Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৯ , ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (111 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০২-২০১৮

সম্পূর্ণ হাসান আজিজুল হক

স্বকৃত নোমান


সম্পূর্ণ হাসান আজিজুল হক

যে যত বড় লেখক তার ভাষা তত সহজ। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাদেশে জীবিত লেখকদের মধ্যে উদাহরণ হিসেবে যাকে প্রথমে টানা যায় তিনি হাসান আজিজুল হক। মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত তার দুই খণ্ডের গল্পসমগ্র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লে যে কোনো পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন, হাসান আজিজুল হকের গল্পের ভাষা কোথা থেকে শুরু হয়ে কোন কোন বাঁক অতিক্রম করে শিল্পের কোন বিন্দুটিকে স্পর্শ করেছে।

ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্য, বিশেষত বাংলা ছোটগল্পে যে মৌলিক রূপান্তরটি ঘটে, হাসান আজিজুল হক সেই রূপান্তরকারী গল্পকারদের মধ্যে অন্যতম। দীর্ঘ অর্ধ শতকের শিল্প পরিক্রমায় গল্পের মাধ্যমে তিনি এমন এক শিল্প ভুবন তৈরি করে নিয়েছেন, তাতে তার পরবর্তী প্রজন্মের যারাই গল্প-উপন্যাস তথা কথাসাহিত্য চর্চায় এসেছেন, অনিবার্য কারণেই তাদেরকে তার গল্পের কাছে যেতে হয়েছে। বিষয়, ভাষা ও আঙ্গিকের স্বাতন্ত্র্যের কারণে আমরা সহজেই চিনে নিতে পারি হাসান আজিজুল হকের গল্প। দ্বিধাহীন বলে দেওয়া যায়, এ গল্পটি হাসান আজিজুল হকের। 

তার অধিকাংশ গল্পে ছিন্নমূল, উৎপীড়িত বাঙাল-মানুষের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বেদনা কিংবা জীবন-যন্ত্রণার যে হাহাকার শিল্পিত হয়ে উঠেছে, তাতে গল্পকার হিসেবে তাকে উন্নীত করেছে এক ভিন্নতর উচ্চতায়। বিচিত্রমুখী, নিরীক্ষাপ্রবণ তার গল্পগুলোতে উজ্জ্বল শিল্পচৈতন্য ও বাঙালি জনজীবনের নানা দিকের প্রতিফলন আমাদের মুগ্ধ করে। তার গল্পে চমক দেওয়ার কোনো ব্যাপার নেই, আবেগের বাহুল্য নেই; আধিক্য নেই উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক যোজনা কিংবা ভাষিক অলঙ্কারেরও। সকল মানবীয় বোধ এবং শিল্প-উপাদানকে সংহত-সংযত রেখে দৃশ্যের আড়ালে গুঁজে দিয়ে, অসম্ভব নির্দয় বাস্তব-পরাবাস্তব ও রূপকের আবরণে কল্পনাকে গল্পের নির্মোহ বুননে প্রকাশ করার এক অসাধারণ দক্ষতা তার। ফলে তার গল্প পড়ে আমরা চমকে উঠি না, বরং এক ভিন্নতর বোধে তাড়িত হই। এই তাড়না পাঠকের মধ্যে দীর্ঘকাল কাজ করে। এ কারণেই তার 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ', 'শকুন', 'তৃষ্ণা', 'জীবন ঘষে আগুন', 'নামহীন গোত্রহীন', 'আমৃত্যু আজীবন', 'পাতালে হাসপাতালে' ইত্যাদি গল্পের শিল্পচেতনা বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে সব সময় ভাস্বর হয়ে থাকে এবং থাকবে।

এবারের একুশে বইমেলা উপলক্ষে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে হাসান আজিজুল হকের নতুন গল্পের বই 'রাই কুড়িয়ে বেল'। এটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে হাসান আজিজুল হক রচিত সর্বমোট গল্পের একটা হিসাব পাওয়া গেল। মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত দুই খণ্ডের গল্পসমগ্রে রয়েছে ৬০টি গল্প। সর্বশেষ প্রকাশিত এই গল্পগ্রন্থে রয়েছে ১২টি। এর মধ্যে ৪টি আবার গল্পসমগ্রের দ্বিতীয় খণ্ডেও রয়েছে। সেই হিসেবে তার গল্পসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৬৮টি। হিসাবটা করেছি এ জন্য যে, মাত্র ৬৮টি গল্প লিখে বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ গল্পকারের আসনটি নেওয়ার নজির আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে খুব বেশি নেই।

'রাই কুড়িয়ে বেল' গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোকে হাসান আজিজুল হক 'উপেক্ষিত' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই অর্থে যে, গল্পগুলোর মধ্যে দু-একটি ছাপার যোগ্য নয় বলে তিনি কোথাও প্রকাশের জন্য দেননি। দু-একটি লেখার পর বা কোনো পত্রিকায় প্রকাশের পর তিনি আর খুঁজে পাননি। ভুলেই গেছেন, গল্পগুলো তিনি লিখেছেন। এই অর্থে গল্পগুলো 'উপেক্ষিত'ই বটে। একজন লেখক একই সঙ্গে একজন পাঠকও। তার লেখা কোন গল্পটি ঠিক গল্প হয়ে উঠেছে, আর কোনটি হয়ে ওঠেনি, সবার আগে লেখক নিজেই টের পান। হাসান আজিজুল হকও টের পেয়েছেন, এ বইয়ের কোনো কোনো গল্প ঠিক ঠিক গল্প হয়ে ওঠেনি। তাই তিনি কোথাও ছাপতে দেননি, কোনো বইয়ের অন্তর্ভুক্ত করেননি। কিন্তু 'হয়ে না-ওঠা' গল্পগুলো পড়ে পাঠক হিসেবে আমাদের ঠিক মনে হয় না এসব গল্পের মধ্যে 'হয়ে না-ওঠা'র কোনো ব্যাপার আছে। যারা হাসান আজিজুল হকের মনোযোগী পাঠক, গল্পগুলো পড়ার সময় তারা ঠিক ঠিকই হাসান আজিজুল হককে খুঁজে পাবেন। খুঁজে পাবেন তার গল্প বলার ভঙ্গি, তার সেই স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গি, সেই সুপ্ত হাস্যরস। 

হ্যাঁ, গল্পগুলো পড়ার সময় কোথাও কোথাও যে একটু হোঁচট খেতে হয় না, তা কিন্তু নয়। যেমন 'পুরনো হৃদয়তল' গল্পটির একটা জায়গায় তিনি লিখেছেন, '...ব্রিজের দু-পাশে কোনো রেলিং নেই, অনেক নিচে খাড়ি নদী কুল কুল বয়ে যাচ্ছে।' লাইনটি পড়ার সময় হাসান আজিজুল হকের পাঠকদের মনে হতে পারে, এই গল্পটি বহু আগের লেখা। গল্পটি যদি সাম্প্রতিককালে লেখা হতো, তবে হয়তো হাসান আজিজুল হক অতিব্যবহূত 'কুল কুল' শব্দ দুটি ব্যবহার করতেন না, অন্য কোনো শব্দ দিয়ে নদীর প্রবহমানতাকে ধরতেন। তার মানে কোনো না কোনোভাবে টের পাওয়া যায়, গল্পগুলোকে কেন তিনি উপেক্ষা করেছিলেন। এই উপেক্ষা লেখক হিসেবে তিনি করতেই পারেন। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমাদের একবারও মনে হয় না গল্পগুলো ঠিক উপেক্ষার যোগ্য।

'রাই কুড়িয়ে বেল' প্রকাশের মধ্য দিয়ে হাসান আজিজুল হকের যা কিছু অপ্রকাশ্য ছিল তাও প্রকাশিত হলো। এর মধ্য দিয়ে আমরা জানতে পারব একজন সম্পূর্ণ হাসান আজিজুল হককে। এই কাজটির জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ প্রাপ্য ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশের প্রকাশক জহিরুল আবেদীন জুয়েল। তার আন্তরিক প্রচেষ্টা না থাকলে এ বই যে প্রকাশ পেত না, তা হাসান আজিজুল হক বইটির ভূমিকাতেই উল্লেখ করেছেন। এখানেই একজন প্রকাশকের দায়, এটাই হচ্ছে প্রকাশকের কাজ। 

লেখক
হাসান আজিজুল হক
প্রকাশক
ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ
প্রকাশকাল
ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ
সমর মজুমদার
মূল্য ২০০ টাকা

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ১২:৩৩/ ০২ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে