Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (105 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৪-১৭-২০১৮

পয়লা বৈশাখে বাঙালি একাত্ম হয়

পয়লা বৈশাখে বাঙালি একাত্ম হয়

সন্জীদা খাতুন-পঁচাশি বছর পার হয়েও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি একাধারে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষক। ষাটের দশকে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র-শতবর্ষ উদযাপনের অগ্রগণ্য সৈনিক তিনি। রমনা বটমূলে বর্ষবরণ আয়োজনের পথিকৃৎ। ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, এখন সভাপতি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে পেয়েছেন রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ও দেশিকোত্তম পুরস্কার। এছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাঁকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি প্রদান করে। একান্ত আলাপচারিতায় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ নিয়ে বলেছেন এই সময়কে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দীপংকর গৌতম।

বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের যে বৈষম্য পয়লা বৈশাখ উদযাপন তার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ ছিল। সেই সময়ের প্রেক্ষাপট জানতে চাই।

পয়লা বৈশাখ ছিল আমাদের বাঙালিত্বের শপথ নেওয়ার দিন। পোশাক-আশাকে, আচার-আচরণে বাঙালিত্বের বলিষ্ঠ ঘোষণা হতো সেদিন। বাঙালির কবিতা বাঙালির সাহিত্য বাঙালির নৃত্যগীতে আমাদের অধিকার চিরন্তন এসব কথা বলতে, বুঝে নিতে, বুঝিয়ে দিতে বটমূলের প্রভাতী সমাবেশ। সাতষট্টির সেই পাকিস্তান আমলে বছরের প্রথম দিনের এ উপলব্ধি যে কত জরুরি ছিল তা তারাই মনে করতে পারবেন যারা বাঙালিত্ব ভোলানোর জন্য পাকিস্তানি নিগ্রহ প্রত্যক্ষ করেছেন। পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরুন, কলেজ শিক্ষকদের বেতন সে সময় কমই ছিল। তবু সাংবাদিকদের চেয়ে ঢের বেশি। তুলনা করে দেখা যায়, সরকারি মর্নিং নিউজের সাব-এডিটর যেখানে পেতেন ৮০ টাকা বেতন+৪০ টাকা সান ডে এলাউন্স, কনভেনস ছিল কুড়ি টাকা। কলেজ শিক্ষক যেখানে পেতেন ২৪৮ টাকা+৫০ টাকা ডিয়ারনেস অ্যালাউনস। যতদূর মনে পড়ে সাতান্ন সাল থেকে নিয়ে ষাট সালের পর পর্যন্ত সাংবাদিক ও কলেজ প্রভাষকদের বেতনের এই পার্থক্য বহাল ছিল। অবস্থা বদল হলো ক্রমে। খবরের কাগজের সব রকমের সংবাদ দেশের ভেতর চাউর করে দেয়। তাই সাংবাদিকদের হাতে রাখার পন্থা উদ্ভাবন হতে লাগল। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সস্তায় মোটর গাড়ি আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হলো তাদের। সরকারি জমি বরাদ্দের সুবিধা এলো। তারপর বেতনও বৃদ্ধি হলো। সে এমনই বৃদ্ধি যে শিক্ষকদের আসন এক ধাক্কায় সাংবাদিকদের চেয়ে কয়েক হাত নিচে নেমে গেল। সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজবোর্ড চালু হয়েছিল।

সাংবাদিকরা পশ্চিম পাকিস্তানে তো বটেই বিদেশেও ট্রেনিংয়ের সুবিধা পেতে লাগল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজন বোঝা গেছিল ক্রমে, যখন ‘উর্দু একমাত্র উর্দুই...’ ইত্যাদি ঘোষণা আমাদের আপন সংস্কৃতি থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র স্পষ্ট করে দিল। প্রিয় বাংলাভাষা আর বাঙালি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যের দিকে চোখ পড়লো তখন ভালো করে। মুসলমান হওয়া যেমন অসত্য নয়, বাঙালি হওয়াও নয় তেমনি অসত্য! কিন্তু শুধু মুসলমান হতে হবে আর বাঙালি সত্তাকে সম্পূর্ণ নিধন করে, আপন ভাষা ভুলে, তবেই হওয়া যাবে খাঁটি পাকিস্তানি। এ বিষয়গুলো শৈশব থেকেই এক ধরনের পীড়া দিয়ে আসছিল। অন্যদিকে মুসলমান বাঙালিতে বা পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বিরোধের কিছুমাত্র কারণ না থাকলেও কর্তাদের ইচ্ছায় কর্ম হলো, পাকিস্তানি আর বাঙালিতে বেধে গেল দ্বন্দ্ব ।

বাঙালির বৈশিষ্ট্যগুলো চিনে নিতে হলো বাঙালিকে। কয়েকটি বিষয় ঘিরে বাঙালি মানস পরস্পর সন্নিহিত হলো। প্রথমটি তার ভাষা। ভাষার জন্য ভালোবাসা। একুশ ফেব্রুয়ারির স্মারক শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে একত্র হলো বাঙালি। দ্বিতীয় বিষয় পয়লা বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ বাংলা নতুন বছরের উৎসব আয়োজনটি বাঙালিকে আর এক বিন্দুতে ঘনিষ্ঠ করল।

উৎসবের জন্য এ দিনটি কেন বেছে নিয়েছিলেন?
বৈশাখের প্রথম দিনের এই উৎসব বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানের সহায়ক হয়েছে। বহুকাল ধরে প্রচলিত গ্রামীণ বৈশাখী মেলা কি দোকানি পসারিদের হালখাতা অনুষ্ঠানের সঙ্গে নগরীর বর্ষবরণ এক রকম নয়, এটা অস্বাভাবিক ব্যাপার বা সমালোচনার বিষয় নয়। মনে রাখতে হবে এর প্রয়োজন আমাদের সংকট থেকে সঞ্জাত। এছাড়াও পয়লা বৈশাখ বিষয়টি নিয়ে একটা ভালো লাগাও আছে। এদিনে বাঙালি আন্তরিকভাবেই একে অপরের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। বাঙালি বলে বাঙালির সঙ্গে কোলাকুলি করে মেলাতেই এ অনুষ্ঠানের সার্থকতা।

ছায়ানট আন্দোলন গড়ে উঠার কথা শুনি?
বায়ান্ন সালে যখন ভাষা আন্দোলন হয়েছে, তখন তো মোটামুটি কাছাকাছি থেকেই জেনেছি। একুশ ফেব্রুয়ারি ক্লাসের পর বাড়ি চলে এসেছি। বিকেল বেলায় শুনলাম গুলি হয়েছে। আজাদ পত্রিকার সান্ধ্য সংখ্যা বেরিয়েছিল। সেটায় দেখলাম, মেয়েদের একটা সভা হবে ২২ ফেব্রুয়ারি কামরুন্নেসা স্কুলের গলিতে। টিকাটুলিতে। আমার মা আমাকে নিয়ে ভয় পেতেন। আমি যাচ্ছি শুনে তিনিও আমার সঙ্গে গেলেন। পথে সেনারা পা দাপিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। মা উল্টো দিকে দৌড় দিচ্ছেন। আবার এগিয়ে যাচ্ছি। সেই সভায় আমি জীবনের প্রথম বক্তৃতা করি। আমি বলি, একুশ আমাকে ভাষা দিয়েছে। আমার মা ভয় পেয়ে আমার সঙ্গে গেলেন, অথচ তিনিই হলেন সেই সভার সভাপতি। সেই সভায় অনেক নারীনেত্রী ছিলেন, কিন্তু রক্তপাতের আশঙ্কায় কেউই সভাপতি হতে রাজি হননি। সেই সময়েই আমরা সোনার বাংলা গাইতাম। আন্দোলনে গাইতে গাইতেই এটা আমাদের জাতীয় সংগীত হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে এই গান গেয়েছি আমরা।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকীর সঙ্গে তো ছায়ানট গঠনের একটা সম্পর্ক আছে?
১৯৬১ সালে আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ পালন করব বলে। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী চিঠি দিয়েছিলেন আমাকে যাওয়ার জন্য। জি সি দেবের বাড়িতে এই সভা হয়েছিল। তারপর সবাই মহড়া করছে। ডা. নন্দীর বাড়িতে রিহার্সেল হচ্ছে। আমি সেই রিহার্সেল দেখতাম। শ্যামার মহড়া দেখতাম। মাঝেমধ্যে বলতাম, এই জায়গাটা এ রকম না। শ্যামা যখন প্রেমেরভাবে গান গাইছে ‘নহে নহে এ নহে কৌতুক’ তখন যে মেয়েটি নাচছে, সে খুব বিষণ্নভাবে নাচছে। বললাম, না, এটা বিষণ্ন নয়। ও একটু ছলেরভাবে ঘুরে ঘুরে নাচছে। তো, বুঝেছিল তারা কথাটা। র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটে মোখলেসুর রহমান সিধু ভাইয়ের বাড়িতে যেতাম। সরকারি চাকরি করি, তাই ওয়াহিদুল হকের পিছনে পিছনে আমি থাকি। হঠাৎ একবার দেখা গেল, চিত্রাঙ্গদার গান গাওয়ার কেউ নেই। বাফা থেকে চিত্রাঙ্গদা হবে। দুদিনের নোটিশে গান তৈরি করে আমাকে গাইতে হলো। কোনো রকমে সে যাত্রা উত্তীর্ণ হলাম। এসব অনুষ্ঠানের পর সিধু ভাই বললেন, ‘চলো আমরা সবাই মিলে একটা সংগঠন গড়ি, না হলে হবে না।’ জয়দেবপুরে গিয়েছিলাম আমরা বনভোজনে। খাওয়াদাওয়া করলাম। সিধু ভাই বলে উঠলেন, আমি যেন এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক হই। বললাম, সিধু ভাই, আমি সরকারি চাকরি করি, আমি পারব না। সাধারণ সম্পাদক হলেন ফরিদা হাসান, সাইদুল হাসান সাহেবের স্ত্রী।

সংগঠনটা তখন কেমন ছিল?
ছায়ানটে প্রথমে শ্রোতার আসর হতো। প্রথম আসরে গাইলেন ফিরোজা বেগম। দ্বিতীয়টায় গাইল আমার বোন ফাহমিদা। এরপর বারীণ মজুমদার, ইলা মজুমদার। কখনো সেতার বাজালেন খাদেম হোসেন খান। এ রকম হয়েছে। এগুলো হওয়ার পর একসময় অনুভব করলাম, আর বিশেষ শিল্পী নেই, যাদের দিয়ে গান গাওয়াব। আমি কিন্তু কখনো গাইতাম না। অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা করতাম। ওয়াহিদুল হক বলে বসলেন, ‘আমরা একটা স্কুল করব।’ এ কথা সভায় পাস করানো কঠিন। হাতে তো নেই কানাকড়ি। চলে সিধু ভাইয়ের টাকায়। ওয়াহিদুল হক বললেন, ‘আমরা সবাই চাঁদা দেব।’ আস্তে আস্তে কে কত দেবেন, কথা হলো। প্রস্তাবটা পাস হয়ে গেল। এভাবে ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন হলো। সেই সংগীতবিদ্যায়তনে আমরা যে কেবল রবীন্দ্রসংগীতচর্চা করেছি, তা নয়। ততদিনে আমরা বুঝেছি, বাঙালি সংস্কৃতিটাই একটা বিপদের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানিরা আমাদের পাকিস্তানি মুসলমান বানাতে চায়, বাঙালি বলে স্বীকার করতে রাজি নয়। এটা বুঝতে পেরে আমরা আমাদের স্কুলে নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নানা রকম যন্ত্র, রাগসংগীত শুরু করলাম। স্বাধীনতার পরে শুরু করলাম পল্লিগীতি। গণসংগীতেরও চর্চা করতাম। শেখ লুৎফর রহমান আমাদের এখানে এসে অনেক গণসংগীত শিখিয়েছেন। একাত্তরের ২৫ মার্চের পর আমরা তো পালিয়ে ভারতে চলে গেলাম। ওখানে যাওয়ার পর আমরা কিন্তু লুৎফর ভাইয়ের শেখানো গান ‘জনতার সংগ্রাম’, ‘বিপ্লবের রক্তরাঙা’, ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’ এই গানগুলোর চর্চা করি। তারপর শিল্পী রফিকুল আলম, ওর বড় ভাই সারওয়ার জাহান এলো। তখন ওরাও গান করল। এমনি করেই পুরো দেশের রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতিকে মিলিয়ে একটা নতুন জিনিস দাঁড়াল। কলকাতায় আমরা একটা দল করেছিলাম। রূপান্তরের গান নামে একটা গীতিআলেখ্য হয়েছিল। লিখেছিল শাহরিয়ার কবীর। জহির রায়হান স্টপ জেনোসাইড নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সে আলেখ্য অনেক পরিবর্তন হয় পরে। রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান করি। আমাদের অনুষ্ঠানে এসে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র সবাই গেয়েছেন। এই করে আমরা কিছু টাকা তুলি। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যেখানেই গান গাইতাম, সে টাকা এনে কেন্দ্রীয়ভাবে জমা দিতাম।

প্রথমদিকের নববর্ষ উৎসব নিয়ে বলবেন?
রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সাল থেকে। তার চার বছর আগে মানে ১৯৬৩ সালে ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তন চালু হয়েছিল। প্রথম প্রথম পয়লা বৈশাখের মঞ্চে বিদ্যায়তনের উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের প্রায় সবাইকেই জায়গা দেওয়া চলতো। আর একক গানের জন্য শিল্পীদের সংগ্রহ করতে হতো বাইরে থেকে। কলিম শরাফী, বিলকিস নাসিরুদ্দিন, মালেকা আজিম খান, ফাহমিদা খাতুন, জাহানারা ইসলাম, মাহমুদা খাতুন, চৌধুরী আবদুর রহিম, পাকিস্তানের শেষদিকে আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সরকারের বিরাগ ভাজন আমলা শামসুর রহমানের পত্নী আফসারি খানমসহ আরো কতজন! তবে প্রথম যখন রমনা বটমূলে অনুষ্ঠান শুরু করি তখন বটমূলের গোড়ায় বাধানো একটু বেদীই ছিল সম্বল। পরে চৌকিজুড়ে খানিকটা বাড়িয়ে নেওয়া হতো। প্রথম দুবারের অনুষ্ঠানে গাছ থেকে শুঁয়ো পোকা ঝরে পড়েছে যত্রতত্র। গুরুজনদের ভয়ে শিক্ষার্থীরা বসে থেকেছে মাথা গুজে। দ্বিতীয়বার ছাত্রছাত্রীদের হাতে পোকা সরানোর জন্য এক একটা কাঠি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারো ঘাড়ে পোকা লেগে লাল চাকা বেধে গিয়েছিল।

পাকিস্তান পর্বে বাধা-বিপত্তি ছিল। বাংলাদেশ আমলে কখনো কোনো বাধার মুখে পড়েছেন?
অনেকবার। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর একবার আমাদের মঞ্চের পাশে উঠলো জগদ্দল চেহারার মঞ্চ। লোকজন জায়গাই পায় না। দুটো মঞ্চের পর আর কতটুকু জায়গা থাকে। তামাশা দেখার ভাব নিয়ে গাছের উপর উঠলো অনেক লোক। আমাদের মঞ্চের উপর ছুঁড়ে ফেললো মরা কাক। তার কিছুক্ষণ পর মোড়ের বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার বিচ্ছিন্ন করে দিলো কারা। মাইক্রোফোন বেকার হলো। জেনারেটর চালু করতে করতে সময় ব্যয় হলো, অনুষ্ঠানের বিশৃঙ্খলা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সেবার অনুষ্ঠান শেষে আলমগীর কবীর এসে বলেছিলেন, আপনি চালিয়ে যান... থামবেন না... আমরা আছি। আরেকবার বিকেল থেকে টেলিফোন আসতে শুরু হলো, যাবেন না, মঞ্চে যাবেন না, নিচে টাইম বম্ব রাখা আছে। সাবধান। তারপর মনে হলো পুলিশে খবর দেওয়া যাক। টাইম বোম আছে কি না তা চেক করে দেখার দায়িত্ব তো পুলিশের। ফোন করে হয়রান করে জানা গেল পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে শিশুদের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থাকবেন বলে পুলিশ ফোর্স সব সেখানে নিয়োজিত হয়েছে, আমাদের জন্য পুলিশের ব্যবস্থা করা যাবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় তাদের উপর বর্তাবে বলে ফোন রেখে দিলাম। ভোরে ছায়ানট সম্পাদকের সঙ্গে কথা হলো। এত ছেলে মেয়ের দায়িত্ব নেবে কে? তিনি নিষেধ করলেন ‘বটমূলে’ যেতে। কিন্তু মনকে মানাব কি করে! গুটি গুটি গিয়ে হাজির হলাম সকালে। মজার কথা সম্পাদক নিজে গেছেন সেখানে ঠিকই! ছেলেমেয়েদের ঘুণাক্ষরে কিছু না জানিয়ে মঞ্চে গিয়ে বসলাম। পুলিশ ছিল। তারা মঞ্চের তলাটা ভালো করে দেখেছে বললো। অনুষ্ঠান শেষে সম্পাদককে বললাম, দেখলেন তো ভয় না করে ভুল হয়নি।

সামরিক শাসনের মধ্যে অনুষ্ঠান করতে সমস্যা হয়নি?
যে বছর মঞ্চের তলায় বোমার কথা বললাম, তার পরের বছর মার্চের শেষে জারি হলো সামরিক আইন। নববর্ষ উৎসবের মহড়া চলছে। কিন্তু সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি পাওয়া যাবে কোত্থেকে! পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না কিছু। বিমান বাহিনীর প্রধান সুলতান মাহমুদ সাহেব আমার পূর্ব পরিচিত ছিল। তার পরিচিত এক ব্যক্তির সূত্রে জানা গেল যে, তিনি বলেছেন, এ অনুষ্ঠান না হওয়ার কি আছে, তিনি নিজে প্রতিবার রমনা বটমূলে আসেন! যাহোক, শেষ পর্যন্ত অনুমতি মিললো, সেই নববর্ষে অনেক রাজনৈতিক নেতা রমনায় উপস্থিত হয়েছিলেন। জমায়েত হওয়ার এমন সুযোগ পাওয়া যাবে কেউ ভাবতে পারেনি। পয়লা বৈশাখ অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা আমাদের কয়েকবার বিব্রত করেছে। এখন মনে হয় সবাই বুঝেছে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে সমবেত হওয়াটাই বড় কথা। এই দিন বাঙালিত্বের শপথ নেওয়াটাই জরুরি।

গান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গে জানতে চাই।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পালিয়ে যেতে হয়েছিল কলকাতায়। সেখানে গিয়ে আমরা ‘রূপান্তরের গান’ নামে একটি গীতি আলেখ্য তৈরি করেছিলাম। তাতে ‘সার্থক জনম আমার’ ছিল। ‘সোনার বাংলা’ তো ছিলই। আরো গান ছিল। ‘দেশে দেশে ভ্রমি তব দুখ গান গাহিয়ে, নগরে প্রান্তরে বনে বনে। অশ্রু ঝরে দু নয়নে, পাষাণ হƒদয় কাঁদে সে কাহিনি শুনিয়ে।’ কিংবা আরেকটা গান ছিল ‘ঢাকোরে মুখ চন্দ্রমা, জলদে।’ মানে চাঁদকে বলা হচ্ছে মুখ ঢেকে ফেলো, বড় লজ্জার দিন, বড় কষ্টের দিন, দুঃখের দিন। এই গানগুলোকে আমরা নতুন করে আবিষ্কার করে তখন গাইতাম এবং এই গান হতো মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে, শরণার্থীদের শিবিরে এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গাতে সাধারণ মানুষকে আমাদের বেদনার সাথে যুক্ত করার জন্য আমরা এই গানগুলো গাইতাম। কাজেই রবীন্দ্রসংগীত আমাদের আন্দোলনের মস্ত বড় একটা হাতিয়ার ছিল এবং এখনো আছে। এখনো আমরা বলি, রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের গান ছিল বড় উদ্দীপনা। এ বিষয়ে কী বলবেন?
বাফা রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা ভালোভাবেই চালিয়ে গেছে সেইসময়। এমনকি শান্তিনিকেতন থেকে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যের দল নিয়ে এসে তারা অনুষ্ঠান করেছে। কলকাতা থেকে দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সুপ্রীতি ঘোষদের নিয়ে এসে তারা অনুষ্ঠানে গান গাইছে। বাফার ভূমিকাটা তখন খুবই ভালো ছিল। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জš§শতবর্ষ উদযাপনের পরই গড়ে ওঠে সমমনা সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে ‘ছায়ানট’। ঢাকায় রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের আবাহনী অনুষ্ঠান শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তান আমলে এগুলো ছিল প্রতিবাদেরই প্রকাশ। এই প্রতিবাদের শরিক হয় ছোটবড় আরো সাংস্কৃতিক সংগঠন। সোনার বাংলা গাওয়া হয়েছে মিছিলে। অনুষ্ঠান হলে সেখানে ‘সার্থক জনম আমার’ গাওয়া হয়েছে। একটি গান আমরা আবিষ্কার করেছিলাম। ‘কে এসে যায় ফিরে ফিরে আকুল নয়ননীরে। কে বৃথা আশা ভরে চাহিছে মুখ পরে, সে যে আমার জননীরে।’ তার পরের কথাগুলো ইম্পর্টেন্ট। ‘কাহার সুধাময়ী বাণী মিলায় অনাদর মানি। কাহার ভাষা হায় ভুলিতে সবে চায়, সে যে আমার জননীরে।’ এই যে গানটা, এটা রবীন্দ্রনাথ বহু আগে বাংলায় যে বক্তৃতা হতো না তা নিয়ে দুঃখ করে গানটা লিখেছিলেন। আর আমরা ভাষা আন্দোলনের পরে এই গানটা নতুন করে আবিষ্কার করলাম। এই গান আমরা তখন গাইতাম। তাছাড়াও পাকিস্তান আমলে আমরা যেটা করেছি, যখনই কোনো একটা বিরূপ ব্যাপার হতো তখনই আমরা রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে আমাদের মনের ব্যথাটা প্রকাশ করতাম। যারা দর্শক হয়ে আসতেন তারা কিন্তু বুঝতে পারতেন।

একটা অনুষ্ঠানে আমরা গেয়েছিলাম ‘কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো! বিরহানলে জ্বালোরে তারে জ্বালো। অন্ধকারের মধ্যে গানটা শুরু করা হয়েছিল এবং সেটা বিশেষভাবে মানুষের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাছাড়া একবার পাকিস্তান আমলে, আইউবের আমলে চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের গ্রামে শিশু-নারী নির্বিশেষে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। সেই সময় বৌদ্ধরা কয়েকজন আমাদের কাছে এসেছিলেন। বললেন, আমরা কিছু তো করতে পারছি না, কিছু বলতে পারছি না। আমরা রবীন্দ্রসংগীতের একটা অনুষ্ঠান করতে চাই। ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’, বুদ্ধকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান আছে, সেই গানগুলো সেসময় তারা আমাদের কাছে দেখে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছিলেন। এটাও আন্দোলনই হলো।’ মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নানা উদ্দীপক গানের সঙ্গে প্রচারিত হয় রবীন্দ্রনাথের গান।

আপা, আপনাকে ধন্যবাদ।
তোমাকেও ধন্যবাদ।

আর/১৭:১৪/১৭ এপ্রিল

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে