Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ , ৩ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (76 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১০-১৬-২০১৮

দুর্গার রূপ, দুর্গার কাঠামো, দুর্গার পূজা

পরিমল বসু


দুর্গার রূপ, দুর্গার কাঠামো, দুর্গার পূজা

দেবী পূজার মূল উৎস হচ্ছে সনাতন ধর্মের আদি শাস্ত্র বেদ। অভৃশ্য ঋষির কন্যা ব্রহ্মবাদিনী বাক সর্বপ্রথম তাঁর অতীন্দ্র ধ্যাননেত্রে আবিষ্কার করেন দেবীসুক্ত। এই দেবীসুক্তই হচ্ছে মাতৃবন্দনার মঙ্গলসূত্র। শক্তি পূজার দুটি দিক আছে : একটি হলো আধ্যাত্মিক, অপরটি আধিভৌতিক। মাতৃসাধক আধ্যাত্মক্ষেত্রে মহামায়া আদ্যাশক্তির আরাধনা করেন এবং অন্তরে কাম ক্রোধাদি রিপু ও ইন্দ্রিয়দিগকে জয় করে আধ্যাত্মিক কল্পনা ও মুক্তি লাভ করেন। অন্যদিকে আধিভৌতিক ক্ষেত্রে সাধক তাঁর পূজা বন্দনা করেন দেশ ও সমাজের বাহ্য শত্রুর ও আন্তবিপ্লবের কবল থেকে দেশ জতিকে মুক্ত করতে।

মহাশক্তি শ্রীদুর্গা দেহ দুর্গের মূল শক্তি। আধ্যাত্মিক ভাবনা দুর্গা কাঠামোতে অন্তর্নিহিত। দুর্গার দশহাত দশ দিক রক্ষা করার প্রতীক, দশ প্রহরণ এক দেবতার সাধনালব্ধ বিভূতি। দেবী ত্রিভঙ্গা-ত্রিগুণাত্মিকা শক্তির প্রতীক অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ তমঃ গুণের প্রতীক। দেবী ত্রিনয়নী- একটি নয়ন চন্দ্রস্বরূপ, একটি সূর্যস্বরূপ এবং তৃতীয়টি অগ্নিস্বরূপ। তাঁর ত্রিনয়নের ইঙ্গিতেই নিয়ন্ত্রিত হয় ত্রিকাল। দেবী সিংহবাহনা-তামসিক পশুশক্তির অধিপতি পশুরাজ সিংহ। মহিষাসুর-দেহস্থ প্রবল রিপুর প্রতীক। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্যের ঘনীভূত মূর্তি মহিষাসুর। শিব-সর্বপুরি অধিষ্ঠিত শিব মঙ্গল ও স্থিরত্বের প্রতীক। দেবীর ডানপার্শ্বে উপরে লক্ষ্মী-ধনশক্তি বা বৈশ্যশক্তির, গণেশ-ধনশক্তির বা শুদ্র শক্তির, সরস্বতী-জ্ঞানশক্তি বা ব্রহ্মণ্য শক্তির, কার্তিক ক্ষত্রিয় শক্তির প্রতীক। শক্তিসমূহ অনুভূতির বিষয়, অনুভূতির আকার নেই। আকার দেওয়া হয়েছে মানুষের বোঝার সুবিধার জন্য। সব শক্তিই ব্রহ্মশক্তি। সাধকের হিতার্থে ব্রহ্মের নানা রূপ কল্পনা । তার দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র সুশোভিত। তার ডান হাতে ত্রিশূল, খড়গ ও চক্র; বাম হাতে শঙ্খ, ঢাল, কুঠার, ঘণ্টা।

দুর্গা দেহ-দুর্গের মহাশক্তি। সাধক সাধনাকালে সেই শক্তিকে জাগ্রত করেন। সেই শক্তি যখন জাগ্রত হয় তখন দেহস্থিত রিপুসমূহ তাকে পরাজিত করে বশীভূত করার জন্য উদ্যোগী হয়। সেসময় দেবশক্তি ও রিপু তথা আসুরিক শক্তির মধ্যে বাঁধে সংঘর্ষ। সেই অন্তর জগতের সংঘর্ষের একটি প্রতীকী রূপ শ্রী শ্রী চণ্ডীর মাধ্যমে রূপায়িত হয়েছে।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথানুসারে দুর্গোৎসব কখনো পনেরো, দশ বা পাঁচ দিনের। দুর্গাপূজার শুরু হয় মহালয়ায়। এ দিন দেবীপক্ষের সূচনা হয়। ভোরবেলা পিতৃতর্পণের মাধ্যমে দেবীপক্ষকে আহ্বান জানান ভক্তরা। শোক, তাপ, দুঃখ, অমঙ্গল, অন্ধকার হরণ করে শুভ, মঙ্গল, আনন্দদায়ক ও আলোর দিশারী অসুরবিনাশিনী মাকে হিমালয় থেকে মর্ত্যে বরণ করে নিবেন তাঁরা। সমবেত কণ্ঠের স্তব– ‘হে দেবী, তুমি জাগো, তুমি জাগো, তুমি জাগো। তোমার আগমনে এই পৃথিবীকে ধন্য করো। কলুষত মুক্ত করো। মাতৃরূপে, বুদ্ধিরূপে, শক্তিরূপে আশীর্বাদ করো পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে। বিনাশ করো মানুষের ভেতরকার অসুর প্রবৃত্তিকে।’ এর ঠিক পাঁচদিন পর মহাষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। শাস্ত্রমতে, দেবীর বোধন হয় বিল্ববৃক্ষে বা বিল্বশাখায়।

মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভ, সপ্তমীবিহিত পূজা। কদলীবৃক্ষসহ আটটি উদ্ভিদ এবং জোড়াবেল একসঙ্গে বেঁধে শাড়ি পরিয়ে একটি বধূ আকৃতিবিশিষ্ট করে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়। এই হলো ‘নবপত্রিকা’, প্রচলিত ভাষায় যাকে ‘কলাবউ’ বলে।

মহাষ্টমীতে মহাষ্টম্যাদিকল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমীকল্পারম্ভ, মহাষ্টমীবিহিত পূজা, বীরাষ্টমীব্রত, মহাষ্টমী ব্রতোপবাস, কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা, মহাপূজা ও মহোৎসবযাত্রা, সন্ধিপূজা ও বলিদান। কুমারী পূজা নিয়ে একটু বলা যাক। বৃহদ্ধর্মপুরাণের মতে, দেবী চণ্ডীকা এক কুমারী কন্যারূপেই দেবতাদের সামনে আবির্ভূতা হয়েছিলেন। দেবী ভগবতী কুমারীরূপেই আখ্যায়িত। কুমারী পূজার দিন সকালে পূজার জন্য নির্দিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয় । তাকে সাজানো হয় ফুলের গহনা ও নানাবিধ অলঙ্কারে। পায়ে আলতা, কপালে সিঁদুরের তিলক, হাতে ফুলের বাজুবন্ধ, কুমারী মেয়েটি যেন সত্যিই দেবীর প্রতিরূপ। মণ্ডপে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে তার পায়ের কাছে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও পূজার নানাবিধ উপাচার। কুমারী দেবীর কাছে ভক্তদের মিনতি :

‘কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারী ধীমহি তন্নো দুর্গিঃ প্রচোদয়াত্’

অর্থাৎ, হে দুর্গা, তুমি কন্যা ও কুমারী। আমরা কাত্যায়নকে জানব। সেজন্য তোমাকে ধ্যান করি। তুমি আমাদের শুভ কাজে প্রেরণা দাও। তবে সব পূজা মণ্ডপে কুমারী পূজার চল নেই। বর্তমান বাংলাদেশে ও ভারতে শুধু রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পূজামণ্ডপগুলোতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মহানবমীতে কেবল মহানবমীকল্পারম্ভ, মহানবমী বিহিত পূজা। বিজয়া দশমীতে বিহিত বিসর্জনাঙ্গ পূজা, বিসর্জন, বিজয়া দশমী কৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা পূজা।

এমএ/ ০৩:২২/ ১৬ অক্টোবর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে