Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (35 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১১-০১-২০১৮

একদিন আমিও ছিলাম

স্বকৃত নোমান


একদিন আমিও ছিলাম

ছাত্রজীবনের মতো মধুর সময় আমাদের জীবনে দ্বিতীয়বার আসে না। এই সময়টা আমরা একবারই পাই; শত চেষ্টা করলেও দ্বিতীয়বার পাই না। ছাত্রজীবন যেমন মধুর, তেমনি তিক্তও কম নয়। বিশেষ করে এসএসসি বা এইচএসসি পাসের পর অনেকের জীবনে শুরু হয় এই তিক্ততা। তিক্ততার কারণ একটাই; টাকা। পকেটে যদি টাকা না থাকে, তিক্ততার শেষ থাকে না। আমাদের গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে এই তিক্ততার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব হয় না। কষ্ট করে পড়ালেখার খরচ চালালেও হাতখরচ দেওয়া সম্ভব হয় না। ছাত্রজীবন মানে তো শুধু পড়ালেখা নয়। পরিবারের ছোট্ট গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এই সময়টায় শিক্ষার্থীরা একটা বৃহত্তর পরিসরে পা রাখে। সতীর্থ ও বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে তৈরি হয় আলাদা একটা জগৎ। সেই জগতের মানুষদের সঙ্গে মিশতে হলে তো টাকার প্রয়োজন হয়। যেসব শিক্ষার্থীর সিলেবাসের বাইরের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে, তাদের তো বই-পুস্তক কিনতে হয়। কোথায় পাওয়া যাবে টাকা? দরিদ্র পিতার পক্ষে তো হাতখরচ দেওয়া সম্ভব হয় না। স্বাভাবিক কারণেই শিক্ষার্থীকে অর্থ আয়ের চিন্তা করতে হয়। কীভাবে অর্থ আয় হবে? পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরি তো করা যাবে না। ছাত্রজীবনে চাকরি পাওয়াও সহজ নয়। পেলেও চাকরির পাশাপাশি পড়ালেখা চালানো যায় না। সুতরাং প্রয়োজনমতো টাকা আয়ের একটাই মাধ্যম- টিউশনি। একে আবার 'প্রাইভেট'ও বলা হয়। ছাত্রজীবনে টিউশনির অভিজ্ঞতা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই কমবেশি আছে।

সরল ভাষায় টিউশনি মানে অর্থের বিনিময়ে ছাত্রছাত্রীকে বাড়িতে গিয়ে পড়িয়ে আসা। টিউশনি মাস্টারকে বলা হয় গৃহশিক্ষক। আমাদের দেশে টিউশনি পদ্ধতির শিক্ষা কি নতুন? একটু ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এ ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি অতীতেও ছিল। প্রাচীন ভারতেও গৃহশিক্ষক পদ্ধতির শিক্ষা ছিল। মধ্যযুগে তো ভারতবর্ষে আজকের মতো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। নালন্দার মতো যেসব বিদ্যাপীঠ গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। সেই সময় শিক্ষা পদ্ধতি ছিল মূলত আশ্রম, টোল ও গৃহশিক্ষককেন্দ্রিক। পণ্ডিতরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রদের পাঠদান করতেন। উদাহরণ হিসেবে দিল্লির সম্রাট আলমগীর, রাজকুমার ও মৌলবির সেই কাহিনী উল্লেখ করা যায়। আলমগীরপুত্রকে পড়াতেন এক মৌলবি। বাদশা একদিন দেখলেন, মৌলবি অজু করছেন, আর লোটা থেকে তার পায়ে পানি ঢালছে রাজকুমার। পরদিন সকালে মৌলবিকে ডেকে পাঠালেন বাদশা। কম্পিত বুকে হাজির হলেন মৌলবি। বাদশা বললেন, 'মৌলবি সাহেব, আপনার কাছ থেকে রাজকুমার আদব-কায়দা কিছু শিখছে বলে তো মনে হচ্ছে না।' মৌলবি তো ভয়ে তটস্থ। বাদশা নিশ্চয় রাজকুমারকে দিয়ে পায়ে পানি ঢালার কথাই বলছেন! ভয়ার্ত গলায় বললেন, 'আমার ভুল হয়ে গেছে হুজুর, আমাকে ক্ষমা করুন।' বাদশা রেগে বললেন, 'আমি তো এমনটা চাইনি। আমি চেয়েছি, রাজকুমার আপনার পায়ে শুধু পানি ঢালবে না, যত্ন করে পায়ে হাত বুলিয়ে ধুয়েও দেবে।' তুমুল উচ্ছ্বাসে দাঁড়িয়ে গেলেন মৌলবি। বাদশাকে কুর্নিশ করে বললেন, 'হুজুর, সত্যি আপনি মহান। শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে আপনি মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আপনাকে সহস্র সালাম।'

মধ্যযুগ-পরবর্তী আধুনিককালেও গৃহশিক্ষক পদ্ধতি ছিল। উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কথা বলা যায়। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের সর্ববিষয়ে পারদর্শী করে গড়ে তোলার জন্য স্কুলের পাশাপাশি বাড়িতেও নানা বিষয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। বালক রবির দিন শুরু হতো খেলার সাথীদের সঙ্গে ধুলোমাটি মেখে কুস্তি লড়ার মধ্য দিয়ে। বেলা বাড়লে গৃহশিক্ষকের কাছে বসে যেতেন বাংলা, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস পড়তে। তারপর যেতেন স্কুলে। স্কুল থেকে ফেরার পর ড্রয়িং মাস্টার আসতেন। তাঁর কাছে শিখতেন ছবি আঁকা। সন্ধ্যার পর আসতেন ইংরেজি শিক্ষক। তাঁর কাছে পড়তেন ইংরেজি। আর প্রতি রোববার সকালে আসতেন বিজ্ঞান শিক্ষক। তাঁর কাছে পড়তেন চারুপাঠ, বস্তুবিচার, প্রাণিবৃত্তান্ত ইত্যাদি।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, অধুনা 'টিউশনি' বা 'প্রাইভেট' শিক্ষা পদ্ধতির একটা ধারা ভারতবর্ষে ছিল। তবে সেই কালে এই শিক্ষা পদ্ধতিকে শিক্ষক, পণ্ডিত বা গুরুরা বাণিজ্য হিসেবে নেননি। শিক্ষাদান করে তারা জাগতিক আনন্দের চেয়ে আত্মিক আনন্দই পেতেন বেশি। নিতেন গুরুদক্ষিণা। সেই গুরুদক্ষিণা যে সব সময় অর্থের বিনিময়ে হতো, তা কিন্তু নয়। আমরা তো এখন বিনষ্টির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আমাদের নীতি-নৈতিকতা সব ধ্বংসের মুখে। শিক্ষকরাও আক্রান্ত হয়েছেন সেই ধ্বংসের কবলে। শিক্ষকরা এখন শিক্ষাকে করে তুলেছেন বাণিজ্যিক পণ্য। স্কুল-কলেজে তারা মাস শেষে বেতন পান। সেই বেতনে তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। তাই শুরু করেন কোচিং ব্যবসা। এই ব্যবসা কতটা নৈতিক- সেই প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যদি পড়ালেখার পাশাপাশি যৎসামান্য উপার্জনের লক্ষ্যে টিউশনি করে, সেটাকে আমি অনৈতিক মনে করি না।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে ছাত্রজীবনে আমাকেও অনেক টিউশনি করতে হয়। টিউশনির প্রথম অভিজ্ঞতা সেই ১৯৯৪ সালে, যখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। থাকি গ্রামের বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে বোনের বাড়িতে। থাকা-খাওয়া ফ্রি। বিনিময়ে ভাগিনা-ভাগিনিকে পড়াই। কিন্তু হাতখরচ? বাবা যা দিতেন তাতে চলত না। যা দিতেন তার বেশি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভবও ছিল না। আপা একদিন ঠিক করে দিলেন একটা টিউশনি। সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী ও তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র। দুই ভাই-বোন। রোজ বিকেলে তাদের পড়াতে যাই। মাস শেষে পাই ২শ' টাকা। ছাত্রীটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়লেও বয়সে আমার সমান। মোটামুটি সুন্দরী। আমার বয়স মাত্র চৌদ্দ। ছাত্রীর সামনে বসলে খুব বিব্রত বোধ করি। প্রতিদিন টিউশনি শেষ করে ফেরার সময় মনে হতো, আবার চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা। চব্বিশ ঘণ্টা পর আবার সুন্দরী ছাত্রীর মুখোমুখি বসতে পারব। ওই বয়সটাই এমন। জগতের সবকিছুই সুন্দর মনে হয়। সম্ভবত মাসচারেক দুই ভাইবোনকে পড়াই। তারপর শুরু হয়ে যায় তাদের পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ, আমার টিউশনির মেয়াদও শেষ। পরের বছর আমি চলে গেলাম চট্টগ্রাম।

পড়ালেখার জন্য ফেনীর উত্তর সীমান্ত থেকে আমাকে চট্টগ্রামের পূর্ব সীমান্ত বোয়ালখালী থানার জ্যোষ্টপুরা গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়ার পেছনে আমার পিতার একটা উদ্দেশ্য ছিল। আমার জন্মগ্রাম বিলোনিয়া দক্ষিণ ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী। মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট। গ্রামের বেশিরভাগ নারী-পুরুষ তখন চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। বাবার ভয় ছিল- আমিও যদি এই পথে চলে যাই! তাই মাত্র পনেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে প্রায় শত মাইল দূরে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিলেন। জ্যোষ্টপুরা গ্রামের সম্পন্ন এক গৃহস্থবাড়িতে আমি লজিং থাকি। বাড়ির তিন ছেলেমেয়েকে পড়ানোর বিনিময়ে তিনবেলা ভাত ও থাকার ব্যবস্থা। দুই মাসে একবার বাড়ি যাই। ফেরার সময় বাবা যে টাকা দেন, তাতে দুই মাস চলা কঠিন। আমার ছিল সিগারেটের অভ্যেস। তখন সিজার সিগারেট পাওয়া যেত। পনের বছরের বালককে সিগারেট খেতে দেখলে তো মানুষ খারাপ বলবে। তাই কখনও বাথরুমে, কখনও পুকুরপাড়ের জংলায়, কখনও বা নির্জন জায়গায় গিয়ে সিগারেট ফুঁকতাম। সুতরাং চা-সিগারেটের জন্য বাড়তি টাকা তো লাগবেই।

এক সিনিয়র বন্ধু ঠিক করে দিলেন একটা টিউশনি। দুই ছাত্র; একজন তৃতীয়, অন্যজন পঞ্চম শ্রেণির। মূলত অংক আর ইংরেজি পড়াতে হবে। মাঝেমধ্যে বাংলা। মাস শেষে ৩শ' টাকা সম্মানী। সেই সময় ৩শ' টাকা আমার জন্য অনেক। গোটা এক মাসের খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু ইংরেজিতে ভালো হলেও আমি অংকে ছিলাম দুর্বল। ক্লাস থ্রির অংক পারতাম; ফাইভের অংক আমার জন্য ছিল কিছুটা কঠিন। সব অংক পারতাম না। যেগুলো পারতাম না সেগুলো এক বন্ধুর কাছ থেকে প্রথমে নিজে শিখে নিতাম, তারপর শেখাতাম ছাত্রকে। রোজ বিকেল ৫টায় টিউশনিতে যাই। সে সময়টা আমার ঘোরাঘুরির সময়। বন্ধুদের নিয়ে কখনও কর্ণফুলী নদীর ওপারে চলে যাই, কখনও পুবের পাহাড়ে; কখনও বা হাটে-বাজারে ঘুরে বেড়াই। টিউশনি করাতে গিয়ে ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়ে গেল। মনটা খুব খারাপ হয়ে থাকে। তবে একটা লাভ হয়। প্রতিদিন বিকেলে খুব খিদা লাগে। লজিং বাড়িতে তো ভাত দেবে সেই রাত ৮টায়! বিকেলে তো কিছু না কিছু খেতে হয়। দোকানের গরম জিলাপি, শিঙ্গাড়া, পুরি, চোলা ইত্যাদি দেখলেই পেটটা ছোঁ ছোঁ করে ওঠে। কিন্তু খাওয়ার মতো সব সময় পকেটে টাকা থাকে না। টিউশনি করাতে গেলে প্রতিদিনই আমাকে কিছু না কিছু খেতে দেয়। কখনও চা-বিস্কিট, কখনও চা-মুড়ি, কখনও চা-চানাচুর, কখনও বা পিঠাপুলি। খাবারের লোভে ঘোরাঘুরির ইচ্ছেটাকে চাপা দিয়ে রাখি। কিন্তু ঘোরাঘুরি বাদ দিয়ে টিউশনি করানোটা একটা সময় আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। দুই মাস পর ছেড়ে দিলাম। কয়েক মাস পর অবশ্য আমারও পরীক্ষা শুরু হয়। তখন চাইলেও আর টিউশনি করাতে পারতাম না।

চট্টগ্রামের পাট চুকিয়ে চলে এলাম ফেনী। থাকি ফেনী শহরের অদূরে সোনাগাজী উপজেলার এক গৃহস্থবাড়িতে। লজিং মাস্টার হিসেবে। বাড়তি আয়ের জন্য আবারও টিউশনির সন্ধান করতে হলো। পেয়েও গেলাম। দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে সব বিষয়ে পড়াতে হবে। প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা। মাসে আড়াইশ' টাকা সম্মানী। প্রথম দিন গেলাম পড়াতে। ছাত্রী আমাকে দেখেই চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। তার মা আর দাদি এসে তাকে অনেক বোঝাল- 'ভয়ের কিছু নাই, এটা তোমার ভাইয়া হয়। তোমাকে মারবে না; আদর করে পড়াবে।' ছাত্রী শান্ত হলো। বই নিয়ে পড়তে বসল। যেই না তাকে মুখে মুখে ছড়া পড়াতে শুরু করলাম অমনি আবার চিৎকার। ছুটে এলো তার মা। আবার বোঝাতে শুরু করল। না, কোনো বুঝই মানল না মেয়ে। অগত্যা মেয়ের মা আমাকে বলল, আমি যেন আগামীকাল আবার আসি। আজ হয়তো কোনো কারণে মেয়ের মন খারাপ। পরদিন যথাসময়ে আমি গেলাম। রহস্যজনক কারণে আজও মেয়ে আমাকে দেখে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। তৃতীয় দিনও গেলাম। অনেক আদর করে কাছে বসিয়ে পড়াতে চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। মেয়ে আমার কাছে পড়বেই না। কী আর করা! বিদায় নিয়ে চলে এলাম। মেয়ের মা আমাকে ১শ' টাকার একটা নোট দিলেন। কষ্ট করে তিন দিন আমি পড়াতে এসেছি। দোষ তো আমার নয়। মেয়ে পড়ছে না, আমার কী করার আছে? টাকাটা আমি নিতে চাইলাম না। মেয়ের মা জোর করে আমার পকেটে টাকাটা ঢুকিয়ে দিলেন। এই টাকা নিয়ে পরদিন চলে গেলাম ফেনী শহরে। তখন সুরত মহল সিনেমা হল বিখ্যাত। টিকিটের জন্য কাড়াকাড়ি লেগে যায়। সম্ভবত সেই প্রথম আমি কেবিনে বসে সিনেমা দেখি। এর আগে দেখেছি সেকেন্ড বা থার্ড ক্লাসে বসে।

কুড়ি-একুশ বছর বয়সে আমার গ্রামেই আমি টিউশনি করি। দুই ছাত্রী। ক্লাস সেভেনের একজন, ক্লাস এইটের একজন। মাসে আড়াইশ' করে ৫শ' টাকা সম্মানী। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পড়াতে যাই। সেভেনের ছাত্রীটি এইটের ছাত্রীটির বাড়িতে আসে। আমি ওই বাড়িতেই যাই। অংক আর ইংরেজি পড়াই। অংকের জন্য আমি এক বন্ধুর কাছ থেকে দুটো গাইড সংগ্রহ করি। সেভেনের একটি, এইটের একটি। গাইড দেখে আগে নিজে অংকগুলো ভালো করে বুঝে নিই, তারপর ছাত্রীদের পড়াই। সেভেনের ছাত্রীটি বেশ মেধাবী, এইটের ছাত্রীটি বোকা। একটা অংক দশবার বোঝালেও তার মাথায় ঢোকে না। একদিন পাটিগণিত পড়ালে অন্যদিন বীজগণিত পড়াই। প্রতিদিন চার-পাঁচটার বেশি অংক করাই না। এর বেশি করাতে গেলে তো আমার সমস্যা। কারণ অংকগুলো যে আগে আমাকে বুঝে নিতে হয়।

একদিন সেভেনের ছাত্রীটি আমাকে বইয়ের মাঝখান থেকে পাটিগণিতের একটা অংক বুঝিয়ে দিতে বলল। আমি কী করি? আমার তো প্রস্তুতি নেই। গাইড ছাড়া আমি কী করে বোঝাই? ছাত্রীকে বললাম, 'দেখো, আমি তো বইয়ের শুরু থেকে অংক করাচ্ছি। হুট করে মাঝখান থেকে কেন?' ছাত্রী বলল, 'স্কুলের স্যার বলেছেন আগামীকাল যেন অংকটা বাড়ি থেকে করে নিয়ে যাই।' নিজের দুর্বলতা ঢাকতে আমি খানিকটা রেগে গেলাম। বললাম, 'না না, একটা ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। বইয়ের শুরু থেকে তোমাকে অংক বুঝে আসতে হবে। মাঝখান থেকে হুট করে আমি অংক করাতে পারব না।' ছাত্রী আর কথা বলল না। আমারও ইজ্জত রক্ষা পেল। ছাত্রীটি যদি জোর করত, তবে সেদিন অংক না পারার দায়ে তাদের কাছে লজ্জিত হতে হতো। 

দুই ছাত্রীকে প্রায় চার মাস পড়ালাম। সেভেনের ছাত্রীটির বাবা প্রতি মাসেই আমার প্রাপ্য সম্মানী দিয়ে দিত। তিন মাসের সম্মানী পেলাম। চতুর্থ মাসেরটা পেলাম না। আর এইটের ছাত্রীটির অভিভাবক আমাকে এক মাসের টাকাও দিল না। তাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তবে ইচ্ছে করলেই আমার টাকাটা দিয়ে দিতে পারত। আমিও আর চাইনি, তারাও দেয়নি। পরবর্তীকালে আমি আর টিউশনি করিনি। এর পর শুরু করি সাংবাদিকতা। তাই টিউশনি করার আর দরকার পড়েনি।

ছাত্রজীবনে আমার অনেক বন্ধু ছিল, যারা বাবা-মায়ের কাছ থেকে এক টাকাও আনত না, নিজে টিউশনি করেই পড়ালেখার খরচ জোগাত। ২০০০ সালের দিকে আমি ঢাকার বনানীর একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি করি। পাশাপাশি করি পড়ালেখা। থাকি অফিস-সংলগ্ন মেসে। উত্তর বাড্ডায় থাকত মামুন নামে আমার এক বন্ধু। তার বাড়ি কাপাসিয়া কি কালীগঞ্জের ওদিকে। ম্যাট্রিক পাস করার পর কখনও বাড়ি থেকে টাকা আনেনি। পড়ত তিতুমীর কলেজে। প্রতিদিন ক্লাসে যেত না। একটা সাইকেল ছিল তার। সেই সাইকেলে করে উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, বনানী, নতুন বাজার এলাকায় টিউশনি করে বেড়াত। মাসে আট-নয় হাজার টাকা আয় করত। মেসের খরচ ও পড়ালেখার খরচ বাদ দিয়ে যা অবশিষ্ট থাকত, তা পাঠিয়ে দিত পরিবারের জন্য। মধ্য বাড্ডার এক ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়াত মামুন। একদিন খবর পেলাম, সেই ছাত্রীর সঙ্গে তার প্রেম চলছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাকে বিয়ে করবে। সত্যি সত্যি একদিন সেই মেয়েকে বিয়ে করল। আমি চাকরি ছেড়ে চলে গেলাম বাড়িতে। মামুনকেও হারিয়ে ফেললাম চিরতরে। আর কখনও দেখা হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে কি-না জানি না।

গ্রাম থেকে যারা রাজধানী ঢাকায় পড়ালেখা করতে আসে, তাদের অধিকাংশকেই নির্ভর করতে হয় টিউশনির ওপর। পরিবার থেকে হাত খরচের টাকা যতই আনুক না কেন, মাসের শেষে হাত ফাঁকা থাকবেই। এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ খুঁজে নেন টিউশনি। আবার অনেক চাকরিজীবীও বাড়তি আয়ের জন্য চাকরির পাশাপাশি যুক্ত হন টিউশনিতে। গৃহিণীরাও পিছিয়ে নেই। তাদের অনেকেই আয়ের জন্য বেছে নেন টিউশনি। অনেকে আবার ইচ্ছা থাকলেও মিলাতে পারেন না টিউশনি। এ জন্য ভরসা করতে হয় পরিচিতদের ওপর। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে টিউশন খুঁজে দেওয়াকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে নানান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যেমন 'টিউটর দিচ্ছি নিচ্ছি', 'টিউশন বিডি', 'ঢাকা টিউশন মিডিয়া', 'টিউশন মিডিয়া লিমিটেড', 'ঢাকা টিউটর' প্রভৃতি। এসব অনলাইনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টিউশনি পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাও কম নয়। 

আমার মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এখন তাকে প্রাইভেট পড়তে হয়। তার জন্য গৃহশিক্ষক খুঁজতে গিয়ে বিচিত্র রকমের অভিজ্ঞতা হয় আমার। শহরের অলিগলিতে নানা সাইনবোর্ড আর পোস্টার দেখতে পাই, যেখানে লেখা- 'গৃহশিক্ষক দিচ্ছি, নিচ্ছি।' একদিন এ রকম এক বিজ্ঞপ্তি দেখে ফোন দিলাম। কথা বলে জানলাম, গৃহশিক্ষক যদি বাসায় এসে সব সাবজেক্ট পড়ায় তবে তাকে দিতে হবে মাসে ১০ হাজার টাকা। আর যদি শুধু অংক-ইংরেজি পড়ায় তবে দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা। আমার সাহস হলো না। এত টাকা দিয়ে গৃহশিক্ষক রাখা স্বল্প আয়ের আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। শুধু অংকের জন্য এক মাস্টার ঠিক করল মেয়ের মা। মাস্টার বাসায় আসবে না; মাস্টারের বাসায় গিয়ে মেয়েকে পড়ে আসতে হবে। প্রতি মাসে দিতে হবে ১৫শ' টাকা। প্রায় পাঁচ মাস পড়ল মেয়ে। সামনে তার পরীক্ষা। এখন আর পড়ার দরকার নেই বলে বাদ দিয়েছে।

ছাত্রজীবনের মতো মধুর সময় আমাদের জীবনে দ্বিতীয়বার আসে না। এই সময়টা আমরা একবারই পাই; শত চেষ্টা করলেও দ্বিতীয়বার পাই না। ছাত্রজীবন যেমন মধুর, তেমনি তিক্তও কম নয়। বিশেষ করে এসএসসি বা এইচএসসি পাসের পর অনেকের জীবনে শুরু হয় এই তিক্ততা। তিক্ততার কারণ একটাই; টাকা। পকেটে যদি টাকা না থাকে, তিক্ততার শেষ থাকে না। আমাদের গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে এই তিক্ততার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব হয় না। কষ্ট করে পড়ালেখার খরচ চালালেও হাতখরচ দেওয়া সম্ভব হয় না। ছাত্রজীবন মানে তো শুধু পড়ালেখা নয়। পরিবারের ছোট্ট গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এই সময়টায় শিক্ষার্থীরা একটা বৃহত্তর পরিসরে পা রাখে। সতীর্থ ও বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে তৈরি হয় আলাদা একটা জগৎ। সেই জগতের মানুষদের সঙ্গে মিশতে হলে তো টাকার প্রয়োজন হয়। যেসব শিক্ষার্থীর সিলেবাসের বাইরের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে, তাদের তো বই-পুস্তক কিনতে হয়। কোথায় পাওয়া যাবে টাকা? দরিদ্র পিতার পক্ষে তো হাতখরচ দেওয়া সম্ভব হয় না। স্বাভাবিক কারণেই শিক্ষার্থীকে অর্থ আয়ের চিন্তা করতে হয়। কীভাবে অর্থ আয় হবে? পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরি তো করা যাবে না। ছাত্রজীবনে চাকরি পাওয়াও সহজ নয়। পেলেও চাকরির পাশাপাশি পড়ালেখা চালানো যায় না। সুতরাং প্রয়োজনমতো টাকা আয়ের একটাই মাধ্যম- টিউশনি। একে আবার 'প্রাইভেট'ও বলা হয়। ছাত্রজীবনে টিউশনির অভিজ্ঞতা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই কমবেশি আছে।

সরল ভাষায় টিউশনি মানে অর্থের বিনিময়ে ছাত্রছাত্রীকে বাড়িতে গিয়ে পড়িয়ে আসা। টিউশনি মাস্টারকে বলা হয় গৃহশিক্ষক। আমাদের দেশে টিউশনি পদ্ধতির শিক্ষা কি নতুন? একটু ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এ ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি অতীতেও ছিল। প্রাচীন ভারতেও গৃহশিক্ষক পদ্ধতির শিক্ষা ছিল। মধ্যযুগে তো ভারতবর্ষে আজকের মতো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। নালন্দার মতো যেসব বিদ্যাপীঠ গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। সেই সময় শিক্ষা পদ্ধতি ছিল মূলত আশ্রম, টোল ও গৃহশিক্ষককেন্দ্রিক। পণ্ডিতরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রদের পাঠদান করতেন। উদাহরণ হিসেবে দিল্লির সম্রাট আলমগীর, রাজকুমার ও মৌলবির সেই কাহিনী উল্লেখ করা যায়। আলমগীরপুত্রকে পড়াতেন এক মৌলবি। বাদশা একদিন দেখলেন, মৌলবি অজু করছেন, আর লোটা থেকে তার পায়ে পানি ঢালছে রাজকুমার। পরদিন সকালে মৌলবিকে ডেকে পাঠালেন বাদশা। কম্পিত বুকে হাজির হলেন মৌলবি। বাদশা বললেন, 'মৌলবি সাহেব, আপনার কাছ থেকে রাজকুমার আদব-কায়দা কিছু শিখছে বলে তো মনে হচ্ছে না।' মৌলবি তো ভয়ে তটস্থ। বাদশা নিশ্চয় রাজকুমারকে দিয়ে পায়ে পানি ঢালার কথাই বলছেন! ভয়ার্ত গলায় বললেন, 'আমার ভুল হয়ে গেছে হুজুর, আমাকে ক্ষমা করুন।' বাদশা রেগে বললেন, 'আমি তো এমনটা চাইনি। আমি চেয়েছি, রাজকুমার আপনার পায়ে শুধু পানি ঢালবে না, যত্ন করে পায়ে হাত বুলিয়ে ধুয়েও দেবে।' তুমুল উচ্ছ্বাসে দাঁড়িয়ে গেলেন মৌলবি। বাদশাকে কুর্নিশ করে বললেন, 'হুজুর, সত্যি আপনি মহান। শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে আপনি মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আপনাকে সহস্র সালাম।'

মধ্যযুগ-পরবর্তী আধুনিককালেও গৃহশিক্ষক পদ্ধতি ছিল। উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কথা বলা যায়। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের সর্ববিষয়ে পারদর্শী করে গড়ে তোলার জন্য স্কুলের পাশাপাশি বাড়িতেও নানা বিষয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। বালক রবির দিন শুরু হতো খেলার সাথীদের সঙ্গে ধুলোমাটি মেখে কুস্তি লড়ার মধ্য দিয়ে। বেলা বাড়লে গৃহশিক্ষকের কাছে বসে যেতেন বাংলা, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস পড়তে। তারপর যেতেন স্কুলে। স্কুল থেকে ফেরার পর ড্রয়িং মাস্টার আসতেন। তাঁর কাছে শিখতেন ছবি আঁকা। সন্ধ্যার পর আসতেন ইংরেজি শিক্ষক। তাঁর কাছে পড়তেন ইংরেজি। আর প্রতি রোববার সকালে আসতেন বিজ্ঞান শিক্ষক। তাঁর কাছে পড়তেন চারুপাঠ, বস্তুবিচার, প্রাণিবৃত্তান্ত ইত্যাদি।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, অধুনা 'টিউশনি' বা 'প্রাইভেট' শিক্ষা পদ্ধতির একটা ধারা ভারতবর্ষে ছিল। তবে সেই কালে এই শিক্ষা পদ্ধতিকে শিক্ষক, পণ্ডিত বা গুরুরা বাণিজ্য হিসেবে নেননি। শিক্ষাদান করে তারা জাগতিক আনন্দের চেয়ে আত্মিক আনন্দই পেতেন বেশি। নিতেন গুরুদক্ষিণা। সেই গুরুদক্ষিণা যে সব সময় অর্থের বিনিময়ে হতো, তা কিন্তু নয়। আমরা তো এখন বিনষ্টির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আমাদের নীতি-নৈতিকতা সব ধ্বংসের মুখে। শিক্ষকরাও আক্রান্ত হয়েছেন সেই ধ্বংসের কবলে। শিক্ষকরা এখন শিক্ষাকে করে তুলেছেন বাণিজ্যিক পণ্য। স্কুল-কলেজে তারা মাস শেষে বেতন পান। সেই বেতনে তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। তাই শুরু করেন কোচিং ব্যবসা। এই ব্যবসা কতটা নৈতিক- সেই প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যদি পড়ালেখার পাশাপাশি যৎসামান্য উপার্জনের লক্ষ্যে টিউশনি করে, সেটাকে আমি অনৈতিক মনে করি না।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে ছাত্রজীবনে আমাকেও অনেক টিউশনি করতে হয়। টিউশনির প্রথম অভিজ্ঞতা সেই ১৯৯৪ সালে, যখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র। থাকি গ্রামের বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে বোনের বাড়িতে। থাকা-খাওয়া ফ্রি। বিনিময়ে ভাগিনা-ভাগিনিকে পড়াই। কিন্তু হাতখরচ? বাবা যা দিতেন তাতে চলত না। যা দিতেন তার বেশি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভবও ছিল না। আপা একদিন ঠিক করে দিলেন একটা টিউশনি। সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী ও তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র। দুই ভাই-বোন। রোজ বিকেলে তাদের পড়াতে যাই। মাস শেষে পাই ২শ' টাকা। ছাত্রীটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়লেও বয়সে আমার সমান। মোটামুটি সুন্দরী। আমার বয়স মাত্র চৌদ্দ। ছাত্রীর সামনে বসলে খুব বিব্রত বোধ করি। প্রতিদিন টিউশনি শেষ করে ফেরার সময় মনে হতো, আবার চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা। চব্বিশ ঘণ্টা পর আবার সুন্দরী ছাত্রীর মুখোমুখি বসতে পারব। ওই বয়সটাই এমন। জগতের সবকিছুই সুন্দর মনে হয়। সম্ভবত মাসচারেক দুই ভাইবোনকে পড়াই। তারপর শুরু হয়ে যায় তাদের পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ, আমার টিউশনির মেয়াদও শেষ। পরের বছর আমি চলে গেলাম চট্টগ্রাম।

পড়ালেখার জন্য ফেনীর উত্তর সীমান্ত থেকে আমাকে চট্টগ্রামের পূর্ব সীমান্ত বোয়ালখালী থানার জ্যোষ্টপুরা গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়ার পেছনে আমার পিতার একটা উদ্দেশ্য ছিল। আমার জন্মগ্রাম বিলোনিয়া দক্ষিণ ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী। মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট। গ্রামের বেশিরভাগ নারী-পুরুষ তখন চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। বাবার ভয় ছিল- আমিও যদি এই পথে চলে যাই! তাই মাত্র পনেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে প্রায় শত মাইল দূরে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দিলেন। জ্যোষ্টপুরা গ্রামের সম্পন্ন এক গৃহস্থবাড়িতে আমি লজিং থাকি। বাড়ির তিন ছেলেমেয়েকে পড়ানোর বিনিময়ে তিনবেলা ভাত ও থাকার ব্যবস্থা। দুই মাসে একবার বাড়ি যাই। ফেরার সময় বাবা যে টাকা দেন, তাতে দুই মাস চলা কঠিন। আমার ছিল সিগারেটের অভ্যেস। তখন সিজার সিগারেট পাওয়া যেত। পনের বছরের বালককে সিগারেট খেতে দেখলে তো মানুষ খারাপ বলবে। তাই কখনও বাথরুমে, কখনও পুকুরপাড়ের জংলায়, কখনও বা নির্জন জায়গায় গিয়ে সিগারেট ফুঁকতাম। সুতরাং চা-সিগারেটের জন্য বাড়তি টাকা তো লাগবেই।

এক সিনিয়র বন্ধু ঠিক করে দিলেন একটা টিউশনি। দুই ছাত্র; একজন তৃতীয়, অন্যজন পঞ্চম শ্রেণির। মূলত অংক আর ইংরেজি পড়াতে হবে। মাঝেমধ্যে বাংলা। মাস শেষে ৩শ' টাকা সম্মানী। সেই সময় ৩শ' টাকা আমার জন্য অনেক। গোটা এক মাসের খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু ইংরেজিতে ভালো হলেও আমি অংকে ছিলাম দুর্বল। ক্লাস থ্রির অংক পারতাম; ফাইভের অংক আমার জন্য ছিল কিছুটা কঠিন। সব অংক পারতাম না। যেগুলো পারতাম না সেগুলো এক বন্ধুর কাছ থেকে প্রথমে নিজে শিখে নিতাম, তারপর শেখাতাম ছাত্রকে। রোজ বিকেল ৫টায় টিউশনিতে যাই। সে সময়টা আমার ঘোরাঘুরির সময়। বন্ধুদের নিয়ে কখনও কর্ণফুলী নদীর ওপারে চলে যাই, কখনও পুবের পাহাড়ে; কখনও বা হাটে-বাজারে ঘুরে বেড়াই। টিউশনি করাতে গিয়ে ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়ে গেল। মনটা খুব খারাপ হয়ে থাকে। তবে একটা লাভ হয়। প্রতিদিন বিকেলে খুব খিদা লাগে। লজিং বাড়িতে তো ভাত দেবে সেই রাত ৮টায়! বিকেলে তো কিছু না কিছু খেতে হয়। দোকানের গরম জিলাপি, শিঙ্গাড়া, পুরি, চোলা ইত্যাদি দেখলেই পেটটা ছোঁ ছোঁ করে ওঠে। কিন্তু খাওয়ার মতো সব সময় পকেটে টাকা থাকে না। টিউশনি করাতে গেলে প্রতিদিনই আমাকে কিছু না কিছু খেতে দেয়। কখনও চা-বিস্কিট, কখনও চা-মুড়ি, কখনও চা-চানাচুর, কখনও বা পিঠাপুলি। খাবারের লোভে ঘোরাঘুরির ইচ্ছেটাকে চাপা দিয়ে রাখি। কিন্তু ঘোরাঘুরি বাদ দিয়ে টিউশনি করানোটা একটা সময় আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। দুই মাস পর ছেড়ে দিলাম। কয়েক মাস পর অবশ্য আমারও পরীক্ষা শুরু হয়। তখন চাইলেও আর টিউশনি করাতে পারতাম না।

চট্টগ্রামের পাট চুকিয়ে চলে এলাম ফেনী। থাকি ফেনী শহরের অদূরে সোনাগাজী উপজেলার এক গৃহস্থবাড়িতে। লজিং মাস্টার হিসেবে। বাড়তি আয়ের জন্য আবারও টিউশনির সন্ধান করতে হলো। পেয়েও গেলাম। দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে সব বিষয়ে পড়াতে হবে। প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা। মাসে আড়াইশ' টাকা সম্মানী। প্রথম দিন গেলাম পড়াতে। ছাত্রী আমাকে দেখেই চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। তার মা আর দাদি এসে তাকে অনেক বোঝাল- 'ভয়ের কিছু নাই, এটা তোমার ভাইয়া হয়। তোমাকে মারবে না; আদর করে পড়াবে।' ছাত্রী শান্ত হলো। বই নিয়ে পড়তে বসল। যেই না তাকে মুখে মুখে ছড়া পড়াতে শুরু করলাম অমনি আবার চিৎকার। ছুটে এলো তার মা। আবার বোঝাতে শুরু করল। না, কোনো বুঝই মানল না মেয়ে। অগত্যা মেয়ের মা আমাকে বলল, আমি যেন আগামীকাল আবার আসি। আজ হয়তো কোনো কারণে মেয়ের মন খারাপ। পরদিন যথাসময়ে আমি গেলাম। রহস্যজনক কারণে আজও মেয়ে আমাকে দেখে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। তৃতীয় দিনও গেলাম। অনেক আদর করে কাছে বসিয়ে পড়াতে চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। মেয়ে আমার কাছে পড়বেই না। কী আর করা! বিদায় নিয়ে চলে এলাম। মেয়ের মা আমাকে ১শ' টাকার একটা নোট দিলেন। কষ্ট করে তিন দিন আমি পড়াতে এসেছি। দোষ তো আমার নয়। মেয়ে পড়ছে না, আমার কী করার আছে? টাকাটা আমি নিতে চাইলাম না। মেয়ের মা জোর করে আমার পকেটে টাকাটা ঢুকিয়ে দিলেন। এই টাকা নিয়ে পরদিন চলে গেলাম ফেনী শহরে। তখন সুরত মহল সিনেমা হল বিখ্যাত। টিকিটের জন্য কাড়াকাড়ি লেগে যায়। সম্ভবত সেই প্রথম আমি কেবিনে বসে সিনেমা দেখি। এর আগে দেখেছি সেকেন্ড বা থার্ড ক্লাসে বসে।

কুড়ি-একুশ বছর বয়সে আমার গ্রামেই আমি টিউশনি করি। দুই ছাত্রী। ক্লাস সেভেনের একজন, ক্লাস এইটের একজন। মাসে আড়াইশ' করে ৫শ' টাকা সম্মানী। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পড়াতে যাই। সেভেনের ছাত্রীটি এইটের ছাত্রীটির বাড়িতে আসে। আমি ওই বাড়িতেই যাই। অংক আর ইংরেজি পড়াই। অংকের জন্য আমি এক বন্ধুর কাছ থেকে দুটো গাইড সংগ্রহ করি। সেভেনের একটি, এইটের একটি। গাইড দেখে আগে নিজে অংকগুলো ভালো করে বুঝে নিই, তারপর ছাত্রীদের পড়াই। সেভেনের ছাত্রীটি বেশ মেধাবী, এইটের ছাত্রীটি বোকা। একটা অংক দশবার বোঝালেও তার মাথায় ঢোকে না। একদিন পাটিগণিত পড়ালে অন্যদিন বীজগণিত পড়াই। প্রতিদিন চার-পাঁচটার বেশি অংক করাই না। এর বেশি করাতে গেলে তো আমার সমস্যা। কারণ অংকগুলো যে আগে আমাকে বুঝে নিতে হয়।

একদিন সেভেনের ছাত্রীটি আমাকে বইয়ের মাঝখান থেকে পাটিগণিতের একটা অংক বুঝিয়ে দিতে বলল। আমি কী করি? আমার তো প্রস্তুতি নেই। গাইড ছাড়া আমি কী করে বোঝাই? ছাত্রীকে বললাম, 'দেখো, আমি তো বইয়ের শুরু থেকে অংক করাচ্ছি। হুট করে মাঝখান থেকে কেন?' ছাত্রী বলল, 'স্কুলের স্যার বলেছেন আগামীকাল যেন অংকটা বাড়ি থেকে করে নিয়ে যাই।' নিজের দুর্বলতা ঢাকতে আমি খানিকটা রেগে গেলাম। বললাম, 'না না, একটা ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। বইয়ের শুরু থেকে তোমাকে অংক বুঝে আসতে হবে। মাঝখান থেকে হুট করে আমি অংক করাতে পারব না।' ছাত্রী আর কথা বলল না। আমারও ইজ্জত রক্ষা পেল। ছাত্রীটি যদি জোর করত, তবে সেদিন অংক না পারার দায়ে তাদের কাছে লজ্জিত হতে হতো। 

দুই ছাত্রীকে প্রায় চার মাস পড়ালাম। সেভেনের ছাত্রীটির বাবা প্রতি মাসেই আমার প্রাপ্য সম্মানী দিয়ে দিত। তিন মাসের সম্মানী পেলাম। চতুর্থ মাসেরটা পেলাম না। আর এইটের ছাত্রীটির অভিভাবক আমাকে এক মাসের টাকাও দিল না। তাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তবে ইচ্ছে করলেই আমার টাকাটা দিয়ে দিতে পারত। আমিও আর চাইনি, তারাও দেয়নি। পরবর্তীকালে আমি আর টিউশনি করিনি। এর পর শুরু করি সাংবাদিকতা। তাই টিউশনি করার আর দরকার পড়েনি।

ছাত্রজীবনে আমার অনেক বন্ধু ছিল, যারা বাবা-মায়ের কাছ থেকে এক টাকাও আনত না, নিজে টিউশনি করেই পড়ালেখার খরচ জোগাত। ২০০০ সালের দিকে আমি ঢাকার বনানীর একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি করি। পাশাপাশি করি পড়ালেখা। থাকি অফিস-সংলগ্ন মেসে। উত্তর বাড্ডায় থাকত মামুন নামে আমার এক বন্ধু। তার বাড়ি কাপাসিয়া কি কালীগঞ্জের ওদিকে। ম্যাট্রিক পাস করার পর কখনও বাড়ি থেকে টাকা আনেনি। পড়ত তিতুমীর কলেজে। প্রতিদিন ক্লাসে যেত না। একটা সাইকেল ছিল তার। সেই সাইকেলে করে উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, বনানী, নতুন বাজার এলাকায় টিউশনি করে বেড়াত। মাসে আট-নয় হাজার টাকা আয় করত। মেসের খরচ ও পড়ালেখার খরচ বাদ দিয়ে যা অবশিষ্ট থাকত, তা পাঠিয়ে দিত পরিবারের জন্য। মধ্য বাড্ডার এক ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়াত মামুন। একদিন খবর পেলাম, সেই ছাত্রীর সঙ্গে তার প্রেম চলছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাকে বিয়ে করবে। সত্যি সত্যি একদিন সেই মেয়েকে বিয়ে করল। আমি চাকরি ছেড়ে চলে গেলাম বাড়িতে। মামুনকেও হারিয়ে ফেললাম চিরতরে। আর কখনও দেখা হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে কি-না জানি না।

গ্রাম থেকে যারা রাজধানী ঢাকায় পড়ালেখা করতে আসে, তাদের অধিকাংশকেই নির্ভর করতে হয় টিউশনির ওপর। পরিবার থেকে হাত খরচের টাকা যতই আনুক না কেন, মাসের শেষে হাত ফাঁকা থাকবেই। এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ খুঁজে নেন টিউশনি। আবার অনেক চাকরিজীবীও বাড়তি আয়ের জন্য চাকরির পাশাপাশি যুক্ত হন টিউশনিতে। গৃহিণীরাও পিছিয়ে নেই। তাদের অনেকেই আয়ের জন্য বেছে নেন টিউশনি। অনেকে আবার ইচ্ছা থাকলেও মিলাতে পারেন না টিউশনি। এ জন্য ভরসা করতে হয় পরিচিতদের ওপর। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে টিউশন খুঁজে দেওয়াকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে নানান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যেমন 'টিউটর দিচ্ছি নিচ্ছি', 'টিউশন বিডি', 'ঢাকা টিউশন মিডিয়া', 'টিউশন মিডিয়া লিমিটেড', 'ঢাকা টিউটর' প্রভৃতি। এসব অনলাইনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টিউশনি পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাও কম নয়। 

আমার মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এখন তাকে প্রাইভেট পড়তে হয়। তার জন্য গৃহশিক্ষক খুঁজতে গিয়ে বিচিত্র রকমের অভিজ্ঞতা হয় আমার। শহরের অলিগলিতে নানা সাইনবোর্ড আর পোস্টার দেখতে পাই, যেখানে লেখা- 'গৃহশিক্ষক দিচ্ছি, নিচ্ছি।' একদিন এ রকম এক বিজ্ঞপ্তি দেখে ফোন দিলাম। কথা বলে জানলাম, গৃহশিক্ষক যদি বাসায় এসে সব সাবজেক্ট পড়ায় তবে তাকে দিতে হবে মাসে ১০ হাজার টাকা। আর যদি শুধু অংক-ইংরেজি পড়ায় তবে দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা। আমার সাহস হলো না। এত টাকা দিয়ে গৃহশিক্ষক রাখা স্বল্প আয়ের আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। শুধু অংকের জন্য এক মাস্টার ঠিক করল মেয়ের মা। মাস্টার বাসায় আসবে না; মাস্টারের বাসায় গিয়ে মেয়েকে পড়ে আসতে হবে। প্রতি মাসে দিতে হবে ১৫শ' টাকা। প্রায় পাঁচ মাস পড়ল মেয়ে। সামনে তার পরীক্ষা। এখন আর পড়ার দরকার নেই বলে বাদ দিয়েছে।

এমএ/ ০৮:৪৪/ ০১ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে