Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (105 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-১৭-২০১৮

আমরা বেঁচে ছিলাম তাঁর সময়ে

আহমাদ মোস্তফা কামাল


আমরা বেঁচে ছিলাম তাঁর সময়ে

স্টিফেন হকিং চলে গেলেন। আমাদের কালের সবচেয়ে প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের একজন, মাত্র একুশ বছর বয়সেই যিনি জেনেছিলেন- তাঁর দিন ফুরিয়ে আসছে দ্রুত, আর মাত্র দু-বছর বাঁচবেন তিনি! চিকিৎসকরাই তাঁর এই আয়ুস্কাল অনুমান করেছিলেন। না, চিকিৎসকদের ভুল ছিল না, কারণ হকিং আক্রান্ত হয়েছিলেন এক আরোগ্যাতীত রোগে, মোটর নিউরন রোগ, যার পোশাকি নাম ধসুড়ঃৎড়ঢ়যরপ ষধঃবৎধষ ংপষবৎড়ংরং (অখঝ). এই রোগটি অতিদ্রুত মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। রোগ এবং সম্ভ্যাব্য আয়ুর কথা যখন শোনেন হকিং তখন তিনি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, স্নাতক হননি তখনও। মেধাবী ছাত্র বটে, তবে ততটা মনোযোগীও নন। দেখা গেল, তাঁর ফলাফল আছে প্রথম শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শ্রেণির বর্ডার লাইনে, যে কোনোটিই পেতে পারেন তিনি। চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষায় তিনি শিক্ষকদের বললেন, 'যদি তাঁরা প্রথম শ্রেণি পাওয়ার মতো মার্কস দেন' তাহলে তিনি কেমব্রিজে পিএইচডিতে ভর্তি হবেন, দ্বিতীয় শ্রেণি পেলে সেই চেষ্টাই করবেন না। শিক্ষকরা তাঁকে প্রথম শ্রেণিই দিলেন, যদিও যাকে বলে টেনে-টুনে প্রথম শ্রেণি! ১৯৬২ সালের কথা সেটি। ততদিনে তাঁর শরীর ধীরে ধীরে অসাড় হতে শুরু করেছে। গল্পটা বললাম এ কারণে যে, যখন আপনি জানবেন- আপনার আয়ু আছে আর মাত্র দু-বছর, তখন নিশ্চয়ই স্নাতক হওয়ার কথা ভাববেন না আর, প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণি তো দূরে থাক। পিএইচডির কথা ভাবা তো নিতান্তই অবান্তর। কিন্তু হকিং এর সবই ভাবলেন। যেন, মৃত্যুকে পাত্তাই দিচ্ছেন না তিনি, যেন ওসব কিছু তাঁর জীবনে নয়, ঘটছে-ঘটবে অন্য কারও জীবনে! অনেক পরে এই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, 'যদিও আমার ভবিষ্যতের ওপর একটা কালো মেঘের ছায়া ঝুলছিল, তবু অবাক হয়ে আবিস্কার করলাম, আমি যেন আগের চেয়ে আরও চমৎকারভাবে জীবনকে উপভোগ করছি। আমি আমার গবেষণা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলাম। আমার গন্তব্য ছিল বেশ সহজ- এই জগৎটা যেভাবে আছে তা এমন কেন, কেনই বা জগৎটা অস্তিত্বশীল হয়েছে, সেটা সম্বন্ধে একটা পরিপূর্ণ বোঝাপড়া করা।' 

আমরা সবাই মৃত্যুর ছায়ায় বাস করি, কখন যে কে ঝরে পড়বে তার কোনোই নিশ্চয়তা নেই। তবু যে জীবনের নানা স্বাদ-গন্ধ-রূপ-রস উপভোগ করি, তার কারণ মৃত্যুকে আমরা ভুলে থাকি। কিন্তু ওরকম জটিল কোনো রোগ যদি হয়েই যায় কারও, একটু দূরেই দেখা যায় মৃত্যুর কালো ছায়া, তাহলে কি ওভাবে উপভোগ করা যায়? আমরা পারব না, কিন্তু হকিং যে কীভাবে পেরেছিলেন সেই বিস্ময় কখনও আমাদের কাটে না। গবেষণাই করেননি শুধু, প্রেম করেছেন, বিয়ে করেছেন, তিনটি সন্তানের জনকও হয়েছেন!

প্রকৃতি নিজেকে নানাভাবে প্রকাশ করেছে, রূপে-রসে-গন্ধে-স্বাদে নিজেকে সাজিয়েছে। কিন্তু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেকে ব্যাখ্যা করেনি বলে সে আমাদের কাছে চির রহস্যময়ই রয়ে যায়। প্রকৃতির সেই রহস্য উন্মোচনের জন্য, তার অব্যাখ্যাত নিয়ম-নীতি-ইচ্ছাকে ব্যাখ্যা করার জন্য প্রকৃতিই জন্ম দেয় বিজ্ঞানী, শিল্পী আর সাহিত্যিকদের। তাদের ভাষা আলাদা, ভঙ্গি আলাদা, বোঝাপড়ার ধরন আলাদা, প্রকাশের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু সবার চূড়ান্ত লক্ষ্য একটাই- জগৎ ও জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং সেটিকে অন্য মানুষের কাছে প্রকাশ করা। এই মানুষগুলো প্রকৃতির বিশেষ সন্তান। কিন্তু হকিং যেন বিশেষজ্ঞদেরও বিশেষ। নইলে এত বিস্ময়কর প্রতিভা যাঁর, তাঁর সমস্ত শরীর কেন অসাড় হয়ে যাবে অতি অল্প বয়সেই, কেন তিনি হারাবেন 'স্বাভাবিক' জীবন-যাপনের অধিকার? প্রকৃতির এ কেমন খেলা? হকিং খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছিলেন নিজের এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বাস্তবতাকে। আর জগৎকে বোঝার জন্য, ব্যাখ্যার জন্য বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞানের ভাষাকে।

স্নাতক ডিগ্রি পাওয়ার পর তিনি পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য গেলেন কেমব্রিজে, তখনকার দিনের মহাকাশ বিজ্ঞানের সুবিখ্যাত পি ত ফ্রেড হয়েলের কাছে গবেষণা করার ইচ্ছা নিয়ে। কিন্তু হয়েল তাঁকে ছাত্র হিসেবে নিতে পারলেন না। ভেঙে পড়তে পারতেন তিনি। কিন্তু এ যে হকিং, অমোঘ মৃত্যুর সম্ভাবনাই যাঁকে দমাতে পারেনি, এটুকুতেই তিনি ফিরবেন কেন? গবেষণা শুরু করলেন উবহহরং ঝপরধসধ নামক এক অধ্যাপকের সঙ্গে, যদি তাঁকে আদৌ চিনতেন না হকিং। পরে অবশ্য তিনি আবিস্কার করেছিলেন, ঝপরধসধ-এর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটা ছিল তাঁর জন্য সৌভাগ্যের। কারণ এই অধ্যাপক ততটা 'বিখ্যাত' না হলেও ছিলেন দারুণ সহযোগিতাপ্রবণ এবং নিজ ক্ষেত্রে এক প্রাজ্ঞ পি ত। তখন পর্যন্ত মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে যত কাজ হয়েছে, কোনো কিছুই তাঁর অজানা ছিল না। তো, হকিং যখন তাঁর পিএইচডি গবেষণার দ্বিতীয় বর্ষে, তখনই তিনি প্রথমবারের মতো এক নতুন ধারণার উদ্ভব ঘটান। সেই ধারণার নাম 'সিঙ্গুলারিটি' বা 'অনন্যতা'। এটা এমন এক গাণিতিক ধারণা যেখানে ঘনত্ব এবং স্থান-কালের বক্রতাকে অসীম বলে ধরে নিতে হয়। পরবর্তীকালে এই ধারণাটিই ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কৃষ্ণগহ্বর হলো কোনো ভারী নক্ষত্রের চূড়ান্ত দশা, এর জ্বালানি শেষ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার পরের দশা, যেখান থেকে কোনো বস্তু তো নয়ই এমনকি আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। তো, এই ধারণাটি নিয়ে নানাদিক থেকে বিতর্ক শুরু হয়, সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলাপে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না এই স্বল্প পরিসরের লেখায়। কিন্তু যেটা বলা যায় তা হলো, ১৯৭০ সালে কৃষ্ণগহ্বরের এই গাণিতিক মডেলটিকে তিনি এবং তাঁর বন্ধু রজার পেনরোজ ব্যবহার করেন মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনে এবং দেখান যে, সৃষ্টির শুরুতে যখন কিছুই ছিল না, তখনও ছিল এমনই একটি সিঙ্গুলারিটি যার ঘনত্ব এবং তাপমাত্রা ছিল অসীম এবং বিন্দুসম সেই রহস্যময় সিঙ্গুলারিটির মহাবিস্টেম্ফারণের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে এই মহাবিশ্ব। এই বিগ ব্যাং তত্ত্বের পরই মহাবিশ্ব সৃজনের ধারণা এক নতুন মোড়ে উপস্থিত হলো, শুরু হলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, আদি অবস্থা থেকে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হওয়ার নানা পর্যায় বিভাজন। হকিং সেখানেই থেমে যাননি। যেহেতু তাঁর তত্ত্বগুলো ছিল নতুন, বিতর্ক তাই লেগেই থাকত, তিনিও নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া সেরে নিতেন, আরও গভীরতর কোনো ব্যাখ্যা হাজির করার চেষ্টায় ব্রতী হতেন। তেমনই একটির নাম হকিং রেডিয়েশন। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর থেকে কোনো কিছুই বের হয়ে আসতে পারে না, সব তথ্যই চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়- এই ছিল তাঁর প্রাথমিক প্রস্তাবনা। পরবর্তীকালে কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগ করে তিনি দেখান- বিশেষ অবস্থায় ব্ল্যাকহোল থেকেও এক ধরনের শক্তির বিকিরণ হবে, সেটির নামই দেওয়া হয়েছে হকিং বিকিরণ বা হকিং রেডিয়েশন। বলা প্রয়োজন, মহাকাশ বিজ্ঞানের এসব তাত্ত্বিক আলোচনায়, নাক্ষত্রিক বিবর্তনের তত্ত্ব বিনির্মাণে তিনি সহায়তা নিয়েছিলেন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের। আবার সেগুলোর আরও গভীর ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য সহায়তা নিয়েছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের। এ এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। কারণ সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব কাজ করে স্থান-কাল, মহাকর্ষ, গ্রহ-নক্ষত্রের উপস্থিতির ফলে স্থান-কালের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন ইত্যাদি সব বড় বড় ব্যাপার নিয়ে, আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব হলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগৎ, অণু-পরমাণুর জগতের ব্যাপার-স্যাপার। এই দুটো বিপরীত মেরুর তত্ত্বকে এক বিন্দুতে মেলানোর চেষ্টাই তো এক বিরাট ঘটনা। 

যাহোক, এই যে কাজগুলো করছিলেন তিনি, বিরামহীনভাবে, সবই কিন্তু ওই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তাঁর শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গই অসাড় হয়ে পড়তে থাকে ধীরে ধীরে। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয় যে, একটি মাত্র আঙুল ছাড়া আর কোনো কিছুই নাড়তে পারতেন না তিনি। ১৯৮৫ সালে তিনি একবার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতটাই যে, চিকিৎকরা সব আশা ছেড়ে দিয়ে লাইফ-সাপোর্ট মেশিন খুলে নেওয়ার জন্য পরিবারের অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু অনুমতি না দিয়ে একটা জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য অনুরোধ করেন তাঁর স্ত্রী। সেই অপারেশনে তাঁর জীবন বাঁচে ঠিকই, কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বরটি হারিয়ে ফেলেন হকিং। সদা ক্রিয়াশীল তীক্ষষ্ট মস্তিস্ক আর ওই একটি মাত্র আঙুল- এই ছিল তাঁর সম্বল। 

এই দিয়েই তিনি হয়েছে উঠেছিলেন তাঁর কালের সবচেয়ে 'সেলিব্রিটি' বিজ্ঞানী। আর সেলিব্রিটি হওয়ার জন্য সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা পালন করেছিল তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বই 'আ ব্রিফ হিস্টোরি অফ টাইম'। ১৯৮৮ সালে এটি প্রকাশিত হওয়ার পর অর্ধশতাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বিক্রি হয়েছে আড়াই কোটি কপিরও বেশি, নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের তালিকায় এক নাগাড়ে ২৩৭ সপ্তাহ ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল বইটি। বিস্ময়কর নয়? তিনি আমাদের জানাতে চেয়েছিলেন সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, আবিস্কার করেছিলেন এক গ্র্যান্ড ডিজাইজেন, রচনা করেছিলেন 'দি গ্র্যান্ড ডিজাইন' বা 'দি থিয়োরি অফ এভরিথিং'-এর মতো দারুণ সব বই। ব্যাখ্যা করেছিলেন মহাবিশ্বের অপার রহস্যের অনেক কিছুর, উত্তর খুঁজেছিলেন অনেক উত্তরহীন প্রশ্নের। যেদিন থেকে তাঁর কথা জেনেছি, শুধু শ্রদ্ধা নয়, অদ্ভুত এক মায়া অনুভব করেছি তাঁর জন্য।

তাঁকে দেখা হলো না, তবু তাঁর সময়ে এই অপূর্ব মহাবিশ্বে আমরাও যে বেঁচে ছিলাম, এ যেন প্রকৃতির তরফ থেকে আমাদের জন্য এক দারুণ উপহার- এই কথা ভেবে সান্ত্বনা পাবো আমি বাকিটা জীবন। 

প্রিয় স্টিফেন হকিং, আপনার বিদায়কালে এই দূর দেশ থেকে গভীর ভালোবাসা জানাই, আপনার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আপনি আমাদের প্রণতি গ্রহণ করুন।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ১০:২২/ ১৭ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে