Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (75 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১০-১৫-২০১৮

সময়ের চিত্রকর হাসান হাফিজ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


সময়ের চিত্রকর হাসান হাফিজ

আজ ১৫ অক্টোবর কবি হাসান হাফিজের ৬৩তম জন্মদিন। একজন ব্যক্তির জন্য ষাটের পরের জন্মদিনগুলি আসে বার্ষিক সময়চক্রে একটা অনাড়ম্বর স্মৃতিময়তা নিয়ে, অনেকের কাছে শেষ-যাত্রা আরো কিছুটা এগিয়ে আসার শংকা নিয়ে। কিন্তু একজন কবির জন্মদিন, তা ৬৩তম অথবা ৮৩তম হোক, হয়ে দাঁড়ায় একটা বিশেষ দিন। 

জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে কবিতা ও সৃষ্টিশীলতাকে উদযাপনের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায় দিনটি। হাসান হাফিজ একজন কবি, হাড়ে-মাংসে, চিন্তা-চেতনায় একজন কবি। তাঁর জন্মদিনে পেছন দিয়ে তাকিয়ে কবিতার ভুবনে তাঁর দীর্ঘদিনের বসবাসের একটা সার সংক্ষেপ তৈরি করা যায়, তাঁর পথচলার একটা বৃত্তান্ত, সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও, তুলে ধরা যায়।

দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ কবিজীবনই বটে। তাঁর প্রথম বই 'এখন যৌবন যার' বেরোয় ১৯৮২ সালে, আর শেষ তিনটি বই, ২০১৭ সালে, যাদের মধ্যে 'আধখানা পাই আধেক হারাই' আমার বিশেষ প্রিয়। এই সাড়ে তিন দশকে হাসান হাফিজের কবিতা ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়েছে, তাদের ভেতর নিঃশব্দে কিছু পালাবদল ঘটেছে, তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পক্ষে গিয়ে ছন্দ ও প্রকরণের ক্ষেত্রে অনেক বলিষ্ঠ হয়েছেন এবং জীবন, জগৎ ও পরিপার্শ্ব নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক পরিবর্তনও ঘটেছে। যেমন প্রথম বইটির শিরোনাম পড়লেই যেমন বোঝা যায়, তিনি ষাট ও সত্তর দশকের প্রভাবের নিচে থেকে লিখতে শুরু করেছেন, যদিও ওই প্রভাবটির একটি সামূহিক ব্যাপ্তিও দিল- ষাটের উত্তাল সময়, আদর্শ ও বৈশ্বিক চিন্তা, মানবিক বোধ, দ্রোহ এবং প্রতিবাদ কে না ধারণ করেছেন! হাসান হাফিজ বরাবরই প্রতিবাদী- বস্তুত তাঁর এই চরিত্রটি এবং তাঁর কবিতায় এর প্রতিফলন তাঁকে আমার কাছে প্রিয় করেছে। ফলে, হেলাল হাফিজের মতো বাঙালির জেগে ওঠার ইতিহাসের ওপর নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার সময়টাকে তিনিও নিজের ভেতরে ধারণ করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয়-তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে হাসান তাঁর নিজের কণ্ঠকে, স্বকীয়তাকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। 'অবাধ্য অর্জুন'-এ (১৯৮৬) তিনি জানিয়ে দেন-

আমার ধমনীব্যাপী কেবলই লাফিয়ে ওঠে
শেষ না হওয়া সেই জনযুদ্ধ (শেষ না হওয়া জনযুদ্ধ)
এই অসমাপ্ত জনযুদ্ধ হাসান এখনও সামিল।

হাসান হাফিজের কবিতার বিষয়-আশয় ব্যাপক :বিদ্রোহ প্রতিবাদ থেকে নিয়ে প্রেম; প্রকৃতি থেকে নিয়ে অধ্যাত্মচিন্তা, বাস্তব থেকে নিয়ে পরাবাস্তব। আবদুল মান্নান সৈয়দের সান্নিধ্য এবং স্নেহ পেয়েছেন হাসান, তাঁর পরাবাস্তব উপমা-উৎপ্রেক্ষার পেছনে মান্নান সৈয়দের একটা প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল, যদিও হাসান পরাবাস্তবে সমর্পিত নন; একে দেখেছেন বাস্তবের পেছনে থাকা এক সময়ের বাস্তব হিসেবেই।

হাসান হাফিজের 'কবিতাসমগ্র' বেরিয়েছে তিন খণ্ডে। সেগুলো পড়ে হাসানের কবিতার একটা সার্বিক এবং বিশ্বস্ত ছবি পাওয়া সম্ভব। আমার মনে হয়েছে, তিনি যেন এক দীর্ঘ যাত্রার পথিক, যা তাঁকে জীবনের নানা বাঁকে, ইতিহাস ও পুরাণে, জনজীবনে, যুদ্ধে ও শান্তিতে অতীতে এবং- হাসানের জীবনদর্শন বিবেচনায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই- ভবিষ্যতে, নিয়ে গেছে। হাসান অতীতে নিজেকে নিমগ্ন রাখেননি, অতীত থেকে বেঁচে থাকা ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার কিছু রসদসংগ্রহ সময় সচেতন কবির ক্ষেত্রে তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি ভবিষ্যতেরও স্বপ্ন দেখেন, যে ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার :

প্রত্যাশারই জলছবি আমাদের সামান্য জীবন (অবসাদ পাথা, 'বল ভরসা দাও রে দয়াল') 

হাসান হাফিজ ছড়া লিখেছেন, শিশুতোষ সাহিত্য লিখেছেন, রঙ্গব্যঙ্গ ও জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন, সাংবাদিকতা চর্চা করেছেন দীর্ঘকাল। কিন্তু তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি একজন কবি। এবং আমাদের সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, যাকে পড়লে আমাদের ইতিহাসের, সময়ের এবং জাতিসত্তার উত্থান ও বিকাশের একটি বিশ্বস্ত এবং অভঙ্গুর আখ্যান আমরা পাই। তাঁর অনেক কবিতা সশব্দ, অনেক কবিতার সুর নিমগ্ন, এমনকি নির্জন। তাঁর কবিতায় বাংলার প্রকৃতিকে পাই, মানুষের একটা পৃথিবী পাই; আবার এই সময়ের বিচার এবং পতনেরও একটা ছবি পাই। তাঁর কবিতার একটি শক্তি হচ্ছে পাঠকের তার কেন্দ্রে টেনে নেয়ার ক্ষমতা।

তিনি একদিকে লেখেন, আমার/ রাণী ও কোমল নম্র বেয়াদব শব্দগুচ্ছ/ আমার অমোঘ অস্ত্র (শব্দই আমার আমার অস্ত্র দূরে পাহাড়ের ঘুম) অন্যদিকে জানান,

নীরবতার মৌন মিছিল কোলাহলের নামে/ এইজীবনের মন্দভাগের বঞ্চনাগান কাজে (নীরবতা/কোলাহল; 'যদি পাই লিরিকের দেখা')

কবি হাসান হাফিজকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শুভেচ্ছার সঙ্গে একটি প্রত্যাশার কথাও বলি :হাসান যেন আরো অনেক অনেকদিন আমাদের কবিতার ভূমিটাকে উর্বর করে যেতে পারেন। 

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০২:২২/ ১৫ অক্টোবর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে