Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (100 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৫-০৪-২০১৮

ফের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

সারোয়ার সুমন


ফের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত

রাঙামাটি, ০৪ মে- অন্তত চারটি ধারায় বিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতি এবং এ বিভক্তিরই সর্বশেষ বলি হলেন নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা। তিনি ছিলেন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) একাংশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। শক্তিমান চাকমাদের এ অংশটি জনসাধারণ্যে সংস্কারপন্থি জেএসএস নামে পরিচিত হলেও তারা নিজেরা লেখে জেএসএস (এমএন লারমা)। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ভেঙে এ দলের সৃষ্টি হয়।

পার্বত্য চুক্তির আগে জেএসএস ছিল পাহাড়িদের একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন, যারা পাহাড়ে সশস্ত্র রাজনীতি জারি রেখেছিল। ১৯৯৭ সালে চুক্তির পর দলটি ভেঙে দুই ভাগ হয়ে যায়। 'পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চাই' স্লোগান দিয়ে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই নিজেদের জানান দেয় চুক্তিবিরোধী বলে পরিচিত ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। অবশ্য দল হিসেবে তারা আত্মপ্রকাশ করে আরও পরে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর, রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। জনসংহতি সমিতির বড় অংশটি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার নেতৃত্বে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করলেও তাদের পুরনো দাবিগুলো নিয়ে মাঠে রয়ে যায় ইউপিডিএফ।

পার্বত্য রাজনীতির এই যখন পরিস্থিতি, তার কিছুকাল আগে থেকেই জেএসএসের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শক্তিমান চাকমা। পড়াশোনা করেছেন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে এবং সেখান থেকে পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। শক্তিমানরা যখন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ করতেন, তখন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের বেশিরভাগ নেতাই বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শক্তিমান ব্যতিক্রম, তিনি ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের বাংলাদেশ ছাত্র, যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি।

জন্মসূত্রে রাঙামাটির ছেলে শক্তিমান চাকমা পড়াশোনা শেষ করে চলে যান পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং যুক্ত হন জেএসএসের রাজনীতিতে। অবিভক্ত জেএসএসের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন এবং সেই সময় ইমডো নামে একটি এনজিও গড়ে তুলেছিলেন।

এক-এগারোর সরকারের সময় ভাঙে জেএসএস। বলা হয়ে থাকে, সেই সরকারের মাইনাস ফর্মুলার অংশ হিসেবেই সন্তু লারমাকে দল থেকে বিতাড়নের চেষ্টা হয়েছিল। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র্র নারায়ণ লারমার (এমএন লারমা) মৃত্যুর পর প্রধান হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন তার সহোদর সন্তু লারমা। সেই থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। প্রথম ভাঙনের মুখোমুখি হন ইউপিডিএফের জন্মের সময়।

দ্বিতীয় দফায় সন্তু লারমার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা সুধাসিন্ধু খীসা, রূপায়ণ দেওয়ান ও তাতিন্দ্রলাল ত্রিপুরা ওরফে পেলে বাবু আলাদা হয়ে গঠন করেন জেএসএস (এমএন লারমা)। তখন এই অংশে যুক্ত হন শক্তিমান চাকমা এবং এরও কয়েক বছর পর ২০১৪ সালে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

পাহাড়িদের রাজনীতিতে প্রথম ভাঙনের পর থেকেই ইউপিডিএফের একাধিপত্য ছিল খাগড়াছড়িতে। দ্বিতীয় ভাঙনের মূল নেতা সুধাসিন্ধু খীসাও খাগড়াছড়ির মানুষ। শত্রুর শত্রু পরস্পরের মিত্র নীতিতে শুরুতেই ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থি জেএসএস গোপন সমঝোতার নীতিতে চলতে শুরু করে এবং তখন এ দু'পক্ষের মিলিত আক্রমণে নাজেহাল অবস্থা হয় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের। অবশ্য জেএসএসও ছেড়ে কথা বলেনি।

চুক্তির পর থেকে তিন পক্ষের লড়াইয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাড়ে ছয় শতাধিক খুন হয়। সংস্কারপন্থি জেএসএস এই সময়ের মধ্যে আঞ্চলিক নির্বাচনে দীঘিনালা, মহালছড়ি ও নানিয়ারচরে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে।

২০১৫ সালের দিকে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন রাজনৈতিক দল জেএসএস, ইউপিডিএফ ও জেএসএস (এমএন লারমা) একটি গোপন সমঝোতা করে বলে জানা যায়। মূলত পাহাড়ি সুশীল সমাজের উদ্যোগে এই সমঝোতা হলেও দলগুলোর পক্ষে কখনও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে দীর্ঘদিন থেমে ছিল খুনোখুনি এবং শক্তিমান হত্যার মধ্য দিয়ে আবারও অশনিসংকেত ধ্বনিত হলো। এমনটা যে হতে পারে, তা গত বছর নভেম্বরে ইউপিডিএফ ভাঙার পরই বোঝা গিয়েছিল।

১৯ বছরের মাথায় এসে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ভাঙনের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠাতা প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ। গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ নামে পরিচয় দেওয়া এ অংশটির নেতৃত্বে রয়েছেন তপনজ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা। ভাঙনের পরপরই তপনজ্যোতি বলেছিলেন, "ইউপিডিএফের গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, বলপ্রয়োগের রাজনীতি, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও অপহরণের রাজনীতি করছেন প্রসিত খীসা। ইউপিডিএফের অনেক নেতা চাঁদার টাকায় 'পকেট ভারী নেতা' হিসেবে পরিচিত।

মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রসিতের ইউপিডিএফ এখন নীতিহীন, আদর্শহীন, লক্ষ্যভ্রষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীদের আর্থিক দন্ড এবং মৃত্যুদন্ড কার্যকর করছেন তারা।"

ইউপিডিএফ ভাঙনের পর খুনোখুনিতে উভয়পক্ষে ১০ জনের মতো খুন হয়েছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দুই নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমা অপহৃত হওয়ার পর গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ তপনজ্যোতির নেতৃত্বাধীন অংশের সঙ্গে সংস্কারপন্থি জেএসএসের যোগসাজশ স্পষ্ট হয়েছে। ওই অপহরণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১ নম্বর আসামি হলেন নিহত শক্তিমান চাকমা এবং দুই নম্বর আসামি তপনজ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা। ওই ঘটনার পর থেকে তপনজ্যোতিকে টেলিফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকাশ্যেই ছিলেন মামলার ১ নম্বর আসামি শক্তিমান চাকমা এবং গতকাল বৃহস্পতিবার নানিয়ারচরে খুন হলেন তিনি।

শক্তিমান হত্যার জন্য সংস্কারপন্থি জেএসএসের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা ইউপিডিএফকে দায়ী করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেই নানিয়ারচর এলাকার ইউপিডিএফের সশস্ত্র বাহিনীর গ্রুপ লিডার অর্পণ চাকমাকে দায়ী করেন। যোগাযোগ করা হলে ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নিরণ চাকমা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা ও বানোয়াট। ইউপিডিএফের মুখপাত্র মাইকেল চাকমার দাবি, 'আমরা নই; এ প্রাণহানির নেপথ্যে তৃতীয় কোনো শক্তি থাকতে পারে।'

পাহাড়ে এমন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে সংক্ষুব্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, 'নিজেদের ছায়ার সঙ্গেই সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলো। সবাই অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বললেও তা আদায়ের পদ্ধতি একেক দলের একেক রকম। এখানে পারস্পরিক অবিশ্বাসও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এটি দূর করে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনা উচিত। কিন্তু এজন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখছি না কোনো দিক থেকেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে ফের মৃত্যুপুরী হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম।'

সূত্র: সমকাল

আর/০৭:১৪/০৪ মে

রাঙ্গামাটি

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে