Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ , ১২ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (37 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৩-১৯-২০১৩

রূপগঞ্জের ত্রাস মোশারফের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে


	রূপগঞ্জের ত্রাস মোশারফের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে

নারায়ণগঞ্জ, ১৯ মার্চ- নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ত্রাস মোশারফ বাহিনীর প্রধান মোশারফ হোসেন মোশার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মারপিটের মামলায় মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন মোশারফ। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রুপম জামিন নামঞ্জুর করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এরপরই পুলিশ মোশারফকে গ্রেফতার করে প্রথমে কোর্টের হাজতখানা ও পরে কারাগারে পাঠায়। ওই মারপিটের মামলায় প্রধান আসামি ছিলেন মোশারফ।

মোশারফ হোসেন মোশা উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া এলাকার মোতালিব মিয়ার ছেলে।

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) হাবিবুর রহমান মামলার বরাত দিয়ে জানান, ১১ মার্চ নাওড়া এলাকার নুরু মিয়ার ছেলে ব্যবসায়ী আজিবুর রহমান বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলায় মোশারফ ছাড়াও সাফাতউল্লাহ, অনু, জামাল, তাজেল, জামাল, আয়েব আলী, সপুম, নয়ন ও জামালকে আসামি করা হয়েছে।

মামলায় বাদী অভিযোগ করেন, ১১ মার্চ দুপুর ১২টায় আজিবুর রহমান ও তার ব্যবসায়ীক পার্টনার আজিজুল বালু নদীর পাড়ে যান। এসময় মোশারফসহ ওই ১০ জন তাদের আটকে বেধড়ক মারধর করেন এবং তাদের কাছে থাকা টাকা-পয়সা ও মোবাইল লুটে নেন। টের পেয়ে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান।

উল্লেখ্য, গত এক বছরে মোশাররফ বাহিনী প্রায় ৬০টি সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। সর্বশেষ ১০ মার্চ (রোববার) রাতে আজিবুর রহমান নামে এক কাঁচামাল ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে মোশাররফ ও তার বাহিনীর সদস্যরা। আহত আজিবুর রহমানের অভিযোগটি তদন্ত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) মামুন মিয়া।

জানা যায়, এছাড়া এলাকায় ছিনতাই, ডাকাতি, জমি দখল, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি ও তার বাহিনী জড়িত। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মূর্তিমান আতঙ্ক `মোশাররফ বাহিনী`র প্রধান মোশাররফ হোসেনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্থানীয় লোকজন।

এ বাহিনীর অত্যাচারে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। মোশারফের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানাসহ বিভিন্ন থানায় ডজন খানেকেরও বেশি মামলা রয়েছে। এতো কিছুর পরও রহস্যজনক কারণে সন্ত্রাসী মোশারফকে গ্রেফতার করতো না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্থানীয় লোকজন ও ভুক্তভোগীরা জানান, রূপগঞ্জের অপরাধ জগত এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন মোশাররফ। কখন কার জমি গ্রাস করতে মোশাররফ বাহিনী তৎপর হয়, এমন আশঙ্কায় দিন কাটে তাদের।

ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় মোশাররফ বাহিনী দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা সশস্ত্র অবস্থায় গ্রামের পর গ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সাধারণ কৃষকের বাপ-দাদার ভিটাবাড়ি জোর করে দখল করে নিচ্ছে।
 
এতোদিন মোশাররফের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতো না। উল্টো অভিযোগকারীর কথা জানাজানি হওয়ার পর বাধ্য হয়ে অনেককেই গ্রাম ছাড়তে হয়েছে।

তারা আরো জানান, মোশাররফ বাহিনীর তাণ্ডব ও মামলার খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর মোশাররফ ও তার বাহিনী গা ঢাকা দেয়। এরপর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে তারা আবারো দখলের মহোৎসবে মেতে ওঠে।

কে এই মোশাররফ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলার নাওড়া এলাকার বেশিরভাগ মানুষের পেশা কৃষি। জমির দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে নাওড়া এলাকার মোতালিব মিয়ার ছেলে ছিঁচকে চোর মোশাররফ নিরীহ মানুষের জমি দখল শুরু করেন। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন ভোল পাল্টে সে দলের কর্মী বনে যান তিনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি যুবলীগ নেতা বনে যান। অবৈধ উপায়ে মূলত জমি দখল করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান তিনি।

ধীরে ধীরে তৈরি করেন বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। বর্তমানে ৩শ’ অস্ত্রধারীর একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই মোশাররফ।

এই বাহিনী চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্ম করলেও সাধারণ মানুষের জমি দখল করাই মোশাররফের প্রধান পেশা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে মোশারফ শুরু করেন সাধারণ মানুষের জমি দখল।

তার বাহিনী চারটি ভাগে বিভক্ত করা রয়েছে। একটি গ্রুপ তাকে নিরাপত্তা দেয়। তাদের প্রত্যেকের কোমড়ে থাকে পিস্তল ও আগ্নেয়াস্ত্র। আরেকটি গ্রুপ জমি দখলের কাজে নিয়োজিত। অন্য একটি গ্রুপ মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। আর সর্বশেষ গ্রুপটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদা আদায়ের কাজে ব্যস্ত থাকে।

এলাকার নিরীহ মানুষ এ বাহিনীর অত্যাচারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এ বাহিনীর অত্যাচারে অনেকেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। স্থানীয়রা ভয়ে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করার সাহসটুকুও পায় না।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, নদী পথে প্রচুর মাদক আসে রূপগঞ্জে। আর এ মাদকের গডফাদার মোশাররফ। এসব মাদক রূপগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করে থাকে তার বাহিনীর সদস্যরা। এ বাহিনীর সঙ্গে কারও তর্কবিতর্ক হলে ফাঁকা গুলির ঘটনা ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। যাদের জমিজমা রয়েছে তারা থাকেন সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে। মোশাররফের চোখ ওইসব জমিতে পড়লে জোর করে তিনি তা দখলে নেবেন।

এছাড়া প্রাণনাশের হুমকির মুখে বাধ্য হয়ে কম মূল্যে জমি বিক্রি করতে হবে।

সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করতে এ বাহিনী কয়েকদিন পরপর ত্রাস  সৃষ্টি করে। কেউ এর প্রতিবাদ করতে গেলেই মামলা হামলা, মারপিট বা হত্যার স্বীকার হতে হয় প্রতিবাদকারীকে।  

মোশাররফের জাল দলিল করে শত শত বিঘা কৃষি জমি দখল করে বালু ভরাট করেছেন।

গজারিয়া এলাকার একব্যক্তি জানান, মোশারফ ও তার বাহিনী তাদের  ৯৮ শতাংশ জমি জাল দলিল করে বালু ভরাট করে দখল করে ফেলেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাওড়া এলাকার এক কৃষক জানান, মোশারফ বাহিনী তাদের ৮০ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে। জমি না কিনেই নিরীহ কৃষকদের জমি দখল করে নিয়েছে এ বাহিনী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মোশাররফ হোসেন ওরফে ছিঁচকে চোরা মোশাররফ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি করে হাত পাকিয়ে এখন সন্ত্রাসীদের গডফাদার হয়েছেন। তার নির্দেশ ছাড়া এলাকার কোথাও কোনো অপকর্ম ঘটে না।

গত বছর মোশাররফ বাহিনীর হামলায় গুরুতর আহত হন রূপগঞ্জের নাওরা এলাকার কালিপ্রসাদ ও সুশীল। দুই লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে মোশাররফ ও তার বাহিনীর সদস্যরা তাদের পিটিয়ে আহত করে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর ফেলে রেখে যায়। পরে প্রাণভয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যান কালিপ্রসাদ ও সুশীল।

গত বছরের ৭ মে মোশাররফ বাহিনীর সদস্য আবদুল মোতালিব, বদিউল আলম, সাখাওয়াত উল্লাহ,  আনোয়ার হোসেন,  মজিবরসহ আরও ১৫/২০ জন সন্ত্রাসী পিস্তল, রামদা, বল্লম ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নাওরা গ্রামের মোক্তার হোসেনের বাসায় ঢুকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। কিন্তু চাঁদা দিতে না চাইলে সন্ত্রাসী মোশাররফ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেন।

এসময় মোক্তার হোসেনকে হত্যার হুমকি দেয় এই বাহিনী। সন্ত্রাসীরা মোক্তারের চাচাতো ভাই নবী হোসেনের ঘরে ঢুকেও ভাঙচুর চালায়। সেখান থেকে তারা নগদ ৭০ হাজার টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারসহ দুই লাখ ৪০ হাজার টাকার মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়।

এছাড়া নবী হোসেনের বাসার মালপত্র ভাঙচুর করে আরও দুই লাখ টাকার ক্ষতি করে। নবীকে এসময় তারা হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।

এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা (মামলা নম্বর: ১৭) করা হয়।

একই বছরের ২৯ মার্চ দুপুরে একই এলাকার আমির হামজাহর বাসায় একই কায়দায় হামলা চালায় মোশাররফ বাহিনী। দিনে দুপুরে সশস্ত্র অবস্থায় সন্ত্রাসীরা আমিরের বাসায় ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। ওই ঘটনায়ও রূপগঞ্জ থানায় মামলা হয়।

২০১২ সালের ৬ মে বড় বেরাইদে নাজিম উদ্দিন তার নিজের জমিতে ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাটের সময় বাধা দেয় মোশাররফ বাহিনী। এসময় চাঁদার দাবিতে তারা একটি ড্রেজারে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দু’টিতে ব্যাপক ভাঙচুর করে।

এতে প্রায় আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে রূপগঞ্জ থানায় করা ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের শেষ নেই। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পেশাদার খুনি ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনা দেখা যায় নাওড়া এলাকায়। তাদের দিয়েই গোটা এলাকায় রামরাজত্ব কায়েম রেখেছেন মোশাররফ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপগঞ্জ থানার এক কর্মকর্তা জানান, ক্ষমতাসীন দলের ওপর মহলের তদবিরের কারণেই তাকে এতোদিন গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

নারায়নগঞ্জ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে