Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (27 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-২৭-২০১৮

আর যদি বাঁশি না বাজে

এম মতিউর রহমান মামুন


আর যদি বাঁশি না বাজে

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪১ সালের ৫ এবং ৬ই এপ্রিল কলকাতা মুসলিম ইনষ্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজত জয়ন্তী উৎসবের সভাপতি রূপে তাঁর শেষ ভাষণে বলেছিলেন " আর যদি বাঁশি না বাজে" ১৯৪২ সালের ১০ ই জুলাই কলকাতা বেতারে বসে কবির রচিত নবযুগে প্রকাশিত "আমার সুন্দর" প্রবন্ধের সাপ্তাহিক কৃষকে প্রকাশিত হয়।

এরপর সেদিন আমরা কেউ হয়তো বুঝে উঠতে পারেনি আর বাঁশি কোন দিনও বাজবে না। সেদিন থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় সাহিত্য ও সৃজনশীল রচনা তিনি উপহার দিতে পারেননি। দীর্ঘ ৩৪ বছর বাক শক্তিহীন পঙ্গু অবস্থায় রোগ ভোগের পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগষ্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কবি না ফেরার দেশে চলে যান। বাংলা সাহিত্যে নজরুল যুগস্রষ্টা একথা সহজভাবে সত্য। তাঁর বিচিত্র ঘটনাবহুল নাটকীয় জীবন ও রচনাবলির পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহের কাজ এখনো শেষ হয়ে যায়নি, তাঁর নতুন নতুন মূল্যায়ন চলতেই থাকবে। ২২ বছরের সংক্ষিপ্ত সৃজনশীলতার কালে সাহিত্য ও সংগীতে তিনি যা দিয়েছেন তা বাঙ্গালির আত্মপরিচয়, জাতীয় চেতনার ও গেীরববোধের ভিত্তিস্বরূপ। তাঁর সীমিত সাহিত্যকালে তিনি আমাদের যা দিয়ে গেছেন তা অসামান্য। ক্ষুধিত-তৃষিত, প্রেম-বিপ্লব, সত্য সৌন্দর্য, বুদ্ধি এবং আবেগ ঢেলে দিয়েছেন তাঁর সাহিত্য কর্মে।

১৯১০-১১ সালে স্থানীয় লেটোদলের "ছোট উস্তাদজী" 'শকুনিবধ' 'মেঘনাদবধ' 'রাজপুত্র' 'চাষার সং' প্রভৃতি গীতিনাট্য ও প্রহসন এবং মারফতি, পাঁচালী ও কবি গান রচনায় খ্যাতি অর্জনের মধ্যে দিয়ে কবি নজরুলের আগমণ। মাত্র ২২ বছর সাহিত্য সাধনায় নজরুল হয়ে উঠেন কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্যকার, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, শিশু-সাহিত্যিক, গীতিকার, গীতালেখ্য ও গীতিনাট্য রচয়িতা, সুরকার, স্বরলিপিকার, গায়ক, বাদক, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীত পরিচালক, পত্রিকা সম্পাদক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র-কাহিনীকার, চলচ্চিত্র পরিচালক।

১৯১১ সলে মাথরুন হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে স্কুল পরিত্যাগ, ১৯১২ সালে রাণীগঞ্জে এক রেলওয়ে গার্ডের খপ্পরে পড়ে কিছুদিন বাবুর্চিগিরি এরপর ১৯১৪ সালে আসানসোলের তৎকালীন পুলিশ ইনস্পেক্টর কাজী রফিজউল্লাহর সঙ্গে পরিচয়। ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে রাণীগঞ্জ সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি এবং সে সময় রচনা করেন 'করুণ গাথা' 'বেদন বেহাগ' ও 'চড়ুই পাখির ছানা' । ১৯১৭ সালে নজরুল ৪৯ নং বাঙ্গালী পল্টনে নাম লেখালেন এবং ঐ বছরেই নজরুল সৈনিক জীবনে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন।

১৯১৮-১৯ নভেম্বর অগ্রহায়ণ ১৩২৫ কলকাতা থেকে মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন কর্তৃক মাসিক সওগাত প্রকাশিত হয় এবং ঐ সংখ্যায় "বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী" গল্পটি ছাপা হয়।১৯২০ জানুয়ারি কলকাতার বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে আসেন এবং সেখানে কমরেড মুজাফ্ফর আহমদের সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় হয়। বৈশাখ ১৩২৭ মোহাম্মদ আফজাল উল হকের পিতা শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হকের সম্পাদনায় মুসলেম ভারত সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয় এবং ঐ সংখ্যা থেকে নজরুলের পত্রোপন্যাস বাঁধনহারা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

এছাড়াও ঐ পত্রিকায় 'শাতিল আরব' 'খেয়াপারের তরণী' 'কোরবানী' 'মহররম' 'কামাল পাশা' ও 'বিদ্রোহী' প্রকাশিত হয়। ১৯২১ মার্চ-এপ্রিল, ১৩২৭ সন নজরুল কুমিল্লা জেলার দৌলতপুর গ্রামে চলে যান। সেখানে আলী আকবর খানের ভাগিনেয়ী সৈয়দা খাতুন নজরুলের দেওয়া নাম নার্গিস- নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রণয় হয়। সেখানে আড়াই মাস অবস্থানকালে নজরুল শিশুপাঠ্য 'খোকার বুদ্ধি' 'খোকার গল্প বলা' 'মা' 'চিঠি' প্রভৃতি কবিতা ছাড়াও নার্গিসকে নিয়ে নয়টি গান এবং 'লাল সালাম' ও 'মূকুলের উদ্বোধন' দুটি কবিতা রচনা করেছিলেন। ১৯২২ মে মাস মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ প্রকাশিত দৈনিক সেবক পত্রিকায় যোগদান করেন।

১১ আগষ্ট তারিখে (২৫শে শ্রাবণ ১৩২৯) নজরুল নিজের সম্পাদনায় অর্ধ সাপ্তাহিক ধুমকেতু প্রকাশ করেন। ধুমকেতুর প্রথম সংখ্যার শিরে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী মুদ্রিত হয়। 'আয় চলে আয় রে ধূমকেতু আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু'। ২২ সেপ্টেম্বর (আশ্বিন ১৩২৯) ধূমকেতুতে নজরুলের 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতাটি প্রকাশিত হলে ঐ কবিতার জন্য (শারদীয় সংখ্যা) বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় এবং কলকাতা চীফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়, এবং ১৬ জানুয়ারি ১৯২৩ মামলার রায় শুনানি হয় এবং ভারতীয় দন্ডবিধি আইনের ১২৪-এ ধারা অনুসারে নজরুলের এক বছর কারাদন্ড হয়। ১৬ এপ্রিল নজরুল ইসলামকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করে সাধারণ কয়েদির পোশাক পরানো হয়।

এক বছর ৩ সপ্তাহ কারাভোগের পর ১৬ ডিসেম্বর নজরুল কারাবাস হতে মুক্তি পান। ১৯২৪ এপ্রিল ১২ই বৈশাখ ১৩৩১ সন নজরুল ২৩ বছর বয়সে আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলাকে বিয়ে করেন। ১৯২৭ সালে ঢাকা বিভাগ থেকে কেন্দ্রীয় আইন সভায় মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত দুটি আসনের একটিতে নজরুল নির্বাচনে প্রার্থী হন। অর্থাভাবে সঠিকভাবে প্রচারকার্য না হওয়ায় নজরুল কেবল নির্বাচনে হারলেন না তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল। ১৯৩০ সালে রাজদ্রোহমূলক অভিযোগে নজরুলের 'প্রলয়শিখা' গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত এবং নজরুলের ছয় মাসের কারাদন্ডাদেশ হয়। কিন্তু গান্ধী-আরউইন চুক্তি অনুসারে কারাদন্ড থেকে মুক্তি পান।

ঐ মাসের ৭মে তারিখে কবিপুত্র বুলবুলের মৃত্যু হয়। ১৯৩২ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর সিরাজগঞ্জে বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে নজরুল 'যৌবনের ডাক' অভিভাষণটি পড়েন। ১৯৩৬ সালে ফরিদপুর মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৯ সালের ১০ মার্চ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার খাজা নাজিমউদ্দিন জানিয়ে দেন যে, নজরুলের নিষিদ্ধ বইগুলোর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না।

১৯৪০ সালের অক্টোবর মাসে দৈনিক নবদূত পত্রিকায় প্রধান সম্পাদক, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ঈদপ্রীতি সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে নজরুল তরুণদেরকে জাগরণের ডাক দেন। ১৯৪১সালে ৫ ও ৬ এপ্রিল কলকাতা মুসলিস ইনষ্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজত জয়ন্তী উৎসবের সভাপতিরূপে তাঁর শেষ ভাষণে বলেছিলেন " আর যদি বাঁশি না বাজে"। ১৯৪২ সালের ১০ ই জুলাই মস্তিষ্ক রোগে আক্রান্ত হন কবি।

১৯ জুলাই মধুপুরে কবিকে চিকিৎসার স্বার্থে নেওয়া হয় এবং ২১ সেপ্টেম্বর কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৪৩ জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে চিকিৎসার কোন উন্নতি না হওয়ায় লুম্বিনী পার্কের মানসিক হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হয় এবং ডাঃ শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি ও সজনীকান্তদাসকে সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ করে নজরুল সাহায্য কমিটি গঠন করা হয়।

১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক প্রদান করে।১৯৫২সালে নজরুল নিরাময় সমিতি গঠন এবং চিকিৎসার জন্য করাচিতে কবি ও কবি পত্নী যান। কিন্তু স্বাস্থ্যের কোন উন্নতি না হওয়ায় ১৯৫৩ সালের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে কবিকে পাঠানো হয়। ১৫ ডিসেম্বর কবিকে পুনরায় কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৬০ সালে ভারত সরকার কবিকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং তার দুবছর পর ১৯৬২ সালে ৩০ জুন কবিপত্নী প্রমীলার মৃত্যু এবং নিজ গ্রাম চুরুলিয়ায় দাফন শেষে কবি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৭২ জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি কে ঢাকা আনার ব্যবস্থা করেন এবং সালের ২৪ মে কবিকে বাংলাদেশ বিমানে করে কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয়।

তাঁর বাসস্থান নির্দিষ্ট হয় ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ২৬ নং সড়ক ৩৩০-বি সবুজ লেন ঘেরা বাড়ি, বর্তমানে বাড়িটি কবিভবন নামে পরিচিত। ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গৌরবময় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবিকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি প্রদান করে। সম্মাননাপত্র পাঠ করেন তদানিন্তন উপাচার্জ ড. আঃ মতিন চৌধুরী এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী বঙ্গভবনে আয়োজিত এক বিশাল অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপ্রতি মাহ্মুদুল্লাহ্ ডি. লিট ডিগ্রি পত্র প্রদান করেন।

এ সময় কবি ধানমন্ডির কবিভবনেই থাকতেন। ১৯৭৬ সালে জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি কবিকে ২১শে পদকে ভূষিত করা হয় এবং ঐ বছর ২৯ আগষ্ট ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ রোববার সকাল ১০.১০ মিনিটে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বেতার ও টেলিভিশনে খবরটি প্রচার হলে জাতি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। জাতীয় পতাকা অর্ধনির্মিত করা হয়। দুপুর দুইটার দিকে কবির মরদেহ পি.জি হাসপাতাল হতে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে নেওয়া হলে সেখানে সর্বস্তরের মানুষ কবির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বিকেল ৪.৩০ মিনিটে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কবির জানাযা হওয়ার পর কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে। সেখানে বাদ আসর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

এমএ/ ১১:০০/ ২৭ আগস্ট

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে