Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (40 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১০-৩০-২০১৮

কাশীনগরে ভারতের এক টুকরো শুভেচ্ছা

মনজুরুল আহসান বুলবুল


কাশীনগরে ভারতের এক টুকরো শুভেচ্ছা

গোমড়ামুখো আবহাওয়াকে খুব গুরুত্ব না দিয়ে ২৮ অক্টোবর সকালে হেলিকপ্টারটি যখন উড়াল দিল, তখন জানা গেল সবাই যাচ্ছে এক অজপাড়াগাঁয়ে। কোনো জেলা বা উপজেলা সদর নয়; এমনকি পৌর শহরও নয়, গন্তব্য চৌদ্দগ্রামের এক গ্রামে। ভারতের মান্যবর হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ভোরে ফ্লাইট ধরে পৌঁছেছেন কক্সবাজার থেকে। বিমান থেকে নেমেই হেলিকপ্টারে আসীন। কূটনৈতিক আচরণের আবরণে ক্লান্তি ঢাকার চেষ্টা করছেন; কিন্তু উৎসাহেও ঘাটতি নেই।

সরকারি তথ্য জানান দিচ্ছে :চৌদ্দগ্রাম উপজেলার দক্ষিণে ফেনী; উত্তরে কুমিল্লা ও সদর দক্ষিণ উপজেলা; পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে নাঙ্গলকোট ও লাকসামের কিছু অংশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে :আগরতলার মহারাজা রাজা বীরেন্দ্র বিক্রম কিশোর মানিক বাহাদুরের খুবই প্রিয় ছিল এই চৌদ্দগ্রাম এলাকা। এই অঞ্চল থেকে রাজার খাজাঞ্চিখানায় প্রচুর রাজস্ব জমা হতো। উদার রাজা এ অঞ্চলে অনেক জনহিতকর কাজও করেছেন। চৌদ্দগ্রামের বড় বড় জলাশয় ও দিঘিগুলো তার পরিচয় বহন করে। খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলকে পরগনা বলে অভিহিত করা হতো। চৌদ্দগ্রামেও একটি পরগনার সদর দপ্তর ছিল। এই পরগনাটি চৌদ্দটি গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ছিল বলে এর নামকরণ হয় চৌদ্দগ্রাম। পরবর্তী সময়ে যখন ১৯০৫ সালে থানা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কেন্দ্রের নাম অনুসারে পুরো থানার নামকরণ করা হয় চৌদ্দগ্রাম। এই এলাকার ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, চৌদ্দগ্রাম সভ্যতা বহু প্রাচীন। এই এলাকায় প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন সভ্যতার বাহক। ১০৫ দশমিক ২৯ বর্গমাইল আয়তনের এই উপজেলায় ইউনিয়ন ১৩টি, পৌরসভা একটি, গ্রাম ৪২৯টি। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, মোট লোকসংখ্যা তিন লাখ ৭৮ হাজার ২৪০ জন।

রাজধানী থেকে চৌদ্দগ্রামের দূরত্ব ১৪৫ কিলোমিটার। সেখান থেকে আরও ২২ কিলোমিটার দূরে অজপাড়াগাঁ কাশীনগর। উপজেলার ১ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ। বললাম অজপাড়াগাঁ; কিন্তু সঠিক বললে এটি একটি মিনি শহরও বটে। প্রায় ২৪ হাজার ভোটারের এই বিশাল ইউনিয়নের সদরেই অতিথিদের গন্তব্য। লক্ষ্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চারতলা ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কাশীনগর হাই স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছাত্রছাত্রী মিলিয়ে দেড় হাজারের বেশি। একটি ইউনিয়ন সদরে স্কুলে এত শিক্ষার্থী- চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! এই ধারাবাহিকতাতেই এখানে  গড়ে উঠেছে কাশীনগর কলেজ, যার শিক্ষার্থীর সংখ্যা চারশ'রও বেশি। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে এখন অনার্স কোস চালু হয়েছে। কলেজ পরিচালনা পর্ষদ আশা করছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মাস্টার্স কোর্স চালু করা সম্ভব হবে।

একটি ইউনিয়ন পরিষদের সদরে শিক্ষার প্রসারে এই অগ্রযাত্রাই প্রমাণ করে- দেশের অগ্রগতি শুধু কথার কথা না, দৃশ্যমানও বটে। কাশীনগর হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, এলাকার এমপি এবং রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলছিলেন তার স্কুলজীবনের কথা। বিশেষত বর্ষাকালে এক হাতে বই, আরেক হাতে কাপড় আর জুতা সামলে ১০ বছরের স্কুলজীবন শেষ করে তখন সবারই স্বপ্ন ছিল কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ। কিন্তু সবাই কি আর সেই স্বপ্ন ছুঁতে পেরেছে? যারা পারেনি; কাশীনগর স্কুল শেষ করেই হয়েছে স্বপ্নের সমাধি। কিন্তু গত ১০ বছরে গোটা চৌদ্দগ্রামের সবক'টি ইউনিয়নে উন্নয়নের যে স্পর্শ, তা দৃশ্যমান হয়েছে নানাভাবে।

এই অগ্রযাত্রার স্বীকৃতি দিতেই ভারতের মান্যবর হাইকমিশনার এই অজপাড়াগাঁয়ে। ভারত সরকার বাংলাদেশকে যে বহুমুখী সহায়তা দিচ্ছে, তার দৃষ্টিও আকৃষ্ট হয়েছে কাশীনগর গ্রামের শিক্ষার অগ্রযাত্রার দিকে। সীমিত অবকাঠামো নিয়েই কাশীনগর কলেজ চালু করেছে কয়েকটি বিষয়ে অনার্স কোর্স। কিন্তু ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরী অবস্থা। অনার্স শিক্ষার্থীদের ক্লাসের জন্য কোনো ক্লাসরুম নেই। সেখানেই হাত বাড়িয়েছে ভারতের জনগণের শুভেচ্ছা, ভারত সরকারের অকৃত্রিম সহায়তা। এই সহায়তা নিয়েই গড়ে উঠবে কাশীনগর কলেজের চারতলা অনার্স ভবন। ভারত সরকারের সম্পূূর্ণ অনুদানে আগামী ১৮ মাসে চারতলা এই ভবনটি মাথা তুলে দাঁড়াবে কাশীনগরের সবুজ শোভিত প্রাঙ্গণে। এই ভবনেরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য কলেজ চত্বরে আয়োজিত বিশাল সমাবেশের মঞ্চে বসে হাইকমিশনার বলছিলেন :এই এলাকার অসাধারণ সবুজ দেখে তিনি যেমন মুগ্ধ, তেমনি মুগ্ধ এলাকাবাসীর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখে। অনুষ্ঠানের বিশাল চত্বরের মূল অংশজুড়ে মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশ-ভারতের পতাকা দোলাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক-অভিভাবকরা তো ছিলেনই; সমাবেশের বিরাট অংশ আলো করে  ছিলেন এক সময়ের বীর তারুণ্য; আজ বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়া মুক্তিযোদ্ধারা। ভারতের মান্যবর হাইকমিশনার যেমন বলছিলেন, চৌদ্দগ্রামের একটু দূরে বা একটু বেশি দূরে বিলোনিয়া পার হলেই ভারতের ত্রিপুরা। বাংলাদেশের এই সবুজের সঙ্গে ত্রিপুরার সবুজের সমারোহের কোনো পার্থক্য নেই। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধারাও স্মরণ করছিলেন ১৯৭১। এলাকার সন্তান, আজকের মন্ত্রী, ঢাকায় পড়তে যাওয়া তরুণ মুজিবুল হক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঢাকায় পড়াশোনার পাট না চুকিয়ে, বাড়ি না ফিরে ১৯৭১-এর মার্চেই চলে যান ভারতে; সক্রিয়ভাবে অংশ নেন যুদ্ধে। আর কাশীনগর, চৌদ্দগ্রামে তার সহযোদ্ধারা শিবির গড়েন ত্রিপুরায়। ভারত সরকারের প্রতিনিধিকে পেয়ে তারা সবাই আপ্লুত; প্রকাশ করলেন কৃতজ্ঞতা। দৃশ্যত কাশীনগর কলেজ মাঠের গোটা সমাবেশ পরিণত হয় মুক্তিযুদ্ধ আর জয় বাংলার সমাবেশে। প্রবীণরা যেমন তাদের স্মৃতিকাতরতা নিয়ে আপ্লুত, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পরীক্ষিত বন্ধু ভারত সরকারের প্রতিনিধিকে পেয়ে তরুণ-কিশোররাও উজ্জীবিত।

সঙ্গত কারণেই এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা হয় রাজনীতি আর আসন্ন নির্বাচন নিয়ে। এলাকাটি সব সম্প্রদায়ের আবাসভূমি হলেও তলে তলে এখানে ঠিকানা গড়ার চেষ্টা করেছে মৌলবাদী জামায়াত। তাদের এক কেন্দ্রীয় নেতা এলাকাটির দখল নিতে উদ্যত। এলাকাবাসীর আশঙ্কা সেখানেই। এলাকার এমপি, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক  টানা দুই মেয়াদে এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নই যে করেছেন তাই নয়; তাকে যে কঠিন-অদৃশ্য চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে হয়েছে তা হচ্ছে এলাকাবাসীর মনোজগতে পরিবর্তন আনতে। জামায়াতচক্রের সেই শক্তিশালী চক্রকে মোকাবেলা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে দৃঢ় ভিতটি গড়ে তোলা হয়েছে, তার দৃশ্যমান চেহারাটি হচ্ছে :চৌদ্দগ্রামের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সব পদে; কি উপজেলা, কি পৌরসভা, কি ইউনিয়ন পরিষদ- সব প্রতিষ্ঠানের সব পদে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হচ্ছেন আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের মতো বড় দলে নানা পর্যায়ে কিছু মতভিন্নতা হয়তো থাকতে পারে; কিন্তু বড়মাপের অর্জনটিকে কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দিতে চান না আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। তারা মনে করেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাই চূড়ান্ত যে, গত দুই দশকে দেশের অর্জন, দলের অর্জন ছোট দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। চৌদ্দগ্রামে এই কথা আরও সত্যি। কারণ একটু ভুল হলে এখানে সেই শক্তির উত্থান  হবে, যারা বাংলাদেশকেই চায়নি। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। বাংলা-ভারত মৈত্রীর যে স্মারক উন্মোচিত হলো কাশীনগরে, তা গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যত হবে কালো হাত।

তবে সেই আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করলেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান। অত্যন্ত দৃঢ়ভাবেই বললেন :হ্যাঁ, ভোটের রাজনীতি হয়তো আছে। কিন্তু নিজের স্বার্থ তো পাগলেও বোঝে। গত এক দশকে চৌদ্দগ্রামের ১৩টি ইউনিয়নের অবকাঠামো, মন্দির-মসজিদ, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আর তরুণ-কিশোরদের শিক্ষার জন্য যে অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে এলাকাকে পেছনে নেওয়ার কোনো অপচেষ্টাই সফল হবে না।

১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কাশীনগর স্কুলের গা ঘেঁষে হয়েছে কলেজ। সেই কলেজে চালু হয়েছে অনার্স। একদিন এই কলেজে মাস্টার্স চালু হবে; একদিন কাশীনগর ইউনিয়ন পরিষদ উন্নীত হবে পৌরসভায়। এই অভিযাত্রায় কাশীনগরকে অনন্য মর্যাদায় উন্নীত করেছে ভারতবাসী; বন্ধু ভারত সরকার। স্বপ্নের এই অগ্রযাত্রাকে কোনোভাবেই বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।

এলাকাবাসীর এই স্বপ্নযাত্রা পূর্ণতা পায় যখন ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন :কাশীনগরে ভারতবর্ষের এক টুকরো শুভেচ্ছা প্রকৃতপক্ষে বাংলা-ভারত মৈত্রীরই একটি রূপ। কাশীনগর কলেজ মাঠের পরিবেশকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে, যখন ভারতীয় কমিশনার স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণে বলেন :বাংলাদেশের সুসময় বা দুঃসময় সবসময়ই ভারত পাশে থাকবে। আবারও ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলেন :সঙ্গে সঙ্গে নয়; ভারত রয়েছে বাংলাদেশের পাশে পাশে। তার এই ঘোষণার সময় দুই দেশের পতাকা তুলে কৃতজ্ঞতা জানায় এলাকার সব বয়সী, সব ধর্মের নারী-পুরুষ। সবার কণ্ঠেই উচ্চারিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেই এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি।  

সূত্র: সমকাল

আর/০৮:১৪/৩০ অক্টোবর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে