Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (14 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১১-২০১১

অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও মানুষ

ফকির ইলিয়াস


অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও মানুষ
সংবাদটি গোটা যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনার ঝড় তুলেছে। পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তার চিকিৎসক কনরাড মারি। জুরিরা তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে তার চার বছর পর্যন্ত কারাদ- হতে পারে।
ছয় সপ্তাহ শুনানি চলার পর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসের আদালত ৭ নভেম্বর ২০১১ এই রায় প্রদান করে। সংবাদটি ছিল তাৎক্ষণিক ব্রেকিং নিউজ। ১২ সদস্যের জুরি বোর্ড সর্বসম্মতভাবে দোষী সাব্যস্ত করে কনরাডকে। ২৯ নভেম্বর তার সাজা ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
রায়ের পর ডা. কনরাড মারিকে (৫৮) যখন হাতকড়া পড়িয়ে আদালত থেকে কারাগারে নেয়া হয়। এই দৃশ্য দেখে বাইরে অপেক্ষমাণ জ্যাকসনভক্তরা তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন। কেউ কেউ আবেগে কেঁদেও ফেলেন।
রায় ঘোষণার সময় তা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সাধারণত কোন রায় এমনভাবে টিভিতে দেখানো হয় না। এটা ছিল একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন জ্যাকসনের পরিবারের সদস্যরাও। জ্যাকসের মা ক্যাথরিন জ্যাকসন পরে সাংবাদিকদের বলেন, 'আদালতের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।' জ্যাকসনের ভাই জারমেইন বলেন, 'ন্যায়বিচার হয়েছে। আর মাইকেল আমাদের সঙ্গেই রয়েছে।'
জ্যাকসনভক্ত ডানা ব্রেঙ্কলিন বলেন, 'এই রায়ে সে হয়তো ফিরে আসবে না, তবে দু'বছর ধরে আমি মাইকেলের সুবিচারের আশায় ছিলাম এবং আমরা তা পেয়েছি।'
এই রায়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ডা. কনরাড মারির আইনজীবী জে মাইকেল ফ্ল্যানাগান। ২০০৯ সালের ২৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলসের বাড়িতে পঞ্চাশ বছর বয়সে মারা যান বহু জনপ্রিয় অ্যালবামের স্রষ্টা পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসন। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা বিশ্বে।
পরে তদন্তে দেখা যায়, চিকিৎসার সময় অতিমাত্রায় চেতনাশক প্রোপোফল শরীরে প্রবেশ করার কারণেই মারা যান জ্যাকসন। ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে ডা. কনরাডই এই শিল্পীর দেখভাল করে আসছিলেন।
জ্যাকসনের মৃত্যুর দুই বছর পর বিচার শুরু হয় চিকিৎসক কনরাডের। জ্যাকসনের পরিবারের পক্ষে আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, কনরাড অতিমাত্রায় প্রোপোফল দেয়ার কারণেই জ্যাকসন মারা গেছেন। অসুস্থ জ্যাকসনের জন্য সঠিক ব্যবস্থা নিতেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
তবে কনরাড মারে দাবি করেন, জ্যাকসন বিভিন্ন ধরনের বেদনানাশক ওষুধে আসক্ত ছিলেন। তিনি নিজেই কোনভাবে প্রোপোফল নিয়েছিলেন। আর সেই সময়টায় কনরাড ঘরে ছিলেন না।
রায় ঘোষণার পর কনরাডকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন আদালত। এ সময় তিনি জামিন পাবেন না। ওই দিনই জানা যাবে, 'অনিচ্ছাকৃত হত্যার' দায়ে কত বছর সাজা খাটতে হবে তাকে।
সংবাদ ভাষ্যকাররা বলছেন, কনরাড মারিকে অনেক কম সময়ই জেল খাটতে হবে এবং ?তাকে নিজ গৃহেই বন্দী রাখা হতে পারে। তবে তার ডাক্তারি লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে- বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত।
অপচিকিৎসা দেশে দেশে একটি মানবিক অপরাধ। তৃতীয় বিশ্বে এর অবস্থা আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অপচিকিৎসায় লাখ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবন দিয়েছে অসংখ্য মানুষ। বাংলাদেশে একটি ওষুধনীতি রয়েছে। সরকার আধুনিক ওষুধের প্রতি এত কঠোর হওয়া সত্ত্বেও রাস্তাঘাট, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার বিভিন্ন দোকানপাট ও জনসমাবেশে কিছু প্রতারককে অবাধে ওষুধের নাম করে অসংখ্য নকল, ভেজাল, ক্ষতিকর আজগুবি সব বস্তু এবং বিষ বিক্রি করতে দেখা যায়। সেসব ক্ষেত্রে সরকারের কোন দৃষ্টি নেই। বাংলাদেশে ওষুধ ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। যারা বড় বড় ডাক্তার তারা সরকারি হাসপাতালে রোগী না দেখে বেশি রোগী দেখেন প্রাইভেট ক্লিনিকে। সেসব ক্লিনিকে যাওয়ার সাধ্য অনেকেরই নেই। তাই তারা তাবিজ-কবজ, গাছগাছড়ার ওপর নির্ভর করেন। হাতুড়ে ডাক্তারদের বিভিন্ন ওষুধের অপপ্রয়োগের ফলে বহু মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশজুড়ে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের নাম ভাঙিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত ও ভন্ড চিকিৎসক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ অসহায় নিরীহ মানুষ।
আমরা জানি বাংলাদেশে একটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা কি মনে করেন না, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ নামের আজগুবি সব বস্তু এবং চলমান অপচিকিৎসার হাত থেকে এদেশের লাখ লাখ অসহায় নিরীহ মানুষকে রক্ষা করার জন্য কিছু করণীয় আছে? নাকি ফ্রি স্টাইলে এসব অপকর্ম চলতেই থাকবে? যদি মনে করেন সত্যি সত্যি কিছু করার আছে তবে দেরি না করে এই অপচিকিৎসা কার্যকরভাবে নিষিদ্ধ করার জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
এ অবস্থা কোন সভ্য সমাজেই চলতে দেয়া যায় না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন নৈরাজ্য ও নৈরাশ্য চলতে থাকলে দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার দায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতিই মানুষ আস্থা হারাবে।
বাংলাদেশে আরেকটি প্রকট সংকট রয়েছে তরুণ-তরুণীর মানসিক সমস্যা। বাংলাদেশে যে অল্পসংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তার ঘাটতি মোকাবিলায় আরও দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং পাশাপাশি বিদ্যমান জনশক্তির মানোন্নয়নে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও বেশি মানসিক রোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি।
এসব বিষয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজন জনসম্পৃক্ততা এবং কার্যকর পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি গণমুখী সেবা খাত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। জনগণের দোরগোড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেঁৗছে দিতে প্রয়োজন 'কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ সার্ভিস', যার অর্থ হচ্ছে কেবল হাসপাতালে বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নয়; বরং এই সেবাকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নূ্যনতম মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার মতো পরিকাঠামো তৈরি করা।
বাংলাদেশে বর্তমানে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা মানসিক হাসপাতাল ও সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে মানসিক রোগ বিভাগ রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি কয়েকটি মেডিকেল কলেজের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানেও এই সেবা দেয়া হয়। আবার দেশের ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানসিক রোগীর একটি বিরাট অংশ এ সেবা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, অথবা সামাজিক সংস্কারের কারণে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা নিতে আগ্রহী নয়। আর যে অংশটি চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য আগ্রহী, তাদের জন্যও বর্তমান কাঠামোতে জনবল ও সম্পদের পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল।
বিশ্ব এখন চিকিৎসাবিদ্যায় এগোচ্ছে প্রতিদিন। নোবেল দেয়া হচ্ছে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যার গবেষকদের। আর বাংলাদেশে ভ- ওঝা ফুঁ দিয়ে ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, মানসিক রোগ সারিয়ে ফেলতে পারে এমন প্রচারপত্র আমরা দেখছি জাতীয় দৈনিকের পাতায়। প্রশ্ন উঠতেই পারে-জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিকগুলোর সম্মানিত সম্পাদকরা এমন প্রচারণা ছাপাচ্ছেন কীভাবে!
খোঁড়া লোককে ফুঁ দিয়ে স্বাভাবিক করে তোলা যায়, এটা চিন্তাই করা যায় না। যদি তা-ই হতো, তাহলে চিকিৎসাশাস্ত্রে জড়িত সারাবিশ্বের শত-সহস্র নামি-দামি বিজ্ঞানী শত শত বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে গবেষণা চালাচ্ছেন কেন?
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। মুখে আমাদের রাজনীতিরা অনেক কথাই বলেন। কিন্তু এরাই না না দরবারে গিয়ে মুরিদ হন। একবিংশ শতাব্দীতে পদার্পণ করেও বাঙালি জাতির অনেকেই এখনো মানুষ হিসেবে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও অন্ধ বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে পারেননি। বাস্তববাদী, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তার অধিকারী ও বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে পারেননি।
রাজনীতিকদের অনেকেই সাধারণ মানুষের পায়ে এই অপচিকিৎসা, অপসভ্যতার শিকল পরিয়ে রাখতে চান। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকারগুলোর নূ্যনতম অংশও রাজনীতিবিদরা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পেঁৗছতে পারেননি।
১৯৪৭ থেকে আজ পর্যন্ত সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসকগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, ঠগবাজি দেশের অসহায় নিরীহ জনগোষ্ঠীকে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করে তুলেছে। বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রেখে নিজেরা প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে। বেড়েছে শ্রেণী বৈষম্যের দেয়াল।
মাইকেল জ্যাকসনের ডাক্তার কম প্রভাবশালী নন। তারপরও তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। তাকে সাজাও ভোগ করতে হবে। সুবিচার এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। অপচিকিৎসা, অপসভ্যতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয় দেশের মানুষকেই। এ প্রজন্ম বাংলাদেশের সব অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোক।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে