Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (65 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৭-১৪-২০১৮

কবিচিত্তে এখনো ঋজু আল মাহমুদ

তুহিন ওয়াদুদ


কবিচিত্তে এখনো ঋজু আল মাহমুদ

আল মাহমুদ অর্ধশতাধিক বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন কবিতা সৃষ্টি করে চলছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। প্রথম কাব্যেই স্বমহিমায় নিজের উপস্থিতি তিনি জানান দেন। কবির বয়স তখন ২৭ বছর। কবিতা গ্রন্থাকারে প্রবেশের আগে সমকালীন পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতো। কৃতী কবি হিসেবে তত দিনে তিনি পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছেন। জীবনে তাঁর বৈরী সময় গেছে বহুবার। চিন্তায় এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু তিনি কবিতার আঙিনা ছেড়ে কোথাও যাননি কোনো দিন। আজ অব্দি নয়। বয়সের ভারে শরীর ন্যুব্জ; কিন্তু তাঁর কবিচিত্ত এখনো ঋজু।

আল মাহমুদের জীবনে তিন রাষ্ট্রের ছায়া আছে। তিন রাষ্ট্রের শাসনগত পার্থক্য থাকলেও তাঁর নিজস্ব ভূমি পরিচিতি বদলায়নি। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ ভারতে জন্ম। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিদায় নেয়। রাষ্ট্রে আসে বিভাজন। অখণ্ড ভারত হয়ে ওঠে ভারত, পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র। বিভাজনের সূত্র দ্বিজাতিতত্ত্ব। পশ্চিম পাকিস্তানে থাকার সময় বর্তমান বাংলাদেশের নাগরিকরা বুঝতে পারে, দেশ বিভাগ তাদের স্বাধীনতা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আল মাহমুদ এই বাস্তবতা দেখে দেখে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর কবিতার ভুবনে প্রবেশের রেখাটিও এই সময়েই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ১৯৬৩ সালে যখন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, তখন বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল সংকটে। বর্তমান বাংলাদেশ সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিকভাবে ছিল পরাধীন। এ রকম উত্তাল সময়ে আল মাহমুদের প্রথম কাব্য প্রকাশিত হলেও কবিতার উপজীব্য প্রেম-কাম-আটপৌরে জীবন। পাকিস্তান শাসনামলেই ১৯৬৬ সালে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কালের কলস’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী রচনা তাঁর বাংলাদেশ পর্বে। কবি একাগ্র মনে নিপুণ বুননে নির্মাণ করে যাচ্ছেন কালজয়ী কবিতা। ‘সোনালী কাবিন’ (১৯৭৩), ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ (১৯৭৬), ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’ (১৯৮০), ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’ (১৯৮৭), ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ (১৯৮০) তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। কথাসাহিত্য-কবিতা উভয় ধারায় দৃঢ় লেখনী শক্তিতে উদ্ভাসিত কবি আল মাহমুদ। তদুপরি তাঁর খ্যাতি কবিতার চরণেই অধিক।

আল মাহমুদের কাছে কবিতা কী তা তিনি কবিতা দিয়েই বুঝিয়েছেন। তাঁর কাছে কবিতা মানে মানুষ, বিলাস-ব্যাসনে থাকা মানুষ নয়। যে লোকায়ত জীবন অনেকের দৃষ্টি এগিয়ে যায়, সেই মানুষই যেন তাঁর কবিতার আরাধ্য। ‘কবিতা তো এমন’ কবিতায় লিখেছেন—‘কবিতা চরের পাখি, কুড়োনো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস/ ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর/ গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর/ কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’

আল মাহমুদ কবিতা সম্পর্কে কবিতার বয়নে যে জীবনের কথা বলেছেন সেই জীবনই তাঁর কবিতার প্রধানতম ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত। প্রাত্যহিক জীবনের জন্য অনিবার্য সব বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতার উপকরণ। যাপিত জীবনের সব কিছুই যে কবিতার জন্য উপযোগী তা তাঁর কবিতায় প্রামাণ্য হিসেবে উঠে এসেছে।

লোকায়ত শব্দের এক অনন্য ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে তাঁর কাব্যগুলো। এটাও এক বিশেষত্ব তাঁর কবিতার। যে জীবন উপেক্ষিত সেই জীবনের বিবিধ শব্দ স্বমহিমায় তাঁর কবিতায় স্থান করে নিয়েছে। ‘সোনালী কাবিন’ কবিতায় কবি লিখেছেন—‘উঠোনে বিন্নির খই, বিছানায় আতর, অগুরু। শুভ এই ধানদূর্বা শিরোধার্য করে মহীয়সী/ আবরু আলগা করে বাঁধো ফের চুলের স্তবক,/ চৌকাঠ ধরেছে এসে ননদীরা তোমার বয়সী/সমানত হয়ে শোনো সংসারের প্রথম সবক/বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল/গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।’ ‘গাঙের ঢেউয়ের মতো’ কবুল বলার যে উপমা তা বাংলা সাহিত্যে বিরল নয়, আনকোরা।

‘কালের কলস (১৯৬৬) যখন কবি রচনা করেন তখনো কবি পরিবর্তিত শাস্ত্রীয় দর্শনে নিজেকে সমর্পণ করেননি। তখনো বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি আর বিজ্ঞানমনস্ক বোধেই তাঁর ছিল বিকাশ। সেই বিকাশের কালেও কবি এক প্রকার রহস্য অনুভব করতেন। সেই রহস্যভেদ করার অভিপ্রায়ও ফুটে উঠেছে। কবি উপলব্ধি করেন, তাঁর কাছে ‘সংগীতে আর লাবণ্য ধরে না।’ কবির কাছে এক শূন্যতা যেন বড় হয়ে দেখা দিতে শুরু করে। আল মাহমুদ একই সঙ্গে কবিতার জন্য অনেক উপাদানই সঞ্চয় করেছেন। ‘আস্তিক-নাস্তিক-সংশয়বাদী-প্রেম সব কিছুর ভেতর দিয়ে জীবনবোধে পৌঁছতে চেয়েছেন। ‘সত্যের আঙুল’ কবিতায় লিখেছেন—‘নির্ঝর সমুদ্র পাখি পর্বত প্রকৃতির কাছে/ আমি যতবার যাই/ দেখি, অর্থহীনতার এক সুন্দর আওয়াজ থেকে কেউ/ সরায় নির্ভার হাত। চিহ্নহীন চকিতে মিলায়/ আলোকিত করাঙ্গুল কার? ধাবমান ধ্বনির ধৈবতে/ নিঃসঙ্গ খুঁজতে থাকি বাহু তাঁর— অঙ্গুলি তাঁহার।’ কবি কখনো কখনো একাকিত্ব বোধ করেছেন। ‘সমস্ত গন্তব্যে একটি একটি তালা ঝুলছে’—বলে তিনি ‘আমার সমস্ত গন্তব্যে’ কবিতায় উল্লেখ করেছেন।

আল মাহমুদ কবিতার আশ্রয়ে নির্দিষ্ট কোনো বাণী প্রচারের কাজ করেননি। তিনি কবিতাকে প্রথমত শিল্পই জ্ঞান করেছেন। এই কবিকে বুঝতে হলে তাঁর কবিতা পাঠ করেই বুঝতে হবে। কবিতায় রূপক-প্রতীক-সংকেত-শব্দচয়ন নিয়ে অনেক কথা বলা যেতে পারে। কবিতায় শব্দ ব্যবহারে তিনি অনেকটাই সংযত থেকেছেন। কবির পরিমিতি বোধ দৃষ্টান্তের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বলা যেতে পারে আল মাহমুদের কবিতা বিষয়ের দোষ-গুণে নয়, শিল্পের মানদণ্ডে অনন্য। বস্তুত আল মাহমুদের কবিতার সৌন্দর্য আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ তুলে আনা দুরূহ। আল মাহমুদের কবিতার সৌন্দর্যের তল খুঁজতে হলে আপনার মেধা-মনন-বোধ দিয়ে তা খুঁজতে হবে। তাঁর কবিতার তুলনা শুধু তাঁর কবিতাই হয়ে উঠতে পারে।

আল মাহমুদের বিশেষত্ব শিল্পনৈপুণ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে। ৫৫ বছর ধরে সদর্প কবিতা চর্চা যেকোনো কবির পক্ষেই কঠিন। এই কঠিন কাজটি করছেন আল মাহমুদ। কৃতী কবির ৮৩তম জন্মদিনে পাঠকের পক্ষে বিনম্র প্রণতি। শতায়ু কবিকে দেখার অভিপ্রায়।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

আর/০৭:১৪/১৪ জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে