Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ , ২৮ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (42 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-১৩-২০১৩

গীতাঞ্জলি’র অনুবাদ এবং রবির উদয়াস্ত

আলী আহমদ


গীতাঞ্জলি’র অনুবাদ এবং রবির উদয়াস্ত

রবীন্দ্রনাথের ধর্মমনস্কতা গবেষণালব্ধ কোনো বিষয় নয়, এটি তাঁর আশৈশব লালিত একটি আত্মিক চেতনা। শৈশবে মা-হারানো কনিষ্ঠ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ধার্মিক পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছেন। বাবার ধর্মভ্রমণের সার্বক্ষণিক সঙ্গী না হলেও অনেক সময়েরই সহচর হয়েছেন তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই। তারপর তাঁর কৈশোরের সময় কেশবচন্দ্র সেনের বিদ্রোহের ফলে ব্রাহ্মসমাজ যখন দুভাগে ভাগ হয়ে গেল, আর ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ নামীয় অংশের আচার্য হলেন দেবেন্দ্রনাথ, তখন সেই কিশোর বয়সেই ঐ অংশের সচিবের দায়িত্ব পড়ল রবীন্দ্রনাথের কাঁধে। ঐ অল্পবয়সেই কবি ও সুকণ্ঠ গায়ক হিসেবে সুপরিচিত রবীন্দ্রনাথ অনেক গান রচনা করেন। তা প্রার্থনাসংগীত হিসেবে ব্রাহ্মসমাজে গেয়েও শোনান তিনি। বাঙালি সংগীতরসিকদের ঘরে ঘরে, জলসায়, বৈঠকে সে গানগুলো এখন যে শুধু গীত হচ্ছে তা-ই নয়, তাদের জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে। বলা বাহুল্য, পূজা পর্যায়ের গান বলে পরিচিত তাঁর ধর্মসংগীতও এর অন্তর্ভুক্ত।

বাঙালি পাঠক, দর্শক ও শ্রোতা, রবীন্দ্রসাহিত্যে যাঁদের বিচরণ আছে, কিংবা তাঁর নামধর্মী সৃজনশীলতার কোনো না কোনো শাখার সঙ্গে যাঁদের কিছুটা হলেও পরিচয় ঘটার সৌভাগ্য হয়েছে, তাঁরা মেনে নেবেন যে, তাঁর সুবিশাল সাহিত্যভাণ্ডারের একটু সামান্য অংশই কেবল ধর্মীয় সংগীত। তবে তাঁর বহুমুখী সৃজনশীলতার সবচেয়ে ঋদ্ধ ভাণ্ডার কবিতার চেয়েও জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাঁর সংগীত, এবং সেই জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছেই। গান মূলত সুরারোপিত কবিতাই। যদিও দুয়ের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে তা মৌলিক কোনো পার্থক্য নয় বলেই আমি মনে করি। তবে বাইরের জগতে রবীন্দ্রনাথের পরিচিতি ও খ্যাতি যে ছোট্ট একটি কাব্যগ্রন্থের জন্য সেই গীতাঞ্জলি মূলত একটি গীতিকবিতার সঙ্কলন। আর ঐ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত গীত কিংবা কবিতাগুলো মূলত ধর্মীয় ভাবোদ্দীপক বলে ধর্মীয় কবি বলেই রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে বহির্বিশ্বে। আমার ধারণা, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এ জন্য কবি নিজেও অনেকখানি দায়ী বলে আমি মনে করি।
 
গীতাঞ্জলি নামে ১৯১০ সালে বাংলায় যে কাব্য কিংবা সংগীত-সংকলনটি রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন, আর ১৯১২ সালে যে ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয় তা হুবহু এক নয়। মূল বাংলা গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদে একদিকে যেমন বেশ ক’টি কবিতা ও গান বাদ দেওয়া হয়েছে, তেমনি বাংলায় ছিল না এমন কয়েকটি গান ও কবিতার ইংরেজি অনুবাদ গীতাঞ্জলিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এই নিবন্ধে তাদের বিস্তৃত পরিচয়ের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
 
ইংরেজি গীতাঞ্জলির বেশ একটু ইতিহাস আছে। তবে সে বিষয়ে আসার আগে গীতাঞ্জলির গীত ও কবিতাগুলোর রচনার সময় রবীন্দ্রনাথের মানসিক জগতের উপর একটু আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে হয়।
 
এই নিবন্ধের শুরুতেই বলেছি, আজীবন ধার্মিক মানুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে তাঁর ধর্মাচরণে কোনো গোঁড়ামি তো ছিলই না, এমনকি প্রথাগত ধর্মীয় কোনো আচার-অনুষ্ঠানও তিনি পালন করেননি। আর একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হওয়ায় সনাতন হিন্দুধর্মের দেবদেবীর মূর্তিপূজাও তিনি করেননি। কিংবা তাতে বিশ্বাস করেননি। তবে গভীরভাবে আস্তিক ছিলেন তিনি সমস্ত জীবনভর। সে কারণে একেবারে কট্টর ‘সেকুলার’ যেমন প্রকৃতির বর্ণনা, মানব-মানবীর ভালোবাসা, ইত্যাদির মধ্যে ধর্মের অনুষঙ্গ না এলেও বিশ্ববৈচিত্র্যের কাব্যিক বর্ণনায় অনেক ক্ষেত্রেই ঐশ্বরিক কিংবা অতিলৌকিক সত্তার প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তাঁর একেবারে ধর্মীয় প্রবন্ধাদি ছাড়া, গদ্য রচনায় এ বিষয়টি কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অনুপস্থিত। কিন্তু কবির মনের সূক্ষ্মতম অনুভূতি কিংবা ভাবের প্রকাশ কবিতা ও গানেই প্রকাশ পায়, এবং সেখানেই অতিলৌকিক সত্তা তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে প্রতিভাত হয়েছে বলে লক্ষ করা যায়। বাল্যকাল থেকে কৈশোর পেরিয়ে প্রথম যৌবন অবধি তিনি মূর্তিপূজারি না হলেও হিন্দু ছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর ‘ভগবান’ তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু হয়ে ওঠে। এরই এক পর্যায়ে তিনি কবিতায় বলেন, “দেবতারে প্রিয় করি– প্রিয়রে দেবতা’। তাঁর ধর্মজীবনের এই পর্যায়েই গীতাঞ্জলির সৃষ্টি। তাঁর এই দেবতা কে তা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, তিনি নিজেও বলেছেন এ নিয়ে। সে কথা এই মুহূর্তে থাক। গীতাঞ্জলির গান ও কবিতাগুলো যখন তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর বয়স তখন পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। দেহের বাঁধন অটুট থাকলেও, তখনকার মাপকাঠিতে তিনি অনেকটাই বুড়ো মানুষ হিসেবে পরিগণিত। আর মনের জগৎ প্রায় বিধ্বস্ত। কবির স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যান ১৯০২ সালে। মায়ের মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় গত হয় কবি-কন্যা রেনুকা। কবির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর অনুজপ্রতিম কবি সতীশচন্দ্র মারা যান ১৯০৪ সালে। ১৯০৫ সালে পরপারে চলে যান কবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাল্য ও কৈশোরে কবির মনোজগতের এই দেবতাপ্রতিম অভিভাবকের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়েছিল নিঃসন্দেহে। আর তারই মাত্র দুবছরের মাথায়, ১৯০৭ সালে অকালে মারা যান কবি পুত্র শমীন্দ্রনাথ। এত অল্পসময়ের ব্যবধানে এতগুলো ঘনিষ্ঠ মানুষের মৃত্যু যে কোনো মানুষকেই উদভ্রান্ত করে তুলতে পারে। কবির অন্তর্জগতেও তীব্র বেদনা ও ঝড় নিশ্চয় উঠেছিল তখন। কিন্তু শান্ত দিনের নিস্তরঙ্গ সমুদ্রের মতোই তার বাইরের জগৎ মনে হত প্রশান্ত। এই সময়টিতে স্বভাবগতভাবে ধর্মপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আরও বেশি ঝুঁকে পড়েন। এই পর্যায়ের রচনাই হচ্ছে গীতাঞ্জলি।
 
রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও পূজাপর্যায়ের গানগুলো সৃজনের মোটামুটি একটা ক্রম অনুসারে সাজিয়ে কেউ যদি লক্ষ করে পড়ে যান, কিংবা গান হিসেবে শোনেন, তাহলে এ বিষয়টি মোটেই দৃষ্টি এড়াবে না যে কবির প্রেমিকা ও দেবী পুরোপুরি দুটো আলাদা জগৎ থেকে উঠে এসে ক্রমাগত নিকটবর্তিনী হতে হতে কোনো এক অনির্দে্শ্য সময়ে একাকার হয়ে যান। তারপর থেকে ঐ দুই অস্তিত্বের সন্মুখযাত্রায় তাঁদের পারস্পরিক স্থান বদল হয় প্রায়শই। এই জাতীয় প্রেম ও পূজা পর্যায়ের গানের শ্রোতারা নিজের ইচ্ছে ও খেয়ালখুশিমতো কবিরই ভাষায় ‘দেবতারে প্রিয় করি– প্রিয়রে দেবতা’ বানিয়ে উপভোগ করতে পারেন ও করেন তাঁর অনবদ্য সংগীত। আর যেগুলো সুস্পষ্ট চরিত্র বৈশিষ্ট্যে পূজা পর্যায়েরই গান সেগুলো ধার্মিকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় তো বটেই, যারা ততটা ধার্মিক প্রকৃতির নন, কিংবা স্পষ্টই ধর্মবিশ্বাসী নন তাঁদের কাছেও তা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর মূল কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের জাদুকরি ভাষা, মনোমুগ্ধকর উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও সুরের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ। যাহোক, গীতাঞ্জলি পর্যায়ের গানগুলো প্রধানত প্রার্থনা সংগীতে পরিণত হয়েছে। কবির মনোজগতের লক্ষ্যনীয় পরিবর্তনের কারণেই যার কিছুটা ইংগিত আমরা ইতিপূর্বেই দিয়েছি। কবির তখন মনে হয়েছে তিনি যা, তার অন্তরের গভীরতম সত্তার যা অনুভুতি– সেগুলোই সংগীতাকারে প্রকাশিত হয়েছে গীতাঞ্জলির গানে ও কবিতায়। এ সময়ে তাঁর ভাইয়ের মেয়ে শ্রীমতী ইন্দিরা দেবীকে লেখা এক চিঠিতে এ কথাই জানিয়েছিলেন তিনি।
 
এরপর ১৯১২ সালে বিলাতযাত্রা করেন কবি। মাদ্রাজ (বর্তমানে চেন্নাই) গিয়ে জাহাজে ওঠার সময় কিংবা ওঠার পরপরই বেহুঁশ হয়ে গেলে, অসুস্থ কবির বিলেত যাওয়া হয় না। শিলাইদহে ফিরে আসেন তিনি। ওখানে বসেই একটি দুটি করে গীতাঞ্জলির গান ও কবিতা পদ্যভাবাপন্ন এক ধরনের গদ্যরীতির ইংরেজিতে অনুবাদ করতে শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। এর বেশ কবছর পূর্বে ‘নৈবেদ্য’ নামে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি কবিতাও তিনি ঐ সময়ে ওখানে বসে অনুবাদ করেন। এরপর শান্তিনিকেতনে ফিরে গিয়ে অন্যান্য লেখালেখি ও কাজকর্মের সঙ্গে গীতাঞ্জলির কবিতা ও গানগুলোর ইংরেজি অনুবাদ করে যেতে থাকেন কবি। শরীর সুস্থ হওয়ার পর ঐ বছরের মাঝামাঝি আবার বিলেত রওনা হন তিনি। সঙ্গে অনূদিত গীতাঞ্জলি। জাহাজে বসেও তিনি অনুবাদের কাজ চালিয়ে যান। স্কুলছাত্রদের হাতের লেখা ঠিক করার জন্য আড়াআড়ি লম্বা রেখা টানা যে খাতাকে এক্সারসাইজ বই বলে তেমন বইতে অনুবাদ করেছিলেন কবি। এমনকি মোট দুটো এক্সারসাইজ বইতে এই কাজগুলো শেষ করেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এর একটি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তা আর কখনও পাওয়া যায়নি। যাহোক বিলেতে পৌঁছে কবি তাঁর বন্ধু উইলিয়াম রটেনস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাণ্ডুলিপিগুলো তাঁকে পড়তে দেন। রটেনস্টাইন অনূদিত লেখাগুলো ভালো লেগে যাওয়ায় তিনি লন্ডনের তখনকার বিখ্যাত কবি ডব্লিউ বি. ইয়েটসকে এইগুলো একটু দেখে দিতে বলেন। কিন্তু তারপর ৭ জুলাই ১৯১২ রটেনস্টাইনের হ্যাম্পস্টেডের বাড়িতে লন্ডনের সাহিত্য ও সংস্কৃতিজগতের বিখ্যাত সব দিকপালের উপস্থিতিতে ইয়েটস্ রবীন্দ্রনাথের অনূদিত লেখাগুলোর বেশকিছু পড়ে শোনান। পড়ার সময় উপস্থিত শ্রোতারা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কবিতাগুলোর গদ্যধর্মী অনুবাদ শোনেন। কেউ কোনোরূপ মন্তব্য না করে সেখানে উপস্থিত রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য সকলের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়ে চলে যান।
 
এরপর ঐ রাতে কবিতাপাঠের আসরে উপস্থিত সুধীমণ্ডলীর মধ্যে অধিকাংশই একে একে লিখিত ধন্যবাদপত্র পাঠাতে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথকে। অভিভূত হলেন কবি; আশ্চর্য হলেন খানিকটা তাদের এত ভালোলাগার কারণে। ১০ জুলাই ১৯১২ ট্রোকাডেরো রেস্তোরায় ‘ইন্ডিয়া সোসাইটি’ একটি আলোচনাসভার আয়োজন করে। এতে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর কাব্যধারা, প্রাচ্যকাব্যের নবজাগরণ ও ভারতীয় সভ্যতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে এক আবেগময় বক্তৃতা দেন কবি ইয়েটস্। তার পরদিন থেকে রটেনস্টাইনের অনুরোধে এবং রবীন্দ্রনাথের সন্মতিতে বই আকারে গীতাঞ্জলি প্রকাশের লক্ষ্যে পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ শুরু করেন ইয়েটস্। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর বই আকারে সীমিত সংস্করণে ইংরেজি গীতাঞ্জলি ছাপায় ‘ইন্ডিয়া সোসাইটি’। তাতে ইয়েটস্ যে ভূমিকা লেখেন, তা তাঁর ১০ জুলাইয়ের বক্তৃতারই প্রতিফলন বলা যায়। এই ভূমিকা নিয়ে আমি আরও পরে কথা বলব।
 
সীমিত সংস্করণে মাত্র ৭৫০ কপি ইংরেজি গীতাঞ্জলি ছাপিয়ে ছিল ইন্ডিয়া সোসাইটি। তার মধ্যে বিক্রির জন্য ছিল মাত্র ২৫০ কপি। এর অল্পকাল পরে অবশ্য ম্যাকমিলান নতুন একটি সংস্করণ বের করে। অল্পদিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম ইংল্যান্ড এবং অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে অত্যন্ত পরিচিত ও বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ অনূদিত গীতাঞ্জলির কবিতাগুলো অবশ্য বাংলা গীতাঞ্জলির হুবহু প্রতিরূপ নয়। বাংলার অনেক কবিতা একদিকে যেমন ইংরেজি সংস্করণে বাদ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আবার বাংলা গীতাঞ্জলিতে নেই এমন বেশক’টি গান ও কবিতা ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ‘নৈবেদ্য’ ও ‘গীতিমাল্য’ থেকে নেওয়া কবিতা ও কয়েকটি গান বিশেষভাবে উল্ল্যেখযোগ্য। তাছাড়া, ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশিত কবিতা কিংবা গানগুলোরও অনুচ্ছেদ, বিন্যাস ও যতিচিহ্ন দিয়ে ছত্র ভেঙে ও কখনও কখনও শব্দ পরিবর্তন করে ইয়েটস্ ওগুলোকে সত্যিকারের কবিতার আকার আকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের লিখিত মূল ইংরেজি বাক্য অনেকক্ষেত্রেই হুবহু রেখে দিয়েছেন। পরিবর্তন যেখানে করেছেন তা তেমন বেশি নয়। আর কবিতাগুলো রবীন্দ্রনাথের অনূদিত ইংরেজি পাণ্ডুলিপিতে গান বা কবিতাগুলোর যে ধারাক্রম ছিল, তা একেবারেই ওলটপালট করে দিয়েছেন ইয়েটস্। অনেক গান বাদও দিয়েছেন।
 
রয়েল সোসাইটির টমাস স্টারজ মূর-সহ কতিপয় সুধীজনদের একটি সন্দেহ ছিল ওগুলো কি রবীন্দ্রনাথের মৌলিক রচনা না কি প্রাচীন ভারতীয় ধর্মসংগীতের ছায়ানুবাদ বা অনুরূপ কিছু। যাহোক, অচিরেই তাদের এ ধারণা দূর হলে টমাস স্টারজ মূর সুইডেনের রয়েল একাডেমিতে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদানের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম প্রস্তাব করেন।
 
১৯১৩ সালের সহিত্যে নোবেল পুরস্কার রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিকে দেওয়া হয়। এ কথা আমরা সবাই জানি। এ-ও জানি যে এরপর রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি অনূদিত হতে থাকে প্রথমে ইউরোপে, পরে সমস্ত পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষাগুলোতে। তিনি সমস্ত পৃথিবীতে অত্যন্ত খ্যাতিমান কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্বল্পসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাহিত্যের খোঁজখবর রাখেন এমন কিছু বাঙালি ছাড়া অনেকেই জানেন না যে, এখন রবীন্দ্রনাথ বা পাশ্চাত্যের ‘টেগোর’ বহির্বিশ্বে বিস্তৃত এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অশ্রুত একটি নাম। এই কঠোর সত্য আমাদের কষ্ট দিলেও, সত্য আসলেই সত্যই। এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য বিদগ্ধ বাঙালি তো বটেই, অনেক বিদেশিও প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও বই লিখেছেন আর খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন এর মূল কোথায়। আমাদের এই ছোট্ট নিবন্ধে তার বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ায় সম্ভব নয়। আমরা শুধু অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক ছুঁয়ে যাব।
 
বিশশতকে দ্বিতীয় দশকের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর পারস্পরিক রেষারেষির কারণে বিশ্ব শান্তি হুমকির মুখে। সমস্ত ইউরোপই যেন সম্ভাব্য এক অশান্তির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। এমন সময়ে গীতাঞ্জলির গান ও কবিতাগুলো এক মহাশক্তির কাছে শর্তহীন আত্মসমর্পণ। কিন্তু আত্মশক্তির উপর অমিত বিশ্বাস এবং সীমার মাঝে অসীমের আবাহন আর একইসঙ্গে অসীমের মাঝে সীমিত অস্তিত্ত্বের বিলীনতার বাণী এক সম্পূর্ণ নতুন এবং চিরায়ত বাণীর মতো শোনাল। ইয়োরোপীয় বিদ্বৎসমাজ চমৎকৃত হলেন। নোবেল পুরস্কারও এল সে কারণেই। কিন্তু এ সময় ছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী, ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে সাহিত্যের আধুনিকতা শুরু হয়েছিল আগের শতকেই। ইংল্যান্ড সে ঢেউ একটু পরে টের পেয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যে অভাবনীয় ধ্বংসযজ্ঞ মানুষ তা কল্পনাও করতে পারেনি কোনোদিন। পুরনো ধর্ম বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ– সবই যেন যুদ্ধের অভিঘাতে তাসের ঘরের মতো ঝুরঝুর করে পড়ে গেল। এই নতুন সমাজমানসের কবিতা নতুন হতে বাধ্য ছিল। তখন Things fall apart কিংবা এই সভ্যতাই a heap of broken images-এর বার্তা নিয়ে উপস্থিত হলেন ইংরেজি সাহিত্যে টি. এস. ইলিয়ট। পৃথিবীর সাহিত্যে শুরু হল নতুন ধারার, নতুন যুগের। রবীন্দ্রনাথ তারপরও বহুদিন বেঁচে ছিলেন, সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্টি করেছেন অনেক, কিন্তু সে ছিল পুরনো ধাঁচের, পুরনো আমলের। পৃথিবী তা আর তেমন আপন করে নিল না।
রবীন্দ্রনাথে লেখার অনাদরের জন্য বুদ্ধদেব বসু, নীরদ চৌধুরীসহ আরও অনেকে রবীন্দ্রনাথের নিজের দুর্বল অনুবাদকে দায়ী করেছেন। উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েও দিয়েছেন এই দুর্বলতার নমুনা। এটি কারণ হলেও আংশিক। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প-উপন্যাস আন্তর্জাতিক মহলে আর চলল না। অথচ বাঙালি পাঠক ও শ্রোতার কাছে তাঁর সাহিত্য ও গান ক্রমান্বয়ে অধিকতর জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এই আপাতবিরোধী অবস্থা ব্যাখ্যা করা দুরূহ। গীতাঞ্জলির চেয়ে অন্যতর কবিতা, গান ও সাহিত্য তিনি গীতাঞ্জলির পরে অনেক রচনা করেছেন, কিন্তু গীতাঞ্জলির ধর্মীয় কবিতার ছাপ রবীন্দ্রনাথ কাটিয়ে উঠতে পারেননি বহির্বিশ্বে। সেটিই তাঁর কাল হয়েছে বলে মনে হয়।
ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকায় ইয়েটস্ রবীন্দ্রনাথের কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ওই ভূমিকায় তিনি উদ্ভট কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ একবার নাকি পদ্মায় বোটে বসে চারদিকের সৌন্দর্য দেখে দীর্ঘ আটঘণ্টা একই রকম স্থির হয়ে বসে ছিলেন। মাঝিমাল্লারা আর নৌকা চালানোর সাহস পায়নি। তাঁর বড়ভাই দার্শনিক গগণেন্দ্রনাথ ঠাকুর গাছের তলায় বসলে কাঠবিড়ালিরা এসে তাঁর গায়ের উপর ঘোরাফেরা করত। আর পাখিরা এসে তাঁর মাথায় বসত। তিনি নাকি টেরই পেতেন না। রবীন্দ্রনাথ এসব বর্ণনার কোনো প্রতিবাদ করেননি।
নোবেল পুরস্কার দিতে গিয়ে কবিকে যে শংসা-বচন দেওয়া হয়েছে তাতে কমিটির প্রধান হ্যারল্ড ইয়ান আরও উদ্ভট কিছু কথা বলেছেন। ইয়ানের কথাগুলো বাংলায় দাঁড়ায়– “কিছুকাল আগে তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) অত্যন্ত ব্যস্তজীবনের কর্মবহুল সময়ে একটা ছেদ পড়েছিল। কারণ তিনি তাঁর জাতির অমর প্রথা অনুযায়ী গঙ্গার পবিত্র পানিতে একটা নৌকায় ভেসে ভেসে কিছুকাল ধ্যানমগ্ন এক সন্ন্যাসজীবন যাপন করেন।
আমরা সবাই জানি নদীবহুল পূর্ববঙ্গে (বর্তমানে বাংলাদেশে) জমিদারির কাজ দেখাশোনা করার জন্য তখনকার মাপকাঠিতে বেশ বিলাসবহুল হাউজবোটে তিনি চলতেন এবং কাচারিবাড়িতে থাকতেন। কিন্তু এই অতিরঞ্জনের এখানেই শেষ নয়। আমরা জানি ইউরোপে মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার কারণে কবি পুরস্কার গ্রহণ করতে সুইডেন যেতে পারেননি।”
১৯২১ সালের ২৬ মে স্টকহোমে নোবেল পুরস্কার গ্রহণবিষয়ক যে বক্তৃতা দেন তার এক স্থানে কবি বলেন, “…বাংলাদেশে গঙ্গানদীর তীরের অখ্যাত এক গ্রামের একটি নৌকাঘরে অতিশয় সমাজবিচ্ছিন্ন সঙ্গীসাথী ও জনমানবহীন এক জীবন আমি একসময় কাটিয়েছি। সেখানে শরতে হিমালয়ের হ্রদ থেকে উড়ে আসা হাঁসগুলো ছাড়া জীবন্ত আর কোনো সঙ্গী আমার ছিল না…।”
এ সম্পর্কে আমি নিজের কোনো বক্তব্য দেব না। তবে তিনি যে প্রাচ্যদেশীয় এক ঋষি, ইউরোপে এই ধারণাটাকে তিনি যেন আরও জোরালো করতে চাইলেন বলে মনে হয়। তিনি গঙ্গায় ছিলেন নাকি পদ্মায়, তাঁর বোটে কোনো জীবন্ত লোকজন ছিল কি না, সেটা তর্কের বিষয় নয়; তিনি যে চিত্র উপহার দিলেন পাশ্চাত্যকে, তাতে তাঁর নিজের সত্যিকার ভাবমূর্তির ক্ষতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সাহিত্যও কোণঠাসা হয়ে থাকল। কারণ বটগাছ যদি ঝড়ে পড়ে যায়, তাতে আশপাশে অনেক কিছুরই অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে অনুবাদ করা হচ্ছে। প্রকাশিত হয়েছে বেশ ক’টি নতুন অনুবাদ। গীতাঞ্জলি ও নতুন আরেকটি ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে দেড়-দুবছর আগে। যদি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে রবীন্দ্রনাথ নতুনভাবে গৃহীত হন আমরা অত্যন্ত খুশি হব। না হলেও, আমাদের কিছু করার নেই। তিনি আমাদের সাহিত্যের দিকপাল হয়ে আছেন, থাকবেন আরও বহুকাল এবং আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জীবনকে প্রতিনিয়তই ঋদ্ধ থেকে ঋদ্ধতর করে যাবেন এই কবি। আমরা ধন্য যে তিনি আমাদের কবি, আমাদেরই ভাষার লেখক।

 

প্রবন্ধ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে