Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ , ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (79 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-২৫-২০১৮

পয়লা অক্টোবরের অপেক্ষায় আছি

আবদুল গাফফার চৌধুরী


পয়লা অক্টোবরের অপেক্ষায় আছি

জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে যাওয়ার ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে এক দিনের যাত্রাবিরতি করেছিলেন। এবার লন্ডনে তিনি কোনো জনসভায় বক্তৃতা দেননি। সম্ভবত সভানেত্রীর নির্দেশে এখানকার আওয়ামী লীগও কোনো আয়োজন করেনি। তবে লন্ডনের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে হুমকি-ধমকি হয়েছে অনেক। শেখ হাসিনার গতবারের লন্ডন সফরের আগে বিএনপির নেতাকর্মীরা লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাঙচুর করে এবং পরে শেখ হাসিনা লন্ডনে এলে তাঁর হোটেলের সামনে বিক্ষোভ দেখানোর নামে গুণ্ডামির আশ্রয় নেয়।

এবার যুক্তরাজ্যের আওয়ামী লীগ আগেভাগেই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের নামে বিএনপি গুণ্ডামি করতে এলে তারা দাঁতভাঙা জবাব দেবে। যুক্তরাজ্যের বিএনপি নেতারা পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন, তাঁরা বিক্ষোভ দেখাবেনই। ব্রিটিশ পুলিশকে তাই সতর্ক থাকতে হয়েছিল।

কিন্তু এবার গর্জন অনুযায়ী তত বর্ষণ হয়নি। বোঝা গেল, বিএনপি অন্য কোনো ভাষা বুঝতে না চাইলেও লাঠির ভাষা ঠিকই বোঝে। এটা দেশে যেমন প্রমাণিত, তেমনি বিদেশেও। লন্ডন বিএনপির এক বন্ধুর কাছ থেকে জেনেছি, গতবারের হাঙ্গামার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ধমক খাওয়ার পর তারেক রহমান লন্ডনের রাস্তায় আর হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সাহসী নন অথবা রাজনৈতিক কারণে ইচ্ছুক নন।

এই রাজনৈতিক কারণটা কী জানতে চাইলে আমার সোর্স বলেছেন, ড. কামাল হোসেন ও ডা. বি চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপির পুরোপুরি ঐক্য না হলেও একটা ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ গঠন এবং নির্বাচনে তার সাফল্য সম্পর্কে তারেক রহমান আশাবাদী। এ জন্য তিনি আগের শত্রুতা ভুলে ডা. বি চৌধুরীর সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেছেন। তাঁর আশা, এই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় নির্বাচনে তাঁদের জোট জয়ী হলে ড. কামাল হোসেন আইনত হিসেবে আইনের সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচে তাঁকে ও তাঁর মাকে আন্দোলনের রায়মুক্ত ও দায়মুক্ত করে মাকে কারাগারের বাইরে এবং তাঁকে দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারবেন।

একবার মুক্ত মানুষ হিসেবে দেশে ফিরতে পারলে তারেক রহমানকে আর পায় কে? তাঁর ঝটিকা বাহিনীর সাহায্যে যেমন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সাধ দুই দিনেই মিটিয়ে দিতে পেরেছিলেন; তেমনি ভবিষ্যতে ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ঘুচিয়ে দিতে পারবেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর পদ তারেক রহমানের জন্যই যে সংরক্ষিত আছে এ সম্পর্কে তিনি দৃঢ়ভাবে আস্থাবান এবং রাজনৈতিক কৌশলের জন্য মাথা নত করে যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব এখন মেনে নিতে হলেও পরে নিজেদের প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করে কমলার খোসার মতো যে পরে ফেলে দিতে পারবেন, সে সম্পর্কেও তাঁর বিশ্বাসে কমতি নেই।

যদিও বিএনপি-যুক্তফ্রন্টের মিলন সম্ভাবনায় এবং একই সভামঞ্চে দুই জোটের নেতারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোর ফলে দেশের একমাত্র ‘নিরপেক্ষ বাংলা দৈনিকটি’ অত্যন্ত উত্ফুল্ল হয়ে তাদের খবরে শিরোনাম করেছে, ‘ভোটের আগে বড় ঐক্যের সূচনা’, কিন্তু লন্ডনে এই দুই জোটেরই শুভাকাঙ্ক্ষী মহলের অনেকের আশঙ্কা, এটা ভোটের আগে ঐক্যের নামে বড় অনৈক্যের সূচনা। তবে একটা ব্যাপারে তারা আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করে যে যদি বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের মধ্যে পুরোপুরি ঐক্য না হয়েও কার্যকর সমঝোতা হয়, তাহলেও ভালো। যুক্তফ্রন্ট তৈরিই হয়েছে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য। তাদের সঙ্গে বিএনপির মিলিত হওয়ার অর্থই হচ্ছে নির্বাচনে যোগ দেওয়া; যদিও যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু এই দাবি মানা না হলেও নির্বাচন বর্জন করবে—এমন কথা বলেনি অথবা বলছে না। আর যুক্তফ্রন্ট যদি নির্বাচনে যায়, তাহলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও তখন তা আর গুরুত্ব পাবে না। বিএনপি এই পাগলামিটা করবে না। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও এই কাজটা তাঁর দলকে করতে দেবেন না। কারণ কারাবাস তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে।

মহানগর নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে আনন্দে উদ্বাহু হয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘ফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য হয়ে গেছে।’ আসলে হয়নি। যা হয়েছে তা বিবাহপূর্ব এনগেজমেন্ট মাত্র। কাবিননামা তৈরি না হলে ‘শুভ বিবাহ’ হবে কিভাবে? ‘জাতীয় ঐক্যের’ সমাবেশের পর বিএনপির যে সভা হয়েছে, তাতে এই ঐক্যপ্রক্রিয়ার কথা আলোচনা হয়েছে। যুক্তফ্রন্টের তরফে জানা যাচ্ছে, দুই জোটের এই ঐক্যের কোনো কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। এই কাঠামো তৈরির জন্য বিএনপির সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তফ্রন্টের আলোচনা বাকি রয়েছে।

এই যদি অবস্থা হয়, সেপ্টেম্বর মাস শেষ হতে আর বাকি আছে ছয় দিন। মহানগর নাট্যমঞ্চের সভায় বিএনপি ও যুক্তফ্রন্ট নেতারা বাহুবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সংক্রান্ত তাঁদের দাবিগুলো ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মেনে না নিলে তাঁরা ১ অক্টোবর থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করবেন। এই ছয় দিনের মধ্যে কি বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ঐক্য হবে এবং তারা যুক্তভাবে আন্দোলনে নামতে পারবে? না, আনুষ্ঠানিক ঐক্যপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় আলাদাভাবে যুগপৎ আন্দোলনে নামবে?

যুক্তভাবে আন্দোলনে নেমেই যেখানে জনগণের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার আশা কম, সেখানে আলাদা হয়ে মাঠে নেমে তারা কোনো ম্যাজিক দেখাতে পারবে কি? আন্দোলন মারমুখো হলে সাধারণত নেতারা কারাগারে যান। অক্টোবরে এ ধরনের আন্দোলন যদি শুরু করা যায়, তাহলে নেতারা কারাগারে যেতে পারেন। যুক্তফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা এখন বৃদ্ধ ও অসুস্থ। তাঁরা কারাগারে যেতে পারবেন কি? বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠিয়ে তাঁর সঙ্গে অভাবনীয়ভাবে একজন পরিচারিকা দিতে হয়েছে। এককথায় তাঁরও বেআইনি বন্দিজীবন। যুক্তফ্রন্টের বৃদ্ধ নেতারা (একজন এরই মধ্যে অসুস্থ) কারাগারে গেলে সঙ্গে পরিচারক চাইবেন কি? আমার তো মনে হয় কারাগারে যাওয়ার ভয়েই মাঠের আন্দোলন স্থগিত হয়ে যাবে। ড্রয়িংরুম আন্দোলন চলবে। এতে জনগণের সমর্থন ও অংশগ্রহণ লাগবে না।

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও যুক্তফ্রন্টের মধ্যে যদি ঐক্যের কাঠামো তৈরিও হয়, তা হবে ওপরে ঐক্য, ভেতরে ক্ষমতার কোন্দল, নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে এক দল আরেক দলকে ঠেঙা মারার জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত থাকবে। একটা উদাহরণ দিই ১৯৫৪ সালের আদি ও অকৃত্রিম যুক্তফ্রন্ট থেকে। এই যুক্তফ্রন্টে প্রধান দল ছিল হক সাহেবের কৃষক শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে জয়ী হলে হক সাহেব মুখ্যমন্ত্রী হবেন, এটা মুখে মুখে স্বীকৃত হলেও তলে তলে এক দলের প্রতি অন্য দলের অবিশ্বাস বাড়ছিল।

নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলো, ফজলুল হক সাহেব আশঙ্কা করলেন, তাঁকে সংসদীয় দলের নেতা করা হবে না, অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী করা হবে না। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক মনোনীত চৌধুরী খালেকুজ্জামান। তিনি ছিলেন শেরেবাংলার ব্যক্তিগত বন্ধু, তাঁর অনুরোধে সম্ভবত হক সাহেব যুক্তফ্রন্টের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার আগেই গভর্নর তাঁকে মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য ডেকে পাঠান। হক সাহেব মুখ্যমন্ত্রিত্বের শপথ নিয়ে তাঁর দলের মাত্র তিনজনকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেন।

এই তিনজন হলেন সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া, রংপুরের আবু হোসেন সরকার ও কুমিল্লার আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী। তিনজনই কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা। প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক সদস্য ক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ হক সাহেবের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে আতাউর রহমান খানকে যুক্তফ্রন্টের নতুন নেতা নির্বাচনের চেষ্টা করে। কেন্দ্রে ক্ষমতায় বসে মুসলিম লীগ সরকার (পূর্ব পাকিস্তানের পরাজিত) তাতেই ইন্ধন জোগাতে থাকে। যুক্তফ্রন্ট দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং হক সাহেবের সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করা হয়।

বর্তমানের দুই নম্বরি যুক্তফ্রন্টের এই অবস্থা ঘটবে, তা বলি না। কারণ তারা যুক্ত বা বিযুক্ত যেভাবেই নির্বাচনে যাক, জয়ী হবে এমন সম্ভাবনা কম। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠনসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে তারা আন্দোলনে নামার মহড়া দিতে পারে, তাতে জনসমর্থন কতটা জুটবে সে সম্পর্কে অনেকের সন্দেহ আছে। কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে চাই না। শুধু ১ অক্টোবরের অপেক্ষায় আছি।

এমএ/ ১১:৩৩/ ২৫ সেপ্টেম্বর 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে