Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.1/5 (112 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-১২-২০১৮

কারা থাকবে বাংলাদেশে?

তসলিমা নাসরিন


কারা থাকবে বাংলাদেশে?

মুক্তচিন্তায়,মানবাধিকারে, নাস্তিক্যবাদে, নারীবাদে যারা বিশ্বাস করতেন, তাদের অনেককে কুপিয়ে মারা হয়েছে। যাদের ধর্মে নয়, ছিল বিজ্ঞানে বিশ্বাস, তারা সদলবলে সপরিবার দেশ ছেড়েছেন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো জনপ্রিয় লেখক, যিনি নিজেকে নাস্তিক বলে কোনোদিন দাবি করেননি, নাস্তিকদের পক্ষে কোনোদিন কোনও আন্দোলনেও যোগ দেননি—তাকেও কুপিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল এখনও দেশ ছাড়েননি। কিন্তু মানুষ জানে, দেশ তার জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। দেশে থাকলে তিনি আবারও আক্রান্ত হবেন। প্রথমবার প্রাণে বেঁচেছেন বলে দ্বিতীয়বার বেঁচে যাবেন—নাও হতে পারে।

দেশ নিরাপদ নয়। মুক্তচিন্তকদের জন্য নিরাপদ নয়, প্রগতিশীলদের জন্য নিরাপদ নয়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ নয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপদ নয়। নিরাপদ নয় নারীর জন্য। জন্মের পর থেকে মৃত্যু অবধি কোনও মেয়ে-শিশু, কিশোরী, তরুণী, মহিলা, রমণী, বৃদ্ধা নিরাপদ নয়। ৮ বছরের শিশু যেমন ধর্ষিতা হয়, ৮০ বছরের বৃদ্ধাও তেমন ধর্ষিতা হয়।

এমন নারীবিরোধী একটি দেশে মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার তো হবেই। কিন্তু দেশের কোথায় সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করে তারা? এর উত্তর নিশ্চয়ই এটি,যেখানে সরকার বা সরকারি দলের লোক আছে। ওই লোকেরা দেশের যেন কোনো রকম বদনাম না হয়, তাদের বিরুদ্ধে যেন কেউ কটু কথা উচ্চারণ করতে না পারে, তার চেষ্টা করে। কিন্তু উলটো হচ্ছে অবস্থা, মেয়েদের হেনস্থা করছে সরকারি দলেই লোকেরাই। সরকারি দল আওয়ামী লীগের মিছিল হয়েছে গত ৭ মার্চে। সেই মিছিলের ছেলেরা মিছিলের ভেতরের এবং বাইরের অনেকে মেয়েকে যৌন হেনস্থা করেছে। এক মেয়ে লিখেছে, ‘জয় বাংলা বলে যারা মেয়ে মলেস্ট করে, তাদের দেশে আমি থাকবো না। থাকবো না। থাকবো না।’ এরা যদি দেশে থাকতে চায়, তবে থাকবে কারা দেশে? ধর্ষক, যৌন নির্যাতক, খুনি, লুটেরা, গুণ্ডা, বদমাশ, হিপোক্রেট, ঠগ আর নারীবিদ্বেষী মৌলবাদীরা? মেয়েটি লিখেছে সেদিন শান্তিনগর মোড়ে একঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনও বাস পায়নি সে। হেঁটে গিয়েছে বাংলামটরে। ওখানে মিছিলের মধ্যে পড়েছে। মিছিলের প্রায় ১৫-২০ জন তাকে ঘিরে ধরেছে। যৌন নির্যাতন করেছে। কলেজ ইউনিফর্মের বোতাম ছিঁড়ে ফেলেছে, ওড়না খুলে ফেলেছে। চড়থাপ্পড় দিয়েছে। মেয়ে লিখেছে, ‘ওরা আমার শরীরে হাত দিয়েছে। আমার দুটো হাত এতগুলো হাত থেকে নিজের শরীরটাকে বাঁচাতে পারেনি।’ কী ভয়ঙ্কর অসহায়তা মেয়েটির কণ্ঠে! দিনের আলোয় এই ঘটনা ঘটেছে, ঘটেছে শহরের মধ্যেখানে, মানুষের চোখের সামনে। মানুষ মেয়েটিকে হায়েনাদের হাত থেকে উদ্ধার করার বদলে ভিডিও করেছে ‘মজাদার’ দৃশ্যের।

যেন ৭ মার্চের মিছিল শুধু পুরুষের উৎসব, মেয়েরা যারা যোগ দিয়েছে মিছিলে, তারা কেউ যেহেতু পুরুষ নয়, সেহেতু তারা মানুষ নয়। তারা সত্যিকার অর্থে ৭ মার্চের উৎসবের জন্য উপযুক্ত নয়। তাদের দ্বারা একটি কাজই সম্ভব, পুরুষের মনোরঞ্জন। মেয়েদের মুখ, বুক, নিতম্ব দেখলে পুরুষেরা উত্তেজিত হয়, পুরুষের হাত চলে যায় ওসব স্পর্শ করতে, ওসব খামচাতে। হাজারো পুরুষের ভিড়ে যে মেয়েরা ঢুকে যায় মিছিলে সামিল হওয়ার জন্য, পুরুষের বিশ্বাস তারা কিছু মনে করবে না, যদি পরনের কাপড় চোপড় টেনে টেনে টুকরো করা যায়। মেয়েরা আবার রাজনীতি কী বোঝে, মেয়েরা আবার ৭ মার্চের কী বোঝে। মেয়েরা তো শুধু সঙ্গমের জন্য, ধর্ষণের জন্য, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য, ঘর সংসারের কাজকর্ম করার জন্য। হ্যাঁ, এই বিশ্বাস, রাস্তার যেকোনও অশিক্ষিত বখাটের, এই বিশ্বাস সরকারি দলের ভদ্রলোকদেরও।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো নারী। না, তিনি নারী নন। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। শেখ হাসিনা যদি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা না হয়ে একা সাধারণ নারী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতেন, হয়তো তিনি বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির মাঠে আদৌ টিকে থাকতে পারতেন না। খালেদাকে মানুষ যেমন জিয়ার স্ত্রী হিসেবে দেখেছেন, রওশনকে যেমন এরশাদের স্ত্রী হিসেবে দেখা হয়, তেমনই হাসিনাকেও দেখা হয় বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে। পুরুষের পরিচয় ছাড়া আজও নারীর কোনও সতন্ত্র পরিচয় নেই। উচ্চপদে যে নারীরা বসে আছেন,তাদের পুরুষতান্ত্রিক হতেই হয়, না হলে টিকে থাকা অসম্ভব। আপস তাদের করতেই হয় পুরুষতান্ত্রিকতার সঙ্গে। যে মেয়েরা হেনস্থা হয়েছে, তারা কেউ সরকারের কাছে সরকারি দলের লোকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি, কারণ তারা জানে পুরুষতান্ত্রিক মসনদে বসা পুরুষতান্ত্রিক শাসকেরা এতে মোটেও বিচলিত হবেন না

বিচারের কোনও ব্যবস্থা করবেন না। সে কারণেই ফেসবুকে হাতেগোনা কজন মেয়ে তাদের বন্ধুদের জানিয়েছে কী ঘটেছে ৭ মার্চের মিছিলে।  যারা ফেসবুকে জানিয়েছে ঘটনা, তারা, বলাই বাহুল্য, খুব সাহসী। আর বাকিরা যারা যৌন নির্যাতন সয়েছে, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলেনি এমনকী ফেসবুকেও জানায়নি, তাদের সংখ্যাই বেশি। তারাও হয়তো মনে মনে বলেছে, এই দেশে থাকবো না, থাকবো না, থাকবো না।

এই দেশে তবে থাকবে কারা? গুণ্ডা, ধর্ষক, যৌন নির্যাতনকারীরা? বাকিরা বিদেয় নেবে। এরকম গণতন্ত্রই কি বাংলাদেশের জন্য দরকার? ভিন্ন ভিন্ন মত যে দেশ বিশ্বাস করে না, সেই দেশ একটা বড় সংকটের মধ্যে পড়ে আছে। যে দেশে নারীকে ঘৃণ্য বস্তু হিসেবে দেখা হয়, নারীকে যা ইচ্ছে তাই করার এমনকী মেরে ফেলারও অধিকার পুরুষের আছে বলে মনে করা হয়, সেই দেশ আসলে সত্যিকার অর্থে কোনও দেশ নয়, সেই দেশের গণতন্ত্র সত্যিকার কোনও গণতন্ত্র নয়।

বাংলাদেশ নামক দেশটি একটি নকল গণতন্ত্রের দেশ। মেয়েরা বাইরে বেরোতে গেলে হিজাব পরতে বাধ্য হয়, কারণ হিজাব তাদের নিরাপত্তা দেবে বলে মনে করা হয়। যে দেশে মেয়েরা নিজের পার্টির মিছিলেও নিজের পার্টির পুরুষ দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, যে দেশে মেয়েদের রাতে বা দিনে, ভিড়ে বা একলা রাস্তায় চলাফেরা করা নিরাপদ নয়, যে দেশে মেয়েরা পুরুষের ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কারণ ঘরে বাইরে তারা হামেশাই পুরুষ দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, যে দেশে মেয়েদের ভয়, খুব সাবধানে না থাকলে তারা নির্যাতিত হবে আরও, সে দেশকে দেশ বলা ঠিক নয়। গণতন্ত্র তো একেবারেই নয়।

পৃথিবীর কোথাও রাজতন্ত্র চলে, কোথাও গণতন্ত্র। বাংলাদেশে চলে পুরুষতন্ত্র। নারী নেত্রীরা পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। পুরুষের মতো নির্বাচনে জেতার জন্য যা করা দরকার তারা তাই করেন। পুরুষের মতোই মেয়েদের সংগ্রামকে তারা সংগ্রাম বলেই মনে করেন না। মেয়েরা যে নির্যাতিত হয়েছে ৭ মার্চের মিছিলে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেন এক সরকারি সচিব।

যে পুরুষেরা অবলীলায় নারী নির্যাতন করেছে, এরাই একদিন দেশের মন্ত্রী হবে। এরাই দেশের ভবিষ্যত। দেশের ভবিষ্যৎকে শাস্তি দেবেন, এত ক্ষমতা কি আর সরকারের আছে?

আমি হতাশায় ভুগতে চাই না। চাই আশার আলো ফুটে উঠুক দেশময়। শেখ হাসিনা যদি তার দলের নারী নির্যাতনকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন, তাহলে অন্তত মানুষ বুঝবে এই দেশে নারীর বিরুদ্ধে অন্যায়টাও অন্যায়। নারীর জীবন ধর্ষিতা হয়ে খুন হয়ে রাস্তায় বা ঝোপঝাড়ে পড়ে থাকার জন্য নয়। নারীর জীবন সভায় মিছিলে অপদস্থ হওয়ার জন্য নয়। নারীর জীবনের মূল্য পুরুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে এক ফোঁটা কম নয়।

লেখক: কলামিস্ট

এমএ/ ১১:০০/ ১২ মার্চ

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে