Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ , ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (77 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-১৬-২০১৩

পৃথিবীর সবচাইতে সেরা শিক্ষাব্যবস্থা!

আবদুল্লাহ আল ইমরান



	পৃথিবীর সবচাইতে সেরা শিক্ষাব্যবস্থা!

ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি জাপানে নাকি ছোটবেলা থেকেই পেশাভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হয়।অর্থাৎ,শিশুর শিক্ষাজীবনের প্রথম কয়েক বছর তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং তারপর ঠিক করা হয় যে তার জন্য কোন পেশা উপযোগী।সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ আর হয়নি।কিন্তু গতসপ্তাহে ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখে আবারও আগ্রহী হয়ে উঠি জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে।
In Japanese schools, the students don’t get any Exams until they reach grade four (the age of 10) because the goal for the first 3 years of schools is not to judge the child’s knowledge or learning,but to establish good manners and to develop their character.
সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সাহায্য নেই বিভিন্ন ওয়েবসাইটএর।এই ব্যাপারে টু দ্যা পয়েন্ট কিছু না পেলেও পেলাম আগ্রহ জাগানিয়া অনেক কিছু।জানলাম সারা পৃথিবীতে মান বিচারে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা চার নম্বরে। আর এক এ অবস্থান করছে ফিনল্যান্ড।ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার হাল হকিকত জেনেও বেশ চমৎকৃত হলাম।প্রথমে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে লেখার ইচ্ছা থাকলেও পরে ভাবলাম পৃথিবীর সেরা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েই লেখা যাক।জাপান বা এশীয় দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলাপ অন্য কোন লেখায় ফাঁদা যাবে।

PISA (Programme for International Student Assessment) যারা কিনা এই ক্রম তৈরি করে তারা বিভিন্ন দেশের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের উপরে নানা পর্যালোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে রিডিং, গণিত এবং বিজ্ঞানে ফিনিশ শিক্ষার্থীরাই পৃথিবী সেরা।এর পরপরই রয়েছে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া,হংকং,সিঙ্গাপুর,জাপান।অথচ USA কিংবা সমমানের অন্য দেশগুলোতে এই খাতে অর্থ-সময় বরাদ্দ,হোমওয়ার্ক,এসাইনমেন্ট অনেক বেশি।ফিনল্যান্ডের হাইস্কুলগুলোতে এত অল্প হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় যেগুলো রাতে মাত্র আধাঘন্টাতেই শেষ হয়ে যায় এবং এলিমেন্টারি ও জুনিয়র স্কুলগুলোতে কোন হোমওয়ার্কই দেওয়া হয় না!কারণ ফিনিশ শিক্ষাব্যবস্থায় মনে করা হয় শিশুদের শিশুর মতই থাকতে দেওয়া উচিৎ।অযথা হোমওয়ার্ক-এসাইন্মেন্টের বোঝা চাপিয়ে শিক্ষার্থীর জীবন দুর্বিষহ করার ব্যাপারে তাঁরা পক্ষপাতী নন।এবং এ ব্যাপারে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা অধিদপ্তরের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা আছে।

ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার ‘হৃৎপিণ্ড’ হয়ে আছেন সেদেশীয় শিক্ষকরা।সেখানে শিক্ষকদের উপর আস্থা এবং স্বায়ত্তশাসনে বিশ্বাস করা হয়।সহায়িকা হিসেবে আছে মৌলিক কিছু গাইডলাইন যেগুলোর বিস্তৃতি আসলে বহুদূর।সেগুলোর ভিতর থেকে চেষ্টা করা হয় শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও মান উন্নয়নে।শিক্ষার্থী যাতে সহজে এবং ভালোভাবে শিখতে পারে সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়।
Those who can,do.Those who can’t,teach-এই প্রবচন ফিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে খাটে না।সেখানকার শিক্ষকরা কঠোর পরিশ্রমী সেই সাথে এই পেশা সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ।শিক্ষক হওয়ার জন্য অবশ্যই মাস্টার্স ডিগ্রীর অধিকারী হতে হয়।প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে তবেই হতে হয় শিক্ষক।শিক্ষকরা এমনভাবে প্রশিক্ষিত হন যাতে করে সব রকমের শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষা সমানভাবে পৌঁছে দিতে পারেন।এমনকি শিক্ষার্থীর শারীরিক কিংবা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা সহ শিক্ষাজনিত অন্য সকল ইস্যুতে শিক্ষকরা যাতে উৎরে আসতে পারেন সে লক্ষ্যে সব ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় শিক্ষকদের।ক্লাসে নিয়মিত শিক্ষাদানের পাশাপাশি শিক্ষকদের নিজেদের জ্ঞানার্জন থেমে থাকেনা।পেশাদারিত্ব উন্নয়নের জন্য ফিনিশ শিক্ষকদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়।এবং এই ব্যয় ফিনল্যান্ডের সরকারই বহন করেন।
কঠোর পরিশ্রম এবং শিক্ষাদানের এর বিনিময়ে শিক্ষকরা কি পান?ফিনল্যান্ডে সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ এবং উচ্চ বেতনভোগী পেশাজীবী হচ্ছেন শিক্ষকরা।আইন কিংবা চিকিৎসা পেশার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় ভাবা হয় শিক্ষকতাকে।যার ফলে ফিনল্যান্ডের তরুণদের কাছে শিক্ষকতা এখন সবচাইতে আকাঙ্ক্ষিত পেশা।পুরো বেতন কাঠামো কিংবা সুযোগ সুবিধার কথা না বলতে পারলেও খুব অল্পের মধ্যে বলে যাই,যেখানে USAর শিক্ষকদের গড় বেতন $৩৬০০০ সেখানে একজন ফিনিশ তরুণ শিক্ষকের প্রারম্ভিক বেতন $২৯০০০!

ফিনল্যান্ডে তেমন কোন বড় পাবলিক পরীক্ষা নেই।কেবল উচ্চ মাধ্যমিক পড়ালেখা শেষে ন্যাশনাল ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষা নামে একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়।এখানে যে সবাই অংশগ্রহণ করে তেমন নয়।গোটা শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা পর্যালোচনা করার জন্য র্যা ন্ডম স্যামপ্লিং এর মাধ্যমে কিছু শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করা হয় এবং তাদের পরীক্ষাই কেবল নেওয়া হয়।তাহলে ফিনিশ শিক্ষার্থীদের মান কিভাবে নির্ধারিত হয়?তাদের পরীক্ষাগুলো হয় প্রজেক্ট নির্ভর।ক্লাসগুলোকে অযথা চাপমুক্ত রাখা হয়।আনন্দদায়ক এবং সৃজনশীল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে জীবনের পাথেয় শিক্ষা নেওয়াটাকেই দরকারি মনে করেন ফিনিশ নীতিনির্ধারকরা।জীবনের প্রথম বছরগুলোতে ‘তথাকথিত’ সাফল্যের চাইতে একজন শিক্ষার্থী কি শিখলেন,সেটাকেই গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন তাঁরা।কিভাবে শিখতে হবে,কিভাবে জীবনযাপন করতে হবে অথবা কিভাবেই বা খুঁজে পাওয়া যাবে নিজের আগ্রহের জায়গা-এগুলো শিখানো হয় একেবারে এলিমেন্টারি পর্যায়ে।

ফিনল্যান্ডে সেরা স্কুল কিংবা শিক্ষকের কোন তালিকা নেই।কারণ ফিনিশরা মনে করে প্রকৃত বিজয়ীকে কখনোই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়না।ফলে ফিনিশ স্কুলগুলোতে প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার মনোভাব বিরাজ করে।যেহেতু সর্বসেরা হওয়ার কোন ইদুর দৌড় সেখানে নেই,সবাই একত্রে কাজ করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে এবং সেই সব সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে কল্যাণ বাড়াতে।

ফিনল্যান্ডের শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা সেরা স্কুল তৈরির বদলে লেভেল প্লেয়িং তৈরিতেই বেশি আগ্রহী যেখানে সব স্কুলে শিক্ষার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে।এক্ষেত্রে পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড,আয় কিংবা ভৌগলিক অবস্থান যাতে প্রতিবন্ধকতা না হয়ে উঠতে পারে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।প্রত্যেক স্কুলের জন্য সমান বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটা যে কমিউনিটির কিংবা দেশের যে স্থানের স্কুলই হোক না কেন।দুর্গম অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা বরাদ্দ রাখা হয়।ফিনিশ স্কুলগুলো সম্পূর্ণ ভাবে ফ্রি।এর মধ্যে খাবার-বই-ভ্রমণ সহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সব কিছু অন্তর্ভুক্ত।বিরাট সব দালান নির্মাণের বদলে ফিনিশ শিক্ষাব্যবস্থায় ক্লাসের ভিতরের পরিবেশের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।এলিমেন্টারি লেভেলের কোন ক্লাসেই ২৪ জন এর বেশি শিক্ষার্থী অনুমোদন করা হয় না।অল্প শিক্ষার্থী,যথেষ্ট দক্ষ শিক্ষক এবং আনন্দদায়ক একটা পরিবেশের মধ্য দিয়েই তরতর করে এগিয়ে চলেছে ফিনল্যান্ডের শিক্ষাতরী।
এই যে বিশাল দক্ষযজ্ঞ এর পিছনে অর্থ যোগায় কে?লেখা এতটুকু পড়েই আশা করি বুঝতে পারছেন ফিনল্যান্ডের সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাই ফিনিশ শিক্ষাব্যবস্থাকে এত উন্নত ও কল্যাণমুখী করে তুলেছে।জিডিপির ৬%সরাসরি শিক্ষাখাতে ব্যয় করা হয়।প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারী।অল্প কিছু ব্যক্তি উদ্যোগে চালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে।সেগুলোও সরকারী অনুদানের উপর নির্ভরশীল।কিন্তু শিক্ষা খাতে এত বরাদ্দের উদ্দেশ্য কি?গত শতাব্দীর ৭০ এর দশকেই ফিনল্যান্ডের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পেরেছিলেন,ফিনল্যান্ডের স্বল্প প্রাকৃতিক সম্পদ ও ক্ষুদ্র আকারের ভারী শিল্প উন্নয়ন আসলে সেইভাবে সম্ভব নয়।সামর্থ্যের এই সীমাবদ্ধতাই তাদেরকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নির্মাণে আগ্রহী হয়ে করে তোলে।যার ফলে এখন ফিনিশরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করার জন্য অন্যদের চাইতে এগিয়ে আছে।
ফিনিশ শিক্ষাব্যবস্থার সফলতার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মূলমন্ত্র কি?কেবলি বিশ্বাস আর আস্থা!গোটা ফিনল্যান্ডে বিশ্বাস করা হয় একটা উন্নত ফিনল্যান্ড বিনির্মাণের লক্ষ্যে ফিনিশ শিক্ষকরা এগিয়ে চলেছেন।এবং এই বোঝা বহন করাটাকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ফিনিশ শিক্ষকরা ও।ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষাব্যবস্থার উপর অহেতুক নজরদারি চালানো হয় না।কোন ধরনের বাহ্যিক খবরদারি বা মান যাচাইয়ের লক্ষ্যে ঘনঘন পাবলিক পরীক্ষা-এর কোনটাই সেখানে চলে না।পিতামাতারা তাদের সন্তানদের ভার শিক্ষকদের উপর ছেড়েই নিশ্চিন্ত।আর শিক্ষকরা?তাঁরা বিশ্বাস করেন একে অপরকে।পারস্পরিক সমস্যা সমাধানে একসাথে কাজ করেন।দলাদলি-বিদ্বেষ পোষণের প্রশ্নই উঠে না।যার ফলে ফিনল্যান্ডে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ১% এর ও কম।আর অর্জন পৃথিবীর সবচাইতে সেরা শিক্ষাপ্রণালী আর শিক্ষাব্যবস্থা।
লেখার একেবারে শেষভাগে চলে এসেছি।এই লেখা লিখবার সময় বারেবারে চোখে ভেসে আসছিল আমাদের দারিদ্যপীড়িত আর সুবিধাবঞ্চিত ক্লাসগুলোর কথা।আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে এত বিপুল অংকের খরচ করাটা একটু কষ্টকর বৈকি!তার উপরে আছে দুর্নীতির ভয়।আছে সঠিক পরিকল্পনার অভাব। তারপরেও আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্কে মনে হয় কেবল সদিচ্ছাটাই জরুরি।বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দ শিক্ষার জন্য রেখে তা যদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং এই ধারা সরকার বদল হলেও না বদলায় তবে বিরাট একটা পরিবর্তন শিক্ষাখাতে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।যদিও তেমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না তারপরেও আমি হাল ছাড়তে নারাজ।মনের গহীনে স্বপ্ন দেখি একদিন বদলে যাবে সব,ভেঙ্গে যাবে সব অচলায়তন।(সৌজন্যে : সরব ব্লগ)

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে