Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (77 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-১৫-২০১৮

ভাগ্যের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু

আনিস আলমগীর


ভাগ্যের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু

বহু দিন ইচ্ছে ছিল বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে পুষ্প অর্পণ করবো, সমাধিস্থলে গিয়ে জিয়ারত করে আসবো। কিন্তু নানান কারণে হয়নি। বিশেষ করে অচেনা জায়গায় একা একা যাওয়ার বিড়ম্বনা আর যৌথ দলের সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ চেয়েও না পাওয়াই ছিল মূল কারণ। যাক, বহু দিন পর গত ৭ জুলাই সে সুযোগ মিললো। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একদল সাংবাদিক টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করার কর্মসূচি নিলে শফিক ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকেও নেওয়ার জন্য।

এর মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের তিন দেশের তিন জাতির জনকের কবর দেখার সুযোগ হলো। ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে দেশ দুটি সফরকালে মহাত্মা গান্ধী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কবরআগেই দেখা হয়েছিল। গান্ধী এবং জিন্নাহর কবরের মতো এতো বিস্তৃত জায়গায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল নয়। পরিবেশও ভিন্ন, পারিবারিক আবহ রয়েছে। চারপাশে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পরিবেষ্টিত। বলা যায় পারিবারিক কবরে শুয়ে আছেন তিনি। বাবা-মায়ের কবরের পাশে। কী নির্মম ঘটনা, ’৭৫ সালের ১৫ আগস্টচলে গেলেন তিনি।আর সেই একই সালের ৩০ মার্চ মারা যান তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান আর ৩১ মে মারা যান তার মা সায়েরা খাতুন। তিনটি কবরকে ঘিরে আধুনিক এক নকশায় সাজানো হয়েছে সমাধিস্থল। রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক জানানোর ব্যবস্থা।

১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর বাকিদের লাশ ঢাকায় কবর দেওয়া হলেও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জনগণের মন থেকে মুছে ফেলতে তার লাশ পাঠানো হয়েছে সেই অজপাড়া গ্রামে। কিন্তু যাকে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয় তার লাশ যেখানেই যাবে সেখানেই প্রতিদিন শত শত মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ছুটে যাবেন সেটা ভেবে দেখেনি খুনির দল। তারা ভেবে দেখেনি এই লোকটি জন্মেছেভাগ্যের বরপুত্র হিসেবে। মৃত কিংবা জীবিত, মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা তার অপরিমেয়।

১৫ই আগস্ট, বাঙালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রয়াণ দিবস। তার মর্মান্তিক মৃত্যুর শুধু শোকগাথা লিখার জন্য আমার এ লেখা নয়। 

ভাগ্যের বরপুত্রের সাফল্যের কথা স্মরণ করার জন্যও আমার এ লেখা। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনেরও একজন সক্রিয় সৈনিক। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে দেখা যায় বাংলার প্রিমিয়ার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দক্ষিণ হস্ত হিসেবে তিনি কত কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন পাকিস্তান সৃষ্টির কাজে।

সমীপ কালের ফেনিল আবর্তের সঙ্গে যুক্ত থাকতে না পারলে শাশ্বতের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে থাকা যায় না। ৫৫ বছরের তার জীবন ছিল সে ফেনিল আবর্তের সঙ্গে যুক্ত থাকা আর অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করা। মুহূর্তের জন্যও তার জীবন ইতিহাসের স্রোতের ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। সুতরাং সে জীবন তো সংঘাতময় হবেই। কায়েমী স্বার্থ তো তার জীবনের অবসান চাইবেই। তার জীবনের অবসান হয়েছে সত্য কিন্তু তার জীবনে অসফলতা ছিল না। সগৌরবে তিনি তার কর্মের সফলতা এনে দিয়েছিলেন। স্রষ্টার পথ সৃষ্টি সাধনার পথ। তিনি তার কাঙ্ক্ষিত সৃষ্টিতে সফলকাম ছিলেন।

যেসব ব্যক্তি জাতির মুক্তির জন্য ওঠে দাঁড়ান তারা সম্ভবত প্রায় এক ও অভিন্ন চরিত্রের লোক হয়ে থাকেন। সম্ভবত সে জন্যই জর্জ ওয়াশিংটন, গান্ধী, জিন্নাহ, বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের অনেক গুণাবলি ছিল, যা প্রায় একই রকম। এসব মহান পুরুষ সত্যের কাছে সদা-সত্যবান থাকেন। নিজের জীবনে যা সত্য বলে নির্ধারণ করেছেন তা তারা কখনও অসত্যের সঙ্গে আপসের মুখোমুখি করেন না। বঙ্গবন্ধু এবং জিন্নাহর চরিত্রে এ গুণের সমাহার ছিল চূড়ান্তভাবে। তাই তারা অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন।

গান্ধী না হলে ভারত স্বাধীন হতো কিন্তু জিন্নাহ্ না হলে পাকিস্তান হতো না আর বঙ্গবন্ধু না হলে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়াও সম্ভব ছিল না। গান্ধী সারা জীবন সত্য নির্ধারণের পরীক্ষা নিরীক্ষায় সময় কাটিয়েছেন। সম্ভবত সে কারণে তিনি তার আত্মজীবনীর নাম দিয়েছেন ‘এক্সপেরিমেন্ট অব ট্রুথ’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও জিন্নাহ্ সত্যকে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে সত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পণ করে মাঠে নেমেছিলেন। সেজন্য জিন্নাহ্ আর বঙ্গবন্ধু সহকর্মীদের অসহযোগিতার মুখোমুখি হননি। কিন্তু গান্ধীর সহকর্মীরা শেষ প্রান্তে এসে গান্ধীর সত্যটাকে পরিত্যাগ করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু তো তার সত্যের পেছনে সাধারণ মানুষের অসাধারণ তেজ সৃষ্টি করে যে কোনও ত্যাগ স্বীকারের জন্য তার জাতির সাড়ে সাত কোটি সাধারণ মানুষকে প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন। যে কারণে তার সহকর্মীরা তো দূরের কথা, বিশিষ্টজনেরাও তার উচ্চারিত সত্যের বিরুদ্ধে যেতে শত-সহস্রবার চিন্তা করেছেন। কিন্তু গান্ধীর সহকর্মীরা তার অনুপস্থিতিতে ভারত বিভক্তির প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে তারা গান্ধীকে ছাড়াই ভারত বিভক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। গান্ধীর ‘অনশন’ অস্ত্রটাকে কোনও পাত্তাই দেননি তারা। বরং গান্ধীকে বাধ্য করেছিলেন তাদের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মতি প্রদান করতে। শুধু মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আর সীমান্তের গান্ধী খান আব্দুল গাফ্ফার খানই গান্ধীর প্রতি অবিচল ছিলেন। নেহরু, পেটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদেরা তো ক্ষমতা লাভের জন্য প্রচণ্ড উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সহকর্মীদের কোনও অস্পষ্টতার মাঝে পথ চলতে হয়নি। বঙ্গবন্ধু খুবই সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট পথ সৃষ্টিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাই তার সহকর্মীরা এবং তার জাতির সাড়ে সাত কোটি মানুষ তার শনাক্ত করা পথে হেঁটেছেন। যে কারণে সফলতা পেতে সময় লাগেনি। মওলানা ভাসানী যখন ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ বলে স্লোগান দিলেন তখন বঙ্গবন্ধু বললেন ‘ভোটও চাই, ভাত চাই।’ জেনারেল আইয়ুবের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এক ইউনিট বাতিলের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। সংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বও দাবি করেছিলেন। এ দুই দাবি যখন তারা মেনে নেন এবং ইয়াহিয়া খান এসে তা বাস্তবায়ন করেন তখন থেকে বঙ্গবন্ধুর বিজয় রথ আর কোনোখানে ঠেকে থাকেনি।

বঙ্গবন্ধু একটা নির্বাচনের মুখাপেক্ষী ছিলেন। এটা ছিল জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার প্রত্যাশায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচন তাকে সে সুযোগ এনে দিয়েছিল। তিনি ওই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে বিশ্বের দরবারে তার নেতৃত্বের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যে কারণে সারা বিশ্ব এমনকি বৈরী আমেরিকার জনগণও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি কংগ্রেস আর জনগণের ভয়ে। কারণ, আমেরিকার কংগ্রেস আর জনগণ বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন এবং তা ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত ম্যান্ডেটের কারণেই। ইয়াহিয়া খান যখন মিয়ানওয়ালি জেলে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিলেন তখন কিসিঞ্জার তাকে এ বলে সতর্ক করেছিলেন যে তাকে ফাঁসি দিলে তোমরা একটা পাকিস্তানি সৈন্যও বাংলাদেশ থেকে জীবিত ফেরত আনতে পারবে না (তখন সামরিক বেসামরিক এক লক্ষ পাকিস্তানি অফিসার বাংলাদেশে ছিল)।

আমি আমার লেখার আরম্ভেই বঙ্গবন্ধুকে ভাগ্যের বরপুত্র বলে উল্লেখ করেছি। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সৃষ্টি না হলে পার্টিতে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকতো না। শুনতে খারাপ লাগলেও, ১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু না হলে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হতো না। এ দুই ঘটনা বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করেছিল তার পরিকল্পিত বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। সংগঠন ছাড়া কোনও মহৎ কাজ করা সম্ভব হয় না। এ উপলব্ধিটা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাই তিনি ১৯৫৪ সালে দল যখন সিদ্ধান্ত নিলো যারা মন্ত্রী হবেন তারা দলীয় পদ পদবী রাখতে পারবেন না, তখনই বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিত্ব পরিত্যাগ করে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। অথচ রাজনীতির ৯৯ শতাংশ মানুষ রাজনীতি করেন মন্ত্রী হওয়ার জন্য।

১৯৫৪ সালে শেরেবাংলা ফজলুল হক প্রথম যখন পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠন করেন তখন তিনি তার মন্ত্রিসভায় আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহাম্মদ, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখকে মন্ত্রী করেছিলেন। এর পরপরই কেন্দ্রীয় সরকার যখন ৯২/ক ধারা জারি করে মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেন তখন মন্ত্রীর বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে জেলখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এ এক বিচিত্র ঘটনা। আল্লাহ যাকে দিয়ে বড় দায়িত্ব সম্পাদন করান তাকে সম্ভবত নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝে গড়ে তোলেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বঙ্গবন্ধুর জীবন সমৃদ্ধ। সম্ভবত সে কারণেই তিনি অভ্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুচতুরতার পরিচয় দিতেন।

বঙ্গবন্ধু ৬ দফা প্রকাশ করেছিলেন লাহোর বিমানবন্দরে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের বৈঠক হয়েছিল। সে বৈঠকেই তিনি তার ৬ দফা পেশ করেছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতারা তা বিবেচনা করতে প্রস্তুত ছিলেন না, তাই তিনি ফেরার পথে লাহোর বিমানবন্দরে তা প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ইডেন কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ ৬ দফা দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে এবং তা নিয়েই আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্য রাত্রি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ঐতিহাসিক। তার সব পদক্ষেপই ছিল নির্ভুল। কোনও আগামী দিনের ঐতিহাসিক তা বিশ্লেষণ করলে সে সিদ্ধান্তেই উপনীত হবেন। তাই আমি তাকে ভাগ্যের বরপুত্র বলে অবহিত করেছি।

লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় বিশ্লেষক

এমএ/ ০৩:১১/ ১৫ আগস্ট

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে