Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯ , ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.3/5 (21 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-২০-২০১৩

রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ

নঈম নিজাম



	রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ

২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের কথা। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে। ফেরার আগে একটি শার্ট কিনলাম ছেলের জন্য। দেশে ফেরার পর স্ত্রী বললেন, মেড ইন বাংলাদেশ। আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে তৈরি শার্ট কিনে এনেছ। ভালো লাগল। এ বছরও আমেরিকার বড় শপগুলোতে দেখলাম বাংলাদেশে তৈরি কাপড় বিক্রি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এ অবস্থান আরও বাড়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বিশ্ববাজারে আমাদের গার্মেন্ট খাত প্রশ্নবিদ্ধ। মালিকদের অতি মুনাফার লোভ, শ্রমিকদের অবিশ্বাস, ভাঙচুর এবং সাভার ট্র্যাজেডি হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে গার্মেন্ট শিল্পকে। বিশ্ব মিডিয়াতে এখন শুধুই বাংলাদেশ। না কোনো ভালো খবরে নয়। একটির পর একটি খারাপ খবরে।

কোথায় যেন আমাদের ভালো খবরগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষের মাঝে লুকিয়ে আছে সন্দেহ-অবিশ্বাস। সত্যকে এখন সত্য বলতে সবাই নারাজ। আমাদের নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম দৃষ্টান্ত সাভার ট্র্যাজেডি। তাই বলে আমাদের ক্ষণে ক্ষণে অবিশ্বাসী হতে হবে? রানা প্লাজার উদ্ধার তৎপরতার শেষ পর্যায়ে জীবিত পাওয়া গেল একজন গার্মেন্ট কর্মীকে। সারা দেশের মানুষ তার জন্য প্রার্থনা করলেন। উদ্ধারে সম্পৃক্ত সদস্যরা আবেগে আপ্লুত হয়ে 'নারায়ে তাকবির' স্লোগানও দিলেন। তারপরও জীবিত রেশমাকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলো। আলোচনা-সমালোচনার ঝড় সোশ্যাল মিডিয়াতেও। মনটা খারাপ হয়ে যায়। কোথায়ও আমরা নিজেদের ওপর আস্থা রাখতে পারছি না। এখন কোনো কিছুকে সহজে বিশ্বাস করতে পারছি না। অকারণে সন্দেহ-অবিশ্বাস দানা বেঁধে ওঠে। তাই ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ বলতে পারি না।
 
অবিশ্বাস শুধু সাভারে নয়, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ, রাতের অভিযান নিয়েও। সোশ্যাল মিডিয়াতে এক পক্ষ প্রকাশ করছে ব্যাপক হতাহত হয়েছে। দিগন্ত ও ইসলামী টিভি রাতে সবকিছু দেখানোর কারণেই এখন বন্ধ। সেই রাতে আমি জেগে ছিলাম পত্রিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংস্করণ নিয়ে। বাসা থেকে সারাক্ষণ বার্তা সম্পাদক কামাল মাহমুদ ও দুই রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলছিলাম। রাত জেগে বার বার টিভি চ্যানেলগুলো বদল করেছি। সারাক্ষণ কথা বলেছি অফিসের সঙ্গে। প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছি। কারণ রাত ১২টার দিকে খবর পেলাম আইন প্রয়োগকারী সংস্থা শাপলা চত্বরে অভিযান পরিচালনা করবে। বিভিন্ন চ্যানেলে তখন মতিঝিলে আগুন, ভাঙচুরের ছবি ও নিউজ। দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে উৎকণ্ঠা আমার মাঝেও ছিল। চিন্তায় ছিলাম, বিশ্বের কাছে এক দিন পর আমাদের অবস্থান কি দাঁড়াবে? আমি সবসময় শান্তি-স্থিতিশীলতার পক্ষে। সহিংসতার বিপক্ষে।
 
একটি অপ্রিয় সত্য সবাইকে জানাতে চাই তা হলো, হেফাজতের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যরাতের অভিযান দিগন্ত ও ইসলামী টিভিতে লাইভ দেখানো হয়নি। তারা লাইভে ছিল বিকাল ও সন্ধ্যায়। মধ্যরাতে শুধু সময় টিভি ছিল লাইভ সম্প্রচারে। আমি সময় টিভিতে পুরো ঘটনা দেখেছি। ঘটনাস্থলে ছিলেন আমাদের সাংবাদিকরা। তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উৎকণ্ঠা ছিল আমার মাঝে। সময় টিভিতে দেখলাম মাত্র ১০ মিনিটে কি করে বিশাল একটি সমাবেশ তুলে দেওয়া হলো। বুটের আওয়াজ, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার সেল আর ফাঁকা গুলির শব্দেই হেফাজত কর্মীরা পিছু হটে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এগিয়ে যায় দৈনিক বাংলা ও নটর ডেম কলেজের প্রান্ত থেকে। দক্ষিণে ইত্তেফাকের সামনের রাস্তা খোলা রাখা হয় সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, সদরঘাট যাওয়ার জন্য। মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্য মতিঝিল শাপলা চত্বর হেফাজতশূন্য হয়ে পড়ে। নিরীহ শিশু-কিশোরদের অনেকে আশপাশের ভবনে লুকিয়ে ছিল। পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে চলে যেতে সহায়তা করে। বঙ্গভবনের পাশের সড়কে অনেকে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়। সমস্যা ওসব নিয়ে নয়, সমস্যা হতাহত নিয়ে। পুলিশি ভাষ্যে ৯ জন নিহত হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়াগুলো বলছে, তিন হাজার। কিন্তু তিন হাজার মানুষ মারতে, লাশ ট্রাকে তুলতে, লুকাতে, দাফন করতে কত সময়ের দরকার তার কোনো ব্যাখ্যা সোশ্যাল মিডিয়াতে নেই। এমনকি লাশ কোথায় সরানো বা গুম করা হলো তারও কোনো ব্যাখ্যা নেই। পুলিশ কমিশনার চ্যালেঞ্জ করে নিহতের তালিকা চাইলেন হেফাজতে ইসলাম এবং তার সমর্থকদের কাছে। কেউ কোনো তালিকা দিতে পারেননি। এমনকি কতজন নিহত-আহত হয়েছেন তারও কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তারপরও সন্দেহ, অবিশ্বাস।
 
আমি একজন মানুষেরও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পক্ষে নই। আমি শান্তির পক্ষে। হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তাদের কর্মীরা সবাই নিরীহ মাদ্রাসা ছাত্র। হুজুরদের নির্দেশে তারা ঢাকা শহর দেখতে এসেছিল। দীর্ঘ লড়াই, আন্দোলন, সংগ্রামের ট্রেনিং এই নিরীহ মাদ্রাসা ছাত্রদের নেই। তাদের হুজুরদের মধ্যে কারও কারও আফগান ট্রেনিং থাকতে পারে। এ কারণে তারা স্বপ্নচারী ছিলেন। অতীতেও কওমি মাদ্রাসাসম্পৃক্ত হুজুররা ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখেছেন। বিএনপির সঙ্গে জোটে এসে দুজন এমপিও হয়েছিলেন ২০০১ সালে। এর আগে-পরে ক্ষমতার মসনদের ইতিহাসে তাদের ঠাঁই নেই। তবে চেষ্টা ছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতি পদেও আগ্রহ ছিল। তা ছিল আল্লামা শফীর পূর্বসূরি হাফেজ্জি হুজুরের সময়। বিচারপতি সাত্তারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন হাফেজ্জি হুজুর। তিনি ছিলেন ওলামা-মাশায়েখদের কাছে শ্রদ্ধাভাজন। তার ভক্তকুল ছিল দেশজুড়ে। দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। তিনি ভোটে দাঁড়ালেন হঠাৎ করে। তাও ছোটখাটো পদ নয়, একেবারে রাষ্ট্রপতি পদে। মার্কা বটগাছ। সারা দেশে তার ভক্তকুল চুঙ্গা হাতে নেমে পড়ে মাঠে। তার সভা-সমাবেশ দেখে মনে হচ্ছিল বিচারপতি সাত্তারের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে হাফেজ্জি হুজুরের। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা অন্যরকম। হাফেজ্জি হুজুর নির্মমভাবে হারলেন। ভোটে প্রত্যাশার আলো ফোটাতে পারলেন না হুজুররা। এর পর অনেক দিন হাফেজ্জি হুজুর সমর্থকরা নীরব ছিলেন। তারা আবার সরব হলেন হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে। এবার আর বট গাছ নয়, আরও বড় কিছু করার পরিকল্পনা। মুখে সবাই বললেন, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই। বাস্তব ছিল তার বিপরীত।
 
আশাজাগানিয়া মন নিয়ে হেফাজতে ইসলামকে সহায়তার হাত বাড়াল অনেক দল, মহল, গোষ্ঠী। পিছিয়ে থাকলেন না কতিপয় বুদ্ধিজীবীও। সবাই তাদের ব্যবহার শুরু করলেন। তবে রাজনীতির জুয়ার বোর্ডে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টিকে শেষ পর্যন্ত হারিয়ে দেয় সরকার। কঠোর হাতে সরকার পরিস্থিতি সামাল দেয়। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হেফাজতের মতিঝিল অভিযান হয়েছে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির আশ্রয় এবং সরকারি দলের প্রশ্রয়ে। সরকারের একটি মহলের প্রত্যাশা ছিল জামায়াতের বিকল্প ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরির। এ কারণে চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামকে প্রথম ছাড় দেওয়া হয়। বড় ধরনের সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয় প্রথম চট্টগ্রামে। তখন গণজাগরণের ডা. ইমরান এইচ সরকারকে চট্টগ্রামে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফেনী থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয় ঢাকায়। এতে উল্লসিত হয় হেফাজত সমর্থকরা। সেদিন ইমরানকে নয়, চট্টগ্রামে হেফাজতকে থামিয়ে দিলে এত জটিলতার সৃষ্টি হতো না। সহিংসতায় ব্যবহার হতো না মাদ্রাসার অবুঝ শিশু-কিশোররা।
 
এদিকে চট্টগ্রামে দাপুটে অবস্থান দেখে হেফাজতকে ঘিরে দেশি-বিদেশি অনেকের মাঝে ক্ষমতার খায়েশও তৈরি হয়। জাগ্রত হয় ইরানি বিপ্লবের স্বপ্ন। তাই ঢাকা অভিযানকে ঘিরে সমাবেশ হয় জেলায় জেলায়। আল্লামা শফী হেলিকপ্টারে উড়ে গেলেন বগুড়ায়। কিন্তু কেউই পুরনো ইতিহাসের দিকে একবারের জন্যও তাকালেন না। বোঝার চেষ্টা করলেন না, রাষ্ট্রযন্ত্রের চেয়ে কেউই বড় শক্তিশালী নন।
 
রাষ্ট্রযন্ত্রকে হুমকিতে রাখতে হেলিকপ্টারে উড়ে বগুড়ার সমাবেশ করা যায়। হয়তো এই খরচের জোগানদারও জুটে যায়। আফগান, ইরান কনসেপ্ট লালন করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ব্যতিক্রম। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এ দেশ কখনো মৌলবাদ অথবা কমিউনিস্টকে পছন্দ করেনি। ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসায়নি। এ কারণেই একসময় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো অসাম্প্রদায়িক চেতনার সৎ ভালো মানুষও তার দলীয় স্লোগানে যুক্ত করেছিলেন ধর্ম, কর্ম, সমাজতন্ত্র। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯০৫ সালের আগে এই ভূখণ্ডে রাজনৈতিক চর্চায় ধর্ম ছিল না। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল না। ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখা হতো। ব্রিটিশ শাসকরা তাদের স্বার্থে ধর্মীয় উসকানি যুক্ত করেছিলেন। এর পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভক্তির কারণে ধর্মকে টেনে আনা হয়েছিল। '৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এবার আবার ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য ধর্মকে টেনে আনা হয়।
 
স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আবারও ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য ধর্মকে টেনে আনা এক ধরনের দেউলিয়াত্ব সবার জন্য। অথচ এই কাজটি রাজনৈতিক দলগুলো কম-বেশি সবাই করেছে। হেফাজতকে নিয়ে এত রাজনীতি করা কারোরই ঠিক হয়নি। কওমি মাদ্রাসাগুলোকে একটি শিক্ষার বৃত্তে আনতে হবে। আলিয়া মাদ্রাসার মতোই চালাতে হবে কওমি মাদ্রাসাকেও। শুধু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করলে চলবে না। এবার হেফাজতের কর্মসূচিতে জাতীয় পার্টির দু'জন কর্মীর নিহত, ১০ জনের গুলিবিদ্ধ হওয়া নিয়ে রহস্যের জন্ম হয়েছে। এই রহস্য পরিষ্কার করা দরকার। সেদিন বিএনপিরও ভুল ছিল ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম। দ্বিতীয় ভুল ছিল, রাতে ঢাকাবাসী ও বিএনপি কর্মীদের মাঠে নামার আহ্বান। এই দুটি আহ্বানের মধ্যে বিএনপি শুধু নিজেদের ছোট করেনি, ক্ষমতাসীনদের আরও একবার শক্ত অবস্থান তৈরিতে সহায়তা করেছে। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে। কারণ সরকার পরিস্থিতি কঠোর হাতে সামাল দিয়ে এখন খোশ মেজাজে আছে। আর এই অবস্থা তৈরির জন্য বিএনপি অনেকটা নিজেরাই দায়ী।
 
অন্যদিকে সরকার হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে রিস্ক বেশি মাত্রায় নিয়েছিল। হেফাজতকে পরোক্ষভাবে ঢাকায় টেনে আনে সরকার। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তাদের মতিঝিলে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া ঠিক হয়নি। ১৯৯৬ সালের পর থেকে শাপলা চত্বরে সভা-সমাবেশ বন্ধ ছিল। অনেক দিন পর সরকার গণজাগরণ মঞ্চ, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামকে শাপলা চত্বর ব্যবহার করতে দিয়েছে। যেখানে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না, তাদের নেতারা দলীয় কার্যালয়ে গেলে আটক হন, সেখানে কি কারণে হেফাজতকে মতিঝিলে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হলো? কারা এই অনুমতি দিল? কেন দিল? এসব প্রশ্নেরও জবাব মেলেনি। দেশের বাণিজ্যিক এলাকায় হেফাজতকে ঢেকে এনে সরকার দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। সে রাতে হেফাজতকে সরানো না গেলে দেশ এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ত।
 
হেফাজত জটিলতার অবসান আপাতত হয়েছে। এখন সবাইকে কমবেশি বাস্তবতায় থাকতে হবে। ধরে রাখতে হবে কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে। দূর করতে হবে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট। কারণ প্রত্যাশার আলো হারিয়ে যাওয়ার পরিণাম কারও জন্য ভালো হবে না। প্রতিবার একটি রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে দেশি-বিদেশিরা ছুটে আসেন। অথবা আমরা তাদের ডেকে আনি। তারা সংলাপের আহ্বান রাখেন। আবার চলে যান। এর মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সবাইকে সংলাপে বসার অনুরোধ করেছেন। ঢাকা সফর করে গেছেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব তারানকো। তিনি বৈঠক করেছেন সরকার ও বিরোধী দল সবার সঙ্গে। এত বৈঠক, এত আলোচনা, তারপরও থেমে আছি আমরা। আসলে আমাদের সংকটের সমাধান বিদেশিরা কীভাবে করবে? সমাধান আমাদেরই করতে হবে। সহনশীলতার কোনো বিকল্প নেই। আশা-নিরাশার দোলায় সংলাপ রেখে লাভ নেই। দুটি দলকেই আসতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকায়।
 
বুঝতে হবে বর্তমানে বিরাজমান মূল সমস্যা হলো আগামী নির্বাচন। ৪২ বছরে আমরা একটি ইলেকশন পদ্ধতি ঠিক করতে পারিনি। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ৪২ বছরে হয়েছে মাত্র একবার। তাহলো ২০০১ সালে। এবার নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার বিলম্ব করেছে। বিরোধী দলকে গোঁ ধরে বসে থাকলে হবে না। কারণ মানুষ লোক দেখানো নয়, অর্থবহ সংলাপ চায়। ২৬ বছরে অর্থবহ কোনো সংলাপ হয়নি। কখনো কমনওয়েলথ, কখনো জাতিসংঘ, কখনো বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা দূতিয়ালি করেছেন। লাভ হয়নি। মরহুম আবদুল মান্নান ভঁূইয়া ও আবদুল জলিলের মতো ক্যামেরা শো-এর সংলাপও মানুষ চায় না। সবার প্রত্যাশা অর্থবহ সংলাপ। বিরাজ সংকটের নিরসন। বাইরের লোক নয়, আমাদের সংকট নিরসন আমাদেরই করতে হবে। বিরোধী দলের প্রতি সরকারকে আরও সহনশীল হতে হবে। তৈরি করতে হবে পরিবেশ। কারণ বিরোধী দল বিএনপি'কে ছাড়া কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।
 
পাদটীকা : দেশ বিভাগের আগে মহাত্দা গান্ধী মাঝে মাঝে নীরবতা দিবস পালন করতেন। এ সময় টানা কয়েক দিন কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। মিথ আছে_ নেহেরু, মওলানা আজাদ, প্যাটেলসহ কংগ্রেস নেতাদের নানামুখী জটিল অবস্থা তৈরি হলে সবাই গিয়ে তার কাছে হাজির হতেন। তর্ক-বিতর্কে জড়াতেন। অনেক জটিল বিষয়ে বাকবিতণ্ডাও হতো। গান্ধী অনেক কিছু পছন্দ করতেন না। তাই পরিস্থিতি জটিল রূপ নিলেই তিনি চলে যেতেন নীরবতা দিবসে। দরজার বাইরে সাইনবোর্ড থাকত_ আগামী সাত দিন নীরবতা দিবস। আমাদের অনেক রাজনীতিবিদের জন্য মাঝে মাঝে দরকার নীরবতা দিবস। কথা নয়।
 
পুনশ্চ: টেলিভিশনে সিরিয়ার দাঙ্গা দমনে পিপার স্প্রে ব্যবহার দেখলাম। আমাদের পুলিশও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। তবে তাদের পিপার স্প্রে ব্যবহার করতে দেখেছি নিরীহ শিক্ষকদের সমাবেশ দমনে। কঠিন দাঙ্গা, তাণ্ডব দমনে পুলিশ পিপার স্প্রে ব্যবহার করেনি। কারণ কি জানি না। একজন বললেন, পিপার স্প্রে'র চেয়ে আরও কঠিন কিছু হয়তো ব্যবহার হচ্ছে।
 
লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে