Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 4.8/5 (98 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১০-২০১১

স্টিভ জবস : একজন শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবকের প্রতি প্রণতি

ফকির ইলিয়াস


স্টিভ জবস : একজন শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবকের প্রতি 
  প্রণতি
কাঁদছে গোটা বিশ্ব। কাঁদছে মানবাত্মা। স্টিভ জবস আর নেই। একজন সিরিয়ান আর একজন আমেরিকানের প্রেমের সন্তান ছিলেন তিনি। স্টিভ জবসের জন্ম ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্রান্সিসকোতে অবিবাহিত দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সিরীয় বংশোদ্ভূত আব্দুল ফাত্তাহ জান্দালি ও আমেরিকান মা জোয়ান সিবিলের সন্তান হিসেবে স্টিভ জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পরেই ক্যালিফোর্নিয়ার মাউনটেন ভিউ অঞ্চলের পল ও ক্লারা জবস শিশু স্টিভকে দত্তক নেন। তারপর তাঁর পথচলা। কলেজ থেকে ড্রপ আউট হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে তিনি ভিডিওগেম কোম্পানি অ্যাঁরি ইনকর্পোরেশনে চাকরি নেন। তবে কয়েক মাস পর ইস্তফা দিয়ে ভারতে বেড়াতে যান। ১৯৭৫ সালে বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াকের সঙ্গে স্টিভ জবস নিজেদের পারিবারিক গ্যারেজে আদি কম্পিউটারটি তৈরি করেন। স্টিভ ছিলেন অসম্ভব মেধাবী মানুষ। তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ?তার মৃত্যুতে বিশ্ব দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষকে হারালো। তিনি ভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারতেন, বিশ্বকে বদলে দেয়ার ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়চেতা। আর তা করার যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তাও তার ছিল।? ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ, গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ল্যারি পেজ, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক স্টিভেন স্পিলবার্গ, নকিয়ার প্রধান নির্বাহী স্টিফেন ইলোপ ছাড়াও বিশ্বপ্রযুক্তি অঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিরা স্টিভ জবসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
বিল গেটস বলেছেন, তার চিন্তা ছিল অত্যন্ত ক্ষুরধার। সহযোদ্ধা উদ্ভাবক স্টিভ ওজনিয়াক বলেছেন, স্টিভ জবসের মৃত্যু তুলনা করা যায়, জন লেনন, জন এফ কেনেডি কিংবা মার্টিন লুথার কিংয়ের সাথে। কারণ তার মৃত্যুর এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবার নয়। ডেলের কর্ণধার মাইকেল ডেল বলেছেন, তিনি ছিলেন আমাদের লিডার। প্রযুক্তিকে তিনি খেটে খাওয়া মানুষের মুঠোয় নিয়ে এসেছিলেন। স্টিভ জবস যেভাবে এই বিশ্বকে তার প্রযুক্তি মেধা দিয়ে জয় করেছেন তার একটা তালিকা আমরা এখানে দেখতে পারি।
১৯৭৬: নিজেদের মেশিনপত্র বিক্রির জন্য জবস ও ওজনিয়াক অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। এ বছরই প্রথম অ্যাপল-১ কম্পিউটারটি পরিচিতি পায়।
১৯৭৭: অ্যাপল-২ বাজারে আসে। এই প্রথম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে কম্পিউটারটি বিক্রি হয়। টানা ১৬ বছর এটি উৎপাদনে থাকে।
১৯৮০: অ্যাপল-৩ বাজারে আসলেও তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়। কম্পিউটারটির নির্মাণে ত্রুটি ছিল। এটিকেই বলা হয় অ্যাপলের দ্বিতীয় কম্পিউটার।
১৯৮৩: লিসা নামের পারসোনাল কম্পিউটার (পিসি) বাজারে ছাড়ে অ্যাপল। মাউস দিয়ে এটি চালানো সম্ভব হয়। তবে এ প্রচেষ্টাও বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়।
১৯৮৪: ম্যাকিনটশ কম্পিউটার বাজারে ছাড়ে অ্যাপল। এটি ব্যাপক মনোযোগ কাড়ে। তবে বিক্রিবাট্টা কম হয়।
১৯৮৫: অ্যাপল ছয়টি কারখানার তিনটিই বন্ধ করে এবং ১২০০ কর্মীকে চাকরিচ্যুত করে। বোর্ডরুম বৈঠকে জন স্কালির কাছে হেরে কোম্পানি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন স্টিভ জবস।
১৯৮৬: লুকাসফিল্ম লিমিটেডের গ্রাফিকস বিভাগ কিনে নেন জবস। প্রতিষ্ঠানটির মালিক স্টার ওয়ারস চলচ্চিত্রের পরিচালক জর্জ লুকাস। এখানে পিক্সার অ্যানিমেশন স্টুডিওস নামের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৮৭: ম্যাকিনটশ-২ বাজারে আসে।
১৯৮৮: নেক্স কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন জবস। আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেননি। মাত্র ৫০ হাজার কম্পিউটার বিক্রি হয়।
১৯৯৫: পিক্সার অ্যানিমেশন স্টুডিওসের প্রধান নির্বাহী থাকাকালীন টয় স্টোরি বের হয়। কম্পিউটারে অ্যানিমেশন করা পূর্ণদৈর্ঘ্যরে ছবি। চলচ্চিত্রটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সাড়া পায়।
১৯৯৬: অ্যাপলের কাছে ৪২ কোটি নয় লাখ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয় নেক্স। জবসের প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন শুরু করে। এতে সফটওয়্যারও নিজেদের নির্মিত।
১৯৯৭: জবস অ্যাপলের অন্তর্র্বর্তী প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পান।
১৯৯৮: স্বয়ংসম্পূর্ণ কম্পিউটার আইম্যাক বাজারে ছাড়া হয়। এর সঙ্গে মনিটরও জুড়ে দেয়া হয়। এর ফলে অ্যাপলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক পেছনে পড়ে যায়।
২০০১: অক্টোবরে প্রথমবারের মতো আইপড বাজারে ছাড়া হয়। এতে সাফল্য আসে।
২০০৩: এপ্রিলে আইটিউনস গানের ডিভাইস বাজারে ছাড়া হয়।
২০০৭: প্রথমবারের মতো আইফোন বাজারে ছাড়া হয়। অ্যাপলের নামে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন স্টিভ জবস।
২০১০: এপ্রিল মাসে আইপ্যাড বাজারে ছাড়া হয় এবং ৮০ দিনের মধ্যে এটি ৩০ লাখ কপি বিক্রি হয়। বছর শেষে দেড় কোটি আইপ্যাড বিক্রির খবর পাওয়া যায়। অ্যাপলের বাৎসরিক আয় ছয় হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০০০ সালে এ আয় ছিল ৮০০ কোটি ডলার।
২০১১: বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় অ্যাপল নতুন পণ্য ছাড়ে। এর মধ্যে আছে, আইপ্যাড২, আইফোন৪ এবং সর্বশেষ আইফোন৪এস।
৫ অক্টোবর বুধবার যখন তার মৃত্যু সংবাদটি মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তার পর থেকেই, সিলিকন ভ্যালির যে বাড়িতে জবস থাকতেন, সেই বাড়ির সামনে ফুল রেখেছে অসংখ্য ভক্ত। ছোট ছেলেমেয়েরা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চোখ ভিজিয়েছে। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। মরেও যারা অমর হয়ে থাকে তাদেরই একজন হচ্ছেন অ্যাপলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস। সিলিকন ভ্যালিতে অবস্থিত অ্যাপলের প্রধান কার্যালয়ের সামনে একটি সাদা রঙের আইপ্যাডের সঙ্গে স্টিভের ছবিতে ফুল দিচ্ছে ভক্তকুল, আর পতাকা নামিয়ে রাখা হয়েছে অর্ধেক। বিশ্বের দেশে দেশে মানুষ অ্যাপলের স্টোর ও শোরুমগুলোতে ভিড় করে ফুল দিয়েছেন। কেউ কেউ শ্রদ্ধা জানিয়ে নোট দিচ্ছেন, কেউবা পূর্ণ আপেলে একটি কামড় বসিয়ে রেখে যাচ্ছেন। ওটিই যে অ্যাপলের প্রতীক। তারা বলছেন, ?জবস আমাদের সবার জীবনকে পাল্টে দিয়েছেন। আমরা আজকে যেভাবে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করি, সেটাই ঠিক করে দিয়েছেন স্টিভ। তাঁর জন্য আমাদের ভালোবাসার শেষ নেই।?
নিউইয়র্কে অ্যাপল স্টোরের সামনেও দেখা গেছে শত শত ভক্তের ভিড়। সবাই বলছেন, জবস শুধু একজন প্রযুক্তিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রযুক্তির জাদুকর। তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তাই ছিলেন না, তিনি আদর্শ কর্পোরেট লিডার। তিনি শুধু একজন সংগ্রামী মানুষই নন, তিনি জন্ম থেকেই শত প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে বিশ্বকে বদলে দেয়া বিশ্বজয়ী সংগ্রামী। তিনি শুধু স্বপ্নই দেখেননি, স্বপ্ন দেখতেও শিখিয়েছেন। তিনি পৃথিবীটাকে আমাদের আঙুলের ডগায় এনে দিয়েছেন।
এই লেখাটি যখন লিখছি বিশ্বের সবগুলো সামাজিক মাধ্যম (টুইটার, ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল+) এখন স্টিভের জন্য শোকবার্তা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রযুক্তি গুরু স্টিভ জীবিত অবস্থায় একের পর রেকর্ড গড়েছেন, আর নিজেই ভেঙেছেন সে সব রেকর্ড। জীবনের ওপারে গিয়েও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কথা আবার জানাচ্ছেন অনলাইন বিশ্বকে। এরই মধ্যে তিনি গড়েছেন আরেক বিশ্ব রেকর্ড। টুইটারের প্রতি সেকেন্ডের বার্তা নিবন্ধনের হিসাবে স্টিভই এখন বিশ্বসেরা। অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষক সংস্থা এসআর৭ সূত্র মতে, স্টিভের মৃত্যুর খবর ঘোষণার পর টুইটার প্রতি সেকেন্ডে ১০ হাজার টুইট বার্তা জমা পড়েছে টুইটার সার্ভারে। এ যেন রীতিমতো শোকবার্তার টাইফুন বয়ে গেছে অনলাইন গণমাধ্যমে। স্টিভের এ অকালপ্রয়াণকে অ্যাপল ভক্তরা সংক্ষেপে ?আইস্যাড? খুদেবার্তা হিসেবে প্রকাশ করেছে। চলে গিয়েও তিনি উপহার দিয়ে গেলেন ?আইস্যাড?। জবসের মৃত্যুর খবর নিয়ে ফেসবুকে কয়েক শ পেজ তৈরি হয়েছে। পেজগুলোতে লেখা : রেস্ট ইন পিস : স্টিভ জবস । একজন প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বের জন্য এতো মায়া আগে আর কখনই দেখা যায়নি। ম্যাক, আইফোন ও আইপডের মতো নতুন নতুন প্রযুক্তি পণ্য উপহার দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন অ্যাপলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস।
দত্তক সন্তান হিসেবে সিলিকন ভ্যালি এসে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পুরো সম্পন্ন না করে শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্ব ঠিকই জয় করেছিলেন স্টিভ জবস। সম্পদ ও পেশাগত সাফল্যে উজ্জ্বল স্টিভ জবস সারাজীবনই সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে বেপরোয়া অভিযাত্রীর খেতাবটা পেয়েছিলেন। তার উচ্চাকাক্সক্ষাই অ্যাপলকে এ গ্রহের সবচেয়ে বেশি পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। স্টিভ জবসের পরিবারের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মৃত্যুর সময় তারা স্টিভের পাশেই ছিলেন এবং এক শান্তির মৃত্যুই তার হয়েছে। স্ত্রী, চার সন্তান ছাড়াও কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সেই চলে গেলেন এই প্রযুক্তি কিংবদন্তি। ২০০৪ সালে তিনি ঘোষণা করেন তিনি অসুস্থ। পেনক্রিয়েটিক ক্যান্সার তার শরীরে দানা বেধেছে। জবস জানান, তিনি অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে সেরে উঠবেন বলে আশাবাদী। অসুস্থতা নিয়েই তিনি ?আইপড? বাজারে আনতে সমর্থ হন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। পরম অহিংসা ও শান্তি ছিল তার ব্রত। ২০০৯ সালে তিনি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করেন। গত মাসেই তার অবস্থার অবনতি হয়। তিনি অ্যাপল-এর নির্বাহীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। টিম কুক নতুন সিইও হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হন। মৃত্যুর আগে স্টিভ জবস বলেছেন, আমি আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, চার সন্তান ও অ্যাপল ইনক রেখে যাচ্ছি। বলা দরকার, এক্স মোবিল এরপর অ্যাপলই যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় ধনবান কোম্পানি।স্টিভ জবস সেই মহামানব, যিনি তার শ্রম দিয়ে বদলে দিয়েছেন আমাদের জীবনধারা। কর্মপ্রণালী। তার আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক। তার প্রতি অন্তিম প্রণতি।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে