Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (111 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-০২-২০১৮

অসামান্য কথাকার

হাসনাত আবদুল হাই


অসামান্য কথাকার

শওকত আলীর সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছে বছর চারেক আগে। একটি দৈনিক পত্রিকা আয়োজিত ঘরোয়া এক আয়োজনে সেদিন তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল প্রায় বছর দশেক পরে। দেখলাম রুগ্‌ণ হয়ে গেছেন। অসুস্থ, বোঝাই গেল। এর আগেও শুনেছিলাম তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা রকম অসুখে ভুগছিলেন। যার জন্য লেখালেখি ঠিক করতে পারছেন না। সেদিন বেশি কথাবার্তা হয়নি। মনে হলো দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার ফলে তিনি সামাজিক জীবনে আর খুব একটা ফিরে যেতে আগ্রহী নন। কেমন একটা ক্লান্তিবোধ করছিল তার মধ্যে। শুনেছি মৃত্যুর আগে তিনি একটা উপন্যাস লিখেছেন। উপন্যাসটা কি আগের না সাম্প্রতিক- সেটা পড়লে বোঝা যাবে।

শওকত আলী শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন- তার মূল্যায়ন আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। এ জন্য হবে যে, তিনি বাংলা ভাষার অত্যন্ত শক্তিশালী একজন কথাসাহিত্যিক। তিনি খুব বড় গদ্য বা প্রবন্ধ লেখেননি- তার প্রায় সব লেখাই ছোটগল্প ও উপন্যাস। কথাসাহিত্যের এ দুই শাখাতেই তিনি তার শক্তিমত্তার মান রেখেছেন।

পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উপন্যাস লেখা বিরল ঘটনা ছিল। উপন্যাস তখন লিখেছেন জহির রায়হান, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌; কিছু লিখেছেন আলাউদ্দীন আল আজাদ এবং আরও কেউ কেউ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌ প্রবাসে থেকে অনেক দিন পর পর একটা বই লিখছেন। সব মিলিয়ে পঞ্চাশের দশকে উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রটা খুব যে সমৃদ্ধ ছিল এমন নয়। এর কারণ হিসেবে আমার যা মনে হয়- তখন লেখার মতো তেমন কোনো সাহিত্য পত্রিকা বেরোতো না। এখন যেমন ঈদসংখ্যা বের হয়। তখন এসব ছিল না। আমাদের দেশে উপন্যাস লেখা বেড়ে গেল এই ঈদসংখ্যাকে কেন্দ্র করে। সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে মূলত ছোটগল্পই স্থান পায়। তখনকার সেই পরিবেশে শওকত আলী একটা ট্রিলজি লিখলেন- 'দক্ষিণায়নের দিন', 'কুলায় কালস্রোত' এবং 'পূর্বরাত্রি পূর্বদিন'- এ তিনটি উপন্যাস একত্রে ত্রয়ী উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত। ত্রয়ী উপন্যাস সম্পর্কে শওকত আলী একবার বলেছিলেন- "ষাটের দশকের মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনায় যে পরিবর্তন আসছে, সেটাই 'দক্ষিণায়নের দিন' যার মানে হচ্ছে শীতকাল আসছে। 'কুলায় কালস্রোত' হচ্ছে পরিবর্তন- যেখানে আঘাত করছে। আর 'পূর্বরাত্রি পূর্বদিন' হচ্ছে নতুন সময় আসার একেবারে আগের সময়টি। মূলত ষাটের দশকে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসে। নতুন একটা চিন্তা-চেতনা দ্বারা আলোড়িত হয় পুরো সমাজ। ধ্যান-ধারণা, চাল-চলন ও জীবনব্যবস্থায় একটা পরিবর্তনের সুর বেজে ওঠে। সেসবই উপন্যাসে আনতে চেয়েছি।" 

সমাজের অন্তর্ভেদী এমন গভীর অভিনিবেশ নিয়ে উপন্যাস নির্মাণে ক্ষমতাধর ছিলেন শওকত আলী। তখনকার দিনে এটা ছিল একটা দুঃসাহসিক ব্যাপার। প্রকাশকরা এ উপন্যাসত্রয়ী ছাপতে আগ্রহী নন। সাহিত্যের প্রতি এ প্রকাশকদের তেমন আগ্রহ নেই। সেই পরিবেশে শওকত আলী এই ট্রিলজি লিখলেন। এটা ছিল একটা বিস্ময়কর ব্যাপার। এ ট্রিলজি কোনো বিনোদনমূলক উপন্যাসের নয়; কিংবা কোনো রোমান্টিক কাহিনীও নয়- এটা রাজনৈতিক, প্রগতিশীল আন্দোলন ও সামাজিক সংকটের বয়ানধর্মী। সাধারণ পাঠকের কাছে এ ত্রয়ী উপন্যাস সে অর্থে খুব আকর্ষণীয় মনে হবে না। খুব সিরিয়াস পাঠকের কাছে এ ধরনের উপন্যাসের হয়তো চাহিদা আছে। তবে চাহিদা আছে কি নেই- শওকত আলী এ কথা চিন্তা করার মতো সাহিত্যিক ছিলেন না। সাহিত্য ও সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতার চিন্তা থেকেই তিনি সাহিত্য চর্চা করতেন। এবং সেই বোধ থেকে তিনি এই ট্রিলজি লিখেছেন। এ ট্রিলজিতে সেই সময়কার বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনের যেসব সমস্যা এবং সেসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য যে উপায় বের করে নেওয়া হচ্ছিল তার একটা অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাওয়া যায়। কেউ খোলাখুলি রাজনীতি করছে, কেউ আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছে। কারও চিন্তা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়া, আবার কারও মত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকে। এসব জীবন সংগ্রামের নানা দিক শওকত আলী তার ট্রিলজিতে অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরেছেন। আমরা বলতে পারি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের, বিশেষ করে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের যদি কেউ সার্থক রূপকার থেকে থাকেন, তিনি শওকত আলী। এখানে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কেউ এ পথে আর সেভাবে অগ্রসর হননি। সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সমাজের যে সমস্যা ও বৈচিত্র্য- সে সমাজের নানা চরিত্র এবং তাদের জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে এত বড় প্রেক্ষাপটে কেউ আর উপন্যাস লেখেননি। আমাদের তৎকালীন মধ্যবিত্ত সমাজের এত বিশাল বড় ক্যানভাস কেউ আর এমনভাবে অঙ্কন করতে পারেননি।

সে সময়ে রাজনীতি নিয়ে লেখা খুব কঠিন ছিল। কেননা পাকিস্তান সরকার রাজনীতির ব্যাপারে খুব স্পর্শকাতর ছিল। লেখালেখিতে রাজনীতির গন্ধ পেলেই সেই লেখকের পেছনে উঠেপড়ে লাগত। 

শওকত আলী কম বয়সেই প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী ছিলেন। রাজনীতি নিয়ে, সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় প্রায় বছরখানেক তাকে জেলও খাটতে হয়েছিল। তবে জেলে থাকার সময় তার সাথে অনেক সাঁওতাল, মুরমু প্রভৃতি আদিবাসী-উপজাতির পরিচয় হয়েছিল। শওকত আলীর অনেক লেখায় বিশেষ করে গল্পে এসব আদিবাসীর কথা এসেছে। পরে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি যখন পেশাজীবনে প্রবেশ করেছেন, দিনাজপুরে তখনও তিনি অনেক উপজাতির সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের জীবন ও ভাষা উপলব্ধি করেছেন। সেসবই তার অনেক লেখায় স্থান পেয়েছে। এমন দক্ষতার সঙ্গে তিনি উপজাতিদের ভাষা রপ্ত করেছিলেন, যাতে মনে হয় তিনি আদিবাসীদেরই একজন। তার বিখ্যাত 'শুনো হে লখিন্দর' গল্পে উপজাতি লোকটি ব্যবসায়ী লক্ষ্মীকান্তকে বিনয়ের সঙ্গে তার অভিযোগ আর ক্রোধ প্রকাশ করেছেন- সে প্রকাশে তার ভাষা এত 'অরিজিনাল' যে, কেউ বিশ্বাসই করবেন না শওকত আলী সেই উপজাতিদের লোক নন।

শওকত আলীর উপন্যাসগুলো প্রধানত মধ্যবিত্ত সমাজকে কেন্দ্র করে। তার বেশিরভাগ ছোটগল্প চিত্রিত হয়েছে ওই আদিবাসী সাঁওতাল ও মুরমুদের জীবনযাত্রা ঘিরে। আর সব মিলিয়ে শওকত আলী তার একটা শক্তিশালী নিজস্ব ভুবন তৈরি করতে পেরেছেন। ভাষা, পটভূমি, ব্যাখ্যা এবং প্রকাশে তার একটা স্বকীয়তা অর্জিত হয়েছিল। যা ওই সময়ে আর অন্য কোনো লেখকের লেখায় অতটা স্পষ্ট করে প্রকাশিত হতে দেখা যায়নি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে লেখকদের মধ্যে সবাইকে অতিক্রম করে গেছেন তার স্বকীয়তা দিয়েই। আর এই স্বকীয়তা এসেছে কীভাবে? মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনকে তিনি একটা নয়, তিন তিনটা উপন্যাসে বিশদভাবে তুলে ধরেছেন; এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যা অনেকেই সাহস করেননি। এটা শওকত আলীর একটি কৃতিত্ব। যে জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। 

আর তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আবশ্য আরও একটি কাজের জন্য- বাংলা সাহিত্যে যা ইতিমধ্যে একটি ধ্রুপদী সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্থান অর্জন করে নিয়েছে। সে কাজটির নাম 'প্রদোষে প্রাকৃতজন'। এ এক অসাধারণ ও ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিক উপন্যাস। বাংলার সেন আমলের জীবনবৈচিত্র্য ও সংগ্রামের কথা এ উপন্যাসে ইতিহাসের আলোয় তুলে ধরেছেন শওকত আলী। বাংলার সে সময়ের এমন বিশ্বস্ত দলিল আমরা আর কারও লেখায় পাইনি। অন্য কেউ এভাবে ইতিহাসের অন্ধকার ঘেঁটে, এমন পেছনে গিয়ে কথাসহিত্যের ক্যানভাসে সৃষ্টি আমাদের উপহার দেননি। শওকত আলী তার এই সৃষ্টি দিয়ে বাঙালির অতীত ইতিহাসকে যেভাবে মলাটবদ্ধ করেছেন, তা এক কথায় অনন্য। কেউ যদি বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী উপন্যাসের একটা তালিকা তৈরি করেন, সেটা যদি দশটা উপন্যাসেরও হয়, তাতে 'প্রদোষে প্রাকৃতজন' থাকবেই। সেই সাথে শওকত আলীর প্রায় প্রত্যেকটি উপন্যাস আমাদের মূল্যবান সামাজিক দলিল। 'প্রদোষে প্রাকৃতজন' আর ট্রিলজি উপন্যাসই নয়; ওয়ারিশ, উত্তরের খেপ, পতন, দলিল, নাঢ়াই, বসত- এমন বহু উপন্যাসের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সূত্র:সমকাল
এমএ/০৮:৫৫/০২ ফেব্রুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে