Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (75 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-০৮-২০১৩

স্বাধীনতা : নিজস্ব নির্মাণের অবিনাশী আয়োজন

সেলিনা হোসেন



	স্বাধীনতা : নিজস্ব নির্মাণের অবিনাশী আয়োজন

২৬ মার্চ একটি তারিখ মাত্র নয়। স্বাধীনতা দিবস শুধু একটি দিনও মাত্র নয়। একটি জাতির জীবনে স্বাধীনতা অর্জন গভীর অর্থবহ দিকনির্দেশনা। সেই জাতির আনন্দ ভরপুর পরমায়ু এবং মৃত্যুর শান্তি। স্বাধীনতা বেঁচে থাকাকে অর্থবহ করে। বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে একটি একক আইডেনটিটি। এর ১৬ কোটি মানুষের ভূখণ্ড, পতাকা এবং জাতীয় সংগীতের অধিকার। একটি জাতির জীবনে স্বাধীনতা নিজস্ব নির্মাণের অবিনাশী আয়োজন। তাই স্বাধীনতার স্রোত গড়িয়ে যায় রক্ত-মৃত্যু পার হয়ে বিজয়ের আনন্দের মহাসমুদ্রে। পাঞ্জাবি ভাষার শ্রীমতী অজিত কৌর লিখেছেন : 'The war of Liberation of Bangladesh was different and unique, be cause it was for preservation of the 'Vibrant spirit of Man' which throbs and thrives only in its own culture and in its own language'.

পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে স্বাধীনতা ও বিজয়ের মতো দুটি দিবস আছে কি না খুব ভালো করে যাচাই না করে বলা মুশকিল। আমাদের অর্জন এমন যে আমরা স্বাধীনতা ও বিজয়ের মতো দুটি দিন দিয়ে নিজেদের জাতিসত্তার জায়গা তৈরি করতে পেরেছি। এভাবে বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী রাষ্ট্র।
 
বিপুল মানবসম্পদে অধ্যুষিত এ দেশের চেহারাই অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আলাদা। এ জাতি স্বাধীনতা অর্জন করেছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার নেতৃত্বে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং নির্ভরতায় তিনি ছিলেন জনপ্রতিনিধি হওয়ার সার্থক উদাহরণ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে দুটি অমর পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।' স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি মানচিত্র, একটি জাতীয় সংগীতসংবলিত সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণায়। কিন্তু একটি জাতির জীবনে এটুকুই শেষ কথা নয়। জাতির স্বাধীনতার অর্জন মানচিত্র লাভের স্বাধীনতার সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে জাতির সমুদয় অধিকারের মর্যাদা রক্ষা করা স্বাধীনতার মৌল সত্য। যে রাষ্ট্রব্যবস্থা এ দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয় স্বাধীনতার সামগ্রিক অর্থ সে ব্যবস্থা ক্ষুণ্ন করে। এ ঘাটতি পূরণ করার জন্য প্রয়োজন হয় আর একটি শক্তির। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের মতো দিনগুলোর শক্তি জাতিকে আনন্দ-বেদনার সঙ্গে গৌরবের উপলব্ধি দেয়। গৌরবের উপলব্ধি জাতিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে।
 
বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে আশ্চর্য দিকনির্দেশনায় জাতিকে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার সঙ্গে মুক্তির সংগ্রামকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। আর এই মুক্তির সংগ্রামকে সফল করার জন্য প্রয়োজন বিজয় দিবসের। যে জাতির জীবনে বিজয় দিবস থাকে, সে জাতি পরাজিত হয় না। অমর্যাদার কাছে সে মাথা নত করে না। বন্ধ্যা সময় তাকে পিছু টেনে রাখতে পারে মাত্র; কিন্তু স্থায়ী হতে পারে না বন্ধ্যা সময়ের বন্ধ্যত্ব। মুক্তির সংগ্রাম অপব্যবস্থায় আক্রান্ত হলে জাতিকে সংগ্রামে জয়ী হওয়ার সাহস দেবে অনাদিকাল ধরে এবং জয়ী হওয়ার মন্ত্রে উজ্জীবিত থাকবে সাহসী জাতির চেতনা। এ দিন জাতির সামনে মাথা নত করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
 
স্বাধীনতা দিবসের সড়ক ধরেই বিজয় দিবস। বিজয় দিবস মানেই জাতির একটি বড় অর্জন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সমষ্টিগত সাফল্যে দেশের মানুষ নিজেদের অর্জনের দিকে গভীর প্রত্যাশায় তাকিয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল সুস্থ, সুন্দর, নিরাপদ, মানসম্মত সমাজব্যবস্থা। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা ছিল সুশাসন। মানুষ চেয়েছিল ভাত-কাপড়, আশ্রয়-চিকিৎসা ও শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক আকাঙ্ক্ষার নিশ্চয়তা। স্বজন হারানোর বেদনা-কষ্টের পরও মানুষের স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতার মর্যাদা বোধের। এই মর্যাদাবোধকে উদ্দীপ্ত করেছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের মুজিবনগর থেকে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণাপত্রের এক জায়গায় উলি্লখিত হয়েছিল '...যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাহাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ওপর তাহাদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছে, সেহেতু আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগণ কর্তৃক আমাদিগকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের মর্যাদা রক্ষার্থে, নিজেদের সমন্বয়ে যথাযথভাবে একটি গণপরিষদরূপে গঠন করিলাম, এবং পারস্পরিক আলোচনা করিয়া, এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিধার নিশ্চিত করণার্থ, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম এবং তদ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করিলাম,...।'
 
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি মুক্তিকামী জাতির সামনে সাহস এবং বিক্রমের অমিত শৌর্য নিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছিল। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন সূচিত করেছিল জাতির গৌরবের দিন। আনন্দ-বেদনার অশ্রুমাখানো বিজয়ের দিন জাতির দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে প্রস্ফূটিত করেছিল। বদলে গিয়েছিল উপমহাদেশের মানচিত্র। আর সবচেয়ে বড় কথা, ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ বাঙালি জাতির গৌরবগাথার মহান দিন। স্বাধীন দেশের সূচনালগ্নে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে প্রণীত হয়েছিল সংবিধান। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছিল- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য গঠিত হয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য পরিকল্পিত হয়েছিল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং পাকিস্তান সেনা সদস্য কর্তৃক নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছিল। ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সরকারিকরণ করা হয়েছিল। কুতরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছিল। আরো নানা কিছু উল্লেখ করা যেত। কিন্তু কথা সেটা নয়, কথা হলো শুরুটা এমনই ছিল। নানা পরিকল্পনার একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে এগোচ্ছিল দেশ। অতঃপর উচ্চাভিলাষী নৃশংস ষড়যন্ত্রকারী কিছু সেনা সদস্য কর্তৃক। সংঘটিত হলো ১৫ আগস্টের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। সপরিবারে নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু। ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। থমকে গেল দেশ ও জাতি। শুরু হলো সামরিক শাসন। দীর্ঘ কয়েক বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পর দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচিত সরকারের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ। স্বাধীনতার চার দশক আমরা অতিক্রম করে এসেছি। একটি দেশ ও জাতির জন্য এটি খুব কম সময় নয়। গড়িয়েছে অনেক জল। বিজয়ের পরবর্তী পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের উত্থান-পতনে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি মুখথুবড়ে পড়ছিল বারবার। ভাত-কাপড়, শিক্ষা, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি মানুষ যে দুটি দাবি জোরাল কণ্ঠে উত্থাপন করেছিল, তা হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। বিলম্বে হলেও জাতি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় পেয়েছে এবং তা আংশিক কার্যকরও হয়েছে। এখনো পলাতক রয়েছে কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত।
 
বিলম্বে হলেও গণদাবির পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। জাতি দীর্ঘ সময় ধরে এ বিচারের অপেক্ষায় আছে। এ বিচারকাজ সম্পন্ন হলে জাতির আর একটি মর্যাদা ও অহংকারের জায়গা তৈরি হবে। এবারের স্বাধীনতা দিবস এই প্রত্যাশাকে দৃঢ় করে তুলুক। এ দেশের মানুষ রক্ত এবং মৃত্যুকে সহজ সত্য করে পাড়ি দিয়েছে ইতিহাসের দুর্গম পথ। বারবারই বিজয়ী হয়েছে আন্দোলনে-সংগ্রামে। অর্জন করেছে অধিকারের জায়গা। মানুষ তার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকে না। মানুষই পারে জীবনের ন্যায় ও সত্যকে পতাকার মতো উড়িয়ে রাখতে। তাই মানুষের জীবনে বিজয়ের আনন্দ মানুষই উৎসবমুখর করে তোলে। এই উৎসবমুখর জীবনের জয়গানের প্রার্থনা ধ্বনিত হচ্ছে আজকের বাংলাদেশে। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের মহিমা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করবে গৌরব অর্জনের পথে, এই বিশ্বাস হোক সবার প্রতিজ্ঞা।

মুক্তিযুদ্ধ

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে