Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (70 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২৮-২০১৮

মৃত মানুষের পথ

মৃত মানুষের পথ

মাইকেল ওবির আশাগুলো অনেক আগেই পূরণ হয়েছিল, যা তার প্রত্যাশার বাইরে ছিল। ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে ওবি সাহেব ডুমি সেন্টার স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। বিদ্যালয়টি সব সময় পিছিয়ে ছিল। তাই মিশন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে একজন তরুণ ও নিরলস ব্যক্তিকে পাঠানো হলো। ওবি সাহেব পুরো উদ্যমের সাথে দায়িত্বটি গ্রহণ করেছিলেন। তার কাছে চমৎকার সব বুদ্ধি ছিল, যেগুলো কাজে লাগানোর এটি ছিল সুবর্ণ সুযোগ। তার সাউন্ড সেকেন্ডারি স্কুলের তালিম তাকে একজন কেন্দ্রীয় শিক্ষক হিসেবে মনোনয়ন পেতে সাহায্য করেছিল। এমনকি তাকে মিশনের অন্যান্য প্রধান শিক্ষক থেকেও আলাদা করেছিল। এই পুরনো আর স্বল্প শিক্ষিতদের সংকীর্ণ চিন্তাভাবনার প্রতি তার ছিল স্পষ্ট নিন্দা। 

'আমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারি, তাই না?' পদোন্নতির সুখবরটা পেতেই সে তার অল্পবয়সী স্ত্রীকে এ কথা জিজ্ঞাসা করল।

'আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব', সে বলল। 'আমাদের থাকবে সুন্দর বাগান এবং সবকিছুই হবে আধুনিক আর রমণীয়...।' 

তাদের এই দুই বছরের বৈবাহিক জীবনে ওবির 'আধুনিক কার্যপদ্ধতি'র প্রতি আসক্তি আর 'শিক্ষাক্ষেত্রে এই বুড়ো এবং পেনশন নিয়ে বিদায় হওয়া লোকগুলো, যাদের উত্তম অবস্থান ওনিস্থা মার্কেটে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে' এদের প্রতি ওবির জঘন্যতায়, সে পুরোপুরি সংক্রমিত হয়েছিল। সে ইতিমধ্যে নিজেকে একজন তরুণ প্রধান শিক্ষকের প্রশংসিত স্ত্রী হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল, যে কিনা বিদ্যালয়ের শাসনকর্ত্রী। 

অন্যান্য শিক্ষকের স্ত্রীরা তার অবস্থানকে হিংসা করবে। সে সবকিছুতে তার ধরন চালু করবে, তখন হঠাৎ তার মনে পড়ল এখানে অন্য স্ত্রীদের তো কোনো অস্তিত্বই নেই। আশা আর ভয়ের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় সে তার স্বামীর দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথা বলছিল। 

'আমাদের সব সহকর্মীই অল্পবয়স্ক আর অবিবাহিত'; ওবি উদ্দীপনার সাথে বলল এবং প্রথমবারের মতো যেটা তার (ন্যান্সি) সাথে মিলছে না। 'যেটা খুব ভালো ব্যাপার', সে (ওবি) বলতে থাকল। 

'কেন?'

'কেন? কারণ তারা তাদের পুরো সময় ও কর্মশক্তি বিদ্যালয়ে দিতে পারছে।'

ন্যান্সি হতাশ হয়ে গিয়েছিল। কিছু সময়ের জন্য সে সংশয়ী হয়ে উঠল বিদ্যালয়টি নিয়ে; কিন্তু তা শুধু কিছু সময়ের জন্য। তার এই সামান্য ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য কখনোই তার স্বামীর এই আনন্দময় প্রত্যাশাকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। সে (ন্যান্সি) তার (ওবি) দিকে তাকাল, যেন সে (ওবি) একটি চেয়ারে গুটিয়ে বসে রয়েছে। তার কাঁধ ঝোঁকানো এবং তাকে জরাগ্রস্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু সে মাঝে মাঝে মানুষকে বিস্মিত করে দেয় তার কর্মচাঞ্চল্যের আকস্মিক বিস্টেম্ফারণ দিয়ে। তার বর্তমান অঙ্গভঙ্গি, যাহোক, দেখে মনে হচ্ছে সব শারীরিক শক্তি তার গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখের আড়ালে অবসর গ্রহণ করেছে, যা তাকে অসাধারণ এক বিচক্ষণতার শক্তি দিচ্ছে। তার বয়স ২৬ বছর, কিন্তু দেখতে ৩০ কিংবা তারও বেশি মনে হয়। সর্বোপরি, সে অসুন্দর নয়। 

'কী ভাবছ (A penny for your thought- এটি একটি ইংরেজি বাগধারা, যার অর্থ 'কী ভাবছ'), মাইক?' কিছুক্ষণ পর একটি নারীবিষয়ক পত্রিকা পড়তে পড়তে ন্যান্সি বলে উঠল।

'আমি চিন্তা করছিলাম, একটা বিদ্যালয় কীভাবে চালাতে হয় তা এই লোকগুলোকে দেখিয়ে দেওয়ার কতই না চমৎকার সুযোগ পেয়েছি আমরা!'

ডুমি স্কুল সবদিক থেকেই অনুন্নত ছিল। ওবি সাহেব ও তার স্ত্রী তাদের পুরো জীবন লাগিয়ে দিল এই কাজে। তার দুটো লক্ষ্য ছিল। একটি উঁচুমানের শিক্ষা প্রক্রিয়া জোর করে চাপিয়ে দেওয়া, আর দ্বিতীয়ত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে এক চিলতে সৌন্দর্যে পরিণত করা। বৃষ্টির আগমনে ও ফুল ফুটে ন্যান্সির স্বপ্নের বাগান জীবন্ত হয়ে উঠল। উজ্জ্বল লাল ও হলুদ রঙের সুন্দর গোলাপ ফুল আর আল্লামান্ডার মাচায় ছেয়ে গেল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, যা পাশের ঝোপের সাথে গিয়ে মিশল। 

এক বিকেলে ওবি যখন নিজের কাজের জন্য তার নিজেকে প্রশংসিত করছিল ঠিক তখনই সে গ্রামের একজন মহিলাকে সূর্যমুখীর কেয়ারি আর বেড়ার ওপর দিয়ে জবুথবুভাবে হেঁটে যেতে দেখে মর্মাহত হলো। সেখানে গিয়ে সে প্রায় অব্যাবহূত একটি পথের অস্পষ্ট চিহ্ন আবিস্কার করল, যা গ্রাম থেকে শুরু করে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পার হয়ে অন্য পাশের ঝোপে শেষ হয়েছে।

'এটি আমাকে অবাক করেছে', তিন বছর যাবৎ বিদ্যালয়ে আছে এমন এক শিক্ষকের সাথে ওবি কথা বলছিল, 'এই পায়ে চলা পথটি তোমরা গ্রামবাসীকে ব্যবহার করতে দিয়েছ। এটা সম্পূর্ণভাবে অবিশ্বাস্য।' সে মাথা নাড়ল।

'পথটি'; শিক্ষক ক্ষমা চেয়ে বলল, 'ওদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি খুব কমই ব্যবহূত হয়। তার ওপর এটি গ্রামের মন্দির আর কবরস্থানের মাঝে একটি সংযোগ স্থাপন করেছে।'

'এর সাথে বিদ্যালয়ের কী সম্পর্ক?' জিজ্ঞাসা করলেন প্রধান শিক্ষক।

'আচ্ছা, সেটা আমি জানি না', অন্যজন কাঁধ ঝাঁকিয়ে না জানার ভঙ্গিমায় উত্তর দিল। 'কিন্তু আমার মনে আছে, কিছুদিন আগে যখন আমরা এটা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলাম তখন এখানে বিশাল এক হাঙ্গামা হয়েছিল।'

'ওটা কিছুদিন আগের কথা। কিন্তু এখন এটা আর ব্যবহূত হবে না'- বলতে বলতে ওবি হেঁটে গেল। 'সরকারি শিক্ষা কর্মকর্তা যখন বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসবেন তখন তিনি কী মনে করবেন?' গ্রামের লোকেরা মনে হয়, আমি যতদূর জানি সিদ্ধান্ত নিয়েছে; পরিদর্শন চলাকালীন তারা বিদ্যালয় কক্ষটি পৌত্তলিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করবে।

বিদ্যালয়ে ঢোকা আর বের হওয়া এই দুই রাস্তায় ভারি লাঠি পুঁতে দেওয়া হলো। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এটিকে আরও মজবুত করা হলো।

তিন দিন পর আনির (দেবতা) অনুসারী গ্রাম্য পুরোহিতকে প্রধান শিক্ষিকার কাছে ডেকে পাঠানো হলো। বুড়ো লোকটি সামান্য ঝুঁকে হাঁটত। সে মজবুত এক ছড়ি নিয়ে বেড়াত, যখনই সে তর্কে নতুন বিষয় তুলে ধরত, তখনই সেটাকে সে সজোরে চাপড় মারত মেঝেতে। 

'আমি শুনেছি', কুশল বিনিময় শেষে সে বলল, 'সম্প্রতি আমাদের পৈতৃক রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।' 

'জি', ওবি সাহেব উত্তর দিলেন, 'আমরা লোকজনকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণটি মহাসড়কে রূপান্তরের অনুমতি দিতে পারি না।' 

'দেখ বাবা', পুরোহিত তার ছড়িটি নিচে নামিয়ে বলল, 'তোমার জন্ম এবং তোমার বাবার জন্মের আগে থেকে রাস্তাটি এখানে রয়েছে। পুরো গ্রামের অস্তিত্ব নির্ভর করে এর ওপর। এদিক দিয়ে আমাদের মৃত স্বজনরা বিদায় নেয় আর পূর্বপুরুষরা আমাদের দেখতে আসে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই রাস্তা দিয়েই নবজাতকের আগমন হয়।'

মুখে সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে ওবি সাহেব সব শুনলেন।

'আমাদের বিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য' অবশেষে সে বলল, 'এ ধরনের বিশ্বাস নির্মূল করা। মৃত মানুষের কোনো পায়ে চলা পথের প্রয়োজন হয় না। এই পুরো ধারণাটাই উদ্ভট। তোমাদের ছেলেপুলেকে এমন ধারণার ওপর হাসতে শেখানোই হলো আমাদের কর্তব্য।'

'তুমি যা বলছ তা হয়তো সত্যি'; পুরোহিত উত্তর দিলেন, 'কিন্তু আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রথা মেনে চলি। আমাদের বিবাদের কিছুই থাকবে না যদি তুমি পথটি পুনরায় উন্মুক্ত করে দাও। যেটা আমি সব সময় বলি তা হলো, বাজপাখি আর ঈগল, দু'জনকেই ডালে বসতে দাও (বাগধারা- যে যা বিশ্বাস করে তাকে তা করতে দাও)।' সে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল।

'আমি দুঃখিত', নবীন প্রধান শিক্ষক বলে উঠলেন, 'কিন্তু বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ জনসাধারণের যাতায়াতের পথ হতে পারে না। এটি আমাদের নিয়মের বাইরে। আমাদের প্রাঙ্গণের কিনারা ঘেঁষে আপনাদের আরেকটি রাস্তা বানানোর পরামর্শ দিচ্ছি আমি। এমনকি এটা বানাতে আমরা আমাদের ছেলেদের সাহায্যও নিতে পারি। এই ঘোরানো পথটি পূর্বপুরুষদের জন্য খুব একটা অসুবিধাজনক হবে বলে মনে হয় না আমার।'

'আমার আর কিছুই বলার নেই', ইতিমধ্যে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ পুরোহিত বলল।

দু'দিন পর একজন অল্পবয়স্ক নারী বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেল। একজন দৈবজ্ঞের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করা হলো এবং সে বেড়া দেওয়ার মাধ্যমে অপমানিত পূর্বপুরুষদের প্রসন্ন করতে বলিদানের কড়া নির্দেশ দিল। 

পরদিন তার কাজের ধংসাবশেষের ভেতর দিয়ে ওবির ঘুম ভাঙল। শুধু রাস্তার কাছ দিয়ে নয়, পুরো বিদ্যালয়ের চারপাশের মনোরম বেড়াটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে; ফুলগুলো পদদলিত করে মেরে ফেলা হয়েছে এবং একটি বিদ্যালয় ভবন ভেঙে দেওয়া হয়েছে...। ওই দিনই সাদা চামড়ার কর্মকর্তা এসেছিল বিদ্যালয় পরিদর্শনে এবং একটি বাজে প্রতিবেদন দিয়েছিল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের অবস্থার ওপর। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো 'বিদ্যালয় আর গ্রামবাসীর ভেতরকার বাড়ন্ত উপজাতীয় দাঙ্গা পরিস্থিতি, যা শুরু হয়েছিল এই নতুন প্রধান শিক্ষকের ভুল আবেগপূর্ণ উদ্যমের এক অংশ হিসেবে।' া

লেখক সম্পর্কে 
চিনুয়া আচেবে নাইজেরিয়ান লেখক, কবি, অধ্যাপক এবং সমালোচক। তিনি ২০০৭ সালে ম্যানবুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পান। আচেবে ইংরেজিতে লিখেছেন এবং এটি উপনিবেশবাদীদের ভাষা বলে এর প্রতিবাদও করেছেন। এর সার্থকতা হলো, উপনিবেশবাদীদের ভাষাতেই তাদের আসল চেহারা ফুটিয়ে তোলা। তার বেশিরভাগ লেখাই ঔপনিবেশিক। Things Fall Apart ( ১৯৫০), No Longer At Ease (১৯৬০), Arrow of God (১৯৬৪), Anthills of Savannah (১৯৮৭) তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। Dead Men’s Path গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। এর পর লেখকের একত্রিত করা ছোটগল্পের একটি বইয়ের নাম Girls at War (১৯৭২) এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০৮:৩৩/ ২৮ অক্টোবর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে