Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৭ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (12 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৮-২০১১

অন্তহীন এ পথ

মীজান রহমান


অন্তহীন এ পথ
অনেকদিনই তো হাঁটা হল এপথে। মনে হয় অনন্তকাল ধরেই হাঁটছি। হাঁটছি আর হাঁটছি। এ পথের শেষ নেই। শুরু কোথায় তা?ও জানিনা ভাল করে। সেদিন এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা এক কফির দোকানে। জিজ্ঞেস করলেনঃ হোয়ের আর ইউ ফ্রম? তাইতো, কোত্থেকে এসেছি আমি? চট্করে কোনও জবাব মুখে এল না। স্থূলার্থে বলা যেত বাংলাদেশ। সেটা সহজ উত্তর। সে-উত্তর প্রশ্নের মূলে যায় না। বাংলাদেশ নামক দেশটির বয়স তো আমার চেয়ে অনেক কম। আমি যখন ক্যানাডায় আসি তখন আমার দেশ ছিল পাকিস্তান। আমার জন্ম কিন্তু পাকিস্তানে নয়, ব্রিটিশ ভারতে, যখন এর নাম ছিল ভারতবর্ষ। তারও আগে, অনেক অনেক আগে সেটা ছিল মোগল ভারত, বৌদ্ধ ভারত, মৌর্য ভারত, আর্য ভারত---। তাহলে নৃতাত্বিক দৃষ্টিতে আমি কে? আমার আদিবাস কোথায়? আপনিই বলুন, হোয়ের এম আই ফ্রম?
  প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে ?অহম? বা ?আমি? নিয়ে একটা মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল। ?অহম? কি একটি ব্যক্তি, বস্তুনির্মিত বিশেষ কোনও সত্তা, নাকি একটা আইডিয়া মাত্র? আত্মা? মায়া? গ্রীক শাস্ত্রে সক্রেটিসই(খৃঃপূঃ ৪৭০-৩৯৯) বোধ হয় সর্বপ্রথম উত্থাপন করেছিলেন প্রশ্নটি---লোকটার তো স্বভাবই ছিল এই, সবকিছুতে প্রশ্ন তোলাঃ কি, কেন, কবে, কোথায়। তাঁর বানী ছিল ? নিজেকে জানো? । নো দাইসেলফ। এই জিজ্ঞাসার পথ ধরে ভারতীয় অধ্যাত্নবাদী চিন্তায় একসময় ?সোহম? শব্দটি জন্মলাভ করে, যাতে করে আত্না এবং পরমাত্নার সমন্বয় বা সমীকরণ স্থাপিত হয়ে যায়। ?সোহমের? অনুরূপ ভাবনা পাশ্চাত্য দর্শনে স্থান পেয়েছিল কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু ইসলামের সুফি ভাবধারাতে এর বলিষ্ঠতম প্রকাশ ঘটেছিল মনসুর আল হাল্লাজ (৮৫৮-৯২২)নামক এক অর্ধ উন্মাদ সুফির ?আনাল হক? (আমিই সত্য, মহাসত্য)ঘোষণাটিতে (যে-অপরাধে খলিফা আল-মুক্তাদির তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন)।
   বিজ্ঞানের তখন শৈশবাবস্থা। আধুনিক বিজ্ঞানের সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কোনরকম চিন্তাই প্রবেশ করেনি মানুষের মনে। সেকালের বিজ্ঞান ছিল মূলত অভিজ্ঞতাভিত্তিক---যা খালি চোখে দেখা যায়, দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপা যায়, দৈর্ঘপ্রস্থ বোঝা যায় কাঠের কাঠি দিয়ে, তার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের চিন্তা। সাধারণ বুদ্ধি,--- কমন সেন্স---ছিল বিজ্ঞানের প্রধান বাহন। হয়ত সেকারণেই পুরাকালের চিন্তাশীল মনীষীরা সাধারণ বুদ্ধির সীমানা অতিক্রম করে একটা গূঢ়তর, ইন্দ্রিয়াতীত জগত রচনা করতে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন কল্পনার রঙ দিয়ে। বস্তুর উর্ধে একটা নৈর্বস্তুক অস্তিত্ব, একটা ছায়াচ্ছন্ন মায়াময় জগত, যার সাধনাতে ধ্যানমগ্ন হয়ে তাঁরা তৈরি করতে চেয়েছিলেন একটা বিকল্প, বিমূর্ত, বাস্তবতা। বিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিশ্বাস যেমন ছিল মহাবিশ্বের ভূকেন্দ্রিক মতবাদ, তেমনি হয়ত মানবকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে উপস্থিত ছিলেন এই রহস্যময় সত্তাটি---?অহম?, যার চূড়ান্ত স্বরূপ প্রকাশ পায় ?সোহম? আর ?আনাল হক? জাতীয় দুঃসাহসী ঘোষণাতে।
  আজকের বিজ্ঞানের প্রধান বাহন কিন্তু অভিজ্ঞতা বা সাধারণ বুদ্ধি নয়। অভিজ্ঞতার বলয়তে প্রকৃতির অনেক রহস্যেরই দ্বারোদ্ঘাটন করে দিয়েছেন আইজ্যাক নিউটন(১৬৪২-১৭২৭)। বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫)এসে আমাদের কল্পনাকে আরো অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গেলেন---যেখানে সাধারণ বুদ্ধি বেশ বড়রকমের একটা ধাক্কা খায় ?সময়? নামক একটি চতুর্থ মাত্রা সংযুক্ত হওয়াতে আমাদের দৈর্ঘ-প্রস্থ-উচ্চতাভিত্তিক ব্যাপ্তিভাবনাতে। আলোকরশ্নিকে আমাদের নতুনভাবে দেখতে শুরু করতে হয়। মেনে নিতে হয় যে যা স্থূল দৃষ্টির আলোতে ধরা দেয় সত্যিকার বাস্তব হয়ত তা নয়। দূর আকাশের গ্রহতারা নীহারিকাদির প্রতি আমাদের চর্মচক্ষুভিত্তিক চিন্তাধারাকে আমূল বদলে ফেলতে হয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে আইনস্টাইনের নিজেরই স্বতন্ত্র একটি কাজের মধ্য দিয়ে, যাতে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে আলোকরশ্নি অনেক সময় অণুর মত ব্যবহার করে, তড়িতচৌম্বিকতামূলক তরঙ্গই কেবল নয়। এই যুগান্তকারী আইডিয়া থেকেই কালে কালে উৎসারিত হয় এক অভিনব বিজ্ঞান, যাকে আজকাল ?কুয়ান্টাম তত্ব? বলে অভিহিত করা হয়। এমনই অদ্ভুত এই বিজ্ঞান যে সাধারণ বুদ্ধি একেবারেই কাজে লাগে না এখানে---সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাতে এর বিন্দুমাত্র ছায়াপাত ঘটেনা। ফলে সবকিছুই কেমন ভোজবাজির মত মনে হয় আমাদের কাছে। কুয়ান্টাম জগতে সাধারণ দাঁড়িপাল্লা, চোখে-দেখা বাস্তব, এসবের কোনও মূল্য নেই। এজগত অণু-পরমাণুর জগত। এখানকার নিয়মকানুন সম্পূর্ণ আলাদা---নিউটন সাহেবের এত ভারি ভারি তত্ব, সব অকেজো এখানে।
  আধুনিক প্রযুক্তির কল্যানে ?অণু? এখন মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে একরকম। বর্তমান যুগের সাধারণ বুদ্ধির আওতায় এসে গেছে শব্দটি। সবাই মোটামুটি মেনে নিয়েছে যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই অণু দিয়ে তৈরি---সৃষ্টির ইটপাথর হল এই ক্ষুদ্র কণাটি। তবে কেউ যেন ভেবে না বসেন যে অণুর অস্তিত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের আবিস্কার। মোটেও নয়। গ্রীক দর্শনের অন্যতম আদিপুরুষ ডেমোক্রিটাস (খৃঃপূঃ ৪৬০-৩৭০)সম্ভবত ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি যাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মূল উপাদান হল কণা, সূক্ষাতিসূক্ষ কণা, যা খালি চোখে দেহা সম্ভব নয় কারো পক্ষে। এটা তিনি কোনও যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করে বের করেছিলেন তা নয়, একান্তই যুক্তিতর্ক দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। তাঁর যুক্তিটি ছিল এরকম। ধরুণ একটা বস্তুকে দু?খণ্ডে ভাগ করা হল। তারপর চারখণ্ড, তারপর আট, ষোল,?..,এভাবে ভাগ করে গেলে শেষমেষ কি দাঁড়াবে? বস্তু তো একবারে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারেনা, সুতরাং সবশেষে এমন একটা জিনিস দাঁড়াবে যা চোখেই দেখা যাবে না, অতএব তাকে আর ভাগ করা সম্ভব হবে না। এই অবিভাজ্য, অখণ্ডনীয় বস্তুটিকেই তিনি নাম দিয়েছিলেন ?এটম?---অণু। গ্রীক Atomos (যার আক্ষরিক অর্থ অকর্তিত) থেকে এর উৎপত্তি। সুতরাং এই লোকটিকে ?অণু?র জনক বলা হয়ত ভুল হবে না। তাঁর এই অসাধারণ আইডিয়াটি সেকালের চিন্তাবিদ সমাজ সোৎসাহে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন তা নয়। বিশেষ করে মহামতি প্লেটো (খৃঃপূঃ ৪২৭-৩৪৭)তো সহ্যই করতে পারতেন না ?এটম? শব্দটি কেউ তাঁর সামনে উচ্চারণ করলে---ঘোর বিরোধী ছিলেন পদার্থের আণবিকতা তত্বের। তাঁর ভয়ে ডেমোক্রিটাসের ভক্তরা টুঁ শব্দটি করেনি যদ্দিন তিনি বেঁচে ছিলেন। মহাপুরুষের মৃত্যুর পর প্রথম মুখ খুললেন আরেক দার্শনিক এপিকিউরাস (খৃঃপূঃ ৩৪২-২৭০)।তিনিও খুব একটা সমর্থন পাননি সমসাময়িক পণ্ডিতদের কাছ থেকে। এটমের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ওজস্বী প্রবক্তা ছিলেন লুক্রেটিয়াস (খৃঃপূঃ  ৯৮-৫৫), (যদিও তিনি ছিলেন রোমান)যাঁর প্রনীত গ্রন্থ এখনো বিক্রি হয় বাজারে।
  দর্শনশাস্ত্রের আইডিয়াজগত থেকে বিজ্ঞানের ব্যবহারিক জগতে প্রবেশাধিকার অর্জন করতে ?অণু?কে প্রায় ১৮৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী লুডভিগ বল্জম্যান (১৮৪৪-১৯০৫) তাপবলবিদ্যার (Thermodynamics) যাবতীয় বিষয়ের আণবিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানের যে নতুন একটি শাখা (Statistical Mechanics)সৃষ্টি করলেন তারই বরাতে বিজ্ঞানজগতে বস্তুর ?অণু?ত্বের আইডিয়াটি শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।পরবর্তীতে আলোকরশ্নির প্রকৃতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) দেখালেন যে আলোর গতিবিধির কোনও ঠিকঠিকানা নেই---একেক সময় একেকরকম ব্যবহার করে। কখনো তরঙ্গ, কখনো কণা। কণার কথা আগেই বলেছিলেন নিউটন, তুলনা করেছিলেন অনেকটা বিলিয়ার্ড বলের সরলরেখায় চলার মত, কিন্তু আলো যে দুটোই হতে পারে সেটা তাঁর মাথায় ঢোকেনি---সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞান তখনো অতটা অগ্রসর হয়নি। আইনস্টাইন এই আলোকণাটির নাম দিলেনঃ photon। তাঁর গবেষণাতে দেখানো হয়েছিল আলোকরশ্নি একটা বিশেষ ধাতুনির্মিত পাতের ওপর বর্ষিত হতে থাকলে একটা পর্যায়ে সেই পাত থেকে একটি দুটি ইলেক্ট্রন ছিটকে পড়বে। অনেকটা ঢিল ছুড়ে দেয়াল থেকে চূন খসিয়ে ফেলার মত। এই আপাত সরল একটি আইডিয়া দ্রুত পরিবর্ধিত ও পরমার্জিত হয়ে বর্তমান যুগের ?কুয়ান্টাম তত্বে? রূপান্তরিত হয়। এ তত্ব এমনই যুগান্তকারি যে আগেকার শত শত বছরের বিজ্ঞানকে প্রায় নাকচ করে দেবার অবস্থায় এনে দেয়। নাকচ অবশ্য হয়নি সৌভাগ্যবশত, কারণ সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের জন্যে নতুন তত্বের চেয়ে পুরনো তত্ব, অর্থাৎ গ্যালিলি-নিউটন-ম্যাক্সওয়েল তত্বই ষোল আনা কার্যকর। মোদ্দা কথা হল দুটির দুই এলাকা। একটি ঠিক আরেকটি ভুল তা নয়---দুটোই ঠিক, কিন্তু নিজ নিজ এলাকাতে। কুয়ান্টাম তত্বের নায়ক নায়িকা হল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা, যেমন ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, ফোটন---এরা নিউটন-গ্যালিলির আইনকানুন একেবারেই মানে না। আর সাধারণ বিজ্ঞানের ক্ষেত্র হল আমাদের এই অতিপরিচিত পৃথিবী, গ্রহ তারা, পাহাড় পর্বত, আকাশ সাগর, আমরা, আমাদের স্থূল বস্তুজগত। মূলত আমরাও কণার সমষ্টি, কিন্তু এতই অগণিত সে সমষ্টি যে শেষমেষ কণার কোনও আলাদা অস্তিত্ব থাকেনা---তখন কুয়ান্টামের এলাকা ছাড়িয়ে আমরা নিউটনের এলাকাতে চলে যাই। কিন্তু কণার জগত এক বিশাল ও বিচিত্র জগত---সে জগত শুধু আমাদের দৃষ্টির বাইরেই নয়, বোধবুদ্ধিরও বাইরে। আমাদের ?সাধারণ বুদ্ধি? সেখানে দারুণ মার খেয়ে যায়। অর্থাৎ সাধারণ যুক্তিতর্ক দিয়ে কুয়ান্টাম তত্ব বোঝার চেষ্টা নেহাৎ বোকামি---লাভ হবে না। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুণ একটা ঢিল ছোঁড়া হল উপরের দিকে একটা বিশেষ গতিতে। ঠিক কোন দিকটিতে সেটা ছোঁড়া হল সেটা যদি সঠিকভাবে জানা থাকে আপনার তাহলে নিউটনের গতিতত্বের সমীকরণসমূহের সাহায্যে আপনি অনায়াসে বের করে ফেলতে পারবেন ঠিক কোন বিন্দুতে গিয়ে সেই ঢিলটি মাটিতে পড়বে। কিন্তু এটি যদি ঢিল না হয়ে একটি অণু হত, যার গতিবেগ প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি (অর্থাৎ প্রতি সেকেণ্ডে ১৮৬,২৮২ মাইল) তাহলে কিন্তু অণুটির গতি আর অবস্থান দুটোই সমান নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভন হবে না আপনার পক্ষে---একটা মাপতে গেলে আরেকটা এতটাই বাধাগ্রস্ত হবে যে সব গণনাই ওলটপালট হয়ে যাবে। এটা আপনার চেষ্টার ত্রুটি নয়, এটাই ঐ জগতের আইন। শুধু তাই নয়, অণুরা ঠিক কোন রাস্তা দিয়ে চলে সেটাও আপনার জ্ঞানের বাইরে। কেবল এটুকুই বলা সম্ভব আপনার পক্ষে যে কণাটির অমুক রাস্তা দিয়ে চলার ?সম্ভাবনা? (probability)অতখানি, অন্য আরেকটি পথ দিয়ে চলার সম্ভাবনা এই। তার বেশি নয়। বলা যায় অণুরা কোনও বিশেষ একটি পথ বাছাই করে চলে না, চারদিকে একটা ? সম্ভাবনার ধোঁয়া? ছড়াতে ছড়াতে চলে। অর্থাৎ তার গতিপথ ঐ ধোঁয়াটির যেকোন পথেই তার যাবার সম্ভাবনা আছে---কোনটাতে কম, কোনটাতে বেশি। আপনি হতবাক হয়ে বলবেন এ আবার কেমন আইন? এতো কোন আইনই হল না। বিশ্বাস করুন এভাবেই চলছে আমাদের অণুকণাদের বাস্তব জীবন---এবং এরকম অদ্ভুত সব নিয়মকানুন মেনে চলা সত্বেও গবেষকদের পুনরাবৃত্ত পরীক্ষায় এর অকাট্যতা নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে।
  আমার বর্তমান নিবন্ধের জন্যে কেবল এটুকুই যথেষ্ঠ যে সাধারণ বুদ্ধি আর দৈনন্দিন জীবনের বেলায় যা প্রযোজ্য তার কোনটাই প্রযোজ্য নয় অণুর জগতে। হতবুদ্ধি হয়ে আমরা সাধারণ মানুষ হয়ত বলতে পারি, আমরা সবাই যদি মূলত অণু দিয়ে তৈরি হয়ে থাকি তাহলে এটা কি করে হয় যে আমাদের শরীরের কণাগুলি পালন করে এক নিয়ম আর শরীর করে আরেক নিয়ম? প্রকৃতি কি এতই খামখেয়ালি? না,  এটা প্রকৃতির খামখেয়ালি স্বভাব নয়, আমাদের বুঝার ভুল। প্রকৃতির বুনোটটাই এরকম---এভাবেই আঁকা হয়েছে এর নীলনকশা। এরই ওপর নির্ভর করে গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্থিতিস্থাপকতা, এর ভারসাম্য। বিংশ শতাব্দীর আগে বিজ্ঞান অতটা অগ্রসর হতে পারেনি বলে প্রকৃতির এই দ্বৈতচরিত্র ধরা পড়েনি এতদিন। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতে এসেও অনেক ঝানু বিজ্ঞানীরই হয়ত পরিষ্কার ধারণা নেই কুয়ান্টাম তত্ব জিনিসটা আসলে কি। একেকজন একেকভাবে দেখে একে। এমনই এক রহস্যঘেরা বিষয় এটি যে এর অবগুন্ঠন উন্মোচন করে এর সত্যিকার রূপ উপলব্ধি করার ক্ষমতা খুব মানুষের নেই। পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, নোবেলবিজয়ী রিচার্ড ফাইনম্যান (১৯১৮-১৯৮৮) একজায়গায় বলেছিলেন, আধো কৌতুকের সুরেঃ ?আমি নির্ভয়ে ঘোষণা করতে পারি যে কুয়ান্টাম তত্ব বোঝার মত লোক কোথাও নেই!? কুয়ান্টাম নিয়ে আরেকটা জনপ্রিয় কৌতুকঃ ?কুয়ান্টাম বিজ্ঞান থাকতে নেশাখোরের গাঁজা লাগবে কেন??
  আমি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র নই, গণিতের। তবুও কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে কুয়ান্টাম তত্বের ওপর দুয়েকটা বই পড়ার চেষ্টা করেছি। পড়ার সময় মনে হয়েছে, বাহ্, বেশ তো, এমন কি কঠিন জিনিস এটা। তারপর বই বন্ধ করে ভাবতে বসে টের পেলাম যে আসলে কিছুই বুঝিনি। এবং সলজ্জে স্বীকার করছি যে সে-অবস্থার কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি এখনো। রিচার্ড ফাইনম্যানের উক্তিটি অন্তত আমার বেলায় ষোল আনা সত্য। তবে ফাইনম্যানের বর্ণাঢ্য জীবনকাহিনী যারা জানেন কিছুটা তারা খুব ভাল করেই বুঝবেন যে কথাটি তিনি বলেছিলেন নেহাৎ রসচ্ছলে---প্রচণ্ডরকমের রসিক মানুষ ছিলেন তিনি। তিনি যে কতবড় পণ্ডিত কুয়ান্টাম শাস্ত্রে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাবেন স্টিফেন হকিং আর লেনার্ড ম্লোডিনোর হালের বই ? গ্র্যাণ্ড ডিজাইন? পড়লে। সুতরাং ফাইনম্যানের রসিকতার অর্থ সবাই বুঝবে---এটা তাঁর বিনয় মাত্র।
  কিন্তু আমার জন্যে এটা বিনয় মোটেও নয়, সাদামাঠা স্বীকারোক্তি। শুধু এটুকুই বুঝেছি আমি যে আকারে ক্ষুদ্র হলেই জিনিসটা তুচ্ছ নয়, কারণ আমরা প্রত্যেকেই এই ?তুচ্ছ? কণা দিয়ে তৈরি। এক হিসেবে আমার ভেতরকার প্রতিটি কণাই আমার চেয়ে হাজারগুণে বেশি শক্তিশালী। পক্ষান্তরে পৃথক পৃথক কণারও নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই অনেক অনেক কণা একত্র না হওয়া পর্যন্ত।হকিং-ম্লোবিনোর বই থেকে একটা উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছিঃ ??individual objects don?t even have an independent existence but rather exist only as part of an ensemble of many?.
  এ আরেক ধাঁধা কুয়ান্টাম তত্বের। অর্বুদ কোটি অণু না হলে একটা জলবিন্দু হয়না, আবার একটি জলবিন্দু আপনা আপনি কোনও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারবেনা, অণুর পর্যায়ে বিপুল কোনও বিবর্তন না ঘটলে। প্রতিটি বস্তুরই এই একই ধর্ম। আমাদের মূল পরিচয় আর অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে গিয়ে এই কথাগুলি বারবার উঠে আসে মনে। সত্যি তো, আমি তো কেউ নই। আমি মূলেতে একটি বিন্দু যার নিজস্ব কোন অস্তিত্ব নেই। আমি একটা স্রোতের অংশ, একটা প্রবাহ। কুয়ান্টাম তত্বের দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে গেলে আমি কিছু নই, আবার সবই। কেউ নই, আবার সবাই। আমি একাধারে সৃষ্টি ও স্রষ্টা, নির্মাণ ও ধ্বংস। প্রকৃতির বোধাতীত দ্বৈততার বিচিত্র লীলাভূমিতে আমি এক নগণ্য ক্রীড়নক ছাড়া কিছু নই। এখানেই আমার উৎস, আমার পরিচয়। আমি হাঁটছি, চিরকাল ধরে হাঁটছি, কারণ ওটাই আমার প্রকৃতি।

  সূত্রঃ 1.The Grand Design, by Stephen Hawking and Leonard Mlodinow, Published by Bantam Books, 2010.
  2. QED, the strange theory of light and matter, by Richard P.Feynman, Published by Princeton University Press, 1985.
  3. Internet.

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে