Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-১০-২০১৮

দক্ষিণ চীন সাগরে সামরকি স্থাপনা নির্মাণ: আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযুক্ত হতে পারে চীন

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন


দক্ষিণ চীন সাগরে সামরকি স্থাপনা নির্মাণ: আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযুক্ত হতে পারে চীন

দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমার দখল নিয়ে শক্তি প্রয়োগের দিকে এগুচ্ছে চীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিতর্কিত দ্বীপে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছে দেশটি। বিরোধপূর্ণ দ্বীপটিতে পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাটি তৈরি করছে চীন। সামরিক ঘাটিতে থাকবে বিমানবাহী রণতরী, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম, এন্টি-এয়ার মিশাইল। মালিকানা নিয়ে বিতর্ক থাকা দক্ষিণ চীন সাগরের একটি বড় অংশ নিজের বলে দাবি করে আসছে চীন। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম একটি দ্বীপ তৈরি করছে দেশটি।

এ অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখতে সচেষ্ট যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের ‘সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে’ সতর্কতা উচ্চারণ করেছে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরা দেশগুলোর সরকারের পক্ষ থেকে গত ৩ জুন একটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছে। বিবৃতিতে তাঁরা বল প্রয়োগ বা শক্তির ব্যবহারে কঠোর বিরোধিতার পাশাপাশি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য বিতর্কিত দ্বীপে চীনের এধরণের একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। চীনের এই পদক্ষেপ বন্ধ না হলে সামরিক সংঘাতে অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিস বিতর্কিত দ্বীপটিতে সামরিকায়ন এবং জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ এনেছেন। এবং চীনের এই পদক্ষেপ চলমান থাকলে ফলাফল ভালো হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

চীনের কার্যক্রম বর্ণনা করতে মি: ম্যাটিস ‘জবরদস্তি দখল’ এই বিশেষ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত চীনের এই একতরফা কর্মকাণ্ডের কারণে যদি কোন দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার দায় এড়াতেই এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষত বিতর্কিত স্প্রাটলি দ্বীপে চীনের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করার জন্য "জবরদস্তি" শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যেন জাতিসংঘ সনদের ২ (৪) ধারা মতে চীনকে অভিযুক্ত করা যায়।

সামরিক বিশ্লেষক প্রফেসর অলিভিয়ের কর্টেনের মতে, জবরদস্তি শব্দটি তখনই ব্যবহার করা হয় যখন কোন একটি রাষ্ট্র জোরপূর্বক ও উদ্দেশ্যমূলক দৃষ্টাভঙ্গিতে অন্য একটি স্থিতিশিল রাষ্ট্র দখলের অভিপ্রায় গ্রহণ করে।

জবরদস্তি অভিপ্রায় এমন পরিস্থিতিগুলোতে ব্যবহার করা হয় বিশেষত যেখানে বিতর্কিত অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করা এবং দখলদারিত্বের প্রশ্ন আসে। যেমন, ১৯৬১ সালে ভারত সরকার কর্তৃক গোয়াতে "দ্রুতগতিতে" চালান সামরিক অভিযান কিংবা ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ অভিযান ইত্যাদি।

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) জানায়, ২০০৪ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের প্রাচীর নির্মাণ জাতিসংঘের চার্টারের আর্টিকেল ২ (৪) এর লঙ্ঘনের মাধ্যমে জবরদস্তি বল প্রয়োগের মাধ্যমে ঘটে। বিতর্কিত ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণে আইসিজের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ইসরায়েল বলপূর্বক এই প্রাচীর নির্মাণ করে।

যদিও ২০১৫ সালে, কোস্টারিকার বিতর্কিত একটি জলপথে নিকারাগুয়ার সৈন্য পাঠানোর বিষয়ে কোন রুল জারি করেনি। বিচারক প্যাট্রিক রবিনসন এই প্রশ্নে আলাদা মতামত দিয়েছিলেন।

রবিনসন মত দেন, যেহেতু সেখানে ভারি অস্ত্রের ব্যবহার এবং গুলি চালানো হয়নি সেহেতু রুল জারি করার প্রয়োজন নেই। এসমস্ত ক্ষেত্রে রুল জারি করতে হলে ভারী অস্ত্রের প্রয়োগ প্রয়োজন হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন যে ‘ঘৃণাত্মক ও সংঘাতের উদ্দেশ্যে বিতর্কিত ভুখন্ডে অনুপ্রবেশ ও সেনা মোতায়েনকে অবশ্যই অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ২ (৪) অনুযায়ি প্রকৃত সশস্ত্র সংঘর্ষের সৃষ্টি না হলেও অভিযুক্ত করা যেতে পারে।

এই বিশেষ ক্ষেত্রে, বিতর্কিত জলসীমায় নিকারাগুয়ার সামরিক ক্যাম্প স্থাপন এবং সেনা সদস্যদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি, বিতর্কিত অঞ্চল থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি এবং কোস্টারিকার বিমানের দিকে অস্ত্রের তাক করা পরিষ্কারভাবে নিকারাগুয়ার "জবরদস্তিমূলক উদ্দেশ্য। রবিনসনের মতে, নিকারাগুয়ার আচরণটি জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ২ (৪) -এর লঙ্ঘন।

সুতরাং চীনের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দক্ষিণ চিন সাগরের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে দেশটির ভূমি অধিগ্রহণ, কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ এবং বিতর্কিত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকে জবদস্তিমূলক পদক্ষেপ বলা ছাড়া কোন উপায় নেই। এটি যুক্তিযুক্তভাবে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রকৃতপক্ষে, বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জে সামরিকীকরণের মাধ্যমে চীন তার বিরোধীদের হাতে ‘জবদস্তি’ অভিযোগ আনার হাতিয়ার তুলে দিচ্ছে। এর ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে, এবং দেশটিকে সংঘাতের মুখোমুখি হতে হবে।

এমনকি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশের চীনের সামুদ্রিক সনদ বাতিল করার পরও দেশটি বিতর্কিত অঞ্চলে তাদের দখলদারিত্ব অব্যাহত রেখেছে। নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক বিজ্ঞানী প্রফেসর এম টেলর ফরেজের মতে, ভূতাত্ত্বিক বিরোধে চীনের বল প্রয়োগের উদ্দেশ্য হচ্ছে এলাকা জুড়ে কঠোরতার নিজেদের সামরিক খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যান্য বিরোধী দেশগুলোকে প্রতিরোধ করা।
সুতরাং, বলা যায় এই শ্রেণীকরণ আন্তর্জাতিক আইন মেনেই করা হয়েছে। জাতিসংঘের সনদের আর্টিকেল ২ (৪) এর বিশ্লেষণে বলা যায় দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের এই সামরিক পদক্ষেপ বেশ কয়েকটি কারণে এই ধারার লঙ্ঘন।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্প্রাটলি দ্বীপে চীনের সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কোন সুযোগ নেই। তবে স্ব-প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চীনের জোরপূর্বক পদক্ষেপের অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ৫১ অনুযায়ী আত্মরক্ষা শুধুমাত্র সশস্ত্র আক্রমণের মুখোমুখি হলেই কেবল প্রযোজ্য হবে।

চীনের সামরিক শক্তি ব্যবহারের যুক্তি খুবই দুর্বল। দেশটি যে দাবি করছে সেটা তুলনামূলকভাবে খুবই ক্ষুদ্র একটি উপাদান। কিন্তু এর পরিবর্তে চীন যে কৌশলগত সমারিক শক্তি ব্যবহারের দিকে এগুচ্ছে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এমনকি চীনের এই পদক্ষেপে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাও করছেন অনেক সামরিক বিশ্লেষক।

দ্বিতীয়, এটা তৃতীয় পক্ষকে এই আঞ্চলিক সংঘাতে অনুপ্রবেশের দরজা খুলে দেবে। জাতিসংঘ সনদের আর্টিল ৫১এ বল প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা হল আন্তর্জাতিক আইন অধীনে একটি বাধ্যবাধকতা। যেটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এই আইনের রাষ্ট্রীয় অনুশীলনের বিভিন্ন উদাহরণ রয়েছে। আর্টিকেল ৫১ লঙ্ঘনের অভিযোগে অনেক দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণও আছে। যেমন- আন্তর্জাতিক শান্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত নিষেধাজ্ঞা। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে সশস্ত্র আক্রমণের পর আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় সম্প্রদায় কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক "শান্তি লঙ্ঘন" হিসাবে চিহ্নিত করে নিন্দা করা হয়। সর্বশেষ উদাহরণ ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করা এবং পূর্ব ইউক্রেনে হস্তক্ষেপের জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা জারি।

উপরোক্ত উদাহরণ থেকে থেকে বলা যায়, চীন যদি দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত স্প্রাটলি দ্বীপে সামরিক ঘাটি স্থাপন ও বাহিনীসমূহের একত্রীকরণ ও সামরিক বাহিনীর একতরফা তত্পরতা অব্যাহত রাখে তাহলে অন্য দাবীদার রাষ্ট্রগুলো (ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, এবং তাইওয়ান,অস্ট্রেলিয়া) দেশটির বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) বল প্রয়োগের অভিযোগ আনতে পারে। চীনের উচিত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিতর্কিত দ্বীপে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকা।

আর/০৭:১৪/১০ আগস্ট

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে