Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (81 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-২২-২০১৮

নিভৃত যতনে জেনো...

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ


নিভৃত যতনে জেনো...

এক.

যে মুহূর্তগুলো চলে যায়, সেগুলো একেকটি হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণমুদ্রার মতো আপন ঐশ্বর্যে অদৃশ্য হয়ে পড়ে। তারা ফিরবে না কোনোদিন আর দৃশ্যপটে। হাতের মুঠোয় পাবো না তাদের আহদ্মাদে, ভালোবাসায় ফিরে। প্রতিটি মানুষের ভেতর তা নিয়ে ফিসফিস থাকে। থাকে কাতরতা। 

অমোনি আছে কিছু মানুষের মুখ, প্রতিটি মানুষের কাছে তারা আপন স্মৃতি-ঘেরা নিদাঘ যন্ত্রণার রেখা তৈরি করে হাহাকার তোলে দূরে সরে যাবার জন্যে। সে মুখগুলো ভাসে শুধু স্মৃতিতে। স্মৃতিগুলো কখনো সজীব, কখনো ঝাপসা। কাচেরও ওপারে তারা রয়ে যায়। বুকেরও তলে জলের খনি করে মাছের মতো পাখনা মেলে সাঁতার কাটে। কখনো তখন মন চায় তাদেরকে সে স্মৃতি হতে জীবন্ত করে করে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে। নিজের পাশে রেখে মনে হয় তাদের নিঃশ্ব্বাসের আঁচড়গুলো স্পর্শ করি। 

সিঁদুর জামিয়ে রাখা কৌটোয় এমন তো অনেক মুখই আমার আছে। কত দেশ আর কত নগরীতে গেছি, সেখানে দিন কাটানো, রাত কাটানো আমার সময়কে সুগন্ধে ভরে দিয়েছে যারা, তারা আজও আমার কাছে সুখ বিলায় মৌনতায়। তাদের একেকটা মুখশ্রী পানির ওপর কম্পন তোলা সূর্যমুখী। প্রবল ঘন কুয়াশা, অথবা ঝুম বৃষ্টিতে আমার চলাচলে ওরা আসে, গল্প করে। জানালা খুলে দিই। ওরা কেউ কেউ নিঃসংকোচে আমার শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। যখন লিখি, তখনো আসে। স্মিত করে হাসি আমি। ওরাও হাসে। গল্প হয় যদি হলো; না হলে আমাকে কিছু না বলেই আপন মনে উল্টোদিকে শুরু করে হাঁটা। পেছন থেকে আমি তাকিয়ে থাকি সেই দূর যাত্রায় ধাবিত অপসৃয়মান ট্রেনের গমন পথে।

দুই.

সুদীপ্তা দেখতে আর্য মুখশ্রীতে কোমল বাঙালি মিশেল। ওর গভীর চোখের সাথে ঠোঁট দুটো খুব আদুরে গড়নের। দুগালে টোল পড়া সেই সুদীপ্তার সাথে দেখা ১৯৯৫-এর মার্চে, মমতার সত্যাগ্রহ যখন চলছিল কোলকাতায়, তখন মেট্রো স্টেশনে। কালীঘাটের স্টেশনে দাঁড়ানো আমি। ওপর থেকে সিড়ি ভেঙে এসে প্ল্যাটফর্মে সুদীপ্তা ঠিক ব্রেক কষলো আমার গা ঘেঁষে। ট্রেন চলেই এলো বলে। আমার প্রথম আসা কোলকাতায়। পথ তেমন চিনি না। টিকিট হাতে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, শুনুন, আচ্ছা, দু'টাকার টিকিটে এখান হতে কতদূর পথ যাওয়া যায়? 

প্রশ্নের ধরনে ও মুখে হাসি টেনে অবাক এক চাউনিতে জবাব দিল, অনেক দূর। 

অনেক দূর! কিন্তু নিউমার্কেট পর্যন্ত তো যাওয়া যাবে?

ওর নতুন জবাব, হুম। দিব্যি যাবে। আমি ওদিকটায় যাবো। তুমি আমার সাথেই কামরায় ওঠো।

কোলকাতায় ছোট বড় সকলেই সকলকে তুমি বলে সম্বোধন করে। প্রথমটায় আমি চটকে গেলেও, পরে ধাতস্থ হয়েছি। ওর কথায় একসাথেই এগোলাম। অফিস টাইম। দু'জনে দাঁড়ানোর জায়গা মিললো। মেট্রোরেলের কামরায় মাথার ওপরে ঝোলানো হাতল ধরে পরস্পর একটু হাসি। কোলকাতা আর ঢাকার দিক থেকে টুকরো করে প্রশ্ন একে অপরকে। ঝাঁ করে একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল। পথঘাট সব বুঝিয়ে সুদীপ্তা আমাকে আমন্ত্রণ করলো বিকেলে ওর অফিসের সামনে।

তোমার অফিস কোথায়? 

জ্যোতি সিনেমা হলের উল্টোদিকে। 

জ্যোতি সিনেমা হল কোথায়? 

খিলখিল করে হেসে উঠলো। ও হো, বাবু সাহেব। তাই তো! আচ্ছা শোনো, তোমায় বলি। শোনো, তুমি তো উঠেছো চৌরঙ্গী হোটেলে। সেখানেই তো এসপ্লানেড, ঠিক তো? 

সংক্ষিপ্তভাবে আমি হুম বলেই খালাস।

সুদীপ্তা এবার এসপ্লানেড থেকে ডালহৌসির দিকে ডান-বাম করে পথটা বুঝিয়ে দিল। শোনো, ওখানে এসে দেখবে জ্যোতি সিনেমা হলে চলছে 'হাম আপকে হ্যায় কৌন'। ফলে চিনতে তোমার অসুবিধে হবে না। 

লক্ষ লোকের ভিড়ে এই অজানা কোলকাতায় সুদীপ্তা আমার প্রথম বন্ধু। আত্মীয়। বুকের মাঝে একটা চড়ুই কিচির-মিচির করে উঠলো। এমন সাবলীলভাবে ও হাসতো যে, সে হাসির সামনে মানুষেরা নিজেকে হারিয়ে হারিয়ে খুঁজবে। সেই থেকে কিছুদিন পরপর যখনি কোলকাতায় গিয়েছি, তখনি একটা ফোন ওকে। সুদীপ্তারও সময় হতো আমার সাথে বিকলেটা কাটানোর। তারপর বাড়ি ফেরার তাড়া থাকতো। নতুন বিয়ের সংসার। সন্ধ্যার আগেই মেট্রোর কামরায় হাতলে দুলতো সবার সাথে। 

এভাবে বছর দুয়েক পেরুনোর পর শেষবারটায় ওকে আর ফোনে পেলাম না। ফোনটা বন্ধ। নিশ্চুপ। মন খারাপ করে ওর অফিসে গেলাম। পরিচয় দিতেই রিসেপশনিস্ট জানালো, সুদীপ্তা ম্যাম কিছুদিন আগে হঠাৎ চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। 

কোনো ঠিকানা? বাসা বা অফিসের?

দু'দিকে মাথা নাড়ালো। জানে না। হঠাৎ মনে পড়েছে ভঙ্গিতে ওর ড্রয়ার হাতড়ে একটা খাম বের করে আমার হাতে দিল। 

খামরে ভেতর চার ভাঁজে অফ হোয়াইট ছোট্ট কাগজ। সুদীপ্তার শেষ কথা আমার সাথে। 

'কবি, জানি তুমি কোলকাতা আসবে। খোঁজ করবে আমার। কিন্তু তুমি যখন আমার এ কথাগুলো পড়বে, তখন জেনো- আমি অনেক দূরে। কতদূরে? বলাই যাবে না। জীবন হয় তো এ রকমই। কেউ কোনোকিছু কোনোদিন আগে জানি না আমাদের গন্তব্য।

আরেকটা কথা। কথাটা রেখো তুমি। কবি, তোমার কবিতায় আমার যেনো ঠাঁই হয়।

ইতি 
সুদূরের সুদীপ্তা 

তিন.

চিরকুটটা সকলের সামনে মেলে ধরার পর আর অন্য কোনো গল্প বলার জন্যে সায় দেয় না মন। তবুও মানুষের কাছে অনেক মানুষ থাকে। তবুও মানুষের ভেতর অনেক গল্প জন্ম নেয়। কোনো একদিন মানুষেরা সেই গল্প বলতে শুরু করে। অমনি আরেকটি মুখ আনিয়া। আমার একদা সহকর্মী আনিয়া হাইল। পাক্কা জার্মান। একহারা গড়নে প্রায় আমার সমান লম্বা। চোখের মণি দুটো গাঢ় নীল। হলিউডের সিনেমায় নায়িকা হিসেবে দিব্যি মানায়। সেই অমন মেয়েটির পাশেই আমার অফিস রুম। আমার দায়িত্ব রাজনীতি আর মিডিয়া। ওর ভাগে সাংস্কৃতিক বিভাগ। 

গুটেন মর্গেন দিয়ে শুরু হতো আমাদের সকাল; আর কখনো দুপুরটা গিয়ে থমকাতো দু'জনে লাঞ্চে, একসাথে। ও টেলিভিশন দেখে না। বই পড়া ছাড়া আর কিছু চেনে না, জানে না। এমন এক পণ্ডিত সহকর্মীর সাথে যে গল্পগুলো হতো, তার সবটাতেই জীবনের নানা ভাবনা, মহাকাশ, রাজনীতি, অর্থনীতি। ওর দেশ এবং সেখানে নব নাৎসির জন্যে অনেকের মনে ছটফটানি। বাংলাদেশের ঘটনা আর গল্প তো আছেই। 

দূতাবাস জীবনে সাধারণত বেশিরভাগ বাঙালি কর্মকর্তা জার্মানদের সাথে খুব একটা মেশে না। মিশলেও থাকে প্রবল দূরত্ব। কিন্তু আনিয়া আর আমার ছিলো উল্টো হিসেব। পার্টি হলে আমরা পাশাপাশি দাঁড়ানো। আমি স্পিচ দিলে সবার আগে হাততালিটা ও দেবে। সেই আনিয়া এক দুপুরে বিষণ্ণ বসে। ওর রুমের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আমি হতবাক! থমথমে মুখ। জার্মান মুখ লাল হয়ে গেলে সে দেখতে অন্য রকম রূপ। 

খুব ধীরে রুমে পা রাখলাম। মুখটা তুললো আনিয়া। টেবিলের উল্টোদিকে চেয়ার টেনে বসলাম। আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই নীল চোখ দুটোর কোণ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি নেমে এলো। আমার বুকের ভেতর একটা খামচে ধরা অনুভব। চেয়ার ছেড়ে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধে হাত রাখলাম। এবার আনিয়া চোখে পানি নিয়েই মৃদু হাসলো। স্মিত হাসিটা ধরে রেখেই বললো, আমি তোমার কোটের পকেটে হাতটা রাখতে পারি? 

প্রতিউত্তরে মৃদু হাসছি। আমার কোটের ডান পকেটে বাম হাতের পাঞ্জাটা ঢুকিয়ে বলে উঠলো, বলতো তোমরা পুরুষরা কেনো এমন? 

কী জবাব দেবো আমি! উত্তরের অপেক্ষা না করেই খুব ধীর প্রবাহে যুক্ত করলো, জানো কবি, আমার মা, সিঙ্গেল। মানে আমার কোনো বাবা নেই। দেখিনি। দেখতেও চাই না আমি। আমাদের সমাজটা দুর্বল না। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে, আচ্ছা, কেমন ছিল দেখতে লোকটা?

তোমার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলে কোনোদিন?

নাহ। তা তো না। ইচ্ছে হয়নি জানতে। ... একটু চুপ থেকে আবার শুরু করলো, আসলে আমি তোমাদের দেশের সংস্কৃতিতে বোধ হয় মিশতে শুরু করেছি। আমার মাঝের শক্ত মেয়েটা নরম হয়ে যাচ্ছে। 

ঠিক কী বলবো আমি বুঝতে পারছি না। কোনো জবাবই তো আসলে জানা নেই আমার। তবুও জোর করে বাক্য জোগাড় করলাম, এবার বাড়ি গেলে মাকে কি জিজ্ঞেস করতে চাও?

আনিয়া হাসিটা একটু বিস্তৃত করে। শোনো, তুমি আমার মার সাথে দেখা করে এসো। এবার তুমি মার সাথে দেখা করলে আমি খুব খুশি হবো। 

কোন শহরে উনি থাকেন?

রাডোলজেলফ। একদম সুইজারল্যান্ড আর অস্ট্রিয়ার উল্টোদিকে জার্মানির শেষ প্রান্ত। লেক বোডেনজির পাড়ে। ছোট্ট শহর। 

বাহ, দারুণ তো জায়গাটা!

তুমি না সামনের সপ্তাহে জার্মানি যাচ্ছ। ওখান থেকে জুরিখ যাবে, বলেছ। 

হুম। আমি ভেবেছিলাম, জার্মানি থেকে আগে ফ্রান্সে যাবো। ওদিক থেকে এদিকে, মানে সুইজারল্যান্ড। 

না, না। তা কেনো! আগে তুমি মিউনিখ হয়ে স্টুটগার্ট দিয়ে সরে আসো লেক বোডেনজির দিকে। এদিক দিয়ে সুইজারল্যান্ডে ঢোকো। 

আমি তো এ পথটার খোঁজ জানি না। শুনেছি, আরেকটা রুট আছে জার্মানি থেকে সহজে সুইজারল্যান্ডে যাওয়া যায়। 

ও বাদ দাও। তোমাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। মাকেও বলে দিচ্ছি। তুমি আমার বাড়ি হয়ে জার্মানি যাবে। একটা রাত মার সাথে থাকো। আমার ঘরে থাকবে। 

জো হুকুম। 

একটা কথা, আমার ঘর বইতে ঠাসা। বইয়ের গন্ধের ভেতর ঘুমুতে তোমার খারাপ না লাগারই কথা। যদি খারাপ লাগে, ঘুম না হলে ফিরে এসে আমাকে তুমি বকতে পারবে না। বলেই হাসতে শুরু করলো। ওর হাসিতে আমার বুকের ভারটা নিচে নামছে। কিছু পরে একটু হালকা আমি। 

আমি যেতে রাজি হওয়ায় নানা পরিকল্পনা আমার কাছে ঠেসে-ঠুসে দিতে লাগলো। হঠাৎ হা-হা করে হাসতে শুরু করলো। আমি তার এমন হাসিতে যোগদান করবো কি-না, বুঝে ওঠার আগেই আনিয়া বলে বসলো, শোনো, শোনো। আসল ব্যাপারটা তো তোমাকে বলাই হলো না। এ বলেই আবারো হাসি। 

ওর এমন পাগল-পারা হাসিতে আমারো পেটে সুড়-সুড় করছে। কিন্তু অফিস বলে কথা। এই দিনদুপুরে ঠা-ঠা করে অফিসে যদি হাসতে থাকি তো, শোভনীয় নাও হতে পারে। যথেষ্ট কষ্টে প্রচণ্ড হাসির দমক চেপে জিজ্ঞেস করলাম, কী সেটা?

শোনো মুজতবা, আমার মার ইংরেজি কিন্তু ভয়ানক! আর তোমার জার্মানও তো সেই রকম। দু'জনে কথাবার্তা বলবে কী করে, সেটাই ভাবছি। পরস্পরকে বুঝবে কী করে- এ ভেবেই এখন আমার মাথা খারাপ! 

ও এই কথা! সে তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ঠিকই সামলে নেবো। 

পারবে তো?

পারা-পারির কী আছে আবার! বলেছি তো, সামলে নেবো। 


চার.

জার্মানির বড় বড় নগরীর অনেক পথ পাড়ি দিয়ে রাডোলজেলফ নামে ছোট্ট শহরের রেল স্টেশনে পৌঁছুলাম। স্টেশন থেকে নেমে লেক বোডেনজির তীরে দু'ঘণ্টা অপেক্ষা। মিসেস ফেরোনিকা হারটার বলে রেখেছিলেন ট্রেনের সময়ের সাথে উনার সময় মিলবে না। আমাকে অপেক্ষা করতে হবে ঘণ্টাদুয়েক। তাই সই। সময়টা লেক বোডেনজির তীরে কাটালাম। শীত আসবে জলদি। সাগরের পানিতে তখনো থেকে যাওয়া কিছু হাঁস। আর সাগরের পাড় ধরে এবং ছোট্ট শহরটায় গাছের পাতারা শত রঙে বর্ণিল। কী অপরূপ প্রকৃতি! এমন রূপ আর ঐশ্বর্য নিয়ে ওরাও গাইতে পারে আমাদের গান- এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি!

লেক বোডেনজি আসলে একটা ছোট্ট সাগরই। তীর থেকে দূর এক অস্পষ্ট ধোঁয়াশা রেখায় বামে অস্ট্রিয়া এবং ডানে সুইজারল্যান্ড। মাঝখানে সাগর। এমন এক জাদুকরী জায়গায় যথাসময়ে এলেন মিসেস ফেরোনিকা হারটার। এসেই ক্ষমা চাইবার এক প্রস্থ স্রোতে। 

তার গাঢ় নীল রঙের ছোট্ট গাড়িতে দু'জনেই ছুুটলাম বাসার দিকে। পথে উনি চেনাতে লাগলেন শহরের কোনটা কী? আমার আর গল্পে মন নেই। বাঙালি পেট চোঁ-চোঁ করছে। ভারি কিছু খাওয়া খুব দরকার। মনে সান্ত্বনা, বাসায় পৌঁছুলে নিশ্চয় খাবার পেটে পড়বে। 

দারুণ সাজানো ছোট্ট এক দোতলা বাড়ি। পাশাপাশি একই রকম অন্য বাড়িগুলো। প্রতিটা বাড়ি বেশ খানিকটা জায়গা করে দাঁড়ানো। নিচতলায় আমাকে আনিয়ার শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিলেন। উনি চলে গেলেন দোতলায়। তার রুমে। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে গা-হাত-পা ছেড়ে দিলাম বিছানায়। চোখ বন্ধ। মিনিট কিছু পরে চোখ মেলে ঘরটার চারদিকে চোখ বুলিয়ে আমি মুগ্ধ। এতো চমৎকারভাবে বই দিয়ে সাজানো! পড়তে চাইলেই হাতের কাছে নেয়া যাবে। অপূর্ব করে আলোর সমন্বয়। দেয়ালে কিছু ফ্রেমে করে ছবি। আনিয়ার নানা বয়সের, নানা বন্ধুর সাথে ছবি। একটা ছবি দেখে চমকে গেলাম। এ কী! এখানে আমি! একটা ফ্রেমে আনিয়া আর আমার এক সাথে বসে কফি খাবার ছবি। আনিয়া ওর মাকে দিয়ে আমার জন্যে সবটাই করে রেখেছে। এই দূর বিদেশেও আমি যেনো অনুভব করি, এটা আমার ঘর। ঘুমুই নিশ্চিন্তে, তেমন করেই আপন বানিয়ে রেখেছে। 

পাঁচ.

সেই আনিয়াই এলো না হাসপাতালে আমাকে দেখতে। ২০০৫ সালে আমি হাসপাতালের বিছানায় মরো মরো। গুলেন ব্যারি সিনড্রোমে আক্রান্ত। পা থেকে মাথা অসাড়। পঙ্গু আমি। নিথর শিথিল মাংশপিণ্ড আমি পড়ে আছি শমরিতা হাসপাতালের বিছানায়। সবাই আসে। কার নাম বলি? বলা ভালো, কে আসে না দেখতে? সবাই আসে। কিন্তু আনিয়া আসে না। আসেওনি। হাসপাতালের ঘরের ভেতর সূর্য ছাড়া আলোয় দিন কাটে। 

ক্রমান্বয়ে ভালো হয়ে উঠলাম। বাচ্চাদের মতো ওয়াকার নিয়ে হাঁটা-চলা পুনরায় শিখলাম। মাস চারেক পর লাঠি হাতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটি। ধীরে সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করি। আবার কর্মক্ষম হবো। বাঁচবো স্বাভাবিক এক জীবন। দীর্ঘ পাঁচ মাস পর অফিসে ফিরলাম। হাতে লাঠি। লাঠিতে ভর করে আছে আমার একদা চটপটে আচরণ। অফিসের গেটে পৌঁছুতেই গার্ড থেকে মালী, সাপোর্ট স্টাফ, সকলেই ছুটে এলো সাহায্য করতে। 

ভেতরে প্রবেশ করলাম। বাকি সবাই এলো। সকলেই হৈ চৈ করছে। একটা উল্লাস। কিন্তু আনিয়া নেই এদিকে। আমারও নিজের ভেতর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তবে মনে হচ্ছে, যে কোনো মুহূর্তে আনিয়ার সাথে দেখা হবে। আমার রুমে যাবার জন্যে করিডোর ধরে ধীর পায়ে এগোচ্ছি। এটা হলো পা গোনা হাঁটা। সামনেই আমার অফিস রুমের দরজা। ডানে আনিয়ার রুমের দরজা। পুরোটাই খোলা। ঠিক ওই বরাবর পৌঁছে ডানে মুখ ফেরালাম। দেখি, আনিয়া স্থির হয়ে চেয়ারে বসা। লাঠি হাতে দাঁড়ানো আমি। একটু হাঁটতেই হাঁফিয়ে পড়ি। ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে ও আমার কাছে এলো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরও কাছ এসে একেবারে হামলে দু'হাতে সাপটে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। 

শক্ত করে জাপটে ধরে আছে। আমার কাঁধে মুখ গুঁজে রেখেছে। ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মুজতবা, আমি তোমাকে এভাবে দেখতে পারছি না। এ দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারছি না। এটা মেনে নেয়া যায় না। 

আনিয়া যেনো পণ করেছে আমাকে ওর বন্ধন থেকে মুক্ত করবে না। ওর পিঠ চাপড়ে দিচ্ছি আমি। আমি ভালো আছি আনিয়া। একেবারেই ভালো। আবারও হাঁটতে পারি, কথাও বলতে পারি। এই তো দেখো না। হেঁটেই তো এলাম অফিসে। একদম মন খারাপ করো না তুমি।


আনিয়া আমাকে ছেড়ে সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তাকিয়েই আছে। নীল চোখ দুটো সরছে না আমার মুখের ওপর থেকে। কবি, একটা কথা। সেটা হলো, যখন তুমি হাসপাতালে ছিলে তখন আমার এখান থেকে ট্রান্সফার অর্ডার হয়ে গেছে। জানো, জার্মানি ফিরে যাচ্ছি। দম নিলো এবার। কবি, কাল সকালেই আমার ফ্লাইট। কাল সকালেই ঢাকা ছেড়ে চলে যাব।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০৯:৪৪/ ২২ এপ্রিল

প্রবন্ধ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে