Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২০ , ৪ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১২-২০১১

ধনিক শ্রেণীর উত্থান, শিশুশ্রম ও সামাজিক বৈষম্যচিত্র

ফকির ইলিয়াস


ধনিক শ্রেণীর উত্থান, শিশুশ্রম ও সামাজিক বৈষম্যচিত্র
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে জনগণের সঙ্গে দেখা করেছেন। বলেছেন, তার দরজা সবার জন্য খোলা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের মানুষের সঙ্গতি বেড়েছে। তাই বেশি বেশি কুরবানি দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই কথার পাশাপাশি কিছু ভিন্ন চিত্র টিভিতে দেখলাম। ঈদের ছুটিতে রাস্তায় শিশুরা ফুলের মালা বিক্রি করছে। দুটুকরা মাংসের জন্য ছুটোছুটি করছে হতভাগা শিশুরা। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণীর সংখ্যা বেড়েছে। এখন কোটি কোটি টাকার ছড়াছড়ি ঈদে-পুজোয়। কিন্তু সার্বিক সমাজচিত্র কী?
 
বাংলাদেশের ভাগ্যাহত শিশুদের ?পথকলি? কিংবা ?টোকাই? পদবি নিয়েই কাটাতে হচ্ছে যুগের পর যুগ। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের একটি ভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। তা হচ্ছে শিশুশ্রম। শিশুশ্রম বন্ধের দাবি বারবার উঠলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বাংলাদেশে গেলো ৪০ বছরে। দেশে হাজার হাজার নব্য কোটিপতির জন্ম হলেও, হাজার হাজার মাল্টি কমপ্লেক্স কোম্পানি গড়ে উঠলেও শিশুসদন, শিশু পুনর্বাসন করার মতো একান্ত মানবিক কর্মটি করার জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান হাত বাড়িয়ে দেয়নি। সরকারি সংস্থার নাকের ডগার ওপর দিয়ে বাংলাদেশের শিশুরা পাচার হয়ে যায় বিদেশে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদেরকে উটের জকি হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। কোনো কোনো শিশু, কিশোর, কিশোরীর শরীরের কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির খবরও আমরা পড়ি পত্রপত্রিকায়।
 
বাংলাদেশের শিশু সম্পদকে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপত্তা দান করার বিষয়টি আজ সমাজের বিবেকের কাছে সময়ের দাবি। প্রতিটি বিত্তবান-চিত্তবান মানুষ যদি একটি আর্তপীড়িত, দুস্থ শিশুর কল্যাণে এগিয়ে আসেন, তবেই পাল্টে যেতে পারে বাংলাদেশের ভাগ্যাহত শিশুদের জীবনচিত্র। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের শ্রমিক হিসেবে না খাটিয়ে, তাদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং কারিগরি প্রযুক্তি সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। শুধুমাত্র মানবিক বিবেকই পারে একটি জাতি গঠনে অগ্রণীর ভূমিকার সোপান নির্মাণ করে যেতে।
 
কিন্তু এই কাজটি করা হচ্ছে না শক্তিশালী উদ্যোগে। যখনই প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা আমরা বলি তখনই আমাদের চারপাশে এসে হাজির হয় নানা রাজনৈতিক রাহুশক্তি। বুর্জোয়া রাজনীতি সবসময় ধনিক শ্রেণীর তোষক। তারা তোষামোদি করে অর্থ-বিত্তের। দরিদ্র মানুষের চাহিদা তাই বারবার হোঁচট খায়। এ প্রসঙ্গে রাশিয়ান অরিজিনের নির্বাসিত কবি যোশেফ ব্রডস্কির একটি কথা আমার সবসময় মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, দরিদ্ররা মেধাবী হলেও তাদের তা প্রকাশের সুযোগ কম। কারণ তারা নিষ্পেষিত। তবে আত্মগোপন করে থাকার মাঝে এক ধরনের আনন্দ আছে। সমাজে আত্মগোপন করেও সত্যের পক্ষে কথা বলা যায়। অনেক ধনী সাধ্য থাকার পরও সত্যের পক্ষে দাঁড়ায় না। তার চেয়ে বেশি বেদনার কিছু হতে পারে না। স্টিম রোলার চালিয়ে কি সব সত্যকে গোপন করে রাখা যায়? মানুষের মনের ইচ্ছা কি রাখা যায় নির্বাসিত? এ প্রসঙ্গে দ্বিমত বা বহুমত থাকতে পারে। কিন্তু এমন কিছু সত্য আছে, যা মনের অজান্তে হলেও মেনে নিতে হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতারণা এর মাঝে অন্যতম।
 
যুক্তরাষ্ট্রে লেবার ডে উপলক্ষে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, বিভিন্ন কাগজে। কিছুদিন আগে একটি বিজ্ঞাপন আমার খুব ঘনিষ্ঠ নজর কাড়লো। পূর্ণ পৃষ্ঠাব্যাপী বিজ্ঞাপনে কার্ল মার্কসের ছবি। শ্রম ও শ্রমিকের অধিকার সংবলিত মার্কসের কিছু বাণী তাতে শোভা পাচ্ছে। এখানে কার্ল মার্কস কেন? আমি প্রশ্ন করি নিজেকে। এখানে থাকার কথা আব্রাহাম লিংকন, ওয়াশিংটন কিংবা জেফারসনের ছবি। না, শ্রমিকরা বেছে নিয়েছেন সেই কার্ল মার্কসকেই। যার মতবাদ এই যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পায়নি ঠিকই কিন্তু শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে তার তত্ত্ব এখনো বিশ্বে সর্বজনস্বীকৃত। মতবাদ যতোই সৎ ও মহৎ হোক না কেন তা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব কোনো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রনায়কদের। কেউ যদি তা নিয়ে আত্মপ্রতারণা করে তবে সাধারণ মানুষের কিছু করার নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। কোনো কালেই পারেনি। আর পারে না বলেই এই সামন্তবাদী রাষ্ট্রে এখনো কার্ল মার্কসই শ্রমিক সমাজের শ্রদ্ধার প্রতীক।
 
বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। এর অনেক কারণ আছে। তবে এই দেশের বামপন্থীরা সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাম রাজনীতিবিদরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যারা দেশের মানুষের অগ্রসরমান যাত্রাকে কুসুমাস্তীর্ণ করতে চান, তারা সকলের সঙ্গে ঐক্য রেখেই কাজ করতে পারতেন। একটি কথা বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বলা খুবই জরুরি। তা হচ্ছে ধমক কিংবা হয়রানিমূলক মানসিকতা শুধু গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্তই করে না, দেশের জনগণের মাঝেও ভীতির সঞ্চার করে। ফলে জনগণ ক্রমেই রাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্রের প্রতি নিজেদের আস্থা হারায়। একটি মধ্যস্বত্বভোগী মহল যে কোনো সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের ফায়দা হাসিলে তৎপর হয়। বর্তমান সরকারের সময়েও এমন কোনো অশুভ শক্তি গজিয়ে উঠছে। সেদিকে ক্ষমতাসীন সরকারকে সদাসতর্ক থাকতে হবে। আবারো বলি, বাংলাদেশে যে জুলুমবাজি ও লুটপাট শুরু হয়েছিল তার বিহিত করার প্রয়োজনে একটি কঠোর সরকারের খুবই প্রয়োজন ছিল। এই সরকার সেই দায়িত্বটি পালন করতে পারছে বলে আমার মনে হয় না। সমাজ বদলের পূর্বশর্ত এমন নয়।
 
অতীতেও আমরা লক্ষ করেছি, সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাঙালি জাতি আবারো দাঁড়িয়েছে সাহস নিয়ে। সরকারি সাহায্য কখনো সমস্যা কাটানোকে লাঘব করেছে। কখনো মানুষ নিজস্ব উদ্যোগেই অতিক্রম করেছে অনেক ঝড়-বাদল, তীব্র প্রতিকূলতা। বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি রাষ্ট্রে সরকারের সৎ ও সুদৃঢ় সহযোগিতা একটি জাতিকে বহুলাংশেই বলীয়ান করে তোলে। রাষ্ট্রের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সরকারের সদিচ্ছাই কাজ করে সবচেয়ে বেশি। দেশের মানুষ মন্ত্রী, এমপির কাছে তাদের দাবি জানায়; এবং তা পূরণ করতে হয় সরকারকেই। আর উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে জনগণের মনের আয়না পাঠ করেই সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। এই হিসাবে ভুল হলে এই সরকার, দল এবং রাজনীতির ওপর খড়গ নেমে আসে। জনগণ মুখ ফিরিয়ে নেয় ক্রমেই। রাষ্ট্রের মালিক যদি জনগণ হয় তবে রাষ্ট্রের জনগণ দ্বারাই নির্বাচিত যে সরকার, তারা জনগণের ইচ্ছে পূরণ করবে না কেন?

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে