Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (75 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-০৯-২০১৩

চুল এখন জীবিকার উৎস

শফিক বাশার/কামরুজ্জামান সেলিম



	চুল এখন জীবিকার উৎস

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল কার্পাসডাঙ্গার পল্লীতে গড়ে উঠেছে শতাধিক চুল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। মেয়েদের মাথার আঁচড়ানো পরিত্যক্ত চুলের ব্যবসা করে স্বাবলম্বি হয়েছে এখানকার শতাধিক বেকার যুবক। আর চুল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে কাজ করে বেঁচে থাকার অবলম্ব^ন খুঁজে পেয়েছে প্রতিবন্ধীসহ ৮ হাজার নারী-পুরুষ। উপজেলার বিভিন্ন বয়সের মানুষ স্থানীয়ভাবে ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মেয়েদের মাথার পরিত্যক্ত চুল সংগ্রহ করে এসব কেন্দ্রে বিক্রি করে। ক্রয়কৃত এসব চুল বিশেষ ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হয় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে। প্রায় এক যুগ আগে থেকেই চুয়াডাঙ্গা ও যশোরের সীমান্ত এলাকায় পরিত্যক্ত চুল কেনাবেচা শুরু হয়। এ সময় একশ্রেণীর দালাল পরিত্যক্ত চুল সংগ্রহ করে চোরাপথে ভারতে পাচার করত। চুল সংগ্রহের কাজে তারা ফেরিওয়ালাদের ব্যবহার করত। ফেরিওয়ালারা ক্লিপ, চিরুনি, কাঁটা, ফিতা, কাচের চুড়ি, বেলুন, আইসক্রিম, বাদামভাজা ও বাচ্চাদের নানারকম খেলনার বিনিময়ে শহর এবং গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এসব পরিত্যক্ত চুল সংগ্রহ করে চোরাকারবারি দালালদের কাছে বিক্রি করত। এসব দালাল সে সময় সীমান্ত পথে ভারতে চুল পাচার করে রাতারাতি প্রচুর টাকার মালিক হয়ে যায়। ফলে দ্রুত বিস্তৃৃতি ঘটতে থাকে এ ব্যবসার। বিষয়টি ব্যাপক আকার ধারন করলে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে চুলসহ অনেকেই ধরা পড়ে। পরে দালালদের হাত থেকে এই ব্যবসা চলে আসে সাধারণ মানুষের হাতে। এ সময় চুল ব্যবসায়ীরা চীন, জাপান, কোরিয়া ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বাংলাদেশ থেকে চুল কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে তারা বাংলাদেশে এসে ভালো দাম দিয়ে এ চুল কিনতে শুরু করে। তখন থেকেই চোরাপথে ভারতে চুল পাচার বন্ধ হয়ে যায়। বৈধভাবে এ ব্যবসা শুরু হওয়ায় নতুন করে পরিধি বাড়তে থাকে চুল ব্যবসার। কুতুবপুর গ্রামের চুল ব্যবসায়ী ঝন্টু জানায়, তার কোনো জায়গাজমি ছিল না। লেখাপড়াও শিখতে পারেনি। ভ্যান চালিয়ে ও পরের জমিতে মজুর খেটে কোনোরকমে চলত তার সংসার। বছর দশেক আগে জীবনজীবিকার তাগিদে ঢাকা শহরে গিয়ে রিকশা চালাতে শুরু করে। একদিন ঢাকায় দামুড়হুদার চন্দ্রবাস গ্রামের ওসমানের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার কাছ থেকে জানতে পারে সে ঢাকায় চুল কিনতে এসেছে। ঢাকা থেকে এ চুল কিনে চোরাইপথে কুতুবপুর সীমান্তপথে ভারতে পাচার করে। লাভ হয় ভালো। ঝন্টু তখন ওসমানকে বেশ কয়েক চালান এ চুল কিনতে সাহায্য করে। এরই একপর্যায়ে ঝন্টু জানতে পারে, বিদেশ থেকে ক্রেতারা এসে ঢাকা থেকে এ চুল কিনে নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে একসময় সে সফল হয়। ঝন্টু তখন তার কাছে গচ্ছিত স্বল্প কিছু পুঁজি নিয়ে লেগে যায় এ কাজে। ২০০৭ সালে ঢাকার মিরপুরে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলে চুল প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র । এ কেন্দ্রে বর্তমানে ৬০ জন লোক কাজ করে। তাদের মধ্যে ৮ জন প্রতিবন্ধীও রয়েছে। গত মার্চ মাসে ঝন্টু কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি কুতুবপুরে একটি চুল প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র চালু করেছে। এখানে ১৫০ জন নারী-পুরুষ কাজ করছে। পরিত্যক্ত চুল প্রক্রিয়াজাত করার ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ হয় না, অন্যদিকে আর্থিক লাভবান হচ্ছে চুল ব্যবসায়ীরা। কীভাবে পরিত্যক্ত চুল প্রক্রিয়াজাত করা হয় জানতে চাইলে ঝন্টু জানান, প্রথমে জট পাকানো পরিত্যক্ত এ চুল কিনে এনে সুচ বা কাঁটা দিয়ে জট ছাড়ানো হয়। এরপর হুইল পাউডার ও পরে শ্যাম্পু দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকানো হয় এবং দৈর্ঘ্য অনুযায়ী প্যাকিং করা হয়। সর্বনিম্ন ৮ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্ব^া চুল বিক্রি হয়। ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত প্রতি কেজি চুল বিক্রি হয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। এভাবে প্রতি ২ ইঞ্চি বেশি দৈর্ঘ্যরে চুল প্রতি কেজি ২ হাজার টাকা বেশি দরে বিক্রি হয়। এভাবে ২৮ থেকে ৩০ ইঞ্চি পর্যন্ত প্রতি কেজি চুল বিক্রি হয় ১৫-২০ হাজার টাকায়। চন্দ্রবাস গ্রামের আবদুস সাত্তার জানান, সে আগে অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করত। অন্যের দেখাদেখি ২০০৯ সালের জুন মাসের দিকে সে নিজ বাড়িতে চুল প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র গড়ে তোলে। বর্তমানে এখানে ২০-২৫ জন নারী-পুরুষ কাজ করছে। এ কাজে প্রতিমাসে তার খরচ বাদ দিয়ে ১০-১২ হাজার টাকা লাভ হয়।  ঝন্টু ও সাত্তারের দেখাদেখি উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের সাইফুল, মামুন, আবদুস সাত্তার, মিদ্দার, আবুল, কুতুবপুর গ্রামের আমির, আমিনুল, সাইফুল, রশিদ, হুদাপাড়া গ্রামের কাশেদ আলী, মিনা, শামসুলসহ আনেকই এখন এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া উপজেলার চন্দ্রবাস, ছাতিয়ানতলা, শিবনগর, কানাইডাঙ্গা, কাঞ্চনতলা, বাঘাডাঙ্গা, কুড়ালগাছি, আরামডাঙ্গা, জাহাজপোতা, পীরপুরকুল্লা, চয়রা, হুদাপাড়া, মদনাসহ ২৫-৩০টি গ্রামে গড়ে উঠেছে চুল প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র।  এদিকে এসব চুল প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রে কাজ করে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও স্বাবলম্বী হচ্ছে। ছাতিয়ানতলার নারী শ্রমিক মোসলেমা জানায়, সে কারখানা থেকে প্রতিদিন ২০০-২৫০ টাকা আয় করে। মোসলেমার মতো অনেকেই এখানে কাজ করছে। চুল ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এ পরিত্যক্ত চুল কিনে আনতে পথে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও বখাটে যুবকরা নানাভাবে হয়রানি করে থাকে। কার্পাসডাঙ্গা চুল প্রক্রিয়াজাত সমিতির সভাপতি সহিদ বিশ্বাস জানান, বর্তমানে চীন, কোরিয়া, মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথেই এসব চুল কিনে নিয়ে যাচ্ছে। বিদেশে এসব চুল ক্যাপ তৈরি ও টাক মাথায় হেয়ার প্ল্যান্টেশনসহ আরও নানা কাজে ব্যবহৃত হয়।

 

চুয়াডাঙ্গা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে