Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০ , ৭ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (23 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-১৮-২০১৩

প্রকৃত শিক্ষার আলোয় সমাজ গঠনের বিবেচনা 

ফকির ইলিয়াস



	প্রকৃত শিক্ষার আলোয় সমাজ গঠনের বিবেচনা 

বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। পাসের হার বেশ ভালো। মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে। প্রজন্ম এগিয়ে যাচ্ছে আলোর দিকে। এটা খুবই সুসংবাদ। আমরা লক্ষ করেছি, কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেয়ার একটা প্রবণতা সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের অভিভাবকরা কি জানেন, তাদের সন্তানকে কারা সংবর্ধনা দিচ্ছে? এরা কারা? এর নেপথ্যে কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা? বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশির দশক থেকে বাংলাদেশে ‘কৃতী ছাত্র সংবর্ধনার’ নামে একটি মহল বেশ তৎপর রয়েছে। এরা ধর্মীয় তমদ্দুনের নামে মূলত মৌলবাদী ইজম প্রতিষ্ঠার কাজটি করছে বাংলাদেশে। এরা ছাত্র-ছাত্রীদের মওদুদীবাদ শেখাবার প্রচেষ্টা করছে খুবই কৌশলে। দেশে ‘ফুলকুড়ি’ ‘কিশোর’ ‘তরুণ’ ‘কাফেলা’Ñ এমন অনেক চটকদার অভিধাযুক্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক (!) ব্যানারে বেশ কিছু সংগঠন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এরা মূলত একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের ডালপালা। যে রাজনৈতিক সংগঠনটি এখনো পাকিস্তানি তমদ্দুন লালন করে বাংলাদেশে পরিচালিত হয়।

দেশে এখন যারা মৌলবাদী আস্ফালন দেখাচ্ছে, তাদের চরিত্র আসলে কেমনÑ তা এই দেশবাসীর অজানা নয়। একটি খুব সাম্প্রতিক উদাহরণ এখানে দেয়া দরকার। একটি সংবাদ অনেকের নজরে এসেছে। ডিবি পুলিশের কাছে হেফাজত মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী যেসব তথ্য, বিবৃতি দিয়েছেন তা মিথ্যা, বানোয়াট ও কল্পনাপ্রসূত বলে দাবি করেছে হেফাজতে ইসলাম। কাকরাইল দারুল উলুম মাদ্রাসা হলরুমে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরীর এক জরুরি সভা শেষে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেনÑ হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মওলানা আব্দুর রউফ ইউসুফী, মওলানা জুনায়েদ গুলজার, মওলানা হাতেম আলী, মওলানা আবদুর রহমান, মওলানা খোরশেদ আলম প্রমুখ। বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, হেফাজতের মহাসচিব বাবুনগরীর বরাত দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে বক্তব্য গণমাধ্যমে আনছে তা মিথ্যা, বানোয়াট ও কল্পনাপ্রসূত। হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেন, ‘এ আন্দোলন চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে।’
 
একটা বিষয় এখানে খুবই স্পষ্ট, হেফাজতের নেতারা এখন তাদের নিজের মহাসচিবের বক্তব্যকেই ‘মিথ্যা’ বলে চালাবার চেষ্টা করছেন। কারণ মূল সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। আর খুঁজলে দেখা যাবে, হেফাজতে ইসলাম যে মোর্চায় গঠিত হয়েছে, সেই ঐক্য মোর্চায় জামাত-বিএনপি সমর্থিত অনেকগুলো ছোট দলই রয়েছে। যারা প্রধানত মওলানা শফিকে নেপথ্যে পরিচালিত করছে। এই হলো তমদ্দুনপন্থীদের মূল চেহারা। এরাই নতুন প্রজন্মকে ‘সংবর্ধনা’ দিয়ে তাদের নিজ ‘কাফেলায়’ শরিক হবার আহ্বান জানাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। একটি দেশে শিক্ষিত মানুষ দরকার। কিন্তু সে শিক্ষা হতে হবে প্রকৃত জ্ঞান নির্ভর, হতে হবে বিশ্বসভ্যতার আলোকে। বাংলাদেশে প্রকৃত মেধাবীদের পৃষ্ঠপোষকতায় আরো সচেতন হওয়া দরকার বিত্তবানদের। আমরা তুলনা করতে পারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। শিক্ষা খাতে একজন ছাত্রছাত্রীর জন্য অনুদান, স্কলারশিপ কিংবা গ্রান্টকে একটি বিনিয়োগ বলেই মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগ। কেউ লেখাপড়া করতে চাইলে তাকে সর্বোচ্চ সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে ফেডারেল, স্টেট, সিটি গভর্নমেন্ট। তার কারণটি হচ্ছে, এই শিক্ষার্থী তার লেখাপড়া সম্পন্ন করে একটা ভালো চাকরি করবে। ভালো বেতন পাবে। আর সেই বেশি বেতন থেকে ফেডারেল, স্টেট গভর্নমেন্টও পাবে বেশি ট্যাক্স। সরকার একজন শিক্ষার্থীর পেছনে যে গ্রান্ট বিনিয়োগ করবে, পনেরো-বিশ বছর ট্যাক্স দিয়ে সেই শিক্ষার্থী ফেরত দেবে এর দ্বিগুণ অর্থ। অতএব লাভ তো সরকারেরই হচ্ছে।
 
ইউরোপ-আমেরিকার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এভাবেই বাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বে শিক্ষার আলো। মানুষ তার ন্যায্য অধিকার পাবে। নাগরিক পাবে তার যোগ্য স্বীকৃতি। এভাবেই হবে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির অগ্রগতি। প্রতিটি দেশ নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ীই তার প্রজন্মকে সংরক্ষণ করবে। বিশ্বের মানবাধিকারের এটাই নিয়ম। কিন্তু সকল দেশে সেই নিয়মটি কি সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে? না হচ্ছে না। আর হচ্ছে না বলেই শুধু আর্থিক দরিদ্রতা নয় বরং মানসিক দৈন্যতাই ম্লান করে দিচ্ছে প্রজন্মের স্বপ্ন। মানুষের অগ্রসর হওয়ার পথ। বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আড্ডায় প্রায়ই কথা ওঠে। সেদিন একজন সমাজবিজ্ঞানী খুব জোর দিয়েই বললেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যাটি হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের অনিচ্ছা এবং একগুঁয়েমি। কারণ ক্ষমতাসীনরা মনে করেন এই প্রজন্মও তাদের অনুগত হবে। তারা তাদের অনুগত হয়ে বড় হবে। তারা অন্ধভাবে লেজুড়বৃত্তি করবে। এটা তো সম্ভব নয়। প্রজন্মকে তাদের মতো করে বড় হতে দিতে হবে। তাদের মেধার বিকাশ সাধন করার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঐ সমাজবিজ্ঞানীর কথাগুলো শুনে আমি বারবার পরখ করার চেষ্টা করছিলাম বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার কথা। কী জঘন্য পরিকল্পিতভাবেই না আজ একটি জাতিকে আদিমতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য একটি অপশক্তির হাতে দেশকে তুলে দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। বিবেক বিক্রি করে জাতিকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। দেশে আজো মৌলবাদী, ফতোয়াবাজ, জঙ্গিবাদীরা গোপনে সংগঠিত।
 
বিশ্বের দেশগুলো মেধার বিনিয়োগ করছে। আর বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠেছে আদিম জঙ্গিবাদ। মৌলবাদী দানবেরা যেকোনো বিজ্ঞান, প্রযুক্তিকেই স্বীকার করে নাÑ এর প্রমাণ তো বিশ্বে কম নয়। তারপরও এই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গ্রামে গ্রামান্তরে তীব্র প্রতিরোধ কেন গড়ে উঠছে না? সে প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। যদি এই প্রতিরোধ গড়ে উঠতো তাহলে কতিপয় মৌলবাদীদের ডাকে হাজারো কোমলমতি কিশোর ঢাকার শাপলা সমাবেশে আসতে পারতো না।
 
মনে রাখতে হবে দানবেরা যতোই শক্তিশালী হোক না কেন, মানবের কাছে তারা সবসময় পরাজিত হয়েছে এবং হবেও। প্রয়োজন শুধু গণঐক্যের। এর পাশাপাশি আমাদের সামাজিক মানসিকতারও পরিবর্তন দরকার। দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমকালীন ও আধুনিকীকরণ প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে। একটি কথা আমরা জানি সমাজে অশুভ শক্তিরা যদি রাষ্ট্রপক্ষের প্রশ্রয় পায়, তাহলে সে রাষ্ট্রে কখনই শান্তি আশা করা যায় না। এ বিষয়টি আমাকে ভাবায় বারবার। একটি রাষ্ট্রে অশুভ শক্তিকে ম“ জোগানোর বিভিন্ন পথ থাকে। সরকারকে অশুভ শক্তি পুষতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। পরোক্ষভাবে কালো শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করা যায়। দেয়া যায় অপশক্তিকে প্রশ্রয়।
 
একটি জাতিকে একেক ধাপ করে এগোতে হয়। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার চলছে, তাতে এই প্রজন্ম দাঁড়াবার সাহস পাবে নিঃসন্দেহে। এ নিয়ে অনেকেই নানা কথা বলছেন। কিন্তু শেষ কথা একটাইÑ বিচার কাজ শেষ হতে হবে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধের বিচার সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ।
 
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজ পর্যবেক্ষণের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়া সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইলে এ বিচারকাজে কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র। তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরদের প্রশিক্ষণেরও ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে মানুষকে সত্যনির্ভর হতে হবে। বাংলাদেশের ভাগ্য হচ্ছে এই হত্যার উল্লাস নিয়ে আমরা হাত বাড়াই বিত্তের দিকে। চারপাশে ধূসর বন্যতা। কেউ অস্ত্র বিক্রি করছে। কেউ চুরি করছে হতদরিদ্রের চালার ঢেউটিন। পঁাঁজর সর্বস্ব কৃষক বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছে গ্রামের বাজারে। আবার কেউ লুণ্ঠিত টাকায় মদ গিলে পড়ে থাকছে অভিজাত এলাকায়। এদেশে বারবার অসহায় হচ্ছে তারাইÑ যারা একটি মৌলিক জীবন চেয়ে হাত বাড়িয়েছিল প্রকৃতির কাছে, পৃথিবীর কাছে।
 
শ্রেণীশোষণের এই যে বোধ, তা শোষক এবং শোষিত- দুয়ের মাঝেই জাগ্রত থাকে সবসময়। প্রতারক জানে সে প্রতারণা করছে। আর প্রতারিত জানে সে প্রতারিত হচ্ছে। কিন্তু আক্রান্তদের কিছুই করার থাকে না। এরা সব সময়ই অসহায়। যে শ্রেণীটি রাষ্ট্র ও সমাজের বিত্তকে নিয়ন্ত্রণ করে, এরা অধিক সময় তাদের মতটা চাপিয়ে দেয় সাধারণ মানুষের ওপর। অস্ত্র ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থেই বদল করে রাষ্ট্রক্ষমতা। মুনাফালোভী সুদখোর কর্পোরেটররা আগাম জানিয়ে দেয় প্রয়োজনে তারা বড় কোম্পানিগুলো একাকার হয়ে যাবে। তবু তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে দেবে না। আম পাবলিকরা কোনো বেইল আউটের সুযোগ পায় না কখনই- মানুষের গালে হাত দিয়ে বসে থাকা দীর্ঘায়িত হয়। আজকের প্রজন্মকে বিষয়গুলো ভেবেই শিক্ষিত হতে হবে মানুষের কল্যাণে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে