Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (167 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৩-১২-২০১৮

ভেঙে পড়লে হবে না, দাঁড়িয়ে থাকতে হবে

পার্থ সারথি দাস


ভেঙে পড়লে হবে না, দাঁড়িয়ে থাকতে হবে

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলায় আক্রান্ত স্বনামধন্য লেখক, শিক্ষাবিদ ড মুহম্মদ জাফর ইকবাল হাসপাতালে যাবার পথে একমাত্র মেয়ে ইয়েশিম ইকবালকে ফোন করে বলেছিলেন 'প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে। কিন্তু আমি ঠিক আছি।' আক্রান্ত হওয়ার পরও বাবার ভেঙে না পড়া ইয়েশিমকে প্রভাবিত করে দারুণভাবে। ইয়েশিম মনে করেন, দেশে হামলার ঘটনাগুলো যাতে আর না ঘটে তার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দরকার।

এজন্য ভেঙে পড়লে হবে না, দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। গত বৃহস্পতিবার সকালে কালের কণ্ঠের সঙ্গে একান্তে আলাপকালে ইয়েশিম তার বাবার অবস্থা, হাসপাতালে তাদের আলাপ, হামলার ঘটনা, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বেড়ে উঠাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। নিউনিয়র্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিটা শেষ করেই মন দিয়ে বড়দের জন্য গল্পের বই লিখবেন। মনোবিজ্ঞানের পড়াশোনায় মনোযোগী ইয়েশিম ঢাকায় গড়েছেন কান পেতে রই-নামের স্বেচ্ছসেবী সংস্থা। এখান থেকে হতাশাগ্রস্তরা পান জীবনে বেঁচে থাকার বিপুল উৎসাহ।   

গত ৩ মার্চ হামলার পর বাবা তাকে ফোন করেছিলেন। ইয়েশিম সময় নষ্ট না করেই বলেন, এটা আমি জানতে পেরেছি ঘটনা ঘটার পর ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে। ইনফেক্ট, আব্বু আমাকে নিজেই ফোন করেছে। আব্বুর ওপর আক্রমন হলো, যারা ওখানে ছিলেন তাকে গাড়িতে উঠিয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। সেই গাড়িতে থাকতে থাকতেই আব্বু প্রথমে মাকে ফোন করলেন। মাকে না পেয়ে আমাকে ফোন দিলেন। আব্বু বললেন, আমার ওপর অ্যাটাক করা হয়েছে। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে। কিন্তু আমি ঠিক আছি। খবর এখনই টিভিতে চলে আসবে। দেখে ভয় পেয়ো না। ফ্যামিলির সবাইকে বলে দাও আমি ঠিক আছি।

ওই মুহূর্তের বিবরণ তুলে ধরে ইয়েশিম বলেন, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা কেউ ভেঙে পড়িনি, কান্নাকাটি করিনি। কারণ আমরা তো আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। আমার সঙ্গে আব্বুর কথা হওয়ার পর আম্মুকে ফোন করলাম। আম্মুকে বললাম, আব্বুর সঙ্গে কথা বলো। আম্মু তখন আব্বুর সঙ্গে কথা বলেছে। মা আর আমি দুইজনই কিন্তু আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি- তখন এটাই ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে কয়েক ঘণ্টা কনফিউজড ছিলাম।

ইয়েশিম বলেন, আমরা তো ঢাকায় ছিলাম। তখন অনেকেই ফোন করছে মাকে ও আমাকে। সিলেট যাবার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরে জানতে পারলাম, আব্বুকে ঢাকায় আনা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সামরিক হেলিকপ্টারে আব্বুকে সিএমএইচে আনা হবে। সে রাতে ঢাকার সিএমএইচে চলে গেলাম। সিলেট থেকে ঢাকায় আনতে আনতে অনেক রাত হয়ে গেল। ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার সিলেটে গেল, আবার ঢাকায় আসলো। আমরা সিএমএইচে। হেলিকপ্টারে আনার পর আব্বুকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে আসা হলো। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর সময় আব্বাকে দেখি।

তখন কি তিনি কথা বলতে পারছিলেন-জানতে চাইলে ইয়েশিম বলেন, তিনি কথা বলতে পারছিলেন। আব্বু বলছিলেন, আমি ফাইন, চিন্তার কিছু নেই। তবে অনেক ব্যান্ডেজ ছিল- দেখে ভীষণ খারাপ লাগলো। তার সঙ্গে দেখা করে সেদিন রাতে বাসায় চলে আসি। ওখানে থাকতে পারিনি। কর্তৃপক্ষ অ্যালাউ করেনি। আব্বু ক্রিটিক্যাল কেয়ারে ছিলেন।

‘এদেশে এইযে এ ধরনের হামলা হয় আমরা অনেকে সহে নিচ্ছি। আপনার কাছে তো এই অনুভুতিটা অন্যরকম। একে তো মেয়ে, তার ওপর মনোবিজ্ঞানী কী অনুভুতি’ আপনার প্রশ্ন ছুঁড়তেই ইয়েশিম বলেন, এ ধরনের আক্রমন অবশ্যই প্রচণ্ড দুঃখের ব্যাপার। এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে অনেক দিন ধরেই। আব্বুর ওপর যে এটা প্রথম হয়েছে তা-নয়। এ ধরনের হামলা উপদ্রুবের মত, অশান্তির। অনেকে মানে, জঙ্গিরা এটা বলে যে, আব্বু ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু আমি বলব, এটা সত্য না। তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে একটা লেখাও লেখেনি, কথাও বলেনি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলেছেন। এরা (হামলাকারী গোষ্ঠী) হয়ত এটা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারে না। এই ধরনের মানুষগুলো ‘বাংলাদেশ’ না। এরা সমস্যা, সমস্যা সমাধানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি দেশে এ ধরনের সমস্যা আছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এরা 'সিরিয়াস প্রবলেম’। আমেরিকার কথা তো আর ছেড়েই দিলাম। এ সমস্যার সমাধানে সবাইকে কাজ করতে হবে। প্রতিরোধ করতে হবে। তবে ভেঙে পড়লে হবে না, দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

আপনার বাবার সঙ্গে প্রতিদিনই তো দেখা হয়। কত সময় কথা হয়-জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বুধবার আব্বুকে সিএমএইচের কেবিনে নিয়ে গেছে। কেবিনে নেওয়ার পর কোনো ভিজিটরকে যেতে দিচ্ছে না। শুধু আমাকে আর আমার মাকে যেতে দিচ্ছে। আগে প্রতিদিন আব্বুর কাছে পাঁচ-ছয় মিনিটের মত থাকার অনুমতি দিয়েছে। কেবিনে আনার পর একটু বেশি সময় তার কাছে থাকতে পারছি। বুধবার আব্বুকে দেখতে গিয়েছিলাম। তার মানসিক অবস্থা ভালো। তিন ঘণ্টা ছিলাম। বিকাল ৫টা থেকে আটটা পর্যন্ত ছিলাম।

অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবী -শিরোনামের একটি লেখার প্রসঙ্গ তুলতেই ইয়েশিম বলেন, আব্বু এটি লিখেছেন। এটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছাপা হয়েছে, আপ করা হয়েছে। এ লেখা লিখে আব্বু আমার হাতে দিয়েছিল। আমি স্ক্যান করে সেটা জয়নাল আঙ্কেলকে ই মেইল করেছি।

বাবা শক্ত মন নিয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন উল্লেখ করে ইয়েশিম বলেন, আমরা খুবই ভাগ্যবান, সিরিয়াস ইনজুরি হয়নি। হলে সিচুয়েশন অন্য রকম হতো। আব্বু, আম্মু দুজনেই শক্ত মনের মানুষ। এজন্য আমিও শক্ত আছি।

আমরা এখন হাসপাতালে গিয়ে নরমাল আলাপ করছি। কি হচ্ছে না হচ্ছে, দেশের ভেতরে ও পরিবারের বিভিন্ন বিষয় আমাদের আলোচনায় আসছে। আমরা বড় ভাই নবিল ইংল্যান্ড থাকে। সে-ও চলে আসবে। এক সপ্তাহের মধ্যে তার আসার কথা। সে আসার পর আমরা সবাই মিলে সময় কাটাতে পারব। এটা একটা ভালো অনুভুতি।

ইয়েশিম বলেন, আমার জন্ম ক্যালিফোর্নিয়ায়। আব্বু ও আম্মু সেখানে ছিলেন। আমার ছয় বছর বয়সে দেশে নিয়ে আসেন। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বড় হয়েছি। ঢাকায় এ লেভেল এবং পরে এ লেভেল পরীক্ষা দিয়েছি। আমার যখন ১২ বছর বয়স তখন সিলেটে টিচার্স কোয়ার্টারে আমাদের বাসায় জামাত-শিবির হামলা করেছিল। ১৭ বছর বয়সে ২০০৫ সালে নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাই। ২০০৯ সালে তা শেষ হয়েছে। তারপর চার বছর হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি বিষয়ে গবেষনার কাজ করি। ২০১২ সালের শেষের দিকে ঢাকায় আসি এক বছরের জন্য। তখন ‘কান পেতে রই’ নামের সংস্থাটি গড়ে তুলি।

জানান, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। তার আশা এক বছরের মধ্যে তা শেষ হবে। এখন পঞ্চম বর্ষে আছেন।  বাবার মতো লেখক হবার ইচ্ছে আছে কিনা জানতে চাইলে সাদাসিদে কথার মেয়ে ইয়েশিম বলেন, আমার খুব ইচ্ছে, আমি গল্পের বই লিখব। বাবা এক সঙ্গে অনেক কাজ করতে পারে। পিএইচডিটা শেষ করে লিখতে শুরু করব। বাবা বিশেষভাবে ছোটদের জন্য লেখে। আমি বড়দের জন্য লিখব, ফিকশন। একটু আধটু তো লিখি। মাঝে-মধ্যে ডায়েরি লিখি।

সূত্র: ঢাকাটাইমস

আর/১০:১৪/১২ মার্চ

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে