপল’ এবং ‘দ্য লাস্ট গুড কান্ট্রি’ স্থান পায়। হেমিংওয়ের মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পর ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাসিকা দ্য গার্ডেন অব ইডেন-এ ‘অ্যান আফ্রিকান স্টোরি’ গল্পটি অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত এবং ছোট-বড় সব মিলিয়ে হেমিংওয়ের ৭০টির মতো গল্প আমরা পাই।

সূত্র:   বাংলা ট্রিবিউন

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে