Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০২-২০১৩

প্ররোচনার বিরুদ্ধে চাই সংহতির ঐক্য

ফকির ইলিয়াস



	প্ররোচনার বিরুদ্ধে চাই সংহতির ঐক্য

শ্রদ্ধেয় শওকত ওসমান সব সময়ই কথাটি বলতেন- ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা সবসময়ই মুক্তিযোদ্ধা নয়, কিন্তু একজন রাজাকার সব সময়ই রাজাকার।’ বাংলাদেশে চলমান সময়ে কিছু খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধারও চরম নৈতিক স্খলন ঘটেছে। যা হতবাক করেছে জাতিকে যদিও কিন্তু তারা অবাক হননি। একজন মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী তাদের মাঝে একজন। তিনি একাত্তরে যে রাজাকারের বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করেছিলেন- এখন তার কর্মকান্ড, লেখালেখি প্রকারান্তরে সেই রাজাকারদের পক্ষেই যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের দিকে তাকালে আমরা এ রকম অনেক উদাহরণই দেখি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর জন্ম হয়। সে দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মেজর (অব.) এম এ জলিল। তার নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর হয়ে হাজার হাজার তরুণ আত্মাহুতি দেয়। সেই এম এ জলিল, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আদর্শ পাল্টে একটি ইসলামি দলে যোগদান করেন। ‘হিরো’ থেকে ‘জিরো’ হয়ে যান জলিল। বাংলাদেশের প্রজন্ম এবং ইতিহাস তাকে কেমনভাবে মনে রেখেছে তা সকলেরই জানা। একটি মহান আদর্শের বিপ্লব কখনো শেষ হয় না। আমরা যদি চেগুয়েভারার জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, চে দেশ থেকে দেশান্তরী হয়েছেন। বিপ্লবের বিজয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত আত্মবিসর্জন দিয়েছেন। তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি আদর্শচ্যুত হননি। বলা যায় বাংলাদেশের কর্নেল তাহরের কথাও। একজন বীর, কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করতে পারেন নাÑ তাহের সে শিক্ষা এই জাতিকে দিয়ে গেছেন। তার রাজনীতি, তার আদর্শ গণমানুষের পক্ষে ছিল বলেই, তিনি মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করেছিলেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তারাও একটি নিবেদিত আদর্শ বুকে ধারণ করতেন। যার ফলে তাদের মৃত্যুভয় কখনই ছিল না। সাম্প্রতিককালে শ্রীলঙ্কার গেরিলা নেতা প্রভাকরণ, এর উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছেন। তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু মুক্তিকামী এই গেরিলা নেতা আদর্শচ্যুত হননি। বিশ্বের সমাজতন্ত্রের এখন দুঃসময়। তারপরও কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রো কিংবা ভেনেজুয়েলার হুগো শ্যাভেজ এখনো যে ঝাণ্ডা তুলে দাঁড়িয়ে আছেন, তা তাদের আদর্শেরই উড্ডীন পতাকা। কারো তা ভালো না লাগতে পারে। ভিন্নমত থাকতে পারে কিন্তু ক্যাস্ত্রো-শ্যাভেজ এখনো এই বিশ্বের অনেক পরাক্রমশালীর চক্ষুশূল। এর কারণ তারা তাদের আদর্শের সঙ্গে আপোস করছেন না।
 
ফিরে আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীই নয়, আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধাই এখন আদর্শচ্যুত। কাদের সিদ্দিকী বারবার বলেন, বিএনপি যদি জামাতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে তার দল বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করবে। কী অরণ্যে রোদন! বেগম জিয়া মৌলবাদীদেরই বেশি পছন্দ করেন। এটা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত বিষয়। তারপরও কাদের সিদ্দিকী উলুবনে মুক্তা ছড়াচ্ছেন কেন? তিনি কি জানেন না, জামাত-বিএনপির গলার মনিহার! বাংলাদেশে কাদের সিদ্দিকীরা মূলত কোন মতবাদের পারপাস সার্ভ করছেন- তা এখন আর অস্পষ্ট নয়। তার কর্মকা-ের সকল ফসলই জামাত-জঙ্গিবাদীদের ঘরে উঠছে। যেমনটি এক সময়ের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদী সম্পাদক, কবি আল মাহমুদ করেছিলেন। আল মাহমুদের কবিতাকে বাংলা সাহিত্য থেকে খারিজ করা যাবে না ঠিকই কিন্তু পৌঢ় জীবনে ব্যক্তি আল মাহমুদ কোনো মৌলবাদী সংগঠনে যুক্ত না হয়েও পরোক্ষভাবে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের যে উপকার করেছেন- তা এই প্রজন্ম ঘৃণার সঙ্গেই স্মরণ করছে। এবং তা তারা ক্ষমাও করবে না। বাংলাদেশে চলমান গণজাগরণ আমাদের আবারো অনেক কিছু চিনিয়ে দিয়েছে। গেলো ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার গোটা দেশজুড়ে নব্য রাজাকাররা শহীদ মিনারে আক্রমণ করেছে। জাতীয় পাতাকা পুড়িয়ে দিয়েছে। অবমাননা করেছে। আমরা টিভিতে খুব স্পষ্টভাবেই দেখেছি জুমার নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ওরা জঙ্গি কায়দায় দৌড়ে বেরিয়ে রাজপথ দখল করেছে। মোনাজাতে পর্যন্ত তারা অংশ নেয়নি। এই হচ্ছে তাদের ইসলামপ্রীতি। আমরা দেখেছি তরুণদের হাতে তারা পবিত্র আল কুরআন তুলে দিয়ে রাস্তায় নামিয়েছে। যাতে পুলিশ আইন প্রয়োগ করতে গেলে পবিত্র কুরআন শরিফকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কী জঘন্য তাদের মানসিকতা। আমাদের মনে আছে একাত্তর সালেও তারা ঠিক এমনটিই করেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধকে তারা ‘ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বলেছিল। শেষ দিকে এসে তারা বলেছিল, ‘ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। কিন্তু শেষ রক্ষা তাদের হয়নি। এটাই ইতিহাস। এটাই বাঙালি জাতির রক্তাক্ত অর্জন। কারণ বাঙালি জাতি গর্জে উঠলে তাদের আর দাবিয়ে রাখা যায় না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাত মার্চের ভাষণ শুনলে আমরা আবারো দেখবোÑ তিনি বলেছিলেন ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ধর্মের প্রতি, মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল। আর ছিল বলেই বাংলাদেশ, বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। পরাজিত হয়েছিল খুনি-ধর্ষক হায়েনা চক্র। যারা এই ২০১৩ সালেও আবার সেই পুরোনো দোহাই দিয়ে বাংলাদেশ রক্তাক্ত করছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছেন, তার সরকার মহানবী (সা.) এর বিরুদ্ধে কোনো কথাবার্তা মোটেই সহ্য করবে না। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যারা এসব বলতে চাইছে এবং যারা তা প্রচার করে সমাজকে উসকে দিতে চাইছে উভয় পক্ষই সমান দোষী। এবং আইনগত ব্যবস্থা উভয়ের বিরুদ্ধেই নেয়া হবে। দেশের তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুও বলেছেন, ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো অপপ্রচার বরদাশত করা হবে না। তারপরও একটি চিহ্নিত মহল জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন করতে চাইছে।
 
১৯৭১ সালে যেমন সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণ করে হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় সাংবাদিকদের ওপর বিনা কারণে হামলা করা হয়েছে। ঢাকার রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছে সাংবাদিকদের রক্তে। দেশের মানুষ দেখেছেন পরাজিত রাজাকার শক্তির কালো হাতের কর্মকা-। যারা পতাকা পুড়িয়েছে, যারা শহীদ মিনার ভাঙচুর করেছে এরা রাষ্ট্রদ্রোহী। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে যে গণজাগরণ তৈরি হয়েছে, তাকে একটি মহল ‘প্যারালাল’ সরকার বলে চালাতে চাইছে। অপবাদ দিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। চারদলীয় জোটের ক্ষমতাকালীন ‘হাওয়া ভবন’ নামে সরকারের একটি প্যারালাল ছায়াশক্তি ছিল। যারা মূলত সরকার নিয়ন্ত্রণ করতো। কই, তখন তো এই জঙ্গি মদতদাতারা প্যারালাল সরকারের কথা তোলেনি। কেন তোলেনি? ধর্ম যে কোনো মানুষের জন্যই একটি সংবেদনশীল বিষয়। তাই বাংলাদেশে কারোই উচিত হবে না ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করে সমাজকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়া।
 
চলতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, সাবেক মন্ত্রী জননেতা তোফায়েল আহমেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, জঙ্গিবাদীদের নিষিদ্ধ না করার পরও তারা জনসমক্ষে যে জঘন্য আচরণ করছে, নিষিদ্ধ করলেও তারা একই আচরণ করবে। অতএব পার্থক্য কোথায়? তাই শক্ত হাতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশে অনেক হাক্কানি আলেম সমাজ আছেন, যারা মওদুদিবাদী ঘৃণ্য রাজনীতির প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। এরা সকলেই যুদ্ধাপরাধী। মানবতাবিরোধী আলবদর-রাজাকারদের বিচার চান। সময় এসেছে তাদের সবাইকে এক কাতারে এনে ঐক্য গড়ে তোলার। যে ধর্মীয় ঐক্য ও চেতনার তোড়ে ভেসে যাবে মওদুদিপন্থীদের ভ্রান্ত মতবাদ।
 
আমরা দেখছি, চরম জঙ্গিবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রশ্নে বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ‘ডায়লগ’ করার আহ্বান জানাচ্ছেন কোনো কোনো মধ্যপন্থী মহল। তাদের সবিনয়ে বলি, বিএনপি কি কখনো জঙ্গিবাদী, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ঘৃণা করেছে? জন্মই যাদের সুবিধাবাদী রাজনীতির ওপর, তারা কি জঙ্গিবাদী দমনে সচেষ্ট হবে? জাতীয় পতাকা পোড়ানোর পরও শহীদ মিনার ভাঙচুরের পরও। বিএনপি নিন্দা জানিয়ে কোনো বিবৃতি দিয়েছে? না দেয়নি। তাহলে টকশোর নায়করা কার সঙ্গে ডায়লগের কথা বলছেন? দেশকে নারকীয় তা-বের দিকে ঠেলে দেয়ার প্ররোচনা আগামী দিনগুলোতে আরো বাড়তে পারে। জঙ্গিবাদীরা নিজেরাই মসজিদ, আল কুরআন, এর অবমাননা করে সমাজকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তাই রাষ্ট্রবাসীকে খুব সাবধানে এগুতে হবে। একটি রাষ্ট্রের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে চাইলে, অনেক অপশক্তিকেই দমন করতে পারে। যেমনটি একাত্তরে বাঙালি জাতি করেছিল। আবারো বলি, প্রজন্মকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে খুবই ধৈর্যের সঙ্গে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে